জনগণকে ৭১ ভুলে যেতে বলেছিলেন শেখ মুজিব

১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তানের লাহোরে ওআইসি সম্মেলন থেকে ফিরে এসে মার্চ মাসে ভারতীয় সাংবাদিক কুলদীপ নায়ারকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন দেশের জনগণের উচিত একাত্তরের তিক্ত অভিজ্ঞতা ভুলে যাওয়া। এই কথা আনুষ্ঠানিকভাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে ঐ বছরেরই ৯ এপ্রিল ভারতে বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে স্বাক্ষরিত ত্রিদেশীয় চুক্তিতে যেখানে ১৪ নম্বর দফায় আছে: ” … the Prime Minister of Bangladesh had declared with regard to the atrocities and destruction committed in Bangladesh in 1971, that he wanted the people to forget the past and to make a fresh start, stating that the people of Bangladesh knew how to forgive.”

১৯৭৪ সালে পাকিস্তান সফর শেষে শেখ মুজিব
কুলদীপ নায়ার
দ্য অভজার্ভার, ঢাকা,
২৭শে ফেব্রুয়ারী ১৯৭৪

ভারত ও পাকিস্তানের মতপার্থক্য মীমাংসায় এবং প্রতিবেশী হিসেবে বসবাসে সহায়তা করতে চান শেখ মুজিব

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব আজ ঢাকায় একটি একান্ত সাক্ষাতৎকারে বলেছেন যে, তিনি ভারত পাকিস্তানের মাঝে পার্থক্য নিরসনে তাঁর “নিজস্ব বিনীত পদ্ধতিতে” “তার অংশ” পালনে ইচ্ছুক। “উপমহাদেশে আমাদের তিনটি দেশকে ভালো প্রতিবেশীর মত থাকতে হবে এবং শান্তির মধ্য দিয়ে আমাদের সমস্যার সমাধান করতে হবে” –এই বক্তব্যের বাইরে আর বিস্তারিত কিছু বলা থেকে বিরত থাকেন।
আমাকে এক ঘন্টার সাক্ষাৎকার প্রদানকারী শেখ সাহেব আজ পাকিস্তানের প্রতি, বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ভুট্টোর প্রতি বেশ উদার ছিলেন। ১৯৭২ সালের মাঝামাঝি সময়ে আমাকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে তাঁর পর্যবেক্ষণের সাথে এর ছিল খুব তীক্ষ্ণ বৈপরীত্য যখন তিনি তাঁর দেশের জনগণের বিরুদ্ধে রাওয়ালপিণ্ডিকে বর্বরতার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছিলেন।

শেখ সাহেব এবারে বললেন, “আমি ভুট্টোর আন্তরিকতায় মুগ্ধ”। “আমার প্রতি প্রদত্ত পাকিস্তানের জনগণের স্নেহ এবং ভালোবাসায় আমি অভিভুত। বিমান বন্দর থেকে ইসলামী শীর্ষ সম্মেলন স্থল পর্যন্ত হাজার হাজার জনতা সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমার নাম মুজিব উচ্চারণ করে তারা ধ্বনি দিচ্ছিলেন। যখন পরিচিত কোর্তা পায়জামা পরা আমাকে তাদের মধ্যে দেখলো তখন ছেলেমেয়েরা উচ্চকণ্ঠ হর্ষধ্বনি দিল”।

পাকিস্তান বাংলাদেশে যে গণহত্যা আর ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল এবং যে উদাহরণ তিনি এর আগেরবার দিয়েছিলেন তা স্মরণ করাবার জন্য আমি যখন তাঁর কথায় বাধা দিলাম, তখন তিনি বললেন; “আমি সে সব কিছু ভুলে যেতে চাই। আমি চাই আমার জনগণও সে সব কিছু ভুলে যাক। আমাদেরকে সব কিছু আবার নতুন করে শুরু করতে হবে”। একটু থেমে তিনি আবার যুক্ত করেন; “আপনি জানেন যে জনগণের স্মরণশক্তি দুর্বল”।

আবার ভুট্টোর প্রসঙ্গে ফিরে যেয়ে তিনি বলেন; “আমি তাঁকে সাহায্য করতে চাই। তিনি একজন পুরনো বন্ধু”। কাশ্মীর প্রসঙ্গে তিনি কিছু বলতে চান কিনা জানতে চাইলে শেক সাহেব বলেন; “না”, এবং তারপর যুক্ত করেন; “এমন প্রশ্ন করা আপনার উচিৎ হয়নি”। চলমান…

গতবার তিনি আমাকে যা বলেছিলেন এবারকার বক্তব্য ছিল তা থেকে একেবারেই ভিন্ন। তারপর তিনি বলেছিলেন তিনি শেখ আব্দুল্লাহর সাথে দেখা করবেন আর তাঁকে বলবেন যে তিনি যেন “আমার কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেন”।

পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের কুটনৈতিক সম্পর্ক কত তাড়াতাড়ি স্থাপিত হতে পারে জানতে চাইলে শেখ মুজিব বলেন; “খুবই তাড়াতাড়ি” (ভু্ট্টো নাকি লাহোরে থাকাকালে শেখ সাহেবকে বলেছিলেন যে অফিসারদের একটি দল দূতাবাসের জন্য উপযুক্ত একটি ভবন খোঁজার জন্য ঢাকায় যাবার জন্য প্রস্তুত আছে। মনে করা হয় যে শেখ সাহেব নাকি বলেছিলেন এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য ত্রিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।)

যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত ১৯৫ জন বন্দীর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে শেখ মুজিব বলেন যে, তাদের ব্যাপারে দিল্লী চুক্তি অনুযায়ী ভারত পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সিদ্ধান্ত নেবে। তিনি ইঙ্গিত দেন যে, তাঁর সরকার এরই মধ্যে সময় এবং স্থান ঠিক করার জন্য দিল্লীর সাথে যোগাযোগ রাখছে, যা তার কথা অনুযায়ী, প্রথমে পররাষ্ট্র মন্ত্রী পর্যায় অনুষ্ঠিত হবে, “এবং তারপর আমরা বৈঠকে বসবো”।

পাকিস্তানের বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি কিভাবে আসলো সেই প্রশ্ন শেখ সাহেব এড়িয়ে যান। সেটা কি ইসলামী শীর্ষ সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীদের চাপের কারণে ঘটেছিল সেটা জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন; “ভুট্টো সাহেব সম্মেলনের আগেই স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন”।

আবারো তিনি লাহোরে যে বিপুল সংবর্ধনা পেয়েছিলেন সেই স্মৃতিতে ডুবে যান। তিনি বলেন মিয়ানওয়ালি জেলে যে পুলিশ অফিসার তাঁর জীবন রক্ষা করেছিলেন তিনি তাকে চিনতে পেরেছিলেন এবং তিনি “সকল নিয়ম শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে” তাঁকে তাঁর বাড়িতে নিয়ে যান।

যখন বলা হলো যে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব তৈরী হচ্ছে, তখন তিনি বলেন; “কিছু কায়েমী স্বার্থবাদী মহল ও বিদেশী শক্তি” দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক খারাপ করার কাজে নিয়োজিত আছে। তিনি বলেন; “আমরা ভালো প্রতিবেশী এবং সেই ভাবেই বসবাস করতে চাই –সার্বভৌম ও বন্ধুসুলভভাবে”। -ভারত আমাদের বিষয়ে নাক গলায়নি; আর আমরাও নাক গলাই নি ভারতের ব্যাপারে”।

অনুবাদ: মুঈনুদ্দীন আহ্‌মদ
সংস্কৃতি মার্চ ২০১৬ সংখ্যা

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৯ thoughts on “জনগণকে ৭১ ভুলে যেতে বলেছিলেন শেখ মুজিব

  1. একটু থেমে তিনি আবার যুক্ত

    একটু থেমে তিনি আবার যুক্ত করেন; “আপনি জানেন যে জনগণের স্মরণশক্তি দুর্বল”।

    মুজিব ঠিকই বলেছেন। তিনি জানতেন এদেশের মানুষের স্মরণশক্তি কম।

  2. রেফারেন্স জরুরী।আর এইকথাগুলো
    রেফারেন্স জরুরী।আর এইকথাগুলো সত্য হলেও বক্তব্যের সাথে তার পরের ঘটনা প্রবাহের কোন মিল নাই।পাকিস্তান বাংলাদেশের সাথে সরাসরি বন্দী সেনাদের নিতে চায় নাই।আর ভুট্টো বোধহয় আমার জানা সব পাকিস্তানি শাষক থেকে সবচেয়ে বড় মিথ্যাবাদী। একটা ভুল সময়ে সত্যও প্রতিক্রিয়াশীলদের অস্ত্র হতে পারে।

    1. ইতিহাসের সত্য সব সময় সত্য
      ইতিহাসের সত্য সব সময় সত্য হিসাবে থাকে। এই সত্যটা কি সময়-অসময়ে বদলায় নাকি? ভুল শাসকদের জন্য প্রতিটা সময় ভুল। প্রতিক্রিয়াশীলদের সাথে বর্তমান শাসকদের চলছে ধুরুন্ধাম দহরম মহরম।

  3. ঘটনার পরাম্পরা অনুধাবন করতে
    ঘটনার পরাম্পরা অনুধাবন করতে হবে। তবেই আপনি সত্যের কাছাকাছি পৌছাতে পারবেন। তখন পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দিদের ভারত শিমলা চুক্তির আলোকে বাংলাদেশকে ওয়াকিবাহাল না করেই একক সিদ্ধান্তে ছেড়ে দিয়েছিলো।যার জন্যই মুজিব পাকিস্তান যেতে বাধ্য হয়েছিলেন।এটা ছিল মুজিবের কৌশল।

  4. যেহেতু বঙ্গবন্ধু আর খোন্দকার
    যেহেতু বঙ্গবন্ধু আর খোন্দকার মাহবুবের উক্তির প্রেক্ষাপট এক নয় , তাদের দুইজনের উক্তির একই ধারাবাহিকতা টানা অনুচিত মনে করি। শেখ মুজিব চীন সৌদির স্বীকৃতি আদায় করার চেষ্টায় ও আই সি সন্মেলনে পাকিস্থানে গিয়েছিলেন (কিন্তু কেউ কেউ যদি মনে করে মুজিব পাকবন্ধু ও একনম্বর রাজাকার এবং গোলাম আযমের মত তিনিও বাংলদেশকে আবার পাকিস্থান বানাতে গিয়েছিলেন তাহলে কিছুই বলার নেই) । একটি রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের কূটনীতিক বাক্যবিনিময় আর স্বীকৃত যুদ্ধপরাধীদের পক্ষে আইনি সহযোগিতার পেশাদার আচরণ লঙ্ঘন করে নির্লজ্জ দালালী করা একই ধারাবাহিকতা হতে পারেনা। রাষ্ট্রীয় সম্পর্কে তিক্ততা ভুলে দুই দেশের জনগনের স্বাভাবিক সম্পর্কে যেতে বলা মানে ইতিহাস ভুলে যাওয়া নয়। নিরীহ বেসামরিক ভিক্টিমদের হত্যা ধর্ষণ লুটপাটের অপরাধ ভুলে যাওয়া নয়। সেগুলা ভুলে গেলে কি পরিনতি হয় তা আমরা মন্ত্রী থাকাকালীন মুজাহিদের দম্ভোক্তি থেকে আজকের মাহবুব পর্যন্ত দেখছি। শেখ মুজিবের যাবতীয় ভুল দোষ ত্রুটি থেকে আমরা ইতিহাসের পর্যালোচনার দ্বারা শিখতেই পারি , তার একটিও ভালো কাজ আমাদের কারো কারো চোখে নাও থাকতে পারে, নৃশংস হত্যার শিকার হওয়া দিয়ে তিনি অনেকখানি ব্যার্থতার দায় শোধ করার পরও তার অর্জিত ইমেজের অবশিষ্ট দাপট অতিক্রম করার জন্য এখনো যৌক্তিক অযৌক্তিক আক্রমনের শিকার তিনি হচ্ছেনও, কিন্তু অহেতুক ক্ষেত্রে অযাচিত ভাবে তাকে টেনে আনা দৈন্যের লক্ষন। চেতনার ব্যবসায়ীদের মূর্খতার জন্য মাহবুবের বক্তব্যের উত্তরসুরিতা কোনোভাবেই ন্যায্যতা প্রতিপাদিত হয়না। মাহবুবরা পারলে এই বিচার বন্ধ করে দিতেন। এই খুনিরা মালা গলায় মন্ত্রী হতেন। এবং শেখ মুজিব এক ফেরাউন এই চেতনার ঢোল আরো জোরে বাজাতেন। শেখ মুজিবের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক সমালোচনা পর্যালোচনা প্রাজ্ঞতার লক্ষণ। আর যেনতেন ভাবে তাকে ফেরাউন বানানো টাইপের বিদ্বেষ পোষণকারীদের মত মনোভাব প্রদর্শনকারীরা নিজেরাই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়ার লক্ষণ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

8 + 1 =