সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘোষনাঃ উদ্দেশ্য আদিবাসী উচ্ছেদ? নাকি বন লুট?

১। 1989 সালে জেনেভায় আদিবাসী জনগণের কনভেনশন , 1989 ( নং 169) নামে যে কনভেনশন অনুষ্ঠিত হয় সেখানে স্বাধীন দেশে অাদিবাসী জনগণের অধিকার বিষয়ে সিদ্ধান্ত এবং অাদিবাসীদের সুরক্ষা বিষয়ে সর্বসম্মত অার্ন্তজাতিক নিয়মাবলী গৃহীত হয়। এটা ILO convention 169 নামেও পরিচিত। এই নিয়মাবলী বা ilo convention 169 অনুসারে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলো নিজ নিজ দেশের অাদিবাসীদের সুরক্ষা এবং সুযোগ সুবিধা দিয়ে অাসছে।

এই ILO কনভেনশনে ১০টি পরিচ্ছেদে ৪৪ টি ধারা সুপারিশ করা হয়েছে যে ধারা গুলোর মাধ্যমে অাদিবাসীদের ভূমি অধিকার সহ সব ধরনের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। পশ্চাৎপদ এই অাদিবাসী জনগোষ্ঠী যেন পিছিয়ে না পড়ে এবং বিলুপ্ত না হয় সে জন্য মূলত এই কনভেনশন।

কনভেনশনের ২নং পরিচ্ছেদে ভূমি বিষয়ক ৭ টি ধারা রয়েছে। সেখানে অাদিবাসীদের ঐতিহ্যগত ভাবে দখলকৃত ভূমির অধিকার বা মালিকানার কথা বলা হয়েছে। সেখানে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, অাদিবাসীরা যে ভূমিতে বসবাস করে অাসছে সেই ভূমির মালিকানা তারই হবে এবং এই মালিকানা বংশপরম্পরায় প্রথাগত ভাবে তার উত্তরসূরিদের কাছে ন্যস্ত হবে।

অাবার ১৪নং ধারার ১নং অনু্চ্ছেদেও বলা হয়েছে—”The rights of ownership and possession of the peoples concerned over the lands which they traditionally occupy shall be recognised” ঐতিহ্যগত ভাবে তাদের দখলকে স্বীকৃতি দিতে হবে সেই ভূমির মালিকানা থাকুর অার নাই থাকুক। মালিকানার বৈধ প্রমাণ না থাকলেও তাদের দখলকে স্বীকার করে তাদের সেই ভূমির মালিকানা দিতে হবে।

১৫ নং ধারার ২নং অনু্চ্ছেদে এটাও বলা হয়েছে যে,সরকার যদি চায় যে সে জমিতে কোন উন্নয়ন মূলক কার্যক্রম করবে কিন্তু সেখানকার ভূমিপুত্রদের তাতে যদি অমত থাকে কিংবা যেসব কার্যক্রমে অাদিবাসীরা সুফল পাবে না তাহলে সরকার কখনো সেই অমতকে অাগ্রাহ্য করতে পারবে না। সেই কার্যক্রমও চালিয়ে যেতে পারবে না।কিন্তু তাতে যদি অাদিবাসীদের মত থাকে তাহলে সরকারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

১৬নং ধারার ১নং অনু্চ্ছেদে বলা হয়েছে—“Subject to the following paragraphs of this Article,the peoples concerned shall not be removed from the lands which they occupy

২। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার এই অার্ন্তজাতিক নিয়মগুলোকে মধ্যমাঙ্গুলি দেখিয়ে মধুপুরে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘোষনা করেছে সেখানে বসবাসকারী অাদিবাসীদের মতামতকে সম্পূর্ণ অগ্রায্য করে।
গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ বাংলাদেশ সরকারের পরিবেশ ও বন মন্ত্রণায়ল এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে টাঙ্গাইল জেলার মধুপুরের ৯১৪৫.০৭ একর জমিকে সংরক্ষিত বনভুমি সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘোষণা করেন।
এই সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে স্থানীয়দের সাথে কোন ধরনের আলোচনা করা হয়নি বলে দাবি করছেন স্থানীয়রা। ঘোষিত বনাঞ্চলের সিংহভাগই আদিবাসী অধ্যুষিত এবং আদিবাসীদের উচ্ছেদের একটা কৌশল।

অপরদিকে মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক ১০ মে নাহার পুঞ্জির খাসিয়া অাদিবাসীদের প্রথাগতভাবে ভোগদখলীয় জমিকে খাস জমি জিনেবর চিহ্নিত করে উচ্ছেত নোটিশ জারি করে।

এই কৌশলের মাধ্যমে ইতিইতিপূর্বেও পার্বত্য চট্টগ্রামে বহু অাদিবাসী উচ্ছেদ করা হয়েছে এবং তাদের ভোগ দখলীয় জমিকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘোষনা করা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের মোট অায়তনের ২৪% সংরক্ষিত বনাঞ্চল বানানো হয়েছে।

Kassalong Reserved Forest, Rankhiang Reserved Forest, Sangu Reserved Fores, Matamuhari Reserved Forest, Other minor Reserved Forest — 406,542 acres, 190,521 acres, 83,612 acres, 100,467 acres, 15,018 acres, Total 796,160 acres — Land Rights of the indigenous PeoPLes of the Chittagong hiLL tRaCts, BangLadesh By Rajkumari Chandra Kalindi Roy

যদিও সরকার থেকে এটা প্রচার করা হয় যে, প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য সরকার সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘোষনা করে থাকে।
অাদৌ এটা সরকারের একটা কৌশল মাত্র। সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘোষনার মাধ্যমে ঐ স্থানে বসবাসকারী অাদিবাসীদের উচ্ছেদ করা এবং সেখানকার প্রাকৃতিক সম্পদ লুট করাই সরকারের মূল উদ্দেশ্য।
যদি একটু খবরে প্রকাশিত সংবাদগুলো দেখেন তাহলে বিষয়টা পরিষ্কার হবে।

বৃক্ষশূন্য হয়ে পড়েছে দীঘিনালার সংরক্ষিত বনাঞ্চল – banglanews24। খবরে বলা হয়েছে দীঘিনালা থেকে ঢাকায় প্রতিদিন গড়ে দেড়শ’ ট্রাক বিনা পারমিট ওটির (ওপেন ট্রান্সপোর্ট) মাধ্যমে বন বিভাগের কর্মকর্তারা এ পাচার কাজে সরাসরি জড়িত।

সরকারের অবহেলায় ধ্বংস হচ্ছে সংরক্ষিত বন – bonikbarta

গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলায় বিভিন্ন সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে একটি চক্র চুরি করে গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছে। এ চক্রের সঙ্গে রঘুনাথপুর বিটের অসাধু বন কর্মকর্তাদের যোগসাজশ রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে – prothom-alo

জোত পারমিটের নামে সংরক্ষিত বনাঞ্চল উজাড় — thereport24

বান্দরবানে নামেই সংরক্ষিত বনাঞ্চল ॥ কোটি টাকার গাছ বিক্রি — dailyjanakantha

উজাড় হচ্ছে কাপ্তাইয়ের সংরক্ষিত বনাঞ্চল —
jaijaidin

সংরক্ষিত বনাঞ্চল ধ্বংস করে র্যাবের ‘ট্রেনিং স্কুল – natunbarta

প্রায় সব খবরেই বলা হয়েছে সরকারী লোকদের যোগসাজে এসব সংরক্ষিত বনাঞ্চল ধ্বংস কা হচ্ছে। বর্তমানে যেসব সংরক্ষিত বনাঞ্চল অাছে সরকার সেগুলোই তো রক্ষা করতে পারছে না, তাহলে নতুন করে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘোষণা কতটুকু যুক্তিসংগত?

এক মানব বন্ধনে বাংলাদেশ গারো স্টুডেস্ট ইউনিয়ন এর ঢাকা মহানগর শাখার সভাপতি ড্রিঞ্জা চাম্বুগং বনবিভাগকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, বনের যে গাছ আছে বনের যে লতাগুলো আছে সেগুলো বাঁচানো দায়িত্ব আমাদের উপর ছেড়ে দিন। বন আমাদের মা, বনে আমরা বসবাস করি, বন আমাদের বাচিয়ে রাখে আমরা বনকে বাচিয়ে রাখি। আপনাদের সিদ্ধান্ত কখনোও আদিবাসী বাদ্ধব নয়, আমরা আন্দোলন করবো, চালিয়ে যাব।

সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘোষনার নামে অাদিবাসীদের প্রথাগত ভোগদখলীয় জমি থেকে উচ্ছেদ না করে, অার্ন্তজাতিক নিয়ম মেনে তাদের দখলকে স্বীকৃতি প্রদান করুন। তারা সেই বনকে সংরক্ষিত বনের চাইতেও অারো বেশি সুন্দর করে সংরক্ষণ করবে। কারন তারা বনকে মায়ের মতই ভাবে। এই বনই তাদের জীবন। আর হ্যা আমরা আন্দোলন করবো, চালিয়ে যাব।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৭ thoughts on “সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘোষনাঃ উদ্দেশ্য আদিবাসী উচ্ছেদ? নাকি বন লুট?

  1. চেতনার লুটপাটের জন্যই এই
    মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় লুটপাট করে খাওয়ার অভিপ্রায়ে আদিবাসীদের উচ্ছেদ করে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘোষনা করা হয়েছে। বনের মানুষদের উচ্ছেদ করা হবে বনকে সংরক্ষিত করার জন্য! হাস্যকর নয় কি? যারা বনকে নিজের মায়ের চাইতে বেশি ভালবাসে তাদের উচ্ছেদ করে বনখেকোদের হাতে বন তুলে দেবে। এ যেন বনের পাখিদের তাড়িয়ে দিয়ে বনের সংরক্ষণ।

    চেতনার লুটপাটের জন্যই এই আয়োজন। ৭২-৭৫ পর্যন্ত লুটপাট করে খেয়েছিল। দেশকে শূন্য করে দিয়ে তারা তাদের নেতাকে খেয়েছে শেষ পর্যন্ত। ইতিহাসের একই কাহিনীর পূনারাবৃত্তি চলছে।

    1. নন্তানকে মায়ের কোল ছাড়া করা
      নন্তানকে মায়ের কোল ছাড়া করা অার অাদিবাসীদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ একই বিষয়। রাষ্ট্রই এর বড় মদদ দাতা।

  2. মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় লুটপাট
    মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় লুটপাট করে খাওয়ার অভিপ্রায়ে আদিবাসীদের উচ্ছেদ করে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘোষনা করা হয়েছে। বনের মানুষদের উচ্ছেদ করা হবে বনকে সংরক্ষিত করার জন্য! হাস্যকর নয় কি? যারা বনকে নিজের মায়ের চাইতে বেশি ভালবাসে তাদের উচ্ছেদ করে বনখেকোদের হাতে বন তুলে দেবে। এ যেন বনের পাখিদের তাড়িয়ে দিয়ে বনের সংরক্ষণ।
    চেতনার লুটপাটের জন্যই এই আয়োজন। ৭২-৭৫ পর্যন্ত লুটপাট করে খেয়েছিল। দেশকে শূন্য করে দিয়ে তারা তাদের নেতাকে খেয়েছে শেষ পর্যন্ত। ইতিহাসের একই কাহিনীর পূনারাবৃত্তি চলছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

13 + = 14