মক্কাবাসীরা কি সত্যিই মুহাম্মদকে হত্যা করতে চেয়েছিল? পর্ব-৩ (ইতিহাসের আলোকে)

দ্বিতীয় পর্ব থেকে জানা গেল , মুহাম্মদ নিজেই মদিনাবাসীদের সাথে ষড়যন্ত্র করে মক্কা আক্রমন করতে চাচ্ছিলেন , সেটা মক্কাবাসিরা জানতে পেরে বিশ্বাসঘাতক মুহাম্মদকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। মুহাম্মদ পালিয়ে মদিনায় চলে গেলেন। এটাই যদি আসল ঘটনা হয়, তাহলে মক্কাবাসীরা কিভাবে দোষী ? দুনিয়ার কোন দেশে কবে বিশ্বাসঘাতকের শাস্তি মৃত্যুদন্ড ছিল না ?অথচ গোটা বিশ্বে যে দেড় বিলিয়নের ওপর মুসলমান আছে , তারা এই ঘটনা কি আদৌ জানে ? তাদেরকে যা জানান হয়েছে , তা হলো , মুহাম্মদকে কুরাইশরা হত্যা করতে চেয়েছিল, আল্লাহর অসীম কুদরতে , তিনি বেঁচে যান। এবার দেখা যাক , এই ঘটনাকে ব্যবহার করে মুহাম্মদ মদিনায় গিয়ে কি শুরু করেন।

মুহাম্মদের আগে ও পরে মদিনায় শতখানেকের মত মক্কাবাসী হিজরত করে। অত:পর মুহাম্মদ নিজেও সেখানে হিজরত করেন। মদিনাবাসীরা কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল ছিল, তাছাড়া তারা ছিল গরিব। পক্ষান্তরে সেখানে হিজরত করা শতখানেক মক্কাবাসীরা কৃষি কাজ জানত না , তারা পশুপালন জানত আর জানত চুরি ডাকাতি, খুন খারাবি। গরিব মদিনাবাসীদের পক্ষে এতগুলো লোককে বসিয়ে বসিয়ে খাওয়ানোর সামর্থ তাদের ছিল না। তাছাড়া মক্কাবাসীদের কাজেরও কোন সংস্থান করা যাচ্ছিল না। আর তখনই মুহাম্মদ তাদের জীবিকার একটা ব্যবস্থা করেন। আর সেটা যে কি , সেটা এবার জানা যাক—–

প্রথমে মুহাম্মদ নিচের আয়াত নাজিল করেন –

সুরা বাকারা -২: ২১৬: তোমাদের উপর যুদ্ধ ফরয করা হয়েছে, অথচ তা তোমাদের কাছে অপছন্দনীয়। পক্ষান্তরে তোমাদের কাছে হয়তো কোন একটা বিষয় পছন্দসই নয়, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর হয়তোবা কোন একটি বিষয় তোমাদের কাছে পছন্দনীয় অথচ তোমাদের জন্যে অকল্যাণকর। বস্তুতঃ আল্লাহই জানেন, তোমরা জান না।

কোন যুদ্ধ , কিসের যুদ্ধ , কেন যুদ্ধ ? মুহাম্মদের দাবী যেহেতু কুরাইশরা মুহাম্মদকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে তাই এখন মক্কাবাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে। দেখা যাচ্ছে , কিছু লোক সেই যুদ্ধ করতে রাজী না। আর তারা হলো আসলে মদিনাবাসী। তারা কেন যুদ্ধ করতে রাজী না , সেটা বোঝা যাবে পরের আয়াত ও তার প্রেক্ষাপট বিচার করলে ।

সুরা বাকারা-২:২১৭: সম্মানিত মাস সম্পর্কে তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে যে, তাতে যুদ্ধ করা কেমন? বলে দাও এতে যুদ্ধ করা ভীষণ বড় পাপ। আর আল্লাহর পথে প্রতিবন্দ্বকতা সৃষ্টি করা এবং কুফরী করা, মসজিদে-হারামের পথে বাধা দেয়া এবং সেখানকার অধিবাসীদেরকে বহিস্কার করা, আল্লাহর নিকট তার চেয়েও বড় পাপ। আর ধর্মের ব্যাপারে ফেতনা সৃষ্টি করা নরহত্যা অপেক্ষাও মহা পাপ। বস্তুতঃ তারা তো সর্বদাই তোমাদের সাথে যুদ্ধ করতে থাকবে, যাতে করে তোমাদিগকে দ্বীন থেকে ফিরিয়ে দিতে পারে যদি সম্ভব হয়। তোমাদের মধ্যে যারা নিজের দ্বীন থেকে ফিরে দাঁড়াবে এবং কাফের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে, দুনিয়া ও আখেরাতে তাদের যাবতীয় আমল বিনষ্ট হয়ে যাবে। আর তারাই হলো দোযখবাসী। তাতে তারা চিরকাল বাস করবে।

উক্ত আয়াতে দেখা যাচ্ছে , সম্মানিত বা পবিত্র মাসে একটা যুদ্ধ হয়েছিল , যেটা আসলে অন্যায়। কিন্তু পরে এই আয়াত দ্বারা সেই যুদ্ধকে বৈধ করা হয়। তো দেখা যাক কি সেই যুদ্ধ। ইবনে কাসিরের তাফসির থেকে দেখা যাক , কি সেই যুদ্ধ। ঘটনাটা সংক্ষেপে বলা হবে।

আব্দুল্লাহ বিন জাহশের নেতৃত্বে আটজন মক্কাবাসীকে মুহাম্মদ মদিনা থেকে নখলা নামক স্থানে পাঠান মক্কাবাসীদের বানিজ্য কাফেলা আক্রমন করে বনিকদেরকে হত্যা করে , তাদের মালামাল লুটপাট করে নিয়ে আসতে। সেই মত তারা মদিনা থেকে রওনা দিয়ে মক্কা পার হয়ে নাখলা নামক স্থানে যায়। নাখলা হলো মক্কা ও তায়েফের মাঝামাঝি একটা জায়গা। মক্কা পার হয়েই সেখানে যেতে হয়। সেখানে গিয়ে তারা রাস্তার পাশে ওৎ পেতে বসে থাকে। অত:পর একটা বানিজ্য কাফেলা আসে, সাথে সাথে তার সেটাকে আক্রমন করে , দুইজন বনিককে হত্যা করে , দুইজনকে বন্দি করে , তাদের মালামাল লুটপাট করে অত:পর মদিনায় ফিরে যায়। বন্দি দুইজন সহ লুটপাটের মালামাল তারা তাদের নেতা মুহাম্মদের সকাশে পেশ করে।কিন্তু ততদিনে চতুর্দিকে জানা জানি হয়ে যায় যে , সেই আক্রমনের ঘটনাটা ঘটেছে পবিত্র মাসে যে মাসে তৎকালীন আরবের প্রথা অনুযায়ী কেউ কারও সাথে যুদ্ধ করত না বা কেউ কাউকে আক্রমন করত না।

একথা শুনে মুহাম্মদ তাদের সেই মালামাল গ্রহন করতে অস্বীকার করে। কিন্তু বেশী দেরী হয় নি, এর কিছুক্ষনের মধ্যেই উক্ত ২:২১৭ নং আয়াত নাজিল হয়ে যায়, আর তাতে বলা হয়, আক্রমনটা যেহেতু কুরাইশদের ওপর ঘটেছে , তাই তা বৈধ তা সে যতই পবিত্র মাসে ঘটুক না কেন। এরপর মুহাম্মদ উক্ত মালামালের এক পঞ্চমাংশ নিজের জন্যে রেখে দিয়ে বাকিটা তাদের মধ্যে বিলি করে দেন ,আর বন্দি দুইজনের জন্যে পন আদায় করে পরে মুক্তি দিয়ে দেন।

সুত্র: পৃষ্ঠা- ৫৯৭-৫৯৮, ১ম,২য় ও ৩য় খন্ড, তাফসির ইবনে কাসির-সাইট:http://www.quraneralo.com/tafsir/

রাস্তায় ওৎ পেতে থেকে বানিজ্য কাফেলায় আক্রমন কিভাবে যুদ্ধ বা জিহাদ হয়? এটা তো স্রেফ ডাকাতি। ঠিক এই কারনেই মদিনাবাসীরা মুহাম্মদের সেই কথিত যুদ্ধে রাজী ছিল না। তারা মুহাম্মদকে সাহায্য করবে বলে রাজী হয়েছিল ঠিকই , কিন্তু তাই বলে অনৈতিকভাবে ডাকাতি করতে রাজী ছিল না। বস্তুত: ২:২১৬ আয়াত নাজিলের পর , মুহাম্মদ পর পর বেশ কয়বার তার দল পাঠিয়ে কুরাইশদের বানিজ্য কাফেলা আক্রমন করে লুট পাট করতে চেয়েছিলেন ,কিন্তু সেসব ব্যর্থ হয়ে যায়। তখন মক্কাবাসীরা মদিনার পাশ দিয়ে চলে যাওয়া রাস্তা ধরে সিরিয়ায় বানিজ্য করতে যেত। মক্কা থেকে মদিনায় যাওয়ার পথেই মদিনা পড়ে। যেমনটা চট্টগ্রমান থেকে ঢাকা যাওয়ার পথে কুমিল্লা পড়ে। সেই সুবিধা নিয়ে মুহাম্মদের দল প্রায়ই মক্কাবাসিদের ওপর হামলা করত। পর পর ৬ টা হামলা এভাবে বিফল হয়ে যায়। এই ছয়টা ডাকাতিতে কোনবারেই মদিনাবাসীরা অংশ গ্রহন করে নি। এমনকি উপরোক্ত ৭ম ডাকাতিতেও মদিনাবাসীরা অংশগ্রহন করে নি। যে আটজন উক্ত ডাকাতি করে , তারা সবাই ছিল হিজরতকারী মক্কাবাসী।

অত:পর মুহাম্মদের এই ডাকাতি প্রচেষ্ঠার কারনে , মক্কাবাসীরা সিরিয়ার সাথে বানিজ্য সাময়িক বন্দ করে দিয়ে, মদিনার পাশের রাস্তা বাদ দিয়ে, মদিনার উল্টো দিকে ইয়েমেনের সাথে বানিজ্য করতে থাকে। অর্থাৎ চট্টগ্রাম বাসীরা ঢাকার সাথে বানিজ্য বাদ দিয়ে অনেকটা কক্সবাজারের সাথে বানিজ্য শুরু করে। ছয় ছয়টা ডাকাতি প্রচেষ্টা যখন বিফল হয়ে যায়, তখন মুহাম্মদ মরিয়া হয়ে , সেই মদিনার উল্টো দিকে , মক্কা পার হয়ে নখলাতে তার দলকে পাঠায় ডাকাতি করতে , কারন মুহাম্মদ জানতেন , সেই রাস্তায় কুরাইশ বনিকরা মোটেই সতর্ক থাকবে না। ঘটনা ঘটেও তাই। পর পর ছয়টা ডাকাতির চেষ্টার বিস্তারিত বিবরন জানা যাবে নিচের সাইটে :

https://en.wikipedia.org/wiki/List_of_expeditions_of_Muhammad

তার মানে দেখা যাচ্ছে , মুহাম্মদ নিজেই মদিনাবাসীদের সাথে আঁতাত করে মক্কা আক্রমনের ষড়যন্ত্র করে ধরা খাওয়ার পর , পালিয়ে মদিনায় যান। সেখানে গিয়ে নিজের লোক ও মদিনাবাসীদের এই বলে উত্তেজিত করেন যে মক্কাবাসীদের বানিজ্য কাফেলায় আক্রমন করতে হবে , কারন তারা মুহাম্মদকে হত্যা করতে চেয়েছিল। অর্থাৎ নিজেই একটা ঝামেলা তৈরী করে অন্য পক্ষকে উত্তেজিত করে , পরে সকল দোষ দ্বিতীয় পক্ষের ওপর চাপিয়ে দেন মুহাম্মদ। মুহাম্মদের এই কৌশল ও চরিত্র আজকের দিনেও মুসলমানরা হুবহু অনুসরন করে চলেছে। একারনেই তারা আজকেও আই এস , বোকো হারাম , আল কায়দা , তালেবান , জে এম বি ইত্যাদি গোষ্ঠির গঠন ও তাদের সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে মুসলমানদের বা ইসলামের কোন দোষ দেখে না , তারা দোষারোপ করে ইহুদি , খৃষ্টান , অমুসলিম এদের ওপর।

অথচ সেই বারশ বছর ধরে আমাদেরকে শুনান হয়েছে , মক্কাবাসীরা মুহাম্মদকে হত্যা করতে চেয়েছিল, আল্লাহ অলৌকিকভাবে তাকে বাঁচিয়ে দেয়। অথচ নাগাড়ে তেরটা বছর মুহাম্মদ প্রায় নিরুপদ্রবে মক্কাতে তার ইসলাম প্রচার করে গেছে , কেউ কিন্তু তাকে ফুলের টোকাটিও দেয় নি। মক্কাবাসীরা মুহাম্মদকে হত্যা করতে যাবে কেন ? মুহাম্মদকে তো তারা পাগল উন্মাদ বলে জানত। উন্মাদ ও পাগলকে কি কেউ হত্যা করতে চায় ?

===================শেষ============================

মক্কাবাসীরা কি সত্যিই মুহাম্মদকে হত্যা করতে চেয়েছিল ? পর্ব-২(ইতিহাসের আলোকে) – See more at: https://istishon.blog/?q=node/21784#sthash.KWLzYisv.dpuf

মক্কাবাসীরা কি সত্যিই মুহাম্মদকে হত্যা করতে চেয়েছিল ?- পর্ব-১(ইতিহাসের ভিত্তিতে) – See more at: https://istishon.blog/?q=node/21778#sthash.Td1LBQnH.GC6T7Dhq.dpuf

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 3 = 7