প্রিয় শিল্পীর সাথে দেখা।

আমরা কয়েকজন পুরোগতিশীল বন্ধু গেলাম প্রিয় শিল্পী কবির সুমনের সাথে দেখা করতে সেই ছোটবেলা থেকে যার গান শুনে প্রেম বিরহ উদযাপন করেছি।। আমাদের সবাই উচ্চ শিক্ষিত, ফ্যাশন সচেতন। পয়েন্ট টু ফাইভ স্পাইক কাট জেল চর্চিত চুল, হাতে ব্রেসলেট, পায়ে উডল্যান্ড স্নিকার, আমেরিকান ঈগল জিন্স, মুখে জলদস্যুদের মত আঁকাবাঁকা দাঁড়ি, গায়ে খরোষ্ঠী বর্ণমালায় উল্কি আঁকা, রাত্রে সকালে পাঁচবার নিয়মকরে জয়তুনের দাঁতন দিয়ে দাঁত ব্রাশ করি। নতুন প্রজন্মের এমন মোডারেটদের তিনি খুব পছন্দ করেন। মনে বড় আশা বরেণ্য শিল্পীর সাথে কিছু আনন্দময় সময় কাটাবো। দল বেঁধে আমরা গেলাম কবির সুমনের জান্নাতুল নাইমের 7 তলার A1 নম্বর ফ্ল্যাটে। কলিং বেল চাপতেই সুরেলা যান্ত্রিক কন্ঠে গেয়ে উঠল, আসসালামু ওয়ালাইকুম, বাড়ায়ে মেহেরবানী কারকে দরোয়াজাটা খুলিয়ে। কয়েকবার বেল বাজার পরে দরজা খুলে দিলেন আমাদের প্রিয় শিল্পী যার গান শুনে বড় হয়েছি। আমাদের সালাম দিয়ে অভ্যর্থনা জানালেন। সুরমা লাগানো চোখের তারায় আয়না না ধরেই দেখতে পেলাম আতরের খুশবুতে ম ম করছে পুরো ফ্ল্যাট। হাতে তার পৌরাণিক সেমেটিক কবিতার বই। আমরা মনের অজান্তেই গুনগুনিয়ে গেয়ে উঠলাম শোন তালিবান, তালিবান গানটা। কবির সুমন যেন শুনে ফেললেন, খুশিতে বলে উঠলেন এই কারনেই তরুনদের আমার খুব ভালো লাগে।

শিল্পী তার বৈঠকখানায় আমাদের বসতে দিলেন। অনেক বিষয়ে আমাদের মাঝে কথা হচ্ছিল। জাতীয়, আন্তর্জাতীয় রাজনীতি, সমাজনীতি, ধর্মনীতি, গান ইত্যাদি হেন কোন বিষয় নাই যা আমাদের আলোচনা হয় নি। কথা প্রসঙ্গে জানতে পারলাম ‘তোমাকে চাই’ গানের প্রেক্ষাপট। আমাদের কেউ জিজ্ঞেস করলো, তাহলে কি সিগারেট নিয়ে লেখা গান নয়? নাকি টগবগে প্রেমের? শিল্পীই শুধরে দিলেন এতদিন যা জানতাম সেটা আসলে ভুলে ভরা, যেমন ভুলে ভরা আমাদের প্রতিদিনের বিশ্বাস। ‘তোমাকে চাই’ গানটা লেখা হয়েছে স্বয়ং আল্লাহ’র ইবাদত করে, যিনি ছাড়া আর কোন উপাস্য নাই, গানের প্রতিটি লাইনে প্রতি মুহূর্তে তাকে কাছে পাওয়ার আকুতি প্রকাশ পেয়েছে। একমাত্র আল্লাহ এবং প্রিয় নবীকে কাছে পাওয়া ছাড়া অন্য কিছু চাওয়া বেদআত। সকল প্রশংসা একমাত্র তাঁর। আমাদের জ্ঞানের দীনতায় কবির সুমনের প্রকৃত দ্বীন চিনতে ভুল করেছিলাম! লজ্জায় মনে হচ্ছিল, ধরণী তুমি দ্বিধা হও, আমরা গাছে উঠি।

নাস্তিক, ব্লগার রাজিব খুন হওয়ার পরে গান লেখা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সুমন চট্টোপাধ্যায় ওরফে কবির সুমন বললেন, এটা ছিল আমার জীবনের শুদ্ধতম ভুল। যারা ওদিকে বেশ কিছু লোক অনেক দিন ধরে প্রবাদ পুরুষ, শান্তি ও শান্তিবাহিনী সম্পর্কে কুৎসিৎতম কথা ফেসবুকে ছড়িয়ে যাচ্ছিল। নাম করা লোকও ছিল অনেক। পবিত্র কবিতার বইয়ের ওপর কফির এঁটো কাপ রেখে দাঁত বের করে পোজ দিয়ে ছবি তুলে পোস্ট করা হল। এত বয়স হল – কোনও শান্তির পথ, পথ প্রদর্শক ও শান্তিবাহিনীর নামে যে এভাবে কুৎসা করা যায় তা কোনওদিন দেখিনি। আমি যদি সেই হিন্দুনামওলা মুক্তমনাকে সামনে পেতাম তো কী করতাম ঠিক জানি না। ভদ্দোরলোক খুন হলেন। অনেকে মাৎ মাৎ করে উঠলেন।””পোকামাকড়দের তো কোথাও না কোথাও একটু মারতেই হয়। এই পোকাগুলোকে Hit দিয়ে মারা যায় না, মাইরি।” সঙ্গে সঙ্গে তিনি হাতে ধরা পবিত্র কবিতার বই বের করে পাতা উল্টিয়ে দেখালেন, এই দেখো, নতুন প্রজন্ম তোমরা দেখো এবং শেখো, কি লেখা আছে এখানে, লাইনের মাঝ বরাবর লাঙলের ফলার মত লাল রেখা টানা আন্ডারলাইনে আমরা দেখতে পেলাম, আর তিনি তার এমন দরাজ কন্ঠে আবৃত্তি করছেন ” যখন নির্দেশ দান করেন ফেরেশতাদিগকে তোমাদের পরওয়ারদেগার যে, আমি সাথে রয়েছি তোমাদের, সুতরাং তোমরা মুসলমানদের চিত্তসমূহকে ধীরস্থির করে রাখ। আমি কাফেরদের মনে ভীতির সঞ্চার করে দেব। কাজেই গর্দানের উপর আঘাত হান এবং তাদেরকে কাট জোড়ায় জোড়ায়।”। তার এমন সুন্দর নিখুঁত উচ্চারণে, সুললিত কণ্ঠে, গীটারের টুং টাং আবহ শব্দে আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনতে লাগলাম প্রাচীন যুগের অন্ধকার কবিতা।

এরপরে আমরা অনুরোধ করলাম গানের। সঙ্গে সঙ্গে শিল্পী বললেন গান তো বাসায় রাখি না। ওটা মেহেরাবে রাখা আছে, সময়মত কাজে লাগবে। এখন কি করছেন জানতে চাইলে বললেন, নজরুলের উপর কাজ করছি, দেখা যাক নজরুলের মাজারের পাশে নিজের কবর রাখার বন্দোবস্ত করা যায় কিনা। সাবিনা সূত্রে আমি তো ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের নাগরিক। সুতরাং উপায় একটা হয়েই যাবে। তারপরে তিনি আমাদেরকে ক্যামেল ব্র্যান্ডের কোমল ঈষৎ ঝাঁঝালো পানীয় অফার করলেন। নতুন জিনিসের রিস্ক না নিয়ে আমরা ইহুদি কোম্পানির পেপসি খেয়ে আপ্যায়িত হয়ে সন্ধ্যার সময় বিদায় নিলাম। প্রিয় শিল্পী তখন গেলেন অজু করতে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 39 = 44