বাংলাপ্রেম নাকি ভণ্ডামি !!

বাংলাদেশের মানুষের হিন্দি ভাষা ব্যবহার নিয়ে আজ ফেসবুকে ভাল রকম একজন জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বের ভিডিও প্রতিবাদ দেখলাম (অনিবার্য কারণ বশত নাম উল্লেখ করছি না) | ভিডিওতে তিনি ভীষণ রকম গালাগাল করলেন তাদের যারা বাঙালি হয়েও হিন্দি ব্যবহার করছে | কিন্তু পুরো কথার মধ্যে গালাগাল থেকে শুরু করে অনেক অংশেই ইংরেজিতে কথা বললেন | এছাড়া ফাক ফুকের মতো উপাদেয় গালাগাল তো আছেই | এক পর্যায়ে তিনি এও বললেন যে হিন্দি ব্যবহার না করে ইংরেজি ব্যবহার করেন কারণ ইংরেজি নাকি একটা টেকনোলজি ! জ্বী আপনি হিন্দি ভাষাকে বাদ দিন | আপনি খাটি বাঙালি সমস্যা নাই | বাংলাদেশের মানুষ হিন্দিতে কথা বলছে দেখলে আপনার খারাপ লাগাটাই স্বাভাবিক , প্রতিবাদ জানান | কিন্তু আপনি প্রতিবাদ জানানোর সময় ইংরেজি ব্যবহার করলে তা যথেষ্ট ভাবনার বিষয় | আপনি সারাদিন ইংরেজিতে ফাক ফুক বলতে পারেন তাতে সমস্যা নাই | আপনি ইংরেজিকে একটা টেকনোলজি বলতে দ্বিধা বোধ করেন না কিন্তু যখনি হিন্দির কথা আসে তখন আপনি সাচ্চা বাংলাপ্রেমী হয়ে ওঠেন | কিন্তু কেন ? এ থেকে কী প্রমাণ হয় না যে আপনার একটি নির্দিষ্ট ভাষা অর্থাৎ শুধু হিন্দির প্রতি ক্ষোভ !

আচ্ছা আজ কয়েকটা বিষয় একটু খোলামেলা আলোচনা করি | প্রথমত হিন্দির কথা উঠলেই বাংলাদেশের জ্ঞানী ব্যক্তিত্বরা চিৎকার চেচামেচি করে বলা শুরু করেন ৫২র ভাষা আন্দোলনের কথা | যদিও ৫২র চেতনা নিয়ে কথা বলতে গেলে অনেক কিছুই বলতে হয় তবু সংক্ষেপে একটু বলি | ৫২র ভাষা আন্দোলনের সম্মান ও স্বীকৃতি দিতে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পুরো বিশ্ব পালন করে | এটা একদিকে যেমন বাংলার প্রতি সবার সম্মান জ্ঞাপনের ব্যবস্থা করে দেয় তেমনি ৫২র আত্নত্যাগ পৃথিবীর সব মানুষকে নিজ নিজ ভাষাকে ভালবাসতে শেখায় | এজন্যই ৫২র চেতনা বর্তমানে আন্তর্জাতিক সম্মান পেয়েছে | আর যেহেতু আমরাই সেই গর্বিত বাংলাভাষী , সুতরাং আমাদের কাছে এর মূল্য কতটা হওয়া উচিত , তা আর মুখে বলার অপেক্ষা রাখে না | হ্যা এখন এই বাংলাদেশের মানুষই যদি বাংলা বাদ দিয়ে অন্য ভাষার চর্চা শুরু করে তখন একজন সাচ্চা বাঙালি হিসেবে লজ্জা ক্ষোভের জন্ম নেয়াটা স্বাভাবিক | তবে এর মানে কিন্তু এই না যে এই ক্ষোভ অন্য একটা ভাষার প্রতি জন্মাবে | বাংলাদেশের মানুষ বাংলার সঠিক মূল্য দিতে চাইলে অন্যান্য সকল ভাষাই ত্যাগ করুক | সব ক্ষেত্রে শুধু বাংলাই ব্যবহার করুক | শুধু হিন্দি কেন ইংরেজিও বাদ দিক | হিন্দি ভাষার সাথে তো বাংলা ভাষার কোন আদিম শত্রুতা নেই | হিন্দি ভাষাভাষীরা নিশ্চই বাংলা ছিনিয়ে নিতে চায় নি | বরং পরবর্তীতে বাংলাদেশ নামক স্বাধীন একটি ভূখণ্ড সৃষ্টির ক্ষেত্রে যথেষ্ট অবদান তারা রেখেছে | তবে আজ এত বছর পর শুধু হিন্দির প্রতি কেন এতো ক্ষোভ ! আরে বাপু হিন্দির ব্যবহার যদি বাংলার জন্য লজ্জাজনক হয় তবে দেশের মধ্যে ইংরেজির ব্যবহার লজ্জাজনক কেন হবে না ? আপনি যদি একজন সাচ্চা বাঙালি হোন , তো প্রথমেই আপনার কাছে সব থেকে লজ্জার বিষয় হবে ইংরেজি চর্চা | কারণ ইংরেজি ভাষাভাষীরা এই বঙ্গদেশের মানুষের উপর কী অনাচার চালিয়েছে তা নিশ্চই কারো অজানা নয় | একসময় ইংরেজরা তাদের ভাষা জোড় পূর্বক শিখতে বাধ্য করিছিলো | তারপরও যখন আজ আপনি সেই ইংরেজিকেই গর্বের সাথে আক্রে ধরেন , শিক্ষাক্ষেত্রে চাকুরিক্ষেত্রে ইংরেজিকে প্রাধান্য দিন অথচ ঐ কতিপয় কিছু ব্যক্তির হিন্দি ব্যবহারের প্রতিবাদ জানান , তখন নিঃসন্দেহে আপনার ভণ্ড বাংলাপ্রেমী মনোভাব প্রকাশ পায় |

একটা বিষয় কী জানেন , আজকে একটি বাঙালি ছেলে যখন পুরাদমে ইংরেজিতে কথা বলতে পারে , তখন আপনারাই তাকে স্মার্ট কিংবা শিক্ষিত বলে থাকেন | যখন কেউ ইংরেজিতে কোথাও ইন্টারভিউ দেয় , তখন বাহবা দেন | কিন্তু যখন হিন্দি বলে , তখন চিৎকার করেন বাংলার চেতনা নিয়ে | কিন্তু একজন বাঙলা প্রেমী হিসেবে আপনার উচিত ছিলো দুটো ব্যাপারেই সমান প্রতিক্রিয়া দেখানো !

যাহোক এখন আসি মূল কথায় যে কেন এই আলাদা প্রতিক্রিয়া | একটু খেয়াল করে দেখবেন যারা বাংলা প্রেমের কথা বলে তারাই আবার প্রতিনিয়ত স্টার জলসা , জি বাংলার মতো ভারতীয় চ্যানেলগুলো বাংলাদেশে বন্ধ করে দিতে খুব জোর গলায় কথা বলে | কিন্তু এটা কেনো হয় ! স্টার জলসায় তো বাংলাই সম্প্রচার করা হয় তাই না ? হ্যা ব্যাপারটা হলো ভারতীয় চ্যানেল | এটাই হলো মূল বিষয় | বাংলাদেশে যখন জঙ্গি আক্রমণ হয় , তখনও একদল মানুষ বলে সব ভারতের চক্রান্ত | ব্যাপারটা অনেকটা এরকম যে ” যারে নজর নাহি , তার চরণ বাকা” | তাই এখন ৭১এ ভারতীয়দের সাহায্যের কথা স্বীকার করলেও একদল মানুষ বলে ভারতের দালাল | তাই তাদের মুখে কিছু মানুষের হিন্দি বলার জন্য আসমান জমিন এক করা মার্কা প্রতিবাদ তেমন বিশেষ কিছু নয় |

একটা বিষয় একটু ভাবুন তো , ভারতীয়রা কী জোর করে আমাদের হিন্দি শিখতে বাধ্য করছে ? আরেহ বাংলা তো তাদেরও একটা বৃহৎ অংশের ভাষা | আর যেখানে ভারতীয় চ্যানেলগুলো দেখার কথা আসে সেখানে আগে ভাবতে হবে বাংলাদেশের মিডিয়ার অবস্থান কী | প্রতিদিন প্রতিদিন এদেশের মিডিয়াতে ওঠে আসে একদল জোকার প্রকৃতির মানুষ | এখন তাদের কাণ্ডকারখানা দেখতে বাংলাদেশের চ্যানেলে মুখ দিয়ে বসে থাকবে সবাই এটা আশা করাটা ভূল | স্টার জলসার মতো চ্যানেলগুলোতে যা দেখানো হয় , তা মানুষের মনে ধরে বলেই তো তারা দেখে এগুলো ! আরেকটু সহজভাবে বলি , আপনার যখন নিজ দেশে তৈরি ঔষধে রোগ না সারবে , তখনি তো আপনি বাইরের দেশের ঔষধের দিকে হাত বাড়াবেন ! আপনার চাহিদাই আপনাকে বাধ্য করবে ওদিকে হাত বাড়াতে | ঠিক এমনই হচ্ছে এই ব্যাপারেও | আসলে সমস্যাটা হলো কী যারা এসব চ্যানেলের বিরোধীতা করেন , তাদের মানসিকতা হলো অনেকটা এরকম যে নিজের ত্রুটি ঠিক না করে অন্যের গুণে ঈর্ষান্বিত হয়ে বিরুদ্ধে কথা বলা |

আরেকটা বিষয় না বললেই নয় | আপনি যদি একটি অশিক্ষিত লোককে এক মাস প্রতিদিন ইংরেজি সিনেমা দেখান আর এক মাস হিন্দি সিনেমা দেখান তো দেখবেন এক মাসে সে ইংরেজি যতটা বুঝতে শিখেছে , তার থেকে অনেক বেশী বুঝতে পারবে হিন্দি | এর কারণ হলো আপনি যদি বাংলা আর হিন্দি এ দুটি ভাষা নিয়েই যথেষ্ট গবেষনা করেন , তো দেখবেন বাংলার সাথে হিন্দি ভাষায় অনেক মিল | যা ইংরেজির ক্ষেত্রে নেই | এই কারণে এদেশের মানুষের মধ্যে হিন্দি বলার প্রবণতা বা হিন্দি চ্যানেলগুলো দেখার প্রবণতা থাকে | কিন্তু তারপরও আপনাকে একটা বিষয় মানতেই হবে যে এদেশের মানুষ যতটা হিন্দি ব্যবহার করে , তার থেকে অনেক বেশী ব্যবহার করে ইংরেজি | সভ্য সমাজে ইদানিং দেখা যায় প্রতিটি বাংলা বাক্য বলার সময় তারা অন্তত একটা ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করবেই | এমনকি বাংলাদেশের বহু সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তানেরা নিজ বাসায় বাবা মার সাথেও ইংরেজিতে কথা বলে | কিন্তু আপনি বাংলাদেশে এমন কয়টা পরিবার পাবেন যারা সবসময় হিন্দি ব্যবহার করে !
সুতরাং বাঙালি জাতির উপর ইংরেজি কতটা প্রভাব বিস্তার করে আছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না |

যাহোক বাংলা ভাষা নিয়ে গর্ব , এর প্রতি ভালবাসা এবং একজন বাঙালি হওয়ার খাতিরে আমিও চাই অন্য সকল ভাষা ত্যাগ করুক মানুষ | সকল ক্ষেত্রেই বাংলা ব্যবহার করুক সবাই | অর্ধ বাঙালি জীবন থেকে মুক্তি পেয়ে খাটি বাঙালি হোক সবাই | কিন্তু এজন্য নিশ্চই চাই না যে অন্য ভাষার উপর দোষ পড়ুক |

পরিশেষে একটা কথাই বলবো , আপনি যদি সত্যিকারের বাঙালি হয়ে থাকেন তো প্রথমে ইংরেজিকে পরিহার করুন | মনে রাখবেন হিন্দি যদি বাংলাদেশের মানুষের মুখে মিশে থাকে তবে ইংরেজি রক্তে মিশে গেছে | বাংলার মর্জাদা করতে কথা বলার সময় আগে ইংরেজি ব্যবহার পরিত্যাগ করা এখন সময়ের দাবী …..

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

71 − 68 =