আমার ক্ষুদে গল্পরা

এই স্বাপ্নিক যেদিকে তাকাতো সেদিকেই ফুটতো চাঁদ, জোৎস্না। আলোভরা তুষার পড়তো, শুকনো পাতার ঝড় হত, হৈমন্তিক সুগন্ধ আসতো। মেপল পাতার মেঘ উড়তো।

/800px-Sandro_Botticelli_-_La_nascita_di_Venere_-_Google_Art_Project_-_edited.jpg” width=”400″ />

অপার্থিব আকাশ

বহুদিন আগে এক স্বাপ্নিক ছিলো, যার নাম জানা যায় না। রুগ্ন মূমূর্ষু সে সমাজের থেকে থাকতো অনেক অনেক দূরে। গহন অরণ্যের ভেতর। যেখানে আইভিলতা ছিলো, অবন্য পাতা ও ফুলও ছিলো। প্রজাপতিরা ঢাক বাজাতো সেখানে, গান গাইতো দানবেরা।

এই স্বাপ্নিক যেদিকে তাকাতো সেদিকেই ফুটতো চাঁদ, জোৎস্না। আলোভরা তুষার পড়তো, শুকনো পাতার ঝড় হত, হৈমন্তিক সুগন্ধ আসতো। মেপল পাতার মেঘ উড়তো।

নিজের ভেতরে সে বহন করতো মহৎ যন্ত্রণা, মাকড়শার মতো যা তার দিকে বাড়াতো পা। পাখি আর পশু আর সৌন্দর্য ছিলো তার বান্ধব। সাহিত্য ছিলো তার জীবনের আশ্রয়।

যতোদিন এ বেঁচে ছিলো ততোদিন আকাশকে মনে হতো আশ্চর্য সুন্দর। তার মৃত্যুর দিনে ঘটলো মহা আলোড়নজাগানো একটি ঘটনা।

আকাশ হয়ে উঠলো ময়লা ময়লা আবছা নীল রঙ করা একটি কাঠের তক্তা। ফাটা ফাটা সেটি। ঘুণে ধরা। স্বপ্ন তো নয়ই, গভীর নীলও নয়, কুৎসিত দুঃস্বপ্নও তাকে বলা যায় না।

আর তার নিচেই পৃথিবীর শুয়োরেরা চিৎকার ক’রে যাবে অনন্তকাল ধ’রে।

ধাতুদের বিকেল

বাঙলা ভাষার এক মহৎ কবিতার মতোই সত্তায় তার আশ্চর্য বিষাদ।

সন্ধ্যার একটু আগে, পুব দিকের তালগাছটি নড়ছিলো যে-সময়, তার চোখের সামনেই ধাতুদের খেলা শুরু হলো।

মাটি ভরলো ল্যাপিস ল্যাজুলাইয়ে। উঠোনের পেয়ারাগাছটির প্রতিটি পাতা রূপান্তরিত হ’য়ে হলো সবুজ মুক্তো। আর সেগুলোর প্রতিটির পাশে গুঁড়ো স্বর্ণের ছোটো ছোটো মেঘ ঘুরপাক খেতে লাগলো।

লোহিত সূর্য হলো বিশাল মণি। স্ফটিকের মেঘ সেটি চুম্বন করলো। তরল স্রোত মহাজগতের পরপার থেকে এসে মানুষটিকে ভাসিয়ে নিয়ে গেলো ধাতুর জগতে।

নীলের কথা লোহিতের কথা

/450px-Moon_in_Sunrise_Sky_2.jpg” width=”400″ />
নীল, অনন্ত/অসীমের প্রতীক যে, আজ আকাশে এমনভাবে ছড়ানো -এমন স্বপ্নীয় আগুনের মতো- যেন সমস্ত অস্তিত্ব ধ্বংস ক’রে, লৌকিক-অলৌকিক সমস্ত অস্তিত্ব গুঁড়ো ক’রে সে-ই শুধু অস্তিত্বমান, সাহিত্যিকের সৃষ্টির মতোন প্রকাশিত। তার মধ্যে হঠাতই জাগলো টকটকে লোহিত সূর্য, রক্তে ভরা স্বচ্ছ কাচের পাত্রের মতো, যার মন্দির হবে আদিম ঘন অরণ্য। সে ছড়িয়ে পড়লো নীলে : তার আলো ছড়িয়ে পড়লো। নীলে মেশলো লাল : অসীমে জীবন। লোহিত সেই সূর্য জানালা দিয়ে ঢুকে ঘুম ভাঙালো আমার, বুঝলাম আমারো অস্তিত্ব আছে।
এমন অপার্থিব আবেগ ডোরাকাটা চামড়ার সুন্দর বনের বাঘের মতো আজ আমার ভেতরে ঢুকলো। সূর্যকে দেখলাম, জানালাটি আকাশনীল হ’য়ে ছিলো, মনে পড়লো নজরুলের বিখ্যাত পংক্তি : ‘সূয্যি মামা/ দেয় হামা/ গায়ে রাঙা/ জামা অই।’ মদির দ্রাক্ষা থেকে মদ্য তৈরি করছে নিসর্গ এখন।
দাড়িম্ববনে সহস্র বিকচ দেখলাম। দক্ষিণাপথে যাযাবর বিহঙ্গের মতো ছুটলো আমার সংকীর্ণ আত্মা। নিশ্চয় সে দর্শনের সীমা লঙ্ঘন করেছে। চোখের মধ্যে যতোদূর পৌঁছোয়, সেই দেবদারু গাছের চূড়ো, তার থেকে আমার দেহের কাছে আসলো এক গম্ভীর মেঘ, সোনালি পাখিরা। একদা তারা কি লীন ছিলো পবিত্র অগ্নিশিখায়?
আচমকা আমাতে যাতনা ভর করে। অস্পষ্ট স্বপ্নও আসে কাছে : বহুদিন আগে, এডন উদ্যান থেকে আদম ও ইভকে তাড়িয়ে দেওয়ার পর, আদম ও ইভের দুই শিশুর জন্ম হয়েছিলো। তারা আবেল ও কেইন। ঈশ্বরকে আবেল উৎসর্গ করেছিলো পশু, কেইন শস্য। আবেলের উৎসর্গ ঈশ্বর গ্রহণ করে, যেহেতু সে পশুপালকের ঈশ্বর, কেইনেরটা গ্রহণ করে না। কেইন আবেলকে হত্যা করে। আর ঈশ্বর কেইনকে অভিশাপ দেয়। আমি কৃষিপ্রধান বঙ্গদেশবাসী। কেইন আমার আদিপিতা। তাই কি প্রতিটি কৃষক মানুষের মতোই আমাতেও ঈশ্বরের অভিশাপ পড়লো? নাকি আমি কোনো অপরাধ করেছি? অপরাধবোধ আমায় আচ্ছন্ন করে, যন্ত্রণায় কাতর হই। আমি একটি মানবসন্তান অর্থাৎ একটি নিকৃষ্ট পশুকে হত্যা করেছি। মানব-বিধাতার আগুনক্রোধ ছুটে আসছে।
মৃত্যু, কেবল মৃত্যুই ধ্রুবসখা।
যাতনা, শুধুই যাতনা সূচির সাথী।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

68 − 62 =