বৃদ্ধাশ্রমের প্রয়োজনীয়তা


কামুর ‘বহিরস্থিত’ উপন্যাসটির প্রধান চরিত্র মার্সো তার সমাজ দ্বারা নিন্দিত হয়েছে, তার অনেক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও কর্মকাণ্ডের সাথে, এটার জন্যে যে সে তার মাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়েছে, নিজের কাছে রাখে নি। মার্সো এর যে-উত্তর দিয়েছে তা বেশ চমকপ্রদ এবং অবশ্যই তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মার্সো এমন কথা বলেছে যে তার মাকে যদি সে নিজের কাছে রাখতো মা সুখী হতো না মোটেই, কোনো সঙ্গ পেতো না, মনে হতো যেন জগতের বাইরে পতিত হয়েছে। কিন্তু বৃদ্ধাশ্রমে যেয়ে তার মা পেয়েছে সঙ্গ বা সুখ।

আসলে বৃদ্ধদের সম্পর্কে আমরা কিছু ভয়াবহ সত্যি লুকিয়ে রাখি। এই সত্যিগুলো যদি আমরা জানতে পারি তবে বৃদ্ধাশ্রমের বিরোধিতা করবো না, বরং বৃদ্ধাশ্রমকে আমরা দেখবো বৃদ্ধদের জন্যে একটি স্বর্গীয় স্থান হিসেবে।

প্রথমত, বৃদ্ধদের ‘সঙ্গ’-এর কথাটা বলা যাক। পুরোনো বাইবেল থেকে আমরা জানতে পারি যে পুরোনো কালের মানুষেরাও জানতো সন্তান পিতা-মাতাকে একদম ত্যাগ ক’রে গ্রহণ করে ভিন্ন লিঙ্গের সঙ্গীকে। এর আগে পিতা-মাতার সাথে সন্তানের সরাসরি যৌন সম্পর্ক না থাকলেও বিশেষ এক ধরনের কামের সম্পর্ক থাকে। মেয়ে সন্তানের সাথে পিতার মধুর সম্পর্ক এবং ছেলে সন্তানের ঘণ্টার পর ঘণ্টা মায়ের শরীরের গন্ধ শোঁকা সম্পর্কে আমরা সবাই জানি। এবং এগুলো খুবই বিখ্যাত। কিছু প্রবচন, লোককথা ও ছেলেভোলানো পদ্যও জন্মেছে এগুলো থেকে। যেমন বলা যায় ‘ছাওয়াল ঘরে থাকতি মার হাতের চুরি খুলতে নাই’-এর কথা। তো সন্তান যখন একটু বড়ো হয়ে যায় তখন পিতা-মাতার ওপর সে বিরক্ত হতে শুরু করে। ঈডিপাস-গূড়ৈষার কাল তো শেষ হয়ই। তখন সে চায় ভিন্ন লিঙ্গের সঙ্গী, যার সাথে সে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করবে। কিন্তু মা-বাবা চাইতে থাকে সন্তানের সঙ্গ। সন্তান মা-বাবার এই কামনাকে ঘেন্না করতে থাকে। তখনই জন্মে ক্ষোভ : ‘ক-এর বিয়া দিয়া করলাম কী? আগে যদি জানতাম, পালকি ধইরা টানতাম। ক-এর বিয়া দিয়া করলাম কী?’

যুবক-যুবতীরা ধারন করে কাম। তবে বৃদ্ধদের কামের মতো তা বিকৃত কাম নয়। তা সুস্থ ও সুন্দর। কামের দিক দিয়ে অনাকর্ষনীয় কিছু যুবসমাজ পছন্দ করে না। তাদের গো গো সানগ্লাস পড়া, শার্টের বোতাম খুলে মোটর সাইকেল চালানো, চুলের স্পাইক, চোঙা প্যান্ট, দুঃখী দুঃখী ভাব করা, গান গাওয়া, ভালো ফলাফল করা; তাদের বাংলা-ইংরেজি মেশানো এক ভাষা, যে-ভাষার নাম আমি দিয়েছি কামেলি ভাষা, সে-ভাষায় কথা বলা, লিপস্টিক মাখা, এসবই কামের জন্যে। অনাকর্ষনীয় বৃদ্ধদের তারা পছন্দ করে না। তাছাড়া, বৃদ্ধদের মধ্যে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য আছে যা খুবই ঘৃণ্য যুবকদের কাছে। ফলে বৃদ্ধরা শতোবার চাইলেও তাদের তরতাজা রক্তের সন্তানদের সঙ্গ পাবে না। তারা এজন্যে হতাশায় মরে। তাদের মনে হয় মহাজগত তাদের শত্রু হ’য়ে উঠেছে।

দ্বিতীয়ত, মৃত্যুচিন্তা গ্রাস ক’রে ফেলে বৃদ্ধদের। তাদের চিন্তার ধরন, কথাবার্তা সব যুবকদের থেকে হয় অন্যরকম। যুবকেরা ওইসব কথা সহ্য করতে পারে না। কিন্তু বৃদ্ধরা ওসব বলার তীব্র চাপ বোধ করে।

বৃদ্ধাশ্রমের বৃদ্ধদের মধ্যে যেয়েই একজন বৃদ্ধ খুঁজে পেতে পারে সঙ্গ, সুখ এবং মেটাতে পারে কথা বলার ক্ষুধা।

মার্সোর মাও বৃদ্ধাশ্রমে যেয়ে সঙ্গী খুঁজে পেয়েছিলো।

বৃদ্ধরা সন্তানদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে কেন? বৃদ্ধরা কি বস্তু? সন্তান যদি অমন করতে চায় নিজের বিষয়-সম্পত্তি ও যৌবনে সঞ্চিত অর্থ দ্বারা বৃদ্ধরা চলা শুরু করবে। এবং রয়েছে বৃদ্ধাশ্রম।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 5 = 4