বাংলাদেশে জঙ্গীবাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক কারা এবং কেন

বাংলাদেশে জঙ্গীবাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক কারা এবং কেন
সাইয়িদ রফিকুল হক

বাংলাদেশে জঙ্গীবাদ নিয়ে নানারকম আলাপ-আলোচনা শুনতে পাওয়া যায়। এই বৎসর রমজান-মাসে গুলশানে ‘হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে’ জঙ্গীদের অতর্কিতে হামলার পর থেকে বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ এতোদিন জঙ্গীবাদের বিষয়টিকে এতোটা আতঙ্কের ব্যাপার মনে করেনি। কিন্তু গুলশানের হামলার পর থেকে বাংলাদেশের মানুষ যেন এখন নড়েচড়ে বসেছে। এখন সাধারণ মানুষও বিষয়টি নিয়ে ভাবে। আর দেশের মানুষের ভিতরে এখন কিছুটা হলেও আতঙ্কভাব কাজ করছে।

বাংলাদেশে জঙ্গীবাদের বীজ একদিনে রোপিত হয়নি। দিনে-দিনে এটি আমাদের অস্তিত্বকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য নিত্যনতুন মোড়কে উপস্থাপিত ও প্রতিস্থাপিত হচ্ছে। এরা স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশকে আজ পরিকল্পিতভাবে হুমকির মুখে ঠেলে দিতে চাইছে। এই বাংলাদেশে এরা বরাবরই সংগঠিত। এদের রয়েছে একটি শক্তিশালী-আশ্রয়কেন্দ্র। আর এদের মদদদাতারাও আগে-পরে অনেক ক্ষমতাশালী। স্বাধীন বাংলাদেশরাষ্ট্রে এরা এখন একটি এলিটশ্রেণী। আর এর মূলে রয়েছে বাংলাদেশবিরোধী কতিপয় রাজনৈতিক দল নামধারী ভয়ানক অপশক্তি। আর এরা জন্মলগ্ন থেকে কোনো নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির অনুসারী বা ধারক-বাহক নয়। এরা রাতের আঁধারে ও অতর্কিতে আবির্ভূত হয়েছে আমাদের সামনে—রাজনৈতিক তকমা গায়ে! এরা গায়ের জোরে বাংলাদেশে রাজনৈতিক দল গঠন করে আজ বাংলাদেশরাষ্ট্রকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চাইছে। এরা পাকিস্তানের চিহ্নিত-প্রেতাত্মা।

বাংলাদেশে জঙ্গীবাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হলো:

১. জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান: বাংলাদেশে জঙ্গীউৎপত্তির বা জঙ্গীবাদের প্রধান উৎস জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান। আর এদের নেতৃত্বেই বাংলাদেশে ভিন্ন-ভিন্ন নামে জঙ্গীর উদ্ভব ও বিকাশ ঘটছে। এরা মুখে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির কথা বললেও—আসলে, এরা সন্ত্রাসকে নিজেদের দলীয় আদর্শ হিসাবে গ্রহণ করেছে। আর ১৯৭১ সালে, তারা জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানের অধীনে যে-ভাবে শান্তিকমিটি, রাজাকার, আলবদর ও আলশামসের নামে সংগঠিত হয়েছিলো—এখনও তারা সেই একইভাবে বিভিন্ন সংগঠনের নামে নিজেদের আধিপত্যবিস্তারের ষড়যন্ত্র ও সন্ত্রাস পরিচালনা করছে। আর মনে রাখবেন: বাংলাদেশের ইতিহাসে সেই ১৯৭১ সালে, জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানের অধীনে সংগঠিত শান্তিকমিটি, রাজাকার, আলবদর ও আলশামস-ই এদেশের প্রথম জঙ্গীসংগঠন। আর এখনকার জেএমবি, হরকাতুল জিহাদ, আনসারুল্লাহ বাংলা-টিম থেকে শুরু করে আল-আনসার পর্যন্ত সবই বর্তমান জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রাধীন।
২. বিএনপি: পাকিস্তানের আরেকটি পাপের ফসল হলো আজকের বিএনপি। এরা বাংলাদেশের সবরকমের জঙ্গীদের অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও সমর্থক। জন্মলগ্ন থেকে বিএনপি সন্ত্রাসের পক্ষে আর সন্ত্রাসবাদকে নিজেদের রাজনীতির প্রধান হাতিয়ার হিসাবে গ্রহণ করেছে। হত্যা ও ষড়যন্ত্রের ভিতর দিয়ে একজন জঙ্গী জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশে বিএনপি-নামক জঙ্গীমদদদাতা-সংগঠনের জন্ম দেয়। আর তাই, বলা হয়ে থাকে, এরা জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানের পকেট থেকে জন্মলাভ করেছে। এখনও এই বিএনপি’র স্থায়ী-কমিটি’র সকল সদস্য দেশে জঙ্গীবাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও মদদদাতা।
৩. পাকিস্তানপন্থী সুশীলসমাজ: বাংলাদেশে পাকিস্তানপন্থী একটি সুশীলসমাজ বা এলিটশ্রেণী রয়েছে। এরা এখনও পাকিস্তানকে মনেপ্রাণে ভালোবাসে। এরা সবসময় বাংলাদেশের জঙ্গীদের আড়াল করার চেষ্টা করে। এদের সবার মধ্যে ধর্মীয় ও মানবিক মূল্যবোধ একেবারে কম। এরা বংশগতভাবে আজও সেই ‘পাকিস্তান-মুসলিম-লীগে’র দালাল। আর তাই, এরা সবসময় বাংলাদেশরাষ্ট্রের স্বার্থপরিপন্থী-অপকাণ্ডে নিয়োজিত। এরা সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় নিজেদের আধিপত্যবিস্তারে এখনও সক্রিয়।
৪. পাকিস্তানপন্থী একশ্রেণীর জারজ-প্রাইভেট-টিভি-চ্যানেলসমূহ: এরা অত্যন্ত কুকৌশলে ধর্মের নামে কিংবা মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে বিভিন্ন প্রাইভেট-টিভি-চ্যানেল চালু করে ধর্মের নামে মানুষহত্যাকারীদের পক্ষ নিয়ে রাষ্ট্রবিরোধী-অপতৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। চ্যানেল ’৭২-’৭৩ এদের ব্যবসার হাতিয়ার।
৫. একশ্রেণীর দেশবিরোধী দৈনিক জারজ পত্রিকা: এই সারির প্রথমে রয়েছে একাত্তরের চিহ্নিত রাজাকার, শয়তানের জারজপুত্র, জল্লাদবাহিনীর প্রধান আব্দুল মান্নান প্রতিষ্ঠিত “দৈনিক ইনকিলাব”। দৈনিক ‘আমার দেশ’ পাকিস্তান, যায়যায়দিন, নয়াদিগন্ত ইত্যাদি। এর মধ্যে ‘দৈনিক আমার দেশ’ পাকিস্তান ও ‘দৈনিক নয়াদিগন্ত’ অতিসম্প্রতি নিষিদ্ধ ঘোষিত হলেও এদের অনলাইন-সংস্করণ কিন্তু এখনও চলছে। আর বাংলাদেশবিরোধী এইসব পত্রিকা সবসময় আমাদের মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনাবিরোধী অপপ্রচারে নিয়োজিত। এরা ধর্মের নামে ধর্মবিকৃতি করে সাধারণ মানুষকে ধোঁকা দিয়ে সমাজে-রাষ্ট্রে সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদকে জায়েজ হিসাবে পরিচালনা করতে চায়।
৬. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র: ১৯৭১ সাল থেকে আমেরিকা বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী-অপকাণ্ডে নিয়োজিত। সারাপৃথিবীতে জঙ্গীবাদ-সম্প্রসারণের একমাত্র মোড়ল আমেরিকা। আর এর সহযোগী শয়তানরাষ্ট্রগুলো হলো: পাকিস্তান, ইসরাইল ও তুরস্ক। এরা সবাই মিলেমিশে বাংলাদেশে জঙ্গীবাদ-সম্প্রসারণ করতে চাইছে। বাংলাদেশের শান্তি ও স্থিতিশীল পরিবেশ বিনষ্ট করাই এখন এদের একমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।

ওরা কেন এরকম করছে?
১৯৭১ সালে, যারা বাংলাদেশরাষ্ট্র চায়নি—তারাই এখন একজোট হয়ে বাংলাদেশকে রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত করে তুলতে চাইছে। বাংলাদেশের স্থিতি ও অগ্রগতিকে নস্যাৎ করার জন্যই তারা স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশেকে বিশ্বের বুকে কোণঠাসা করে রাখার জন্যই এই আগ্রাসনপরিচালনা করছে। আর এরা সবাই আমাদের মুখচেনা-শয়তান—আর বাংলাদেশের ঘোরশত্রু। তারা এই দেশটাকে আফগানিস্তান কিংবা পাকিস্তান বানাতে চাইছে। আর তাই, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনা পুরাপুরি মুছে ফেলতেই আজ তাদের এই জঙ্গীউত্থানের ভয়ানক অপচেষ্টা।
বাংলাদেশে নৈরাজ্যসৃষ্টির মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতাদখল করার জন্যই ১৯৭১ সালের পরাজিত-শকুনগোষ্ঠী জঙ্গীনামে দেশের ভিতরে সংগঠিত হয়েছে। আর এরা এই দেশটাকে নিজেদের স্বার্থউদ্ধারের আফগানিস্তান বানাবার জন্য এহেন অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

সাইয়িদ রফিকুল হক
মিরপুর, ঢাকা, বাংলাদেশ।
০৪/০৮/২০১৬

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “বাংলাদেশে জঙ্গীবাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক কারা এবং কেন

    1. আপনি ঠিকই বলেছেন। সরকারকে আরও
      আপনি ঠিকই বলেছেন। সরকারকে আরও সতর্ক ও দায়িত্বশীল হতে হবে।
      আপনাকে অশেষ ধন্যবাদসহ শুভেচ্ছা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 8 = 1