স্বদেশী আন্দোলনের মূল্যায়নে রবীন্দ্রনাথ কি ভুল করেছিলেন?

কৈফিয়তঃ স্বদেশী আন্দোলনের পক্ষে বিপক্ষে মেলা যুক্তি শুনেছি, এর দু দিকেই আবার আছে অনেক ফেরকা, সরলভাবে ইতিহাস জিনিশটা জানা যায় না সম্ভবত। এ বিষয়টা অনেকদিন ধরে আমার মাথা কামড়াচ্ছে। মাথায় নতুন চিন্তা আসলে শেয়ার করার জন্য পাগল হয়ে যাই, অপরাধ কবুল করছি, এই লেখাটা আমি এক বৈঠকে লিখে ফেলেছি।

পটভূমি

সম্প্রতি ‘তুমি শুধু পঁচিশে বৈশাখের’ জন্মদিন গেলো। আল-বিরুনি প্রমিথ ও এ.টি।এম গোলাম কিবরিয়ার লেখাসূত্রে, আমার মনে হল কিছু কথা লেখা দরকার, স্বদেশী আন্দোলনের বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ কৃত মূল্যায়ন বিষয়ে। খণ্ডিত জ্ঞানের দায় এই উপমহাদেশ নানাভাবেই মেটাচ্ছে, কারো পক্ষে পূর্নাঙ্গ জ্ঞান অর্জন সম্ভব নয়, তবে বিচ্ছিন্ন চিন্তাগুলো নিশ্চয়ই ‘এসেম্বল’ করা যায়!

বারবারা সাউথার্ড ১৯৮০ সালে অরবিন্দ ঘোষকে নিয়ে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন, এই লেখার অধিকাংশ তথ্য নিয়েছি এটি থেকেই, শুরুতেই সেই ঋণ আমি স্বীকার করে রাখলাম। সেই প্রবন্ধে তিনি জানিয়েছেন, বাংলার আপার কাস্টরা ছিলো হিন্দুদের শাক্ত কাল্ট (মা কালীর উপাসক) আর লোয়ার কাস্টরা ছিলো হিন্দুদের বৈষ্ণব কাল্ট (রাধাকৃষ্ণের যুগলমূর্তির উপাসক) এবং মুসলমান সম্প্রদায়। বলে রাখা দরকার, আলীগড় আন্দোলনের সৈয়দ আহমদ খান বা সৈয়দ আমীর আলীরা উত্তর ভারতের মুসলমান ছিলেন, বাংলার মুসলমানদেরকে নিয়ে তাঁদের মাথাব্যাথা ছিলো না।

বারবারা আরো জানাচ্ছেন, আপার কাস্টগুলো ছিলো ব্রাহ্মণ বৈদ্য ও কায়স্থ, তাঁদের পেশা ছিলো জমিদারী এবং কলকাতায় কেরাণীগিরি। এই কেরাণীরাই নিজেদের দাবী করতেন ‘ভদ্রলোক’ হিসেবে, ১৯০১ সালের সেন্সাস থেকে এটা জানা যাচ্ছে, মোট জনসংখ্যার মাত্র ৫ শতাংশ হওয়া সত্ত্বেও, এঁদের জন্য বরাদ্দ ছিলো ৮০ শতাংশ চাকরি। ইংরেজি শিক্ষার এতো বেশি দাম ছিলো যে, ভদ্রলোকরা এমনকি নিজেদের জমিদার স্ববর্ণীয়দেরও ‘ক্ষ্যাত’ ভাবতেন, মূলত এঁরাই হচ্ছেন আজকের মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকদের পূর্বসূরী।

ইংল্যান্ডের ‘মিডলক্লাস’ সরাসরি সম্পর্কিত ছিলো কমার্স/ইন্ডাস্ট্রির সাথে, কিন্তু এই বাঙালি ‘মধ্যবিত্তের’ জেনেসিস চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, জমি ছাড়া সে আর কিছুই কখনো বোঝেনি।

লোয়ার কাস্টগুলো ছিলো পশ্চিমবঙ্গে কৈবর্ত ও মহিঃস্থ, পূর্ব বাংলায় নমঃশূদ্র, আর সাধারণভাবে মুসলমানেরা। এছাড়া ছিলো বানিয়া। এরা ক্ষুদ্রব্যবসায়ী ছিলেন।

আপার কাস্টরা দূর্গা আর কালীর উপাসনা করতেন। দূর্গা অসুর বধ করে দূর্গতি নাশ করেন, আর, কালীর গলায় ঝুলতে থাকে শত্রুদের রক্তাক্ত মুণ্ড। এসব ধর্মীয় ‘প্রতীক’ পরবর্তীতে ‘ব্যবহার’ করা হয়েছিলো।

১৮৭০ সাল থেকেই ভদ্রলোকরা বেকারত্ব-আশঙ্কায় ভুগছিলেন। তাই তাঁদের মধ্যে ‘স্বশাসনের’ আকাঙ্খা দ্যাখা দিচ্ছিলো, ১৮৯৯-১৯০৫ এই সময়টায় লর্ড কার্জনের অজনপ্রিয় পলিসি, এই আকাঙ্খাকে রাজনৈতিকায়িত করার পথ দ্যাখায় বঙ্গভঙ্গ। এবং এর ফলে স্বদেশী আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে।

স্বদেশী আন্দোলনের পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তনঃ নিয়মতান্ত্রিকতা থেকে সন্ত্রাসবাদ

স্বদেশী আন্দোলন শুরুতে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে পরিচালিত হয়। কলকাতার টাউন হলে মিটিংয়ের মাধ্যমে এর যাত্রারম্ভ। কিন্তু অতি দ্রুত এ আন্দোলন ভাগ হয়ে যায়। একদিকে থাকেন ‘মডারেট’ সুরেন ব্যানার্জি রাসবিহারী ঘোষরা, অন্যদিকে অরবিন্দ ঘোষ বিপিন পালরা ‘র‍্যাডিকাল’ হন। র‍্যাডিকালরা দাবি দাওয়া আর বিদেশী কাপড় বর্জনে, বা জাতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণে তুষ্ট নন, তাঁরা চান ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আরো তীব্র আন্দোলন। ১৯০৭ সালে সুরাট কংগ্রেসে ফাটলটা স্পষ্ট হয়। র‍্যাডিকালরা বেছে নেন ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিপ্লবের পথ, বন্দে মাতরম পত্রিকা মডারেটদের পরিহাসে মেতে ওঠে, গড়ে উঠতে থাকে যুগান্তর অনুশীলনের মতো সমিতি। নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনই একসময় রূপ নেয় সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনে, ১৯১২ সালে দুই বাংলা আবার জোড়া লাগে, এবং এই আন্দোলন তাঁর ‘র‍্যাশনাল’ হারিয়ে ফেলে।

অরবিন্দ ঘোষের পলিটিকাল বেদান্তঃ সনাতন ধর্মের আধুনিকীকরণ?

কায়স্থ ডাক্তারের ছেলে অরবিন্দ বাংলা জানতেন না। সেই সময় ভদ্রলোকের সন্তানরা পড়তে যেতেন কলোনিয়াল ইংল্যাণ্ডে, এখন যেমন তাঁরা পড়তে যান ইউরোপ আমেরিকায়, মাঝখানে যদিও টেমস নদীতে অনেক পানি গড়িয়েছে। অরবিন্দও উচ্চশিক্ষা লাভ করেছিলেন সেই ইংল্যান্ড থেকেই, ১৮৯২এ দেশে ফিরে তাকে রীতিমত খাটতে হয়েছে, নিজের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের শেকড়টা খুঁজে পাওয়ার জন্য। অরবিন্দ দেশে ফিরে ‘ইন্দু প্রকাশের’ প্রাবন্ধিক হন, তিনি লক্ষ্য করেন কলকাতার মধ্যবিত্ত শেকড় বিস্মৃত, এবং এটা রাজনীতিকে আটকে রাখছে তাঁদের মধ্যে। তিনি মত দিলেন, কলকাতার মধ্যবিত্তকে তাঁর পলিটিকাল স্ট্র্যাটেজি বদলাতে হবে, হরিজন্টালি যুক্ত হতে হবে গ্রামের স্ববর্ণীয়দের সাথে, আর তাঁদের মাধ্যমে ভার্টিকালি লোয়ার কাস্টদের সাথে। যদিও অরবিন্দ ‘র‍্যাডিকাল’, রাজনীতি কিন্তু তিনি রাখতে চেয়েছেন মধ্যবিত্তেরই হাতে, আর অন্যদেরকে তিনি চেয়েছেন স্রেফ ‘ব্যবহার’ করতে। এজন্য তিনি এবার বেছে নিলেন ধর্মের হাতিয়ার।

এক্ষেত্রে তাঁর প্রধান রেফারেন্স বঙ্কিমচন্দ্র ও বিবেকানন্দ। বঙ্কিম তাঁর আনন্দমঠে সন্ন্যাসের ‘আধুনিক’ তাফসির করেছিলেন, যেখানে সনাতন ধর্মে সন্ন্যাস ‘ব্যক্তিগত মুক্তি’ আকাঙ্খী, সেখানে বঙ্কিম একে ‘জাতীয় মুক্তির’ ব্রহ্মাস্ত্র বানান। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী একটি দুর্দান্ত প্রবন্ধে (নামঃ সংমিশ্রণের পাপ) দেখিয়েছিলেন, উপন্যাসের শেষে জ্ঞান যখন হাত ধরছে ভক্তির, সনাতন ধর্মের এই আধুনিকীকরণে আসলে ভক্তির কাছে হেরে যাচ্ছে জ্ঞান। আবার বঙ্কিমের কাছে জাতি হচ্ছে আপার কাস্টসমূহ, বন্দে মাতরমের দেবী হচ্ছেন শাক্ত কাল্টের কালী, যিনি কোল দেন না মুসলমানসমেত লোয়ার কাস্টসমূহকে। বেদান্ত ছিলো শঙ্করাচার্য প্রচারিত ‘অদ্বৈত দর্শনের’ মূলগ্রন্থ, ক্রিশ্চান মিশনারি আর ব্রাহ্মসমাজের যৌথ আক্রমণের শিকার, তাঁরা ভাবতেন এই দর্শন সমাজের বেটারমেন্টের বিরোধী। বিবেকানন্দ ‘প্র্যাকটিকাল বেদান্ত’ লিখে এর জবাব দেন। অরবিন্দ প্র্যাকটিকালিটিকে প্রতিস্থাপিত করেন তাঁর পলিটিকালিটি দ্বারা।

অরবিন্দ তাঁর রাজনৈতিকতায় মেলান এই দুজনকে, তাঁর পলিটিকাল বেদান্ত বিশ্বাস করে মানবজাতির কল্যানে, এই মানবজাতি তৈরি হয়েছে বিভিন্ন জাতি দ্বারা, প্রতিটি জাতির ‘শক্তি’ জনগণের ‘শক্তির’ সামষ্টিক রূপ, এবং নিশ্চয়ই মা কালীই সকল শক্তির উৎস, ১৯০৫এ প্রকাশিত ‘ভবানী মন্দির’ নামক একটি পামফ্ল্যাটে, অরবিন্দ ঘোষ দাবী তোলেন একদল রাজনৈতিক সন্ন্যাসীর যাঁদের কাজ কালী মায়ের জন্য আত্মাহুতি দেওয়া ‘জাতীয় মুক্তির’ লক্ষ্যে। পরবর্তীতে নজরুল ইসলামের আনন্দময়ীর আগমনে কবিতায় প্রকাশ পেয়েছে এই আকাঙ্খাই, “আর কতোকাল থাকবি বেটি মাটির ঢেলার মূর্তি আড়াল/ স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি চাঁড়াল!” এখানে স্বর্গ ভারতবর্ষ আর চাঁড়াল হচ্ছে ইংরেজ।

অরবিন্দ ঘোষ পরবর্তীতে পরিণত হয়েছিলেন হিন্দু সাধুতে, কিন্তু আগে থেকেই তাঁর মধ্যে আধ্যাত্মপ্রিয়তা ছিলো, তিনি ভারতের স্বাধীনতাকে স্পিরিচুয়াল মিশন মনে করতেন এবং মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন ভারত বিশ্বকে বস্তুবাদী সভ্যতার হাত থেকে আত্মিক মুক্তিলাভে নেতৃত্ব দেবে। এখানে তিনি প্রভাবিত হয়েছিলেন কিছুটা বিবেকানন্দ দ্বারা। তবে ফারাকটা হচ্ছে, বিবেকানন্দ যা করতে চেয়েছেন ‘রামকৃষ্ণ মিশনের’ মাধ্যমে, অরবিন্দ তা করতে চেয়েছিলেন সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের মাধ্যমে।

অরবিন্দ আশা করতেন সমর্থন পাবেন গ্রামের স্ববর্ণীয়দের, আর তাঁদের মাধ্যমে লোয়ার কাস্টের সকল প্রজার, ব্রিটিশ ব্যুরোক্রেসির বিরুদ্ধে তাঁর ‘সন্ত্রাসবাদী’ রাজনৈতিক ‘বিপ্লবে।’ এই আশা অবশ্য শেষ পর্যন্ত কাজ করেনি। না করার কারণ এই পরিসরে বর্ণনা অসম্ভব।

অরবিন্দ ১৯১০এ চলে গিয়েছিলেন মাদ্রাজের ক্ষুদে-ফরাশি-টেরিটোরি পণ্ডিচেরিতে।

কিন্তু তাঁর চিন্তা তাঁর সাথে চলে যায়নি।

সন্ত্রাসবাদীদের আবিষ্কৃত এই ‘জাতি’ বাদ দিলো কাদেরকে?

মুসলমানসমেত লোয়ার কাস্টসমূহকে।

শুরুতে কিন্তু মুসলমানরা স্বাগত জানিয়েছিলেন স্বদেশী আন্দোলনকে। মুসলমানদের প্রতিনিধিত্বকারী মিহির ও সুধাকর পত্রিকার ১৯০৫ সালের জুলাই মাসের ১৪ তারিখের সংখ্যা থেকে জানা যাচ্ছে, তাঁরাও হিন্দুদের মতো বাংলার অখণ্ডতায় বিশ্বাস করেন, এবং তাঁরা স্বদেশী আন্দোলন মন থেকে সমর্থন করেন। কিন্তু ১৯০৬-০৭এ পত্রিকাটি পূর্বাবস্থান থেকে সরে আসে, দাবি করে বঙ্গভঙ্গে লাভ হচ্ছে মুসলমান সম্প্রদায়ের, এবং সমর্থন সরিয়ে নেয় স্বদেশী আন্দোলন থেকে। ১৯০৭ সালে বিক্রমপুর, কুমিল্লা আর জামালপুরে হিন্দু মুসলমান সংঘর্ষ ঘটে। হিন্দুদের (আপার কাস্টসমূহের, কারণ, তখন লোয়ার কাস্টসমূহের পত্রিকা ছিলো না কোনো) প্রতিনিধিত্বকারী পত্রিকাগুলো ব্রিটিশদের ‘ডিভাইড এন্ড রুল’ পলিসিকে দায়ী করে, আর মুসলমানদের প্রতিনিধিত্বকারী পত্রিকাগুলো দাবী করে হিন্দুদের শোষণকে, আমার ধারণা দুই তরফের দাবিই আংশিকভাবে সত্য।

সব ‘হিন্দু’ কখনোই বঙ্গভঙ্গের পক্ষে ছিলেন না, আপার কাস্টসমূহের বাইরে এর আবেদন ছিলো না, অরবিন্দ ঘোষের হরিজন্টাল ভার্টিকাল স্ট্র্যাটেজি ফেইল করেছিলো। লোয়ার কাস্ট বানিয়ারা স্বদেশী আন্দোলনে সাড়া দেননি, তাঁদের ক্ষুদেব্যবসার জন্য বিলেতিকাপড় বর্জন কাউন্টার-প্রোডাকটিভ ছিলো, এই কারণেই দেননি। এই একই কারণে, শুরুতে স্বদেশীদের আন্দোলনের ব্যাপারে কিছুটা আগ্রহ দ্যাখালেও, পরে কলকাতার অবাঙালি মারোয়ারিরাও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলো। তাঁদের বিজনেস তো ছিলো ইংল্যাণ্ডের ইন্ডাস্ট্রিসমূহের সাথেই, স্বদেশ নিয়ে তাঁদের কোনো আবেগ ছিলো না, পুঁজিপতিরা যেখানে মুনাফা পায় সেইটাই তাঁদের স্বদেশ! পূর্ববাংলার নমঃশূদ্ররা শুরু থেকেই বর্ণপ্রথার বিরুদ্ধে ছিলেন, ১৯০১ সালে তাঁদেরকে শূদ্র স্ট্যাটাস দেওয়া হয়, এর আগে তাঁদেরকে চণ্ডাল/চাঁড়াল (আভিধানিক অর্থঃ অস্পৃশ্য) সম্বোধন করা হত। ১৯০৭ সালে নমঃশূদ্র এসোসিয়েশন সক্রিয় হয়ে ওঠে। ১৯০৮ সালে খুলনায় নমঃশূদ্ররাও মুসলমানদের সাথে মিলে বঙ্গভঙ্গের ‘পক্ষে’ এবং স্বদেশীদের ‘বিরুদ্ধে’ আন্দোলনে নামেন।

কিন্তু আন্দোলনের অন্যদিকও আছেঃ শ্রমিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ

আন্দোলন শুধুমাত্র ধর্মের কাঠামোয় আটকে ছিলো না। এই আন্দোলনের সাথে অর্থনীতির সম্পর্ক তো ছিলোই, যেমনটা ওহাবি বা ফরায়েজি আন্দোলনের ক্ষেত্রে সত্য, তদুপরি এই আন্দোলনে শ্রমজীবীদের সক্রিয় অংশগ্রহণও ছিলো। বদরুদ্দীন উমর ‘বঙ্গভঙ্গ ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি’-তে জানাচ্ছেনঃ

“বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময়কার অপর একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, বঙ্গভঙ্গ প্রতিরোধ আন্দোলনে বাংলাদেশের শ্রমিক-কর্মচারীদের অংশগ্রহণ। ১৯০৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর বঙ্গ বিভাগের ঘোষণা প্রচারিত হলে তার পর দিনই বার্ন আয়রন ওয়ার্কস-এর তিনশত কেরাণী ধর্মঘট করেন। ১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হওয়ার দিন কলকাতায় ব্যাপকভাবে হরতাল পালিত হয়। এই হরতালের সময় চিৎপুরে র‍্যালি ব্রাদার্সের শ্রমিক, ১১ হাজার গরুর গাড়ির গারোয়ান ও কুলি, ১২টি জুট প্রেস ফ্যাক্টরি, ১টি চিনিকল, সহ প্রায় সব কারখানার শ্রমিকরা ধর্মঘট করেন। এছাড়া শিবপুর পাটকলের শ্রমিকরা অফিসারদের বিরোধিতা সত্ত্বেও কারখানা জোরপূর্বক বন্ধ রাখেন এবং হাওড়ায় বার্ন কোম্পানির শিপ ইয়ার্ডের ১২০০ শ্রমিকও ধর্মঘট করেন। লিলুয়া ইস্ট ইন্ডিয়ান রেলওয়ের ওয়ার্কশপ শ্রমিকরা ধর্মঘটের ঘোষণা দেওয়ায় কর্তৃপক্ষ ওই দিন ছুটি ঘোষণা করেন। বাওয়ারিয়ার ফোর্ট গ্লস্টার জুট মিল-এর হিন্দু মুসলমান শ্রমিক-কর্মচারীরা রাখি বিনিময় করার সময় ইউরোপীয় ম্যানেজার তাতে বাধা সৃষ্টি করার প্রতিবাদে সেখানে পরপর কয়েকদিন ধর্মঘট পালিত হয়।”

অ-শ্রমিক হিন্দু মুসলমান (হিন্দু ভদ্রলোক থেকে শুরু করে মুসলমান কৃষক) থেকে শ্রমিক হিন্দু মুসলমানদেরকে আমাদের আলাদা করেই বিবেচনা করতে হবে। কারণ পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিকরা আধুনিক পুঁজিবাদী শিল্পোৎপাদনের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত ছিলেন। তাই তাঁদের মানসিকতা শিল্পোৎপাদনবিচ্ছিন্ন মধ্যবিত্ত তো বটেই, এমনকি, পূর্ববাংলার গ্রামের কৃষকদের চেয়েও যথেষ্ট পরিমাণে আলাদা। এখানে লক্ষ্যনীয় যে, শ্রমিকরা স্বদেশী আন্দোলনের পক্ষ নিচ্ছেন সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িকভাবে, এবং তাঁদের অংশগ্রহণ পশ্চিমবঙ্গে সীমাবদ্ধ অর্থনৈতিক কারণেই। বঙ্গভঙ্গ হলে শুধু কলকাতাকেন্দ্রীক ভদ্রলোক আর তাঁদের পূর্ববঙ্গীয় গ্রাম্য স্ববর্ণীয়রাই ক্ষতিগ্রস্ত হন না, কলকাতার কারখানায় কর্মরত শ্রমজীবী মানুষেরও ক্ষতি হয়, এই কারণেই এই শ্রমিকরা বিরোধী ছিলেন বঙ্গভঙ্গের। সন্ত্রাসবাদীদের আবিষ্কৃত ‘জাতি’ তাঁদের স্পর্শ করে নি। ধর্ম নিয়ে বেহুদা বাড়াবাড়ি সবসময়ই মধ্যবিত্তের বৈশিষ্ট্য, শ্রমজীবীরা সরল বিশ্বাসী, সাম্প্রদায়িকতার ক্লেদ তাঁদের স্পর্শ করেছে খুব কমই।

এবার রবীন্দ্রনাথের মূল্যায়ন

রবীন্দ্রনাথ শুরুতে বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন সক্রিয়ভাবে সমর্থন করেছিলেন, যদিও, তিনি পরে নিজেকে আন্দোলন থেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন। কেনো এই সিদ্ধান্তবদল? এর জবাব পাওয়া যাবে মেলা বছর পর ১৯-১০-১৯৩৭এ লেখা সুভাষচন্দ্র বসুর কাছে তাঁর লেখা একটি চিঠিতে যা নিচে সংক্ষেপে উদ্ধৃত করছি।

“বন্দে মাতরম গানের কেন্দ্রস্থলে আছে দূর্গার স্তব এ কথা এতই সুস্পষ্ট যে এ নিয়ে তর্ক চলে না। অবশ্য বঙ্কিম এই গানে বাংলা দেশের সঙ্গে দূর্গাকে একাত্ম করে দেখিয়েছেন, কিন্তু স্বদেশের এই দশভূজামূর্তিরূপের যে পূজা সে কোনো মুসলমান স্বীকার করে নিতে পারে না। … যে রাষ্ট্রসভা ভারতবর্ষের সকল সম্প্রদায়ের মিলনক্ষেত্র সেখানে এ গান সর্বজনীনভাবে সঙ্গত হতেই পারে না।”

১৯১৬ সালে প্রকাশিত হয়ে রবীন্দ্রনাথের ঘরে বাইরে। আর এটা সম্ভবত রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে সমালোচিত উপন্যাস। এই উপন্যাসটির কারণে তিনি ‘গণশত্রু’ হয়ে গেছেন, ‘বিপ্লবী’ সন্ত্রাসবাদীদের চোখে, কিন্তু তিনি কি সত্যই ব্রিটিশদের ‘দালালি’ করতে লিখেছিলেন এই উপন্যাসটি?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সম্পাদিত নতুন দিগন্ত পত্রিকার, অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০১২ সংখ্যায়, “স্বদেশী আন্দোলন ও রবীন্দ্রনাথের ঘরে বাইরে” প্রবন্ধে জনাব নূর মোহাম্মদ লিখেছেনঃ

“…সন্দ্বীপ যথার্থই বলে এই দেবী পোলিটিক্যাল দেবী- যেখানে ধর্ম আসলে রাজনীতিই। আর দেবী ইংরেজবিরোধিতার অন্তরালে জনসমাজধবংসকারী, মুসলমানদের নিচে দাবিয়ে রাখার। ভারতবর্ষ সত্য হলে, মুসলমানকে নিয়েই সত্য- দেশ দেবী নয়, সত্য দেশের চেয়েও বড়ো…”

রবীন্দ্রনাথ ভারতবর্ষের স্বাধীনতা চান নি সত্য নয়, কিন্তু তাঁর বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে ধর্মের প্রতীকী ব্যবহার নিয়ে আপত্তি ছিলো, তিনি তাঁর বিবিধ লেখায় আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন এই হিন্দু [শাক্ত, বৈষ্ণব নয়] সাম্প্রদায়িকতা মুসলমানদের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতাকে জনপ্রিয় করবে এবং মুসলিম লীগের ক্রমান্বয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠা এবং দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ হওয়া তাঁর এই আশঙ্কাকে সত্য প্রমাণিত করেছিলো।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পথের দাবী ওভার্টলি সাম্প্রদায়িক নয়, কিন্তু সেখানেও জাতীয়তাবাদী ‘বিপ্লবী’ ভয় পান কৃষককে, পথের দাবীকে আনন্দমঠের ‘(ছদ্ম)সেক্যুলার’ সংস্করণ বলা চলে। রবীন্দ্রনাথ এই কারণেই সমালোচনা করেছিলেন পথের দাবীর। এটা আমার ধারণা।

ফরহাদ মজহার একটা অদ্ভূত প্রস্তাব দিয়েছিলেন রবীন্দ্রপ্রসঙ্গে। আমাদেরকে ‘রক্তের দাগ মুছে রবীন্দ্রপাঠ’ করতে হবে। কেনো?

রবীন্দ্রনাথ জমিদার ছিলেন, তিনি, কৃষকদের শোষণ করেছেন। এটা ঐতিহাসিক সত্য। এও সত্য এই শোষণটা সম্পূর্ণ শ্রেণীগত ছিলো। মুসলমান প্রজাদের প্রতি তাঁর ধর্মবিদ্বেষ ছিলো না, ‘ঠাকুরের ব্যাটাই’ কিন্তু ‘দুই বিঘে জমি’ লিখেছেন, লোয়ার কাস্ট উপেনের সাথে মুসলমানের ফারাক কি? তলস্তয়ও জমিদার ছিলেন। এবং রাশিয়ায় যখন পুঁজিবাদ প্রগতিশীলভাবে বিকশিত হচ্ছিলো, তখন, তলস্তয় প্রতিক্রিয়াশীল ‘ক্রিশ্চান করুণাবাদের’ পক্ষে ব্যাপকভাবে লিখেছেন। লেনিন কিন্তু তলস্তয়ের ‘রক্তের দাগ’ মোছেন নাই, একদিকে তিনি তলস্তয়ের প্রতিক্রিয়াশীলতার তীব্র সমালোচনা করেছেন, একই লেখায় আবার তাঁকে ‘রুশ বিপ্লবের দর্পণ’ বলেছেন।

রবীন্দ্রনাথের কাছে কমিউনিজম আশা করার প্রয়োজন নাই, রাশিয়ার চিঠির মধ্যে ‘ওয়ান্ডারল্যাণ্ড’ দ্যাখার বিস্ময় যতোটা, সোভিয়েত সমাজের বস্তুনিষ্ঠ পর্যালোচনা সেই পরিমাণে নেই। তাঁকে পাঠ করতে হবে সাময়িক ও সামাজিকভাবে, তাঁর শ্রেণীগত সীমাবদ্ধতার ন্যায়সঙ্গত সমালোচনা অবশ্য কর্তব্য, কিন্তু জোর করে তাঁকে মুসলমানবিদ্বেষী বানালে তাতে কার লাভ হয়? হয় তারিক মনোয়ারদের, যারা ওয়াজে দাবি করে বাংলাদেশ নজরুলের দেশ, এই দেশের মাটিতে নাকি রবীন্দ্রনাথের ঠাঁই নাই!

এখানেই শেষ নয়

রবীন্দ্রনাথকে দেবতা বানানোর কোনো উদ্দেশ্য আমার নাই। আর সবার মতো তাঁরও আছে অজস্র সীমাবদ্ধতা। কিন্তু, তিনি সাম্প্রদায়িক ছিলেন না, গণশত্রুও না। স্বদেশী আন্দোলনের বিরোধিতা তিনি ব্রিটিশভক্তির কারণে করেননি, করেছেন এতে সাম্প্রদায়িকতার বিষাক্ত বীজ দেখতে পেয়ে, আমি মনে করি তাঁর মূল্যায়নটা মোটাদাগে সঠিক। হতে পারে পুরোপুরি সরে আসা উচিত হয়নি, তাঁর উচিত ছিলো ‘ভেতরে’ থেকে লড়াই করা, তিনি পারেন নি। সেটা ভিন্ন আলোচনা, কোনো আলোচনাই আসলে কোথাও ‘শেষ’ হয় না, তা চলতে থাকে নিরন্তর কোথাও না কোথাও। এখানেই শেষ নয়…

জিগাতলা। ঢাকা। ১৫ মে ২০১৪।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

6 + 2 =