পৃথিবীর রাঙ্গা রোদ চড়িতেছে আকাংক্ষায় চিনিচাঁপা গাছে

আজকের দিনটা বেশ ঝলমলে রোদ্রস্নাত দিন ।বিকেল বেলার সোনালী ঠান্ডা আলো জানালায় দুই পর্দার চির পেয়ে মসৃণ ভাবে বিছানায় রাখা জীবনান্দ দাশের খোলা কবিতার বইয়ের উপর পরছে ।

“পৃথিবীর রাঙ্গা রোদ চড়িতেছে আকাংক্ষায় চিনিচাঁপা গাছে –
জানি সে আমার কাছে আছে আজও সে আমার কাছে আছে ।”

অলস বিকেল কাটাচ্ছি ।দুপুর থেকে ঘুমোনোর অনেক বৃথা চেষ্টা করেছি ।এপাশ-ওপাশ করতে করতে বিছানার চাদর কুচকে যাচ্ছে । তারপর আবার চাদরটা টান টান করছি । আবার শুয়ে ঘুমোনোর চেষ্টা করি।কিন্তু মাথায় জীবনান্দের ঐ দু’লাইনই ঘুরপাক খাচ্ছে । আচ্ছা রাঙ্গা রোদ মানে কি রোদ্রস্নাত কৃষ্ণ চূড়া !

চির বেয়ে আসা ঠান্ডা আলোয় চোখদুটো খুব করে ভেজাতে মন চাইছে ।শুনেছি একাকিত্ব নাকি মানুষের শত্রু ।আমিতো একা নই এই সোনালী রোদটাতো সেই কখন থেকে আমাকে সংগ দিয়ে চলছে ।তবুও কেন জীবনান্দের ঐ দু’লাইন আমার মাথার চারপাশে ভ্রমরের মত গুণ গুন করে ঘুরছে ,কেন বকুল ফুলের গন্ধের মত আমার সারা ঘরে ছড়িয়ে যাচ্ছে ,কেন সেই ছেলেটাকে হাজীর করছে আমার অবচেতন মনে !

ছেলেটার নামটাও এতদিনে ভুলে গেছি ।তাই মনে মনে ছেলেটাকে দীপ্ত বলে ডাকি ।দীপ্ত’র সাথে দেখা হয়েছিল ঠিক ৫ বছর আগে বসন্তের কোন রোদ্রস্নাত দিনে ।

আমি দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলাম ফার্মগেট অভার ব্রীজের নিচে এক অপরিচিত ছেলের জন্য ।এর আগের রাতে ওর ফোন পেয়েছিলাম প্রথম ও শেষবারের মত ।যখন দেখা হল তখন ভাবতেও পারিনি আমার আকাংক্ষিত পুরুষের সাথে তার এত মিল থাকবে ।ছ’ফুট উচ্চতা ,বলিষ্ঠ শ্যামলা দেহের অধিকারী ,মাথায় তার এক গোছা বাবরী চুল আর মুখে আবছা আবছা দাড়ি-গোফ ।কালো জীন্স , নীল শার্ট আর অনেক দিনের পুরোন স্যান্ডেলে তাকে কেমন দেখাচ্ছিল তা আমি হাজার চেষ্টা করেও ভুলতে পারি নি ।যখন আমরা দুজন পরস্পরকে চিনতে পারলাম ফোনের দেওয়া বর্ণনায় তখন দীপ্ত সময় নষ্ট না করে আমাকে নিয়ে ওভার ব্রীজ পার করলো ।তেঁজগা কলেজের সামনে এসে রিক্শা’র ওয়ালাদের জিজ্ঞেস করতে লাগলো “এই যে ভাই যাবেন শিশু হাসপাতালের সামনে ” আর কখনো বলতে লাগল “ভাই পঙ্গুর সামনে যাবেন ” কিন্তু রিক্শা ওয়ালারা রাজী হচ্ছিল না ।আমি দুর থেকে এসব দেখছিলাম কিন্তু না দেখার ভান করছিলাম ।রিক্শায় ওঠার পর কানে ইয়ার ফোন লাগিয়ে গান শুনতে লাগলাম । তখন পাশ থেকে হঠাৎ দীপ্ত বলে উঠলো “আপনি কোথায় পড়েন ?” আমি তাকে খেয়াল করে যাচ্ছিলাম তাই ইয়ার ফোন খুলে উত্তর দিয়েছিলাম ; কিন্তু কোন পালটা প্রশ্ন না করা স্বত্তেও সে বলেছিল “আমি নাট্যকলায় পড়ি ”।

রিক্শাটা প্রশস্ত রাস্তা পেয়ে দ্রুত বেগেই চলছিল ।দীপ্ত আমার সাথে কথা বলার জন্য উশ-খুশ করছিল ,কিন্তু আমি তা আমলেই নিচ্ছিলাম না ।সংসদ ভবনের সামনে দিয়ে লাল-হলুদ কৃষ্ণ চূড়া ফুল গাছের নিচে দিয়ে রিক্শাটা ক্রিং ক্রিং শব্দ করে শিশু হাসপাতালের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ।বায়ে মোড় নেওয়ার সময় রিক্শার গতি কমে গেল ।রোদের জলে স্নান করা রাস্তাটার উপর দিয়ে রিক্শার সামনের পাখির লাল সবুজ পালক লাগানো চাকাটা ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে ।এমন সময় আমি দীপ্তকে বললাম “দেখুন রক্ত দেওয়ার পর আমি এত দুর্বল হয়ে পরি যে একা একা রাস্তায় হাটতে পারি না আপনি যদি আমাকে ব্রীজের নিচে নামিয়ে দেন তাহলে কৃতজ্ঞ থাকব ” উত্তরে দীপ্ত বলেছিল “ঠিকাছে” ।

কিছু পরীক্ষার পর আমি এক শিশুর জন্য বেডে শুয়ে গেলাম রক্ত দিতে ।আমার মাথার সামনে দীপ্ত ওর হাতে আমার ব্যাগ ।ডান হাত থেকে রক্ত নেওয়ার সময় দেখা গেল আর রক্ত বের হচ্ছে না ।দীপ্তকে একটু চিন্তিত দেখাগেল ।আমাকে জিজ্ঞেস করলো “আপনার কেমন লাগছে ” আমি শুধু মাথাটা ডান দিকে কাত করলাম ।এরপর নার্স আমার বাম হাতে মোটা সুই ঢুকিয়ে দিল আর বললো আঙ্গুল গুলো মুঠ করে আনুন এরপর আবার ছেড়ে দিন ।পৌনে এক ঘন্টার মধ্যে আমার রক্ত দেওয়া শেষ হল । আমি তারাতারি বাড়ি ফিরতে চাচ্ছিলাম কিন্তু দীপ্তর কথায় কিছু সময় রিলাক্স করতে হলে আর কিছু খেতে হল ।

হাসপাতাল থেকে বের হয়ে সি এন জি পেয়েগেলাম ।গাড়িতে চুপ করে বসে আছি ।জানি দীপ্ত আমার পাশে ঘেষে বসেনি তবুও আমি সিটের বাম সাইডে চিপকে বসে আছি ।নিরবতা ভংগ করে তাকে জিজ্ঞেস করলাম “আচ্ছা আপনি কোন নাট্যদলে কাজ করেন ” কি যেন একটা জবাব দিয়েছিল ভুলে গিয়েছিলাম এক মিনিট পরেই ।এরপর যখন বাড়ির সামনে এসে পরি তখন আমি জোড় করেই নেমে যাই কিন্তু দীপ্ত বাড়ি পর্যন্ত আমাকে এগিয়ে দিতে চেয়েছিল ।মা জানতনা আমি রক্ত দিতে গেছি তা করেছিলাম ।বাড়ি এসে তারাতারি দীপ্তর ফোন নাম্বার ডিলিট করে দিলাম ।

এরপর দীপ্তর খোঁজ আমি কখনই করিনি কিন্তু মাঝে মাঝে লাল লাল কৃষ্ণ চূড়া আর রোদ্র স্নাত দিন চোখে পরলেই পাখির পালক লাগানো রিক্শার ঘুরন্ত চাকার কথা মনে পরে ।

আর মনে পরে দীপ্ত কে ।

পৃথিবীর রাঙ্গা রোদ চড়িতেছে আকাংক্ষায় চিনিচাঁপা গাছে –
জানি সে আমার কাছে আছে আজও সে আমার কাছে আছে ।

বি.দ্র. সব চরিত্র কাল্পনিক ।

সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ:গল্পটি খুবই বাজে ।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “পৃথিবীর রাঙ্গা রোদ চড়িতেছে আকাংক্ষায় চিনিচাঁপা গাছে

  1. ছেলেটার নামটাও
    এতদিনে ভুলে

    ছেলেটার নামটাও
    এতদিনে ভুলে গেছি ।তাই
    মনে মনে ছেলেটাকে দীপ্ত
    বলে ডাকি ।দীপ্ত’র
    সাথে দেখা হয়েছিল ঠিক ৫ বছর
    আগে বসন্তের কোন রোদ্রস্নাত দিনে ।
    আহারে !

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

5 + 5 =