আমাদের ধমনীতে নিলয় নীলের রক্ত, এই রক্ত কোনোদিন পরাভব মানেনা

(১)
আমার এক প্রিয়জনের ধমনীতে আক্ষরিক অর্থেই নিলয় নীলের রক্ত। রোজার দিন ছিল। রক্ত দেয়ার তালিকায় আছেন কয়েকজন। স্কয়ার হাসপাতাল থেকে দুপুরে জানানো হল, এখনই রক্ত দিতে হবে। আমি তালিকা ধরে ধরে টেলিফোন করে চলেছি। একজন আমার কাছে জানতে চাইলেন, “রোজা রাখা অবস্থায় শরীরে সুঁই ঢোকানো ইসলাম সম্মত কি”?

আমি থমকে যাই। মৌলবাদ নিয়ে পুস্তক লিখেছি সেই ১৯৯৫ সালে, ২০ বছর আগে। আমার মায়ের কাছ থেকে “ইসলাম” শিখেছি। আম্মা কি উত্তর দিতেন ভাবছি। আমি জানি ১৪০০ বছর আগে ইনজেকশন ছিলনা, রক্তদেয়ার পদ্ধতি তখনো আবিস্কৃত হয়নি। এই প্রশ্নে কোন মুফতি বা আল্লামা তার নিজের অভিমত “ইসলামের” নামে বলতে পারবেন, কিন্তু “ইসলাম” নিজে এসে তো এই ভদ্রলোকদের জানাতে পারবেনা যে রোজা রাখা অবস্থায় রক্ত দেয়া হারাম নাকি হালাল। মুসলমানেরা শতাধিক ফেরকায় (ভিন্নমত) বিভক্ত। আমি এই লোককে কি জবাব দেব?

আমি জানিয়ে দেই, “অসুবিধা হলে আসার দরকার নেই”। নিলয় নীল ততক্ষণে এসে রক্ত দিয়ে গেছে। সেই রক্ত চলছে। আরও বন্ধু ছোট ভাইয়েরা এসে গেছে রক্ত দেয়ার জন্য। আমাদের মানুষের রক্তের দরকার ছিল, কোন হিন্দু, মুসলমান, খৃস্টানের রক্ত নয়।

(২)
নিলয় নীলের রক্তাক্ত নিথর দেহ দেখার অনেক আগে, ১৯৭১ সালে আমি প্রথম রক্তাক্ত মৃত্যুপথযাত্রী তারুণ্য দেখি। আমার স্কুলের সহপাঠী, বিশের কোঠা পেরোতে এখনো কয়েক বছর বাকি তাঁর। পাকিস্তানি আর্মি বরিশাল শহর দখলে নিয়েছে। গ্রামে সাধারণত আসেনা। আজকে এসেছে গুলি করতে করতে। মানুষ পালাচ্ছে। সেই মানুষের উপর গুলি চলছে। আমার এক ভাই ডাক্তারি জানেন, আহত মানুষদের ব্যান্ডেজ করে রক্ত বন্ধ করা ছাড়া আর কোন সুযোগ নেই।

একটি জাতির জন্মের জন্য, দেশের জন্মের জন্য রক্তের দরকার হয়, কখনো কখনো। অনেক মানুষ রক্ত দিয়েছিল ১৯৭১। আমরা তিরিশ লক্ষ বলি। আমি নিশ্চিত কোন সংখ্যা জানিনা। হয়ত তিরিশ লক্ষেরও বেশী।
মানুষ পতাকার এবং দেশের জন্য কি রক্ত দেয়? ন্যায় বিচারের জন্য, সাম্যের জন্য, ভালোবাসার জন্য, মুক্তির জন্য এবং স্বাধীনতার জন্য কি? স্বাধীনতার স্বপ্ন কিছু মানুষের রক্তে । মুক্তির সাধ আর স্বপ্নের বিশ্বাস এদের রক্তেই বহমান। শোষণ বঞ্চনা বৈষম্য থেকে মুক্তির স্বপ্ন যেমন আদিবাসী ও শ্রমজীবী মানুষদের রক্তে নিভৃতে বয়ে চলে, তেমনি সত্যদ্রষ্টা তারুণ্য অন্ধবিশ্বাসের বন্ধন থেকেও মুক্তি খোঁজে, কলম তাঁর মুক্তিযুদ্ধের হাতিয়ারে।
হ্যাঁ, নিলয় নীল এরকম একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিল। ২০১২ সালে, কিংবা তারও আগে থেকে তাঁর এই একক যুদ্ধটার শুরু। বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদের আলোয় দুর করতে চেয়েছিল সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ ও ধর্মসন্ত্রাস। এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ হয়ে উঠতে পারবে কি? নিঃশঙ্ক চিত্তে নীল নিবেদিত ছিল বিজ্ঞানের দর্শনের মুক্তির জন্য। এই সংগ্রামটি চলছে, হত্যার বিভীষিকার বিপরীতে।

(৩)
দর্শনের মুক্তির সংগ্রামটিও ধর্মের মতই পুরনো। বিজ্ঞানের জন্য জিওর্দানো ব্রুনোর (১৫৪৮ – ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৬০০) মৃত্যদন্ডের কাহিনী আমরা অনেকেই জানি। গ্যালিলিও গ্যালিলির ইতিহাসও অনেক সুবিদিত। আমরা হাইপেশিয়া, মিসায়েল সারভেন্টেস, গেরহার্ড ডমাক, ইবনে রুশদ এবং আরও অনেককে জানি, যারা নির্যাতন সয়েছেন, বিজ্ঞানের মুক্তির জন্য জীবন দিয়েছেন। এই মুক্তিসংগ্রামের অনবদ্য উপাখ্যান রয়েছে বিজ্ঞানের এগিয়ে চলার পথে পথে, সকল সংস্কৃতির ইতিহাসে।

দর্শনের মুক্তি মানে বিজ্ঞান চেতনারও মুক্তি, বিজ্ঞানেরও মুক্তি। নিলয় নীলের সংগ্রামটিও ছিল, প্রধানত দর্শনের মুক্তিকে ঘিরেই। দর্শনের মুক্তির সংগ্রামে, ইতিহাসের ছুটে চলা মশাল হাতে নেয়া একজন মানুষ নিলয় নীল। নীল ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়, যে ইতিহাস দর্শনের মুক্তির জন্য রক্তদানের। নিলয় নীলের রক্ত তাই পরাভব মানেনা।

ধর্মের সহিংসতার বিপক্ষে নিলয় নীল কোন সশস্ত্র সংগ্রামী নয়। তাঁর হাতিয়ার ছিল ল্যাপটপের কিবোর্ড। নিলয় নীলের রক্তে কোন সহিংসতা ছিলনা। দর্শনের প্রতি ভালোবাসা এমন প্রগাঢ় ছিল যে নীলের রক্তে ছিল সৃষ্টির উৎসব। কৌতুকও ছিল, যা অসময়ে ভুল মানুষের কাছে পৌঁছেছিল তাদের ঘৃণার ও ভয়ের, ভয়ের ও লোভের, লোভের ও হিংসার এবং সহিংসতার প্রতিক্রিয়ায়।

(৪)
সহিংসতা, হোক সেটি অর্থনৈতিক শোষণ, বঞ্চনা ও বৈষম্যের কাঠামোগত সহিংসতা, হোক সেটি সন্ত্রাসী ধর্ষকামী পিতৃতন্ত্রের, হোক তা মতান্ধ, বিজ্ঞান চেতনা বিরোধী সাংস্কৃতিক সহিংসতার কিংবা ধর্মান্ধ জঙ্গির প্রত্যক্ষ আক্রমণ, এর ভিত্তিতে রয়েছে শ্রেণী ও পিতৃতান্ত্রিক রাজনীতি। চূড়ান্ত বিচারে, মুক্তি আসে, হোক তা রাজনৈতিক কিংবা সাংস্কৃতিক, কেবল মাত্র সত্য উপলব্দির পথে, যে সত্য বিজ্ঞানের আলোয় সার্বজনীন।

ইতিহাসে সত্যের মুক্তি, দর্শনের মুক্তি, বিজ্ঞানের মুক্তির সাথে জীবনের মুক্তির সমান্তরাল সাযুজ্য আমরা অনেক সময়ই দেখিনা। স্পার্টাকাসের সাথে সক্রেটিসের, মার্ক্সের সাথে চেগেভারার কিংবা বিরসা মুন্ডার সাথে তার আদিবাসি দর্শনের যা মুক্তির ধর্মতত্বের যোগাযোগ, এই সম্পর্কের বা সমান্তরাল সংগ্রামের উপাখ্যান আমরা অনেক সময় দেখিনা। কিন্তু শেষ বিচারে, মানুষের সকল মুক্তির সংগ্রামই দার্শনিক ও রাজনৈতিক, অবিচ্ছেদ্য।
বলিভিয়ার জংগলে কোন বিপ্লবীর কিংবা আরবের নগরে কোন বিজ্ঞানবাদী লেখক হত্যার পেছনে সেই একই রাজনীতি। মুক্তিসংগ্রামীদের ধমনিতেও সেই একই রক্ত। চাপাতি কিংবা ৫৭ ধারার আক্রমণের মুখে এই রক্ত পিছু হটেনা। মানুষেরা গ্যালিলিও, হাইপেশিয়া, জিওর্দানো ও চেগেভারার উত্তরাধিকার হয়ে ওঠে, এই রক্ত প্রবাহের কারণে। সেই একই চেতনা। এই পরাভব না মানা নীলেরা স্বাধীনতা সংগ্রামের রক্তের উত্তরাধিকার।

(৫)
৭ আগস্ট ২০১৫ নীলের দেহান্তর ঘটেছে। নীলকে যারা হত্যা করেছে, তাদের বিচার হয়নি। আইনি বিচার হবে হয়ত কোন সুদূর ভবিষ্যতে। রাষ্ট্রের দায় এই বিচার করার, তার অস্তিত্বের বৈধতার জন্যই।
আমাদের দায়, নীলদের রক্তের উত্তরাধিকার হয়ে ওঠার। স্বাধীনতা সংগ্রামী হয়ে ওঠার। দর্শনের ও জীবনের মুক্তির সংগ্রামটিকে অব্যাহত রাখার।

নীলের দেহান্তর দিবসে আমরা ভাববো, আলোচনা করব, সংগীতে ও প্রদীপে নিবেদন করব নীলের প্রতি ভালোবাসা। মানুষের সত্যদ্রষ্টা হয়ে ওঠার জন্য প্রার্থনাও করবো আমাদের যৌথ ও উচ্চতর মানবিকতার কাছে। বঞ্চনা বৈষম্য থেকে, সাম্প্রদায়িকতা মৌলবাদ থেকে ও ধর্মান্ধ সহিংসতা থেকে মানুষের মুক্তির জন্য আমাদের অঙ্গীকার ঘোষণাও করব, একাকী কিংবা যৌথভাবে।
আমাদের ধমনিতে নিলয় নীলের রক্ত, এই রক্ত কোনোদিন পরাভব মানেনা।

[আগস্ট ৬, ২০১৬, বার্লিন]

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “আমাদের ধমনীতে নিলয় নীলের রক্ত, এই রক্ত কোনোদিন পরাভব মানেনা

  1. নিলয় নীল মুক্তচিন্তার কোনো
    নিলয় নীল মুক্তচিন্তার কোনো আইকন বা প্রেরনা হলে মহাবিপদ আছে। যার অনেক কারনের একটি রেকর্ড করতে সক্ষম হয়েছিলাম । https://archive.fo/HTlOS
    বিভিন্ন ক্লোজড গ্রুপ ও ফ্রেন্ডস অনলি পোস্টগুলোতে এবং তার বাইরে সে যা করেছিলো, তার তো রেকর্ড রাখা অসম্ভব ব্যাপার এবং আইন অনুযায়ী মামলা খাবার মত অপরাধ।

    এই কমেন্টটি হয়তো ডিলিট করে দেওয়া হতে পারে, আমার অন্য কমেন্টের মত। তাই আর্কাইভ ডট টুডের সহায়তা এখানে নেওয়া হলো।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

72 − 66 =