নীলয় নীল: আপনাদের যৌক্তিকতা মানুষ মেনে নিচ্ছে?

বৌদ্ধ ধর্মকে সমালোচনা করে নীলয় নীল একটা ধারাবাহিক লেখা লিখেছিল ‘বৌদ্ধ ধর্মে পুরুষতন্ত্র’ নামে। পৃথিবীর সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধ প্রধান দেশগুলোর নারীদের চলাফেরা ও জীবন যাপনের স্বাধীনতা দেখলেই বুঝা যায় বৌদ্ধ ধর্মের যদি কোন বিষ দাঁত থেকেও থাকে সেটা কিছুতে বৌদ্ধদের জীবনযাপানে দংশন করতে পারেনি। বৌদ্ধ ধর্মের সমালোচনা তাই এখন একাডেমিক বা জ্ঞান আহরন সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতায় আটক। একইভাবে আমরা যখন খ্রিস্টান ধর্মের চার্চের জ্ঞান-বিজ্ঞানের উপর নিপীড়নকে টেনে এনে এখনো সমালোচনা করি, কিংবা মনু সংহিতার নারী নিপীড়ন ও বিদ্বেষের শ্লোকগুলোকে তুলে ধরি সেটাও অনেকাংশে একাডেমি বা তুলনামূলক। টি-শার্ট আর জিন্স পরে মন্দিরে যেতে পারাটা ঐ ধর্মের রক্ষণশীলতার মুঠো আলগা হয়ে যাবার উদাহরণ। অন্তত পৃথিবীর সাড়ে চার হাজার ধর্মের আর কোনটি এখন আর মানুষের আধুনিক জীবনযাপনে নাক গলায় না। ব্যক্তি ও সমাজকে পদে পদে শৃঙ্খলিত করে রাখতে পারে না। তবু ধর্মের তুলনামূলক একটা ইতিহাস নিয়ে লেখালেখি বা কথপোকথনে আজো তিন হাজার বছর আগের পুরোনো অকার্যকর ধর্মের শাস্ত্রকে ধরে তুলোধুনো করা হয়। অথচ যে ধর্মটি আজো সমকালিন পৃথিবীতে মূর্তিমান এক আতংক, দেড়শো কোটি অনুসারীর প্রায় অর্ধেক নারী সাম্প্রদায়কে পদনত করতে এখনো সমান প্রতিক্রিয়াশীল, যে ধর্মের শাস্ত্রকাররা এখনো রাষ্ট্র-সমাজ ও ব্যক্তির উপর চড়াও হবার সমস্ত ক্ষমতা ও প্রভাব রাখে, গোটা মানব সভ্যতার জন্য যারা একটা হুমকি হয়ে উঠেছে- সেই ধর্মের সমালোচনাটা কি যৌক্তিক নয়? কি দরকার অহেতুক ধর্মকে খুঁচানো? এই প্রশ্নটি নীলয়কে কোন বৌদ্ধ বিশ্বাসী কোনদিন করেনি। আক্রমন তো দূরের কথা। ইন্টারনেটে ইসলামী সাইটগুলোতে মূর্তি পুজার বিরোধীতা করে যে পরিমাণ লেখা আছে তার কারণে কোন ইসলামিস্ট লেখককে কোন মূর্তি পুজারী তার ধর্মের সম্মান রক্ষার্থে হামলা করেছে? নিদেন পক্ষে বলেছে, কি দরকার ধর্ম নিয়ে খোঁচানো? কিন্তু মানবতার পক্ষ নিয়ে, মত প্রকাশের পক্ষ নিয়ে, অসাম্প্রদায়িকতার পক্ষ নিয়ে নীলয় নীলকে জীবন বাঁচাতে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে।

অনন্ত বিজয় দাসকে হত্যা করে ইসলামিস্টরা তার মোবাইল ফোন নিয়ে গিয়েছিল। মোবাইল ফেইসবুকে চ্যাটলিস্টের তথ্য নেয়াই ছিল তাদের উদ্দেশ্য যাতে ছদ্মনামের ব্লগারদের সম্পর্কে সব তথ্য তারা জানতে পারে। নিলয় ছিল অনন্ত’র সঙ্গে অনেক ঘনিষ্ঠ। স্বাভাবিকভাবে অনন্ত মারা যাবার পর ওর মোবাইল খুনিদের হাতে চলে যাওয়ায় আতংকিত হয়ে পড়ে তার ঘনিষ্ঠ ব্লগাররা। সে সময় নীলয় ঢাকা ছেড়ে অন্যত্র গা ঢাকা দেয় খুনিদের ভয়ে। কারণ ততদিনে নীলয়কে ফলো করা হচ্ছিল নিয়মিত। ওর ফেইসবুক পোস্ট দেখে জানা যায়, শাহবাগ থেকে মানববন্ধন করে টেম্পুতে চড়ার সময় দুটো ছেলে ওকে অনুসরণ করতে থাকে। অফিস যাওয়া আসার সময়ও তাকে ফলো করত নীলয় সেটা বুঝতে পারত। কিন্তু অনন্ত মারা যাবার পর নীলয় বুঝে গিয়েছিল এরপর হয়ত তার পালা! ঢাকার চাকরি ছেড়ে গ্রামে চলে গিয়েছিল। বিদেশে যাবার চেষ্টা করছিল। সাহায্যকারী সস্থা যে সব ব্লগারদের জন্য চেষ্টা করছিল নীলয় তাদের একজন। সে ভারতেও চলে যেতে চেয়েছিল কিন্তু কোন কারণে সেটা সম্ভবপর হয়নি। ফের ঢাকায় ফিরে আসে নীলয়। শেষদিকে তার মৃত্যু চিন্তার সংক্রান্ত পোস্ট পড়ে বুঝতে পারা যায় কতখানি নিজের জীবন নিয়ে তার সংশয় জেগে উঠেছি মনে। কতখানি অনিশ্চিত, অনিরাপদ হয়ে উঠেছিল। সাহায্যকারী সংস্থা কি আদৌ নীলয় সম্পর্কে ভাল করে জানতে পেরেছিল? মনে হয় না। ঢাকায় তার ফের চলে আসাটা কেন যেন আমার কাছে মনে হয়েছে একটা হতাশা থেকে। ওর মৃত্যুচিন্তা সংক্রান্ত পোস্ট আমার এই ধারণাটিকে অনেক বেশি করে মজবুত করে। তার মানে নীলয়কে কেউ কোথা থেকে অভয় দিতে পারেনি। এই রাষ্ট্র যেটা সবচেয়ে ভাল করে পারত কাজটা সে-ই তারাই নীলয়কে বেঁচে থাকার কোন দায় নিবে না আগেই বলে দিয়েছে। উল্টো এই রাষ্ট্রের অনুভূতিতে আঘাত হানলে কোনভাবে সহ্য করা হবে না সেটা বার বার হুংকার দিয়ে জানিয়ে দেয়া হয়েছিল। নীলয়কে আমরাও কেউ অভয় দিতে পারিনি। পারিনি কারণ আমরা বিচ্ছিন্ন আর বহু ইগোতে ভারাক্রান্ত। মুক্তমনা ব্লগে অভিজিৎদা মারা যাবার পর আমরা অনেকেই কোণঠাসা হয়ে পড়ি। সরাসরি আমাদের কয়েকজনের নাম ধরে তখন প্রচার চালানো হয়েছিল আমরা ‘উগ্র নাস্তিকতা’ করি। নীলয় ইস্টিশন ব্লগে তখন বেশি লিখত। এখানেই নিয়মিত হয়েছিল। নীলয় সেই লেখক যিনি মৃত্যু ভয়েও লেখা ছাড়েননি। হেফাজত ইসলাম মাঠে নামার কালেই কতলোক ভোল পাল্টে মোল্লা সেজে গিয়েছিল। কেউ কেউ ‘সহি ভদ্র নাস্তিকতা’ প্রচার শুরু করেছিল। ‘যে সত্য বলা হয়নি’ বই লেখার জন্য আকাশ মালিককে ‘উগ্র নাস্তিকতার গুরু’ বলে ‘সহি উপায়ে ভদ্র নাস্তিকতা’ যারা প্রচার করছিলেন তারা মুক্তমনা ব্লগারদের লেখালেখিকে প্রায় স্তব্ধ করে দেয়ার চেষ্টা করে ফেলেছিল এই উছিলায়। কিন্তু ‘যে সত্য বলা হয়নি’ বইয়ে লেখক হিসেবে যখন আরো দুইজনের নাম প্রকাশ পেলো- অভিজিৎ আর অনন্ত- তখন সেইসব ভদ্রলোকদের মুখ চুপসে গিয়েছিল। হ্যা, নীলয় নীলের মৃত্যুর এক বছর পর আরো বহু গিরগিটির মুখই এখন চুপসে গিয়েছে। নীলয়, অনন্ত, বাবু, অভিজিতের হত্যাকে জায়েজ করতে তাদের ইসলাম বিরোধী লেখালেখি দায়ি করে, তাদের হত্যাকারীকে লঘু করতে তাদের লেখালেখিকে চাপাতী দিয়ে খুনের সঙ্গে জাস্টিফাই যারা করেছিল, যারা দায় নিবে না বলে দম্ভ করেছিল, সেইসব অনুভূতিঅলাদের সকলের মুখই এখন চুপসে গেছে! নিরহ পুরোহিত কোন ধর্মকে কট্টাক্ষ করেনি। নিরহ সংখ্যালঘু দোকানদার কোন ধর্মের গুরুকে অমান্য করেনি। রেঁস্তরায় খেতে যাওয়া সাধারণ নিরহ মানুষজন কোন ‘শান্তিবাদী’ ধর্মের সঙ্গে দ্বিমত করেনি তবু তাদের নির্মমভাবে খুন করা হয়েছে। ঈদের নামাজ পড়তে যাওয়া মুসল্লিদের খুন করার জন্য প্লাণ করা হয়েছিল। এখন আর কেউ বলে না, ঈদের জামাতে বোমা মারাকে সমর্থন করি না, তাদেরও ঈদের নামাজ পড়তে যাওয়াটা ঠিক হয়নি…।

নীলয়, আপনি জানেন না, আপনার, আমাদের লেখালেখির একটা যৌক্তিকতা মানুষের মাঝে একটু একটু করে উন্মোচিত হচ্ছে। এতকাল আমরা যে দাবী করে এসেছিলাম, মসজিদের খুতবায় ঘৃণা ছড়ানোর যে অভিযোগ করতাম, কুরআনের আয়াতের যে সহিংসতার কথা বলতাম, হাদিসের আত্মঘাতি বাণী নিয়ে যে সব সচেতনতা দেখাতাম আজ সেসবই পরক্ষভাবে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে। এই রাষ্ট্র খুতবা প্রচারের উপর কঠর হয়েছে। নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে মসজিদের ইমামদের। বয়ানের নামে কুরআনের কোন অংশ পাঠ করা হচ্ছে, সেখানে জিহাদ আছে কিনা- সে বিষয়ে সরকারের বড় মাথারা মুখ খুলতে শুরু করেছেন। পিস টিভির মত কুরআন-হাদিসের চ্যানেল বন্ধ করতে সরকার বাধ্য হয়েছে…। এখন আর এসব এদেশের মানুষের কাছে ‘ইসলাম বিদ্বেষ’ নয়। এখন এসব দেশের মানুষের জন্য ‘নিরাপত্তা’ ব্যবস্থা! মানুষকে অসাম্প্রদায়িক হতে, ধর্মের কুসংস্কার ও অন্ধ অনুসরণ হতে তাদের মুক্তি দিতে আপনারা যারা লিখে নিজেদের প্রাণ দিয়েছেন- এটি আপনাদের একটি বড় বিজয় ও স্বীকৃতি। আমি জানি, আগামী দিনের মানুষ আপনাদের লেখা অনেক আগ্রহ নিয়ে খুঁজে পড়বে। এটিই আপনার আমাদের লেখার যৌক্তিতা…। আপনার প্রথম মৃত্যু দিবসে আমি আপনার খুনের বিচার চাইব না। আমি চাই আপনার খুনিদের যারা প্রশ্রয় দিয়েছে, খুনিদের হয়ে যারা সাফাই গেয়েছে, খুন আর লেখালেখিকে জাস্টিফাইকারীদের পরাজয়ই আমার কাম্য। আর সেখানেই আপনাদের যৌক্তিতা আর চিন্তার স্বীকৃতি। আমি আপনার, আপনাদের, আমাদের সেই স্বীকৃতি চাই…। ‘ধর্মরাষ্ট্রের’ কাছে বিচার চেয়ে লাভ নেই…।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৩ thoughts on “নীলয় নীল: আপনাদের যৌক্তিকতা মানুষ মেনে নিচ্ছে?

  1. অভিজিৎ, অনন্ত, নীল’রা বুকের
    অভিজিৎ, অনন্ত, নীল’রা বুকের রক্ত দিয়ে যে সত্য প্রতিষ্ঠার যাত্রা শুরু করেছে সে সত্য প্রতিষ্ঠা একদিন হবেই।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

9 + 1 =