প্রেমের সাতকাহন

মানুষের প্রেম ঘটিত সব দুঃখের প্রধান কারণ অতিরিক্ত মানসিক এটাচমেন্ট। বালক বা বালিকা যখন প্রেমে পড়ে তখন বুঝতে পারে না যে সে আসলে চোরাবালিতে দাঁড়িয়ে মরীচিকার স্বপ্ন দেখছে। কিছুদিন পরে চোরাবালিতে যখন কমোডিফিকেশন অফ লাভ শুরু হয়, ডুবে যেতে থাকে আকণ্ঠ, তখন তারা বুঝতে পারে তাদের প্রেম টিকেছিল একটা তাসের ঘর বা বালির বাঁধের উপর। নিয়তির কাছে জিজ্ঞেস করে কি আশায় বাঁধি খেলাঘর। চারিদিকে এত সুযোগের অপরচুনিটি যে দুজনেই অলোয়েজ সার্সিং ফর বেটার ওয়ান খুঁজে বেড়ায়। অনেকটা ঘোড়া বেঁধে রেখে হাতি খেলতে যাওয়ার মত। আর কেন নয়? নিরামিষ খেলেই কি মানুষ আর মাছের দাম জিজ্ঞেস করতে পারে না?

প্রেম রাখবেন কোন পকেটে?
মানুষের প্রেম ঘটিত সব দুঃখের প্রধান কারণ অতিরিক্ত মানসিক এটাচমেন্ট। বালক বা বালিকা যখন প্রেমে পড়ে তখন বুঝতে পারে না যে সে আসলে চোরাবালিতে দাঁড়িয়ে মরীচিকার স্বপ্ন দেখছে। কিছুদিন পরে চোরাবালিতে যখন কমোডিফিকেশন অফ লাভ শুরু হয়, ডুবে যেতে থাকে আকণ্ঠ, তখন তারা বুঝতে পারে তাদের প্রেম টিকেছিল একটা তাসের ঘর বা বালির বাঁধের উপর। নিয়তির কাছে জিজ্ঞেস করে কি আশায় বাঁধি খেলাঘর। চারিদিকে এত সুযোগের অপরচুনিটি যে দুজনেই অলোয়েজ সার্সিং ফর বেটার ওয়ান খুঁজে বেড়ায়। অনেকটা ঘোড়া বেঁধে রেখে হাতি খেলতে যাওয়ার মত। আর কেন নয়? নিরামিষ খেলেই কি মানুষ আর মাছের দাম জিজ্ঞেস করতে পারে না?

.pagespeed.ic.zevyU1JZEr.jpg” width=”500″ />

বাজারে বিকল্প পণ্যের ছড়াছড়ি। যেমন চায়না, বেশিদিন যায় না দিচ্ছে সাধ এবং সাধ্যের মধ্যে আরাধ্য প্রেম। প্রচার করুন আপনি একজন ইউনিক, বাংলায় বললে অনন্য। অর্থ সব কিনতে পারে এমনকি শরীরের ভিতরের মন, সাথে মাংশের দোকান ফ্রি। বড় পুঁজি ছোট পুঁজি গিলে ফেলার অংশ হিসেবে একদিন দেখা যাবে বালিকা অন দ্যা ড্যান্স ফ্লোর, মানে দেখো, আপনি যা খুঁজছেন তা আগের জায়গায় নেই। মা লক্ষ্মী অলক্ষ্যে সরিয়ে নিয়েছেন বস্তু। সমাজবিজ্ঞানীগণ ভালবেসে এই ভালবাসার নাম দিয়েছেন লিকুইড লাভ। লিকুইড লাভের পরিণতি হল তরল প্রেম, প্রেমের আধুনিকতা বা কন্টিনজেন্ট লাভ। যেখানে লসের কোন সুযোগই নাই। তাই তো প্রেম নামের অমৃতের সন্ধানে হাল ফ্যাশনের গার্গীর মত অনন্ত ছুটে চলা। একটা বিয়ার খরচ করলেই যেখানে সারারাত পারফর্মিং আর্ট চর্চা করা যায় সেখানে দুধের জন্য আস্ত গরু পালন তো কস্ট প্রফিট এনালিসিসে পুরা ধরা। এই কারনেই বিজ্ঞজনেরা বলেছেন, প্রেমে কখনোই শতভাগ মানসিক এটাচমেন্টে যাবেন না। তারা রূপকের আড়ালে বলেছেন, “প্রেমকে মানিব্যাগে বা প্রয়োজনীয় ফাইলের মধ্যে রাখবেন না। বরং প্রেমকে রাখবেন বুক পকেটে যেখানে মানুষ সাধারণত খুচরো দুই চার টাকা বাস ভাড়ার জন্য রাখে। আর খুচরো পয়সা হারালে কেই বা এত দুক্ষু পায়?”

তরল প্রেম কি?
বিজ্ঞানের জয়যাত্রায় নারী বেরিয়ে এসেছে ঘর থেকে। নারী এখন অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি স্বাধীনতা এনজয় করে। শিক্ষা দিয়েছে মুক্তি। প্রযুক্তি চিরতরে দূর করে দিয়েছে যোগাযোগ প্রতিকূলতা। সময় আর স্থানের দূরত্ব গেছে ঘুচে। নারীর ক্ষমতায়ন শিথিল করে দিয়েছে সামাজিক বন্ধন, পরিবার, দেশ এমনকি জাতিসত্তা। এর প্রভাব পড়েছে তাদের লাইফ স্টাইলে। পুরুষের মত বহুগামি হতে বাঁধা নেই। অর্থকেন্দ্রিক সমাজে যে পুরুষ ভালবাসার দায় মেটাতে পারে না, ভোগের যোগান না দিতে পারে তার বিচি সেই পুরুষের বিচি আটকা পড়েছে ফাটা বাঁশে। অক্ষম পুরুষকে নারী অনায়াসে বলে দিচ্ছে তুমি বানপ্রস্থে চলে যায়, সন্যাস গ্রহণ করো।
সেই প্রাচীনযুগে একদা গর্ভধারণের শারীরিক অসুস্থতা আর সন্তান প্রতিপালন সুখের কারণে সামাজিক কর্মকান্ডে অনুপস্থিতি নারীকে সিংহাসনচ্যুত করেছিল। জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি আবিষ্কার নারীকে কিছুটা হলেও দিয়েছে সেই পূর্বেকার স্বাধীনতার স্বাদ। হয়ত ভুল করে হয়ে গেছে শারীরিক সম্পর্ক! তো কি হয়েছে? ভুলের দায় নিতে হবে না, এইযে আছে ‘ঘোড়ার ডিম’ পিল। যৌনান্দের তিনদিনের মধ্যে খেয়ে নিন, নিশ্চিন্ত থাকুন। কিছুদিন আগেও যেখানে হাত ধরলে রাধা কলঙ্কিনী হয়ে যেত, আজ সে অক্ষত যোনি। সভ্য ইউরোপ তো যুদ্ধে যাওয়ার আগে স্বামী বেচারা স্ত্রীর সতীত্ব রক্ষায় নিম্নাঙ্গে তালা দিয়ে যেত চেস্টিটি বেল্ট লাগিয়ে। কিন্তু সময় বদলে গেছে দ্রুত, মিরার হাতে এসে গেছে ক্ষমতা, আজ রাধা বিজ্ঞাপন দেয়—

“নেই ঝামেলা মাসভর,
মিলনোত্তর পোস্টিনর”

অথবা শহরের বিলবোর্ডে বড় বড় অক্ষরে লেখা —
“থাকলে রাজা কনডম,
থাকে না চিন্তা ভাবনা আর”

জন্মনিয়ন্ত্রণ শিখে নারী ক্ষমতা নিজের হাতে নিয়ে নিয়েছে। স্বামী স্ত্রী দুজনেই শ্রমজীবী। কারো অর্থনৈতিক ক্ষমতা কারো থেকে কম নয়। একজন নারী ঘরে ফিরে বলতেই পারে “এখনো ভাত রান্না হয় নাই?” এতদিনের পুরুষতান্ত্রিক পুরুষের পৌরুষে ঘা লাগে। শুরু হয় অন্তর্দাহ। এমনকি কৃষ্ণকে ছাড়াই মিরা মা হতে পারে, বিজ্ঞান সেই সুযোগ করে দিয়েছে। পুরুষ একদিন বিয়ে করতে গিয়েছিল মায়ের কাছে প্রতিজ্ঞা করে, “তোমার জন্য দাসী আনতে যাচ্ছি বলে”। বিয়ের মন্ত্রে উচ্চারণ করেছিল “পুত্রস্য কামনায় ক্রিয়োতে ভার্যা”। পুরুষের তলে নিয়ত নিষ্পেষিত নারী তথ্যবাতায়নে দেখতে পারছে পুলক সুখ, কেমন আসন আর সময়সীমা। ফলে সে নিজেই মানদণ্ড ঠিক করতে পারে। সে এখন নিজের সুখ আর তৃপ্তির কথা বলতে পারে। পুরুষ যদি ব্যর্থ হয় তাহলে নারী তাকে বহিষ্কার করতে পারে। এটা তার অধিকার এবং নারী অন্য যেকোন সময়ের থেকে বেশি সচেতন। এখন একজন নারী যদি বিদ্যমান অশান্তি আর অতৃপ্তিকে মেনে নিয়ে বিয়ে নামক প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখে তাহলে সেটা নৈতিকতা আর যদি নতুন সঙ্গী বেছে নেয় তবে নান্দনিকতা।

নির্ভেজাল প্রেমের খোঁজে
তথ্যবাতায়নের যুগে সময় আর কালের দূরত্বের মাঝে আছে শুধু একটা মাউস ক্লিক। দ্রুতগতির যান আন্তমহাদেশ অতিক্রম করতে পারে সময়ের পার্থক্য না করেই। বিশ্বায়ন ভেঙ্গে দিচ্ছে ঐতিহ্যবাহী সামাজিক মেলবন্ধন। সব কিছু ভেঙ্গে পড়ে, ভেঙ্গে যাচ্ছে পরিবার-এলাকা-গোত্র-জাতি-শ্রেণি-নৃগোষ্ঠী-সঙ্ঘ-ধর্ম-লিঙ্গ। সৃষ্টি হয় মানুষের এক ভয়াবহ অস্তিত্ব সংকট। বিশ্বায়ন উৎপাদন-বন্টন খাতে প্রযুক্তির পরশ পাথর ছুঁইয়ে দিয়েছে। এর পিছনের মেকানিজমটা হল পুঁজিবাদ। ব্যক্তি মানুষটি মানুষ থেকে ভোক্তায় পরিণত হয়েছে। তার ক্রয় ক্ষমতা বেড়েছে। খুব স্বাভাবিক, কর্পোরেশনকে তো পণ্য বেচতেই হয়। বাজারে তরল না থাকলে তারল্য ছড়াবে কিভাবে? বুঝতেই পারছেন ফেল কড়ি, মাখো তেল এর মানে হচ্ছে ” দিয়ার ইজ নো ফ্রি লাঞ্চ”। ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে সে বাড়ি, গাড়ির মিথ্যে মালিকানা লাভ করতে পারে। সুতরাং ভোক্তা যে গাড়িটি ব্যবহার করছে, যে বাড়িতে বাস করছে সেটি আসলে কর্পোরেশনের। অস্তিত্ব সংকট আর কাকে বলে! হায় বিচিত্র, কি সেলুকাস এই বেবিডল দুনিয়া। যেখানে ব্যক্তি মালিকানা নাই, সেখানে নারী প্রগতির এই যুগে আসলে নিজের বলে কোন বালিকাও নাই। শরীর ছাড়া প্রেম তো একটা ধারণা মাত্র।

এরকম অনিশ্চয়তায় প্রেম আর প্লেটনিক থাকে না। প্রেম হয়ে যাচ্ছে ইন্সট্রুমেন্টাল। জ্ঞানের পণ্যায়ন মানুষকে বলছে, জানার দরকার নেই আপনার কি প্রয়োজন, আমাদের রিসার্চ এন্ড ডেভেলমেন্ট বিভাগ বলে দেবে আপনার কি প্রয়োজন।

আপনি অনেক কাজ করেছেন, একটু টায়ার্ড। হঠাৎ মনিটরে একটা স্লিম এন্ড স্লিক ভীট চর্চিত বালিকা এলে কেমন হয়। সে এসেই তার ভাইটাল স্ট্যাটের বিজ্ঞাপন দিয়ে দিল। আর বুঝিয়ে দিল সে এইমাত্রই সৌদি যুবরাজকে ঠান্ডা করে এল। এখন সে আপনার শহরে। জাস্ট মেক আ ডায়াল টু ডার্লিং। থাকলেন তার সাথে কিছুদিন, শুরুতে হাজার বছর ধরে পথ হেটে পাখির নীড়ের মত চোখের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, যা বাহ্যিক চোখ দিয়ে দেখেন আর চোখ বুজে কাটামুন্ডের দিবা স্বপ্নে যা যা দেখার স্বপ্ন দেখেন। শরীরের জ্যামিতি দেখে মনে হয় সেক্স একটা পারফর্মিং আর্ট। কিন্তু কিছুদিন পরে বোঝা গেল নারদের বীণার তার ছিঁড়ে গেছে, বাঁশি তো আগের মত বাজে না। এটাকে বলে প্লাস্টিক সেক্সুয়ালিটি। ধরে নিলেন এটা প্রথম ভুল। ভুল সংশোধন করার জন্য বা জৈবিক প্রয়োজনে দ্বিতীয় ভুল করার জন্য আগুনে ঝাপ দিলেন এবং বুঝতে পারলেন প্রেম হয়ে গেছে তরল। অর্থনীতিতে নগদ অর্থকেও তরল বলে। এভাবে অমৃতের সন্ধানে একের পর এক ভুল করতেই থাকবেন। ১০০ পারসেন্ট নির্ভেজাল খাঁটি নারকেল তেলের মত বিশুদ্ধ লাভ খুঁজতে গিয়ে মনে হবে “মোর না মিটিতে আশ, ভাঙিল খেলা”।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

36 − = 32