পরশ পাথর

ইদানিং কে যেন কানের কাছে কথা বলে। হারু পাগলা এখন প্রায়ই কানের মধ্যে কী যেন শুনতে পায়। কে যেন তার কানের কাছে এসে বিড়বিড় করে কথা বলে। গত কয়েক বছর তার মধ্যে একটা পরিবর্তন এসেছে। আগে সে চোর ছিল। মসজিদ থেকে জুতা চুরি করতো। যখন সবাই সেজদায় যেত হারু চোরা তখন সব জুতা বস্তায় ঢুকিয়ে দৌড় দিত। মানুষ নামাজ ছেড়ে তার পেছনে দৌড়াতো। মানুষের ঈমান এত দূর্বল। সামান্য জুতার জন্য নামাজ ছেড়ে দেয়। এখন সে আর চুরি করেনা। একবার এমন মার মেরেছিল পাবলিক যে তিনমাস হসপিটালে ছিল। এর পর থেকে জুতা চুরি বন্ধ। আর জুতা চুরি করে ধান্ধাপাতিও খুব একটা ভালো হচ্ছিলো না। এখন সে গাঁজার ব্যবসা করে। নিজেও মাঝেমাঝে গাঁজা টানে। তবে গত কয়েকমাস তাও ছেড়ে দিয়েছে। এখন সে প্রতিদিন এই ভাঙ্গা বাড়িটার কাছে এসে বসে থাকে। একটু নির্জন বলে এখানে মানুষজন বলতে গেলে আসেইনা। হারু একা একা এখানে এসে বসে থাকে। হারুর বউ তাকে খুঁজতে মাঝেমাঝে আসে। এখন আর আসেনা। কারণ এখন হারু এখান থেকে নিজের ইচ্ছা ছাড়া যায়না। এটা একটা পুরাতন জমিদার বাড়ি। বিশাল ইটের দালান। কয়েকশ বছর বয়স হবে এই বাড়ির। কথিত আছে এই বাড়ির মালিক জমিদার বাবু ছিলেন প্রচণ্ড অত্যাচারী। বিদ্রোহী প্রজাদের একদল তার পুরো পরিবার মেরে ফেলে। যারা জানে বাঁচতে পেরেছিল তারা নাকি সবাই কলকাতা পালিয়ে গেছে। হারু বাড়ির বারান্দায় বসে সিগেরেট টানছিল। কানের কাছে আবারো কে যেন কথা বলছে। নাহ, সে মনে হয় পাগল হয়ে যাবে। এমনিতেই সবাই তাকে হারু পাগলা বলে ডাকে। চোরার জায়গায় পাগলা। হারু মনে মনে হাসে। হঠাৎ কানের কাছে একটা ভারি পুরুষ কণ্ঠ শোনা গেল।

কে রে তুই?

হারু পেছনে তাকিয়ে দেখে একজন অত্যন্ত সুদর্শন গৌর বর্ণের বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে আছে। হাতে একটা লাঠি। হারু তার এই পঁয়তাল্লিশ বছরের জীবনে এত সুন্দর লাঠি কোনদিন দেখেনি।

হারু কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বললো,

আপনি কে?

আমি জমিদার প্রতাপ নারায়ণ। তোর এত বড় সাহস, আমাকে দেখেও নমস্কার করলি না? ছোটলোকের বাচ্চা।
গালি শুনে হারুর মাথায় রক্ত উঠে গেল। সে হুংকার দিয়ে বললো,

ওই ব্যাটা বুইড়ার বাচ্চা। তোর এত বড় সাহস।

বৃদ্ধ তার হাতের লাঠি দিয়ে হারুর মাথায় জোরে একটা বাড়ি দিলো। হারু আস্তে আস্তে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো।

ঘরে আলো একদম আবছা আবছা। কেমন একটা আলস্যে শরীর জুড়িয়ে আছে। ক্লান্তি আছে তবে দূর্বলতা নেই। হারু আস্তে আস্তে চোখটা মেলে দেখে তার বউ তার মাথায় হাত বুলাচ্ছে। সে ঘরে কীভাবে এলো ঠিক বুঝতে পারছেনা। নাকি স্বপ্ন দেখছে। মনে হয় ঘুমিয়ে পড়েছিল। ওই বুইড়া ব্যাটাও মনে হয় স্বপ্নে আসছিল। হারু পড়ালেখা না করলেও এটা অন্তত জানে যে এখন আর জমিদারি যুগ নেই। সে আস্তে আস্তে উঠে বসলো। তখনই তার বউ তাকে বাঁধা দিয়ে বললো,

আপনে উইঠা বসতাছেন কেন? আপনের শরীর খারাপ। আপনেতো ওই পুরান বাড়ির সামনে বেহুঁশ হইয়া পইড়া ছিলেন। আমি কসম খাইছিলাম আর আপনেরে ডাকতে যাবোনা। কিন্তু তারপরও যাই। কী আর করুম, গরীবের কসমের দাম নাই। আল্লাহ মাফ কইরা দিবো।

হারু চোপ বলে একটা ধমক দিলো। ধমকের কারনে আলতা বিবি মুখ কালো করে উঠে গেলো। সে আর এই পাগলের সংসার করবেনা। গরীবের সংসার করা যায়, পাগলের না। তার বাচ্চা-কাচ্চা নেই। মনে হয় হবেও না। সে মনে মনে ভাবে সে আবার বিয়ে করবে। তার খুব মা ডাক শুনতে ইচ্ছে করে।

হার আজ আবার ওই জমিদার বাড়ির সামনে বসে আছে। তার মন বলছে ঐদিন সে সত্যি সত্যিই জমিদার প্রতাপ নারায়ণকে দেখেছে। এত স্পষ্ট। সে ওই বাড়ির কথা এখনো ভুলেনি। বুইড়ার গায়ে জোর আছে। কিন্তু এ কী করে সম্ভব। হঠাৎ কানের কাছে কে যেন বলে উঠলো,

ওই গোলামের বাচ্চা গোলাম। তাড়াতাড়ি উপরে আয়।

হারু অবাক হয়। এ কেমন কথা। এতো জমিদার প্রতাপ নারায়ণের কণ্ঠস্বর। এই ব্যাটা কি গালি ছাড়া কথা বলতে পারেনা নাকি। হারু ঝট করে দাঁড়িয়ে উপরে উঠতে থাকে। মাকড়শার জালে ভরা সিঁড়ি ঘর। এখানে কত বছর মানুষের পা পড়েনি কে জানে। হারু উপরে উঠে দেখে লম্বা টানা বারান্দার ঠিক মাঝখানে জমিদার প্রতাপ নারায়ণ দাঁড়িয়ে আছে। মুখটা হাসি হাসি করে রেখেছে। সে ধীরে ধীরে তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। তারপর দুহাত জড়ো করে বলে নমস্কার বাবু।

জমিদার প্রতাপ নারায়ণ হাত তুলে বলে,

হারু, তোর সাথে আমি অন্যায় করেছি। তুইতো আর আমাকে কোনদিন দেখিসনি। তাই আমাকে চিনার কথাও না। তোকে আঘাত করাটা আমার অন্যায় হয়েছে। আমি খুব অত্যাচারী জমিদার ছিলাম। যার প্রায়শ্চিত্য আমি স্বপরিবারে খুন হয়ে করেছি। এই নে তোকে একটা হীরের আংটি দিলাম। তুই এখন অনেক বড়লোক হয়ে যাবি।

হারু কাঁপা কাঁপা হাতে আংটিটা নিলো। সে এমন আংটি জীবনেও দেখেনি।

আমি এই আংটি তোকে দিলাম। তোর আর কোন অভাব থাকবেনা।

হারু তাকিয়ে দেখে কেউ নেই। তার হাতে জ্বলজ্বল করে জমিদার প্রতাপ নারায়ণের দেয়া হীরের আংটিটি।

সমাপ্ত

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

46 + = 47