ইসলাম হয়ে গেছে পরকালের ধর্ম

মাদ্রাসা শিক্ষা দোয়া করতে শিখিয়েছে, কিন্তু প্রতিবাদ করতে শেখায়নি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের চেতনা তারা ধ্বংস করে দিয়েছে শাসনকে নিষ্কণ্টক করার প্রয়োজনে।

এ প্রসঙ্গটার অবতারণার কারণ হলো, দেশ ও ইসলাম যখন জঙ্গিবাদে আক্রান্ত তখন এর বিরুদ্ধে সবচেয়ে সোচ্চার হওয়ার কথা ছিল আলেম সমাজের কিন্তু তেমনটা দেখা যাচ্ছে না। এর কারণ কী? এর কারণ তারা ন্যায়-অন্যায় নিরূপণে নিজেরাই দ্বিধাগ্রস্ত।

তাদের একটি অংশকে সরকার প্রতিপালন করেন, বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা ভাতা দেন। তাই কৃতজ্ঞ সুবিধাভোগী হিসাবে সরকার কর্তৃক আয়োজিত কর্মূসচিতে তারা অংশগ্রহণ করেন, সুবিধার ঘাটতি হলেই গাঁইগুই করেন। স্বার্থই তাদের ধর্ম।

অন্যদিকে কওমী আলেমরা বিভিন্ন ইস্যুভিত্তিক আন্দোলন করেন যার মধ্যে জেহাদী জোশ ব্যবহার করার প্রাণান্তকর চেষ্টা থাকে। বিশেষ করে যখন তাদের মাদ্রাসাগুলোকে সরকার নিয়ন্ত্রণে নিতে চায় তখন তারা প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠেন, যেন মাদ্রাসার কর্তৃত্বটা বেহাত না হয়। ওটাই তো জীবিকার উৎস।

কেউ ইসলামের বিরুদ্ধে কটূক্তি করলেও তারা তেড়েফুঁড়ে ওঠেন, উদ্দেশ্য হচ্ছে তারা যে ধর্মের কর্তৃপক্ষ, মানুষের ধর্মানুভূতির অস্ত্রটি যে তাদেরই হাতে সেটা স্মরণ করিয়ে দেওয়া। এখানেও রয়েছে কায়েমি স্বার্থ, ইসলাম নয়-মানবতাও নয়।

অথচ কলেমার প্রথম শব্দটি হচ্ছে – “লা” যার অর্থ “মানি না”। সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে চিরন্তন প্রতিবাদের ভাষা এই কলেমা। তাই মুসলিম হবে সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী বিপ্লবী। ব্রিটিশরা এই চেতনাটিকেই কবর দিয়েছিল মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে। হাজার হাজার মাদ্রাসা থেকে লক্ষ লক্ষ আলেম বেরিয়ে আসছেন এবং মনে করছেন যে তারা ইসলাম শিখেছেন। জনগণও তাই ভাবছে, তাদের লেখা বই পড়ে, তাদের ওয়াজ শুনে সেই বিকৃত ইসলামকেই জীবনে ধারণ করেছেন।

ফল কী হয়েছে? এই মানুষগুলোও অন্যায়ের বিরুদ্ধে নির্বিরোধী প্রতিবাদহীন গোবরগনেশে পরিণত হয়েছেন। প্রতিষ্ঠিত সমাজব্যবস্থায় যতই অন্যায় হোক, দিন দিন অবিচার নিষ্পেষণ যতই বাড়ুক এই আম-জনতা সব মুখ বুজে সয়ে যায়। ধর্ম তাদেরকে কেবল ‘হায় আল্লাহ’ ‘হায় আল্লাহ’ বলতে শেখায়, প্রতিবাদের প্রেরণা দেয় না। বরং তারা নফসের বিরুদ্ধে জেহাদে রত থেকে অন্যায়পূর্ণ সমাজ থেকে যদ্দুর সম্ভব সুবিধা আদায় করে যায়।

আল্লাহ বলেছেন, তোমাদেরকে মানবজাতির মধ্যে শ্রেষ্ঠ জাতিরূপে উত্থিত করা হয়েছে এই জন্য যে তোমরা মানুষকে ন্যায়ের আদেশ করবে আর অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে (সুরা ইমরান-১১০)। আল্লাহ শ্রেষ্ঠত্বের ভিত্তিটি কোথায় স্থাপন করেছেন সেটা জাতিকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে সুরা-কালামের মুখস্থবিদ্যার শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে। সমাজ গোল্লায় যায়, প্রতি হরফে আমরা দশটি করে নেকি চাই, সোবাহান আল্লাহ বলে জান্নাতের বাগানে গাছ বানাতে চাই। অর্থাৎ ইসলাম হয়ে গেছে পরকালের ধর্ম।

প্রতিটি সভ্যতার ভিত্তিমূলে একটি আবেগ থাকে, চেতনা থাকে। ইসলামের চেতনা ছিল – সমাজে কোনো মিথ্যা থাকবে না, অন্যায় থাকবে না, অবিচার থাকবে না। জালেমের বিরুদ্ধে সত্যভাষণকে বলা হয়েছে জেহাদের আকবর।

সেই সভ্যতা তার প্রাণ হারিয়ে নিছক দাড়ি টুপি আর মাসলা-মাসায়েলের ধর্মে পরিণত হয়েছে। তাদের সমস্ত আবেগ এখন দাড়িভিত্তিক, বোরকাভিত্তিক। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রতিরোধ নয়, আসমানের দিকে দুই হাত তুলে হাউমাউ করে চোখের পানিতে বুক ভাসিয়ে ফেলেন। হায় অন্ধত্ব, হায় মূর্খতা, হায় অবাস্তব অর্থহীন শাস্ত্রপূজা।

খোরশেদ আলম, লেখক ও গবেষক

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “ইসলাম হয়ে গেছে পরকালের ধর্ম

  1. আপনার সামনে কি কোরানের খালি
    আপনার সামনে কি কোরানের খালি দুই একটা শান্তির আয়াতই পড়ে ? কোরানে যে এত শত শত জিহাদী আয়াত ও জিহাদী হাদিস আছে , সেসব চোখে পড়ে না ?

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

30 − 25 =