**** রক্তাক্ত ১৫ই আগস্ট, ১৯৭৫এর পথে – পর্ব – ১ ****

?w=640&h=361″ width=”600″ />
ডিসেম্বর মাস, ১৯৬৭ সাল
কাকুল মিলিটারী একাডেমী
রিসালপুর, পশ্চিম পাকিস্তান


?w=640&h=361″ width=”600″ />
ডিসেম্বর মাস, ১৯৬৭ সাল
কাকুল মিলিটারী একাডেমী
রিসালপুর, পশ্চিম পাকিস্তান

রাজশাহীর পীর বংশের ছেলে দেওয়ান এসেরাতুল্লাহ সৈয়দ ফারুক রহমান আজ পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করলেন। তার শরীরে বহমান আরবের অভিজাত সৈয়দ বংশের রক্ত। তার মা জামালপুর জেলার ইসলামপুরের জমিদার পরিবারের মেয়ে, যারা জাতিতে একসময় তুর্কী ছিলেন। বংশের এই পরিচয়ে উনি খুবই গর্বিত। উনার বাবাও পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে ছিলেন মেডিকেল কোরের ডাক্তার হিসেবে, মেজর হিসেবে অবসর গ্রহন করেন। তার পরিবার বেশ ভালোই পরিচিত দেশে। সৈয়দ নজরুল ইসলাম (পরবর্তীতে মুজিবনগর সরকারের ভারপ্রাপ্ত রাস্ট্রপতি) উনার চাচা, সৈয়দ আতাউর রহমান যিনি পুর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন এবং পরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হন তিনিও তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। এর বাইরেও সেনাবাহিনীতেই তার পরিচিত অনেক আত্মীয় আছেন, এদের একজন হচ্ছেন ক্যাপ্টেন খালেদ মোশাররফ, যিনি পরবর্তীতে ৩ দিনের জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধানও হবেন। ক্যাপ্টেন খালেদও (পরব্ররতীতে কে ফোর্স কমান্ডার এবং মেজর জেনারেল) ফারুক রহমানের মামা হন।

প্রথমে বিমান বাহিনীতে যোগ দিতে চেয়েও ব্যর্থ হলেও ৬৫ সালের যুদ্ধের সময় দেশপ্রেম আবার জেগে উঠলে আন্তবাহিনী নির্বাচনী পরিষদের পরীক্ষায় উত্তীর্ন হয়ে যোগ দেন সেনাবাহিনীতে। সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষনেও তিনি বংশের নাম ভালোমতই রক্ষা করলেন। তার কোর্সের ৩০০ জন ক্যাডেটের মধ্যে চতুর্থ স্থান দখল করেই তিনি পাসআউট করলেন। সেখানে তিনি ছিলেন বিএসএম (ক্যাডেটদের একটা সম্মানজনক এপয়েন্টমেন্ট, ব্যাটালিয়ান সার্জেন্ট মেজর)। সেনাবাহিনীর অফিসারদের মধ্যে যারা সবচেয়ে চৌকস তারাই পদাতিক বাহিনীতে কিংবা ইনফ্যান্ট্রিতে যোগ দেন।

তবে একাডেমীর বাঙ্গালী ইন্সট্রাকটর ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমান এবং ক্যাপ্টেন খালেদ মোশাররফ (দুজনেই তখন পিএমএ তে কর্মরত ছিলেন) যখন তাকে উপদেশ দিলেন ইনফ্যান্ট্রিতে যোগ দিয়ে বেঙ্গল রেজিমেন্টে চলে আসতে, তখন তিনি শান্তস্বরে উত্তর দিলেন,

– “আমি সেনাবাহিনীতে পায়ের উপর হাটতে আসিনি।“

উনি বেছে নিলেন আর্মার্ড কোর এবং ১ম আর্মার্ড ডিভিশনের ১৩ নং ল্যান্সার রেজিমেন্টে যোগ দিলেন। সেখান থেকে তিনি পরবর্তীতে ৩১ তম ক্যাভালরী রেজিমেন্টে বদলী হবেন, যেখানে ১৯৭০ সালে মাত্র ২৪ বছর বয়সে ক্যাপ্টেন অবস্থাতেই একটি ট্যাঙ্ক স্কোয়াড্রনের কমান্ড গ্রহন করবেন। এর পেছনে কারন ছিলো ট্যাকটিকাল আর্মার্ড কোর্সে তার অসাধারন ফলাফল করে প্রথম হওয়া।

১৯৭১ সালে উনি ছিলেন আবুধাবীতে ডেপুটেশনে। একদিন ব্রিটিশ অফিসার্স মেসে বেশ কিছু ইংরেজী পত্রিকায় বাংলাদেশের সংবাদ দেখে উনি চমকে উঠলেন। যার মধ্যে একটা ছিলো এন্থনী ম্যাসকারেনহাসের ‘জেনোসাইড’ নামে সানডে টাইমসে প্রকাশিত একটি আর্টিকেল। এই ব্যাপারে তিনি পরে এন্থনী ম্যাসকারেনহাসকে এক সাক্ষাতকারে বলবেন,

– “প্রকৃতপক্ষে আপনার লেখার যে বিষয়টি আমাকে সবকিছু বিশ্বাস করতে বাধ্য করেছিলো তা হচ্ছে আপনার কৌশল এবং প্রতিবেদন। আপনি যেভাবে সেই পাকিস্তানী অফিসারদের ব্যাপারে লিখেছিলেন তা আমাকে চমকে দেয় এবং আমি বুঝতে পারি এই লোক ভন্ড নয়। শুধুমাত্র সেই ব্যক্তিই তাদের ব্যবহার সম্পর্কে বলতে পারবে যারা তাদের সংস্পর্শে এসেছে। আর আমি জানি এই ব্যাপারটা কেউ বানিয়ে বলতে পারবেনা। এ কারনেই আমার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে যে এই লোক ঠিকমতই জানে সে কি লিখছে এবং তা মিথ্যা হতে পারে না। এটাই আমাকে পালাবার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে।“

এই পক্ষত্যাগের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে তিনি এন্থনী ম্যাসকারেনহাসকে আরো বলেন,

– “আমার রাজনীতিতে আগ্রহ ছিল না, কারন আমি পেশাগত ক্ষেত্রে খুব দ্রুতই উন্নতি করছিলাম। আমার লক্ষ্য ছিল কতটা দ্রুত আমি এগিয়ে যেতে পারি। আমি কেবলমাত্র একজন জেনারেল অফিসার হিসেবে পেশাগত ক্ষেত্রে নিজেকে দেখতে চাইছিলাম। এরপর এই ব্যাপারটা এসে আমার ক্যারিয়ারের বারোটা বাজিয়ে দিলো।“

একজন প্রকৃত ভালো মানুষের অহংকার থাকে না। থাকলেও সেটা বিনয় দিয়ে লুকিয়ে রাখতে চেষ্টা করেন। আবার একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক দেশের জন্য লড়তে গিয়ে কি হারালেন সেটা নিয়ে ভাবনাগুলো মনে স্থান দেননা।

তবে মেজর ফারুকের মতে, তার আরেক চাচা নুরুল কাদের, যিনি মুজিবনগর সরকারে কর্মরত ছিলেন, তার চিঠি তাকে দেশের অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত করে। আর তিনি সিদ্ধান্ত নেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে চাকরি করা তাঁর পক্ষে আর সম্ভব না। ১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসের ১২ তারিখ উনি দুবাই এয়ারপোর্টে নিজের গাড়ি ড্রাইভ করে চলে যান। এরপর বৈরুতের পথ ধরে লন্ডন হয়ে ভারতে পৌছান। তবে বাকী প্রায় সব বাঙ্গালী অফিসারদের মত উনি সীমান্ত পার হয়ে ভারত পৌছাননি। তবে যতদুর জানা যায় উনি লিবিয়ার রাজধানী ক্রিপোলী হয়ে যুদ্ধে যোগদান করেন। আর সেই সময় লিবিয়ার নেতা মুয়াম্মার গাদ্দামী ছিলেন জুলফিকার আলী ভুট্টোর বন্ধু এবং লিবিয়া বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান নেয়। এটা আমাদের নিশ্চিত না হলেও অন্যকিছু ভাবতে বাধ্য করে।

মেজর খন্দকার আব্দুর রশীদও প্রায় একই সময়ে পিএমএ তে যোগ দিলেন, এর আগে তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র। তবে তিনি ফারুক রহমানের মত সবদিক থেকে এতো চৌকস ছিলেন না। তিনি প্রায় ৩০০ ক্যাডেটের মধ্যে ৯২তম স্থান অধিকার করেন এবং বেঙ্গল রেজিমেন্ট প্রথম পছন্দ থাকলেও তাকে দেয়া হয় আর্টিলারী। তিনি কুমিল্লার দাউদকান্দির একটা গ্রাম থেকে উঠে আসেন। তার বাবা ছিলেন একজন প্রাইমারী স্কুল শিক্ষক। স্বাধীনতার পর খন্দকার মোশতাক আহমেদের সাথে তার সুসম্পর্ক থাকলেও আত্মীয়তা ছিল না, তারা ছিলেন একই উপজেলার বাসিন্দা।

১৯৭১ সালের মার্চের পাকিস্তানী সেনাদের ক্রাকডাউনের সময় তার পোস্টিং ছিলো কাশ্মীর সীমান্তের হাজিরা নামক স্থানে। সেই সময়ে তার স্ত্রী টিঙ্কু তাকে উৎসাহিত করেন মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে। সেপেম্বরের শুরুতে তিনি বাবামায়ের অসুস্থতার কারন দেখিয়ে ফারলং লিভের আবেদন করেন এবং তাদের অবাক করে দিয়ে সেই ছুটি মঞ্জুর করা হয়। অক্টোবরের ২ তারিখ তারা ঢাকায় পৌছান এবং স্ত্রী সন্তানদের চট্টগ্রাম পাঠিয়ে দিয়ে তিনি আগরতলা সীমান্ত পাড়ি দেবার চেস্টা করেন। এই সময় বেশ কয়বার ক্রসফায়ারের মধ্যে পরলেও এবং এক পর্যায়ে ২৯ শে অক্টোবর ভারতে পৌছাতে সক্ষম হন। সেখান থেকে তিনি জেড ফোর্সের সাথে যোগ দেবেন এবং মুক্তিবাহিনীর একটি হাউইৎৎজার ব্যাটারীর সাথে ডিসেম্বরে সিলেট দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করবেন। স্বাধীনতার পর এই ব্যাটারীটিকে একটি রেজিমেন্টে পরিনত করা হয়। মেজর খন্দকার আব্দুর রশীদ হবেন এর প্রথম কমান্ডিং অফিসার।

এভাবেই পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধের প্রায় শেষ পর্যায়ে তারা যুদ্ধে যোগ দেবেন।

মেজর রশীদ আর মেজর ফারুক দুজন সম্পর্কে ছিলেন ভায়রা ভাই। চট্টগ্রামের বিশিষ্ট শিল্পপতি এস এইচ খানের দুই কন্যাকে বিয়ে করেছিলেন তারা দুজন। মেজর ফারুকের স্ত্রীর নাম ফরিদা এবং লেঃ কর্নেল রশীদের স্ত্রীর নাম জোবায়দা, ডাক নাম টিঙ্কু। তাদের স্ত্রীর চাচা এ কে খান ছিলেন মুসলীগ লীগের বড় নেতা এবং পাকিস্তানের শিল্পমন্ত্রী। ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে দুই ভায়রা ভাই মেজর ফারুক এবং মেজর রশীদ পাশাপাশি দুই বাংলোবাড়িতে থাকতেন। তাদের দুজনের বাড়ির মাঝখানে কেবল একটা দেয়াল ছিলো। প্রায় প্রতিদিন বিকেলেই দুই মেজর তাদের স্ত্রীদের সহ একসাথে আড্ডা দিতেন। চা পান করতে করতে গল্প করতেন। পেশাগত সম্পর্কের বাইরেও আত্মীয়তা এবং প্রতিবেশীর সম্পর্ক ছিলো তাদের মধ্যে। একজন অন্যজনকে আয়নার মত দেখতে পেলেন। পিএমএ তে থাকাকালীন সময়েও তাদের এই সম্পর্ক এমন মানিকজোড়ের মত ছিলো।

১৯ শে মার্চ, ১৯৭২
ঢাকা, বাংলাদেশ
ভারতের সাথে ২৫ বছর মেয়াদী মৈত্রী এবং পারস্পরিক সহযোগিতা চুক্তি সাক্ষরিত হলো আজ। ভারতীয় বাহিনী বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে যথাসম্ভব সাহায্য করেছিলো এবং বঙ্গবন্ধু সেই বন্ধু রাস্ট্র ভারতেরই দ্বারস্থ হলেন বাইরের যেকোনো শক্তির আগ্রাসন থেকে দেশকে রক্ষার জন্য। এই চুক্তি একটা কার্যকর প্রতিরক্ষা বাহিনী থাকবার প্রয়োজন অনেকটাই দূর করে দিলো। দেশের সামরিক স্থাপনা এবং শক্তি তাই আভন্তরীন নিরাপত্তা দিতে পারে এমন পর্যায়েই সীমিত থাকবে আরো বেশ কয় বছর এবং আনুষ্ঠানিকতার জন্য ব্যবহৃত হবে। ৭২-৭৫ সালে বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর কোন অনুমোদিত টিওএন্ডই (টেবল অফ অর্গানাইজেশনাল এসটাবলিশমেন্টস) ছিলনা। বঙ্গবন্ধু নিজেও এ ব্যাপারে বললেন,

– “আমি কোন দানব সৃষ্টি করতে চাইনা বাংলাদেশে, যেমন এক দানব পাকিস্তানে তৈরী হয়েছিলো।“

তবে তিনি ক্ষমতার শুরুতেই আরেক দানব সৃষ্টির প্রক্রিয়া শুরু করে ফেলেছিলেন, উনার নিজের কাছে দানব না হলেও সেটা জনগনের কাছে দানব হিসেবেই পরিচিত হবে প্রামথিক পর্যায়ের কিছু সাফল্যের পর।

তিনি সামরিক বাহিনী সম্পর্কে এন্থনী ম্যাসকারেনহাসকে পরবর্তীতে পোকার খেলবার সময় সামরিক বাহিনীর ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে বলেছিলেন,

– “যখন তুমি ভদ্রলোকের সাথে খেলবে, ভদ্রলোকের মতই খেলবে। কিন্তু যখন তুমি বেজন্মাদের সাথে খেলবে, নিশ্চিৎ করে নিও যে তুমি আরো বড় বেজন্মার মতই খেলছো। নাহলে তুমি হেরে যাবে। ভুলে যেওনা, আমি বেশ ভালো কিছু শিক্ষক পেয়েছিলাম।“

৭ মার্চ, ১৯৭২
ঢাকা, বাংলাদেশ
আজকে প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবুর রহমান রাস্ট্রপতির নির্বাহী আদেশে (প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডার নং ২১ অফ ১৯৭২ বা জাতীয় রক্ষী বাহিনী অর্ডার) জাতীয় রক্ষী বাহিনী নামের এক অভিজাত আধাসামরিক বাহিনী গঠন করা হয়েছে। এই আদেশ কার্যকর হচ্ছে ১ ফেব্রুয়ারী ১৯৭২ থেকেই। সঙ্গত কারনেই বঙ্গবন্ধু আর আওয়ামী লীগের নেতারা সেনাবাহিনীকে আর তেমন বিশ্বাস করতে পারছেন না। সেই পাকিস্তান আমল থেকেই তাঁরা অনেক দুর্ভোগের মুখে পরেছেন এই সেনাদের কারনেই। তারা সেনাবানীর বিকল্প অন্য এক অনুগত বাহিনীর কল্পনা করলেন, যারা বঙ্গবন্ধু এবং দলের প্রতি অনুগত থাকবেন।

রক্ষী বাহিনীর ধারনাটা দিলেন বিএলএফ বা মুজিব বাহিনীর নেতারা। যারা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেই মুক্তিবাহিনীর সমান্তরালে কেবল দলীয় আদর্শের কর্মীদের নিয়ে আরেকটা বাহিনী গঠন করেছিলেন। যদিও মুক্তিযুদ্ধটা দলের নামে হয়নি, দেশের জন্য লড়েছিলো সবাই একসাথে। বঙ্গবন্ধু, তাজউদ্দীন আহমেদ সহ অন্যান্য প্রথম সারির নেতারাও ভাবছিলেন যে বিরোধীপক্ষের চক্রান্তে স্বাধীনতা যুদ্ধের আত্মত্যাগের ফসল নষ্ট হতে পারে। তাজউদ্দীন আহমেদ উনাকে পরামর্শ দিলেন লক্ষাধিক সাধারন জনতা মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রশিক্ষন নিয়েছিলো, তাদের রাষ্ট্রের অধীনে নিয়ে আসা যেতে পারে এবং একটা আধাসামরিক বাহিনী গঠন করে তাতে আত্মীকরন করা যেতে পারে। এমন কিছু চিন্তারই ফসল এই রক্ষী বাহিনী। তাজউদ্দীন আহমেদ সমাজতন্ত্রের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন। চীন, রাশিয়ার পদ্ধতি উনাকে আকর্ষন করে থাকতেই পারে।

এই ধরনের কিংবা কোন বাহিনী গঠনের বিশেষ প্রয়োজনীয়তা অবশ্যই ছিলো এই সময়ে। এ সময়ে পুলিশ এবং অন্যান্য আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যসংখ্যা ছিলো নগন্য। এদের অনেকে যুদ্ধকালীন সময়ে আহত হন, অনেকে শহীদ হন। সেই শুন্যস্থানও পুরন করা দরকার ছিলো। নানা সন্ত্রাসী দল এখানে সেখানে হামলা করতো, চোরাচালানে যুক্ত হচ্ছিলো, কাঁচামাল এবং যন্ত্রাংশ ভারতে পাচার হয়ে যাচ্ছিলো, কিন্তু লোকবলের অভাবে তা ঠেকানো যাচ্ছিলোনা। এছাড়া বঙ্গবন্ধু সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে ক্যু জাতীয় কিছুর আশংকাও করছিলেন হয়তো। তাই প্রথমে এই ধারনা বাতিল করে দিলেও পরে প্রধানমন্ত্রী মনসুর আলীর সাহায্যে একটা অভিজাত প্যারা-মিলিটারী বাহিনী গঠনের নির্দেশ দিলেন।

মন্ত্রীসভায় কোন ধরনের আলোচনা ছাড়াই এই বাহিনী গঠিত হলো, যার প্রাথমিক দ্বায়িত্ব জনগনের নিরাপত্তা বিধান করা। আর অফিশিয়ালী এই বাহিনীকে দ্বায়িত্ব দেয়া হলো মুক্তিযুদ্ধের সময় বেসামরিক লোকেদের কাছে ছড়িয়ে থাকা অস্ত্র উদ্ধার করা। তবে বাস্তবে এই বাহিনী বঙ্গবন্ধুর নিজস্ব বাহিনীতে পরিনত হবে যারা সেনাবাহিনী কিংবা অন্য কোন সশস্ত্র দলের হুমকি থেকে প্রেসিডেন্টের সুরক্ষায় নিয়োজিত থাকবে।

এই বাহিনীর দুর্বতলা ছিলো এর গঠনতন্ত্র, যার কোন সুনির্দিস্ট আইনগত কাঠামো ছিলো না। রক্ষী বাহিনী অর্ডারের আওতায় এই বাহিনীর কার্যক্রম সম্পর্কে বলা হয় যে, ‘তা আভ্যন্তরীন নিরাপত্তা রক্ষায় বেসামরিক প্রশাসনের সাহায্যের জন্য নিয়োজিত হবে। এর বাইরেও তা সামরিক বাহিনীকেও প্রয়োজন মোতাবেক সাহায্যে করবে’। এই বাহিনী সরকারের নজরদারীতে থাকবে এবং একজন মহাপরিচালকের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রনে থাকবে। এই বাহিনীর নানা নিয়মকানুন রক্ষী বাহিনী অর্ডারের ১৭ নং প্যারা দিয়ে প্রয়োজন মোতাবেক তৈরী করা হবে। রক্ষী বাহিনীর কোন কর্মকর্তা কর্তব্য পালনের সময় কোন ধরনের ওয়ারেন্ট ছাড়াই সন্দেহবশত যে কোন ব্যক্তি, স্থান কিংবা যানবাহন তল্লাশী, জব্দ কিংবা গ্রেফতার করতে পারবে যদি তার ধারনা জন্মে যে সেই ব্যক্তি দেশের আইনের যেকোন ধারায় শাস্তিযোগ্য কোন অপরাধ করতে পারে কিংবা জড়িত।

গঠনতন্ত্রের এই দুর্বলতা কিংবা কোন সুনির্দিস্ট নিয়মকানুন না থাকা এই বাহিনীকে দিলো ব্যাপক ক্ষমতা। ১৭ মার্চ এই ভারতীয় বাহিনী বাংলাদেশ ত্যাগ করবার সাথে সাথেই এই বাহিনীকে সক্রিয়ভাবে মোতায়েন করা হলো।

বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে এই বাহিনীকে প্রশিক্ষনের দ্বায়িত্ব নেন ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এর মেজর জেনারেল সুজন সিং উবান, যিনি আগে মুজিব বাহিনীর প্রশিক্ষনের দ্বায়িত্বে ছিলেন এবং স্বাধীনতার পর শেখ মনির সঙ্গী হিসেবে বাংলাদেশে আসেন। এই বাহিনীর প্রাথমিক প্রশিক্ষনের দ্বায়িত্ব বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে না দিয়ে তাদের ভারতে প্রেরন করা হয়। এর বাইরে রক্ষী বাহিনীর অফিসার সহ বিশেষ কিছু সদস্যকে দেহরাদুনের ভারতীয় মিলিটারী একাডেমীতে প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা নেয়া হয়। রক্ষী বাহিনীর সদস্যরা সজ্জিত হয় ভারতীয় এসল্ট রাইফেল, হেভি মেশিনগান, স্টিল হেলমেট এবং চামড়ার তৈরী লং বুটে। জীপ, ট্রাক সহ অন্যান্য যানবাহনও কেনা হয় ভারত থেকেই যা ভারতীয় সেনাবাহিনীর স্ট্যান্ডার্ড ট্রুপস ক্যারিইং ভেহিকেল হিসেবে পরিচিত ছিলো। তাদের ইউনিফর্ম হলো জলপাই রঙয়ের, যা ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ এর মত ছিলো।

জাতীয় রক্ষী বাহিনীর প্রথম পরিচালক ছিলেন ব্রিগেডিয়ার এ এস এম নুরুজ্জামান। এর বাইরে মেজর শহীদ, লেঃ কর্নেল আবুল হাসান, লেঃ কর্নেল সারোয়ার, লেঃ কর্নেল সাহাবুদ্দীন এবং লেঃ কর্নেল আজিজ ছিলেন তার পাঁচ ডেপুটি ডিরেক্টর।

রক্ষী বাহিনীর কাজ কর্ম সম্পর্কে কোন ধরনের জবাবদিহীতা না থাকা, উপদেষ্টা হিসেবে ভারতীয় সেনা কর্মকর্তাদের উপস্থিতি এবং ভারতীয় সেনাদের মত ইউনিফর্ম প্রভৃতি কারনে এই বাহিনী সম্পর্কে শুরুতেই জনগনের মধ্যে বেশকিছু প্রশ্নের জন্ম দিলো, যদিও প্রথমদিকেই এই বাহিনী অস্ত্র উদ্ধার এবং অন্তর্ঘাতমুলক কাজকর্ম নিয়ন্ত্রনে বেশ ভালো সাফল্য দেখাচ্ছিলো।

তবে প্রাথমিক মধুচন্দ্রিমার সময়ের পর এই বাহিনীর তার আসল রুপ দেখাতে শুরু করে। আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী থেকে অন্য কিছুতে পরিনত হতে থাকে। বাহিনীতে প্রধানত আওয়ামী লীগের কর্মীদের বেশি উপস্থিতির কারনে তা পরিনত হয় আওয়ামী লীগেরই সশস্ত্র শাখায়। প্রধানত রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির কাজে ব্যবহার করা শুরু হয় এই বাহিনীকে। যেহেতু এই বাহিনীকে নিয়ন্ত্রনের জন্য কোন ধরনের নিয়ম নীতি ছিলনা তাই শক্তির সর্বোচ্চ এবং নির্দয় প্রয়োগ করা শুরু হয়। অভিযানের সময় এই বাহিনী একটা এলাকা ঘিরে রাখত এবং চিরুনী অভিযান চালাতো। এই সময় অত্যাচার, লুটোপাট এবং গুম করার অভিযোগ পাওয়া যায়, যেটা খুব সাধারন ঘটনায় পরিনত হয়। রক্ষী বাহিনীর কার্যক্রম পরিচালনার স্ট্যান্ডার্ড প্রসিডিউর হয়ে যায় এটাই। কখনোই কোন বাহিনীকে সম্পুর্ন মুক্ত করে দিতে হয়না, হাতে অস্ত্র থাকলে একজন আপাত নিরীহ মানুষও হয়ে উঠতে পারে একজন দানব, তা রক্ষী বাহিনীর সদস্যরা প্রমান করতে থাকে।

বঙ্গবন্ধুর আশীর্বাদ ধন্য এবং উনার প্রতি সম্পুর্ন অনুগত এই বাহিনী ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ভাবে আওয়ামী লীগের জন্যই বদনাম বয়ে আনে। মুজিব বিরোধী প্রচারনার অংশ হয়ে দাঁড়ায় রক্ষী বাহিনীর কর্মকান্ড। তাদের প্রধান আক্রমনের লক্ষ্যও হয় এই বাহিনী। বিরোধীদের ধারনা ছিলো যে রক্ষী বাহিনীকে ধ্বংস করতে পারা মানে আওয়ামী লীগকেও দুর্বল করে ফেলতে পারা। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং সেনাবাহিনী উভয়ের প্রতিই এই বাহিনী পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে শক্তি প্রদর্শনের পন্থা অবলম্বন করে। সেনাবাহিনীকে এই বাহিনীর পক্ষ থেকে এমন বার্তা প্রদর্শন করা হয় যে কোন ধরনের ক্যু এর চিন্তা করলে পরিনতি নির্মম হবে।

লক্ষাধিক সার্টিফিকেটধারী মুক্তিযোদ্ধাকে এই সময়ে দেশের পুনর্গঠনমুলক কাজে সেভাবে ব্যবহার করা হয়নি। তারাও কিছুটা হতাশ ছিলেন। তবে বঙ্গবন্ধু মুক্তিযোদ্ধাদের সামরিক বাহিনীতে আত্মীকরনের পদক্ষেপ নেন, যদিও মাত্র ৮০০০ এর মত মুক্তিযোদ্ধা এই আহবানে সাড়া দেন। তবে এদের বেশিরভাগই ছিলেন মুজিব বাহিনীর সদস্য এবং আওয়ামী লীগের সক্রিয় কর্মী। তাদের বেশিরভাগকেই রক্ষী বাহিনীতে নেয়া হয়। এই সকল কারনে রক্ষী বাহিনীর সদদ্যরা আদর্শগতভাবেই আওয়ামী লীগের একান্ত অনুগত ছিলেন এবং বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত বাহিনীতে পরিনত হয়।

১৯৭৫ সালে যখন এটিকে বিলুপ্ত করা হয় তখন এর জনবল ছিলো প্রায় ২৫০০০। একে ১৩০০০০ সদস্যের একটী শক্তিশালী বাহিনীতে পরিনত করার পদক্ষেপ নেয়া হয় ১৯৮০ সালের মধ্যেই, যা সেনাবাহিনির সদস্য সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যেতো বহুগুনে। এই সময়ে সেনাবাহিনীর নতুন নিয়োগ প্রায় বন্ধ করে দেয়া হয়। সেনাবাহিনীর সদস্যরাও এই বাহিনীকে নিজেদের জন্য হুমকী হিসেবেই দেখছিলো। এই বাহিনীর সদস্যদের ৬০ টি জেলা গভর্নরের আওতায় এনে সারা দেশে ছড়িয়ে দেবার পরিকল্পনা ছিলো যা ১৯৭৫ সালের ১লা সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হতো বাকশালের প্রশাসনিক পর্যায়ে আনুষ্ঠানিক যাত্রার সাথে সাথে। সেই সময়ে সামরিক খাতে বাজেট বরাদ্ধ ছিলো মোট বাজেটের ১৩%, যার অর্ধেকেরও বেশি ব্যয় করা হতো এই বাহিনীর পেছনে। সেনাবাহিনী হয়ে যায় উপেক্ষিত। যেই সেনাবাহিনীর সদস্যরা প্রশ্নাতীতভাবে মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রেখেছিলেন তাদের অবস্থা হয় অনেকটা এতিমের মতন। বৈষম্য কখনো সুফল বয়ে নিয়ে আসেনা। ৭৫ পর্যন্ত সেনাবাহিনী কোন ধরনের প্রতিবাদ না করলেও তাদের বিশাল একটা অংশের শেখ মুজিবের প্রতি ব্যক্তিগত আনুগত্য বলতে আর তেমন কিছু রইলোনা। মেজর জেনারেল মঞ্জুর এন্থনী ম্যাসকারেনহাসকে বলেন, ‘এমন ঘটনাও ঘটেছে যখন রক্ষী বাহিনী সেনাবাহিনীর সদস্যদেরও হত্যা করেছে রাজাকার কিংবা পাকিস্তানীদের দোসর বলে প্রচার করে’। এই বাহিনীর সদস্যরা বঙ্গবন্ধুর নামে ব্যক্তিগত আনুগত্যের শপথ নিতো। দেশের বৈধ সন্ত্রাসের প্রতিশব্দ হয়ে ওঠে এই বাহিনী।

(চলবে)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “**** রক্তাক্ত ১৫ই আগস্ট, ১৯৭৫এর পথে – পর্ব – ১ ****

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 1