রঙের কারিগর এস এম সুলতান


রনি রেজা: আজ চিত্রশিল্পী প্রয়াত এস এম সুলতানের ৯৩ তম জন্মদিন। ১৯২৪ সালের এই দিনে নড়াইলের মাছিমদিয়ার মেছের আলী ও মাজু বেগমের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর পুরো নাম শেখ মোহাম্মদ সুলতান।

গ্রামীণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা এস এম সুলতানের জীবনের মূল সুর-ছন্দ খুঁজে পেয়েছিলেন বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবন, কৃষক এবং কৃষিকাজের মধ্যে।

আবহমান বাংলার সেই ইতিহাস-ঐতিহ্য, দ্রোহ-প্রতিবাদ, বিপ্লব-সংগ্রাম এবং বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে থাকার ইতিহাস তাঁর শিল্পকর্মকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে।

তাঁর রঙের ছোঁয়ায় ফুটে উঠেছে গ্রামীণ জীবনের পরিপূর্ণতা, প্রাণপ্রাচুর্যের পাশাপাশি শ্রেণীর দ্বন্দ্ব এবং গ্রামীণ অর্থনীতির হাল।

বিশ্বসভ্যতার কেন্দ্র হিসেবে গ্রামের মহিমা উঠে এসেছে এবং কৃষককে এই কেন্দ্রের রূপকার হিসেবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে শিল্পীর আপ্রাণ চেষ্টায়।
চরম দারিদ্রতার মাঝেও ১৯২৮ সালে নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুলে লেখাপড়া শুরু করেন শেখ মোহাম্মদ সুলতান।

লেখাপড়া ছেড়ে ১৯৩৮ সালে কলকাতায় গিয়ে ছবি আঁকা ও জীবিকা নির্বাহ শুরু করেন। সে সময় চিত্র সমালোচক শাহেদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে তার পরিচয় হয়। সোহরাওয়ার্দীর সুপারিশে ১৯৪১ সালে কলকাতা আর্ট স্কুলে ভর্তির সুযোগ পান। ১৯৪৫/৪৬ সালের দিকে ভারতের সিমলায় তার প্রথম একক চিত্র প্রদর্শনী হয়। এর তিন বছর পর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর বোন ফাতিমা জিন্নাহ লাহোরে সুলতানের চিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন। ১৯৫০ সালে চিত্রশিল্পীদের আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে যোগদানের জন্য তিনি আমেরিকা যান।

পাবলো পিকাসো, সালভেদর দালি, পল ক্লি প্রমুখ খ্যাতিমান শিল্পীর ছবির পাশে সুলতানই এশিয়ার একমাত্র শিল্পী যার ছবি এসব প্রদর্শনীতে সুযোগ লাভ করে। পরবর্তীতে ১৯৫৩ সালে নড়াইলে ফিরে আসেন সুলতান। দি প্রতিষ্ঠা করেন ইনস্টিটিউট অব ফাইন আর্ট।

১৯৯২ সালে নিজস্ব সঞ্চিত অর্থ দিয়ে ৬০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১৫ ফুট প্রস্থবিশিষ্ট দোতলা নৌকা (ভ্রাম্যমাণ শিশুস্বর্গ) নির্মাণ করিয়েছিলেন এই রঙের কারিগর।

চিত্রাপাড়ের লাল মিয়া শিল্পের মূল্যায়ন হিসেবে পেয়েছেন ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘ম্যান অব দ্য ইয়ার’, নিউইয়র্কের বায়োগ্রাফিক্যাল সেন্টার থেকে ‘ম্যান অব অ্যাচিভমেন্ট’ ও এশিয়া উইক পত্রিকা থেকে ‘ম্যান অব এশিয়া’ পুরস্কার। এ ছাড়া ’৮২ সালে একুশে পদক ও ’৯৩ সালে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত হন। ১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর অসুস্থ অবস্থায় যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন সুলতান। প্রিয় জন্মভূমি নড়াইলের কুড়িগ্রামে তাকে শায়িত করা হয়।

গুণি এই চিত্রশিল্পীর ৯৩তম জন্মদিন উপলক্ষে নড়াইলের সংগ্রহশালা চত্বরে আজ সকাল সাড়ে ৬টায় কোরআনখানি, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, শিল্পীর কবরে পুষ্পমাল্য অর্পণ, আলোচনা সভা, দোয়া মাহফিল ও পুরস্কার বিতরণের আয়োজন করা হয়েছে।

এ ছাড়া আগামী ২৯ থেকে ৩১ আগস্ট তিন দিনব্যাপী সুলতান উৎসব এবং ১ সেপ্টেম্বর চিত্রা নদীতে ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছেন আমাদের নড়াইল প্রতিনিধি।


লেখক: কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 49 = 57