ধর্মীয় স্বাধীনতাঃ ইসলাম ও আধুনিকতার ‘পাবলিক-প্রাইভেটে’র তুলনামূলক আলোচনা (শেষ পর্ব)

?cb=1417970458″ width=”500″ />

পর্ব -১
পর্ব – ২

আমাদের মনে রাখা দরকার যে, পাবলিক ও প্রাইভেটের সুস্পষ্ট পার্থক্যকরণ সেকুলারিজমের অন্যতম পূর্বশর্ত। ‘সেপারেশন অফ চার্চ এন্ড স্টেট’ বলতে যা বুঝানো হয়, তা মূলত পাবলিক স্পেসের ধর্ম তথা সিভিক রিলিজিওনের বিলুপ্তি। তবে এই সেপারেশনের যেমন একক কোন মডেল নাই তেমনি এই সেপারেশনের প্রক্রিয়াও সোজা সাপ্টা কোন বিচ্ছেদের গল্প না, বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের ইতিহাস। ফ্রান্সের লেসিটে (Laïcité) মডেলের সেকুলারিজম পাবলিক স্পেস থেকে ধর্মকে একেবারে ঝেটিয়ে বিদায় করে দেয়ার পক্ষে। অন্যদিকে ইংল্যান্ডের সেকুলারিজম ধর্মকে সংস্কৃতির অংশ হিসাবে পাবলিক স্পেসে অচ্ছুত মনে করে না। সেকুলার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ধর্মের প্রভাব কোনভাবেই খাটো করে দেখার উপায় নাই। এও ভুলে গেলে চলবে না যে, ফরাসি বিপ্লবের পরে কিন্তু নেপোলিয়নের স্বৈরশাসনের আবির্ভাব ঘটেছিল এবং এই শাসনের বৈধতার প্রয়োজনে ক্যাথলিক চার্চ ফ্রান্সের রাষ্ট্র ধর্ম হিসাবে নতুন শক্তি সঞ্চয় করতে সক্ষম হয়েছিল। তবে পাবলিক স্পেসে ধর্মের অবস্থান নিয়ে পার্থক্য থাকলেও এবং পাবলিক স্পেস থেকে ধর্মের গুরুত্ব হ্রাস পাওয়াটা দীর্ঘমেয়াদি ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার অংশ হলেও ধর্মকে প্রধানত ‘ব্যক্তিগত’ বিষয় গন্য করাটা সেকুলারিজমের ইউনিভার্সাল বৈশিষ্ট। তবে এইক্ষেত্রে ইসলামি ঐতিহ্যের সাথে সেকুলার আধুনিকতার পার্থক্য কম। পার্থক্য ও সংঘাত যেগুলো দেখা যাচ্ছে সেগুলো পাবলিক স্পেসে ধর্মের অবস্থান নিয়ে। ইসলাম বনাম সেকুলারিজমের তর্কে এই পার্থক্যটাই বারবার আলোচিত হয়। কিন্তু ইসলামি ঐতিহ্য আর সেকুলার আধুনিকতার প্রাইভেট ও পাবলিক সংক্রান্ত ধারণার সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যটা খুব সম্ভবত পাবলিক ও প্রাইভেটের হায়ারার্কি সংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গীতে। ইসলামি ঐতিহ্যে ব্যক্তির অন্তরের বিশ্বাস, তার অন্দরমহলের প্রাইভেসিকে সবসময়ই সবকিছুর ঊর্ধে গন্য করার চর্চা ছিল। ব্যক্তিগত ধর্ম বিশ্বাসকে পাবলিক ধর্মাচারের চাইতে উচু অবস্থানে রাখার প্রবনতাও ইসলামি ঐতিহ্যে হাজার বছর ধরেই টিকে আছে। শরিয়তের উপর নির্ভরশীল সিভিক ধর্ম আর স্বাধীনভাবে গ্রহন করা ব্যক্তিগত ধর্মতত্ত্ব, দর্শন বা আধ্যাত্মিকতার মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য করার প্রবনতা ইসলামি স্বর্ণযুগের মুসলিম পন্ডিতদের মধ্যে বিশেষ করে দার্শনিক ও ধর্মতাত্ত্বিকদের মধ্যে ছিল সাধারণ ব্যাপার। তারা পাবলিক স্পেসের সামাজিক ধর্মকে ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিকতা, দার্শনিকতা ও উচ্চমার্গিয় ধর্মবোধের তুলনায় নিচু জিনিস মনে করতেন। জামাতে নামাজ আদায়ের চাইতে বেশি কিছুর প্রয়োজন ব্যক্তি মানুষের আছে বলে তাদের ধারণা ছিল। নিজেদের জগতকে তারা তাই অভ্যন্তরীন আর বহিরাগত, উচু ও নিচু এই দুই স্তরে ভাগ করতেন। ইসলাম ধর্মে যেহেতু কনফেশনাল খ্রিস্টান ধর্মের মতো নিয়মিত কনফেশনের মাধ্যমে অভ্যন্তরের ধর্মকে নিয়ন্ত্রন করার চেষ্টা ছিল না ফলে অন্তর ও অন্দরের ধর্ম চিন্তাকে তারা সদরের ধর্মের অধীন মনে করতেন না। উচু স্তরটাকে তারা সেকুলারাইজ করতে সক্ষম হয়েছিলেন, কিন্তু নিচু স্তরে তা করতে যান নাই। দার্শনিক ও ধর্মতাত্ত্বিকরা ছাড়া মুসলিম সুফিদের মধ্যেও ব্যক্তিগত ধর্ম আর আম জনতার ধর্মের মধ্যে এই উচু নিচু পার্থক্য করার ঐতিহ্য আছে। শরিয়ত আর মারেফতের মধ্যে তর্ক তো বাঙলায় এখনো একটি জীবন্ত বিষয়। অন্যদিকে ওলামা সমাজ, যারা সবসময় জোর গলায় শরিয়তের গুরুত্ব প্রচার করেছেন, তারা মুসলমানদেরকে জনতা (আম্মা) এবং নির্বাচিত (খাসা) এই দুই স্তরে ভাগ করতেন। জনতার পক্ষে ব্যক্তিগতভাবে ধর্ম সম্বন্ধে সঠিক জ্ঞান লাভ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ আদৌ সম্ভব বলে তারা মনে করতেন না। তারা দাবি করতেন যে জনতার আদৌ কোন মাজহাব থাকতে পারে না, সমাজের ধর্মীয় নেতা বা ওলামাদের মাজহাবই জনতার মাজহাব। তাদের ব্যক্তিগত ধার্মিকতাকেও তারা সমাজ বা জনতার ধর্ম থেকে উচু অবস্থানের মনে করতেন। শিক্ষিত ও সম্ভ্রান্ত মুসলিমদের অন্দরমহলে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয় এমন দর্শন, শিল্প, সাহিত্য, সঙ্গিত এমনকি হোমো সেক্সুয়াল এরোটিকার চর্চাও ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। অপরের ব্যক্তিগত গোপনিয়ত রক্ষা করাকে একটি উচু শ্রেণীর গুনাবলি হিসাবে গন্য করা হতো। আজকাল আইসিস ও অন্যান্য কট্টর ইসলামপন্থী অধ্যুসিত অঞ্চলে প্রায়ই বিবাহবহির্ভুত যৌন সম্পর্কের অভিযোগে পাথর ছুড়ে হত্যা করা কিংবা সমকামিতার অভিযোগে উচু দালান থেকে ফেলে হত্যা করার ঘটনা ঘটছে। কিন্তু প্রাক-আধুনিক যুগের মুসলিম দুনিয়ায় এইধরণের অভিযোগে কাউকে বিচারের মুখোমুখি করা ও এই ধরণের নির্মম শাস্তি দেয়া ছিল তুলনামুলকভাবে খুবি অনিয়মিত ঘটনা। ওসমানি খেলাফতের সূদীর্ঘ শাসনামলে ‘জেনা’র অভিযোগে পাথর ছুড়ে মৃত্যুদন্ড দেয়ার মাত্র একটি ঘটনার রেকর্ড পাওয়া যায়। সেই বিচারের পেছনেও বড় ধরণের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ছিল। প্রাক-আধুনিক যুগের মুসলিম দুনিয়ায় মানুষের প্রাইভেসিকে উচ্চ মর্যাদা দেয়া হতো বলেই আইন থাকলেও এই ধরণের আইনের প্রয়োগ ছিল কম। হাদিস শাস্ত্রে দেখা যায় যে কারো ব্যক্তিগত দূর্বলতা বা পাপ যা সরাসরি অন্য কারো ক্ষতি করে না সেই বিষয়ে গোপনিয়তা রক্ষা করা মুসলমানদের গুনাবলি হিসাবে প্রচার করা হয়েছে। আরো দেখা যায় যে ধরণের পাপ বা অপরাধ প্রাইভেসির সীমা অতিক্রম করে না সেধরণের অপরাধের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত দোষ স্বীকারকে সর্বোচ্চ মানদন্ড ধরা হয়েছে, অপরের অভিযোগ নয়। ইসলামের ইতিহাসের ব্লাসফেমি বা এপোস্টেসির ক্ষেত্রেও প্রাইভেসি রক্ষার চর্চাই ছিল স্বাভাবিক ঘটনা।

অন্যদিকে সেকুলার ও আধুনিক চিন্তায় পাবলিক স্ফিয়ারের অবস্থান হলো উচুতে। যদিও লিবারাল গণতান্ত্রিক আইন ব্যক্তি মানুষের প্রাইভেসিকে একটি অধিকার বলে বিবেচনা করে, কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রগুলোর গত কয়েকশ বছরের ইতিহাস অনুযায়ি বিষয়টা এতো সরল সোজা নয়। শিক্ষা, ধর্ম ও পারিবারিক সম্পর্কের প্রশ্নে আধুনিক রাষ্ট্র মানুষের অন্দরমহলে প্রবেশ ও তার উপর খবরদারির অধিকার রাখে। ব্যক্তির নিজ সন্তানের উপর অধিকার নিয়ন্ত্রিত হয় সরকারি কল্লান ও উন্নয়ন সংস্থাগুলোর খবরদারির মাধ্যমে। আর একবিংশ শতকে তথ্য প্রযুক্তি ও সার্ভেইলেন্সের উন্নয়নের ফলে ব্যক্তির প্রাইভেসি এক ধরণের অস্তিত্ব সংকটের মধ্যে পরে গেছে। অন্যদিকে ইসলামি ঐতিহ্যে সামাজিকভাবে মানুষের স্বাধীনতা সীমিত হলেও ব্যক্তির অন্তর অথবা অন্দরমহলে সামাজিক খবরদারি বেআইনি মনে করা হতো। ইউরোপে পাবলিক স্ফিয়ারের আবির্ভাব আর তাতে জনগণের মুক্ত মতপ্রকাশ ও বিতর্ককে গণতন্ত্র চর্চার অন্যতম পূর্বশর্ত গন্য করা হয়। আধুনিক দুনিয়ায় নিজের মতামতকে ব্যক্তিগত না রেখে পাবলিক স্ফিয়ারে প্রচার করাকে শুধু অধিকারই নয়, সামাজিক দায়িত্ব হিসাবে গন্য করা হয়। বলা হয় যে জনসম্মখে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের এই চর্চাই গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার মূল ভিত্তি। ইউরোপে ফরাসি বিপ্লবের মধ্য দিয়ে প্রথম পাবলিক স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত অর্থাৎ পাবলিক স্পেসের সেকুলারাইজেশন সম্পন্ন হয়েছিল। বর্তমান দুনিয়ায় পাবলিক ক্রিটিসিজমের মাধ্যমে সত্য ও স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠাকে আধুনিকতার চিহ্ন ধরা হয়। হাজার বছর ধরে যে ক্যাথলিক চার্চ ব্লাসফেমি ও এপোস্টেসির অপরাধে মানুষকে শাস্তি দিয়ে এসেছে আধুনিক যুগে এসে সেই চার্চের পোপকেও বলতে শোনা যায় যে সত্যকে সবসময় জনসম্মখেই প্রচার করা উচিত, এমনকি কারো কারো কাছে তা ব্লাসফেমি মনে হলেও। জনগণের অনুভূতি আহত করে হলেও বৃহত স্বার্থে সত্য প্রচারের উপযোগবাদী (utilitarian) এই যুক্তি বিগত কয়েকশ বছর যাবৎ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জন তুলে ধরেছেন। এই ধরণের উপযোগবাদী যুক্তি বর্তমান বাংলাদেশে ধর্ম সমালোচক, নাস্তিক ও সেকুলারদের একাংশকে বহুল ব্যবহার করতে দেখা যায়। তাদের মতে তাদের সমালোচনা বা বাকা কথায় ধার্মিকরা আহতবোধ করলেও তারা আসলে ধার্মিকদেরকে অন্ধ বিশ্বাস, কুসংস্কার থেকে মুক্ত করতে অর্থাৎ তাদের সার্বিক কল্লান সাধনের জন্যেই এধরণের সমালোচনা করছেন। অর্থাৎ আহত হয়ে যে ক্ষতি তার চাইতে ‘ধর্ম সমালোচনার’ কল্লানকর উপযোগ অনেক বেশি। এইক্ষেত্রে উপযোগবাদী দার্শনিক জন স্টুয়ার্ট মিলের একটি বিখ্যাত উক্তি ‘সন্তুষ্ট বোকা হওয়ার চাইতে অসন্তুষ্ট সক্রেটিস হওয়া ভালো’ স্মরণ করা যায়। আধুনিক উপযোগবাদী দার্শনিকরা উচু ও অধিক মূল্যবান উপযোগ এবং নিচু ও সস্তা উপযোগের মধ্যে পার্থক্য করতেন। ফলে কারো মনে আঘাত দেয়াকেও একটি ‘নেসেসারি ইভিল’, এমনকি কোনক্ষেত্রে একটি ‘ভালো জিনিস’ গন্য করারও সুযোগ থাকে। এধরণের যুক্তিকে উড়িয়ে দিতে চাই না। আঘাত করা অথবা ধাক্কা দেয়া সমাজ পরিবর্তনের অংশ নয় ইতিহাস তা বলেও না। তবে উপযোগবাদী দৃষ্টিভঙ্গীর সমস্যা হলো যে এই ধরণের যুক্তি প্রয়োগ করে আবার ধর্ম সমালোচনা কিংবা ব্লাসফেমিকে বড় ধরনের ক্ষতিকর জিনিস হিসাবে বিবেচনা করারও সুযোগ থাকে। সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মিয় অনুভুতিকে বাড়তি গুরুত্ব দেয়ার পক্ষে যে যুক্তি তাও উপযোগবাদী। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মাবলম্বী হিসাবে মুসলমানদের ধর্মানুভুতিকে তথা মানসিক সুখকে পাবলিক স্পেসে অধিক গুরুত্ব দেয়ার ইসলামিস্ট দাবিকে ইউটিলিটারিয়ানিজম ছাড়া আর কি বলা যেতে পারে? তেমনি এই প্রবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভয়ে বাংলাদেশের সেকুলারদের একাংশ যে ‘গণতান্ত্রিক একনায়কত্বের’ নামে একটি একদলীয় শাসনকে নীতিগত বৈধতা জুগিয়েছেন, তার পেছনেও একটি উপযোগবাদী যুক্তিবোধ আছে। জন স্টুয়ার্ট মিল একদা সমাজের শিক্ষিত ও সভ্য শ্রেনীর সদস্যদের একের অধিক ভোটাধিকারের পক্ষে যুক্তি দিয়েছিলেন যাতে সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমজীবী শ্রেনীর সাথে তাদের ক্ষমতা সমান হয়। আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত হবে না যে উপযোগবাদ একসময় উপনিবেশের দার্শনিক ও নীতিগত বৈধতা জুগিয়েছে। ভারতের অসভ্যদের সার্বিক কল্লানের জন্যেই উপনিবেশের ‘নেসেসারি ইভিল’কে সমর্থন দেয়া হয়েছে। স্টুয়ার্ট মিলের পিতা জেমস মিলের স্বপ্ন ছিল ভারতবর্ষে এনলাইটেনমেন্ট পৌছে দেয়া। যেহেতু বাংলাদেশের ইসলামিস্টরাও ইদানিং মানবাধিকার, সংখ্যাগরিষ্ঠের অনুভুতি ইত্যাদি এনলাইটেনমেন্টের ভাষায় কথা বলে, ফলে তার স্বপ্ন কিছুটা হলেও পুরন হয়েছে ধরে নেয়া যায়। কিন্তু সমস্যা হলো যে এনলাইটেনমেন্টের পথ বড় দূর্গম। আঠারো শতকে এনলাইটেনমেন্ট সম্পন্ন হওয়ার দুইশ বছর পার করে এসে ইউরোপিয়রা দুটি বিশ্বযুদ্ধ বাধিয়ে দিয়েছিল। আর আঠারো শতকি এনলাইটেন্ডদের হাতে ইন্টারনেট থাকলে কি হতে পারতো তা কল্পনার উপরে ছেরে দেয়া যেতে পারে। কল্পনাটি আমাদের জন্যে সুখকর হবে না।

ছবিঃ জন স্টুয়ার্ট মিল

এই লেখায় যদি ধর্মীয় স্বাধীনতা ও বাক স্বাধীনতা প্রসঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান সংকটের কোন সমাধান কেউ আশা করে থাকেন তাহলে ভুল করবেন। এই লেখার উদ্দেশ্য যেমন তা না, তেমনি কোন সমাধান বা প্রেসক্রিপশনও আমার কাছে নাই। এই লেখার মূল উদ্দেশ্য ছিল কয়েকটা জিনিস পরিস্কার করা। প্রথমত, বাংলাদেশে এসংক্রান্ত সংকটের মূলে আমরা প্রধানত ইসলামকে খুঁজতে পছন্দ করলেও এসব সংকটের চরিত্র যে বহুলাংশেই আধুনিক সেই বিষয়টি সামনে আনা। ‘ধর্মীয় অনুভুতি’ ও তাতে ‘আঘাতের ধারণা’র সিলসিলা খোঁজার কারনও তাই। তালাল আসাদ দাবি করেছেন যে, প্রাচ্যের আপোস্টেসি ও ব্লাসফেমি সংক্রান্ত যেসব মামলা সারা দুনিয়ায় আলোচিত হয়েছে তার বেশিরভাগই অধুনা ঘটে যাওয়া ঘটনা এবং এসবের সাথে আধুনিক রাষ্ট্র ও আধুনিক বিচার ব্যবস্থার গঠন ও আধুনিক রাজনীতির উত্থানের গভির সম্পর্ক রয়েছে। এর সাথে উনবিংশ শতকের ইংল্যান্ডে ঘটে যাওয়া একের পর এক ব্লাসফেমি সংক্রান্ত মামলার তুলনা করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত যে বিষয়টিতে গুরুত্ব দিতে চেয়েছি তা হলো ইসলামি ঐতিহ্য আর সেকুলার আধুনিকতার মধ্যে পাবলিক ও প্রাইভেট সংক্রান্ত একটি তুলনামুলক আলোচনা। বাংলাদেশে এখন আমরা যে সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি তাতে পাবলিক ও প্রাইভেটের পার্থক্য এবং দুই জায়গাতেই ‘স্বাধীনতার সীমা’ সংক্রান্ত বোঝাপড়া করা সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে। আমাদের বাংলাদেশী মানুষদের পক্ষে এই কাজটা করতে গেলে আধুনিকতা এবং ইসলাম এই দুইয়েরই পাবলিক ও প্রাইভেট সংক্রান্ত ঐতিহাসিক বোঝাপড়াগুলো পাঠ করা ছাড়া কোন উপায় নাই, কারন এই দুইয়ের একটাকেও এড়িয়ে গিয়ে সংকট মোকাবেলার কোন বাস্তবতা নাই। পাশাপাশি কেউ যদি মনে করেন যে আমি ধর্মীয় সমালোচনা সীমাবদ্ধ করতে চাচ্ছি তাহলেও বিরাট ভুল করবেন। কারন বাস্তবতা হলো যে, স্বাধীনতা এমনিতেই সীমাবদ্ধ, এই সীমা টানায় আমার কোন হাত নাই। আমি কেবল সীমা বুঝার চেষ্টা করাতে জোর দিচ্ছি মাত্র। আমাদের ভুলে গেল চলবে না যে, এনলাইটেনমেন্টের প্রধান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্টের কাছে ‘সমালোচনা’ (critique) ছিল যুক্তির প্রতিষ্ঠিত সীমা আর ‘ব্যক্তিগত বিশ্বাস’ (private faith) এবং সামাজিক যুক্তি(public reason)র মধ্যকার নির্ধারিত সীমা বিবেচনা করে জ্ঞানতাত্ত্বিক আত্মসংশোধনের একটি প্রক্রিয়া।

আমরা এমন এক সময়ে বসবাস করছি, যখন আমাদের সেকুলারদের যেমন প্রায়ই ধর্মের ভাষায় কথা বলতে দেখা যায়, তেমনি ইসলামিস্টরা নিয়মিতই আধুনিকতার ভাষায় কথা বলেন। হেফাজতে ইসলামের আধুনিকতা বিষয়ে এই লেখায় কিছুটা আলোচনা করেছি। তবে সম্প্রতি ৫ ও ৬ মে’র দুই বছর পার হয়ে যাওয়ার পরে একটা বিষয় পরিস্কার হয়েছে যে ‘ধর্মানুভুতিতে আঘাত’ তাদের কাছে মতিঝিলে তাদের কর্মীদের উপর ‘শারীরিক আঘাতের’ চাইতে বড় আঘাত। ফলে তারা এখন তাদের কর্মীদের উপর গুলি চালানো সরকারের উন্নয়ন তত্ত্বের ভাষায় কথা বলেন কিন্তু তাদের অনুভুতিতে আঘাত করা নাস্তিকদের সাথে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। একদিকে তারা জিডিপির অগ্রগতিকে উন্নয়ন বলে স্বীকৃতি দিচ্ছেন, যা শতভাগ উপযোগবাদী প্রবনতা। অন্যদিকে আবার পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত লড়াই জারি রাখার হুঙ্কার দিচ্ছেন, যেই ধরণের নেরেটিভ ঐতিহাসিকভাবে অতি প্রাচীন কালের।এই দুইয়ের মিলন কিভাবে একবিংশ শতকের বাঙলায় সম্ভব হলো সেই বিষয়ে এখনো অনেক গবেষনা ও আলোচনা বাকি রয়ে গেছে। তবে এই দুইয়ের মিলনে যে ম্যাকিয়াভেলিয়ান ইসলামি রাজনীতির জন্ম হয়েছে তাতে মানুষের জীবনের মূল্য কমে গেছে সবচাইতে বেশি, এখন সেই মানুষ নাস্তিকই হউক, বা হেফাজতের মিছিলে হাজির হওয়া মাদ্রাসার ছাত্র। আমি আশা রাখি যে, বাংলাদেশের সেকুলাররা অন্তত এই জায়গায় নিজেদেরকে ইসলামিস্টদের থেকে আলাদা করতে পারবেন। যদিও তারাও বিভিন্ন রকম ‘আবেগ’, ‘অনুভুতি’ ও ‘চেতনা’ দ্বারা তাড়িত হন, কিন্তু জনগণের সার্বিক কল্লান দূরে থাক, অন্তত নিজেদের কল্লানের স্বার্থেই ‘চেতনা’, ‘আদর্শ’ ইত্যাদির চাইতে মানুষের জীবনকে বেশি মূল্য দেয়াটা তাদের শেখা উচিত। পাশাপাশি ‘প্রাইভেট’ ও ‘পাবলিকে’র মধ্যে পার্থক্য করতে শেখাটাও এখন সময়ের দাবি। ইন্টারনেটওয়ালা এনলাইটেন্ড বাঙালিদের জন্যে এর কোন বিকল্প নাই।

Notes:
১ Patricia Crone.(2007).Islam and Religious Freedom. German Congress for Oriental Studies. Freiburg.p.6.
২ Sadakat Kadri (2012). Heaven on Earth: A Journey Through Shari’a Law from the Deserts of Ancient Arabia. Macmillan.p.217.
৩ Talal Asad.(2008).Reflections on Blasphemy and Secular Criticism. In Religion: Beyond a Concept, Hent de Vries, editor, Fordham University Press.p.17.
৪ Ibid.pp.37-40.
৫ ANTHONY FISHER and HAYDEN RAMSAY.(2000). OF ART AND BLASPHEMY. Ethical Theory and Moral Practice, Vol. 3, No. 2.Springer. p. 137.
৬ Talal Asad.(2008).Reflections on Blasphemy and Secular Criticism. In Religion: Beyond a Concept, Hent de Vries, editor, Fordham University Press.p9.
৭ Talal Asad.(2008).Reflections on Blasphemy and Secular Criticism. In Religion: Beyond a Concept, Hent de Vries, editor, Fordham University Press.p.19.
৮ Ibid.p.36.

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “ধর্মীয় স্বাধীনতাঃ ইসলাম ও আধুনিকতার ‘পাবলিক-প্রাইভেটে’র তুলনামূলক আলোচনা (শেষ পর্ব)

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 2 = 4