আদিবাসী বিতর্কঃ রাষ্ট্রীয় মানচিত্রের আদি নিবাসীরাই কি আদিবাসী ?

আদিবাসীদের নিয়ে বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী বাঙ্গালিরা যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি তুলে থাকেন সেটা হোল , ক্ষুদ্র-নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীগুলো যদি আদিবাসী হয় , তাহলে বাঙ্গালিরা কি ?
আদিবাসী বা ‘Indigenous people’ বলতে আসলে কি বোঝায় ?

‘Indigenous’ শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ ব্যাখ্যা করলে দাঁড়ায়ঃ- ‘কোন নির্দিষ্ট অঞ্চলে ঐতিহ্যগতভাবে বংশপরম্পরায় নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি,জীবনাচরণ নিয়ে বসবাসরত প্রারম্ভিক জাতি’ ।যার বাংলা পরিভাষা আদিবাসী।
তবে বিংশ শতকের শেষভাগে আন্তর্জাতিকভাবে প্রণীত আইনানুসারেঃ- উপনিবেশায়ন(colonization) আক্রান্ত স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী এসব প্রাচীন জাতিকে ‘আদিবাসী’ জনগোষ্ঠী বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। ‘Indigenous people in international law’ গ্রন্থে লেখক জেমস আনয়া আদিবাসী জনগোষ্ঠীদের ব্যাপারে এভাবে বলেছেনঃ-“…বর্তমানে অন্যদের প্রভাবাক্রান্ত কোন অঞ্চলের বহিরাক্রমণ-পূর্ববর্তী অধিবাসীদের জীবিত বংশধর ।সাংস্কৃতিকভাবে পৃথক এই জনগোষ্ঠী নিজেদেরকে দখলদারী এবং অনুপ্রবেশকারীদের দ্বারা আগ্রাসনের স্বীকার বলে মনে করে”।
এছাড়া বিভিন্ন রাষ্ট্র এবং জাতিসংঘসহ নানা আন্তর্জাতিক সংস্থা নানাভাবে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংজ্ঞা দিয়েছে।এসব সংজ্ঞা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক থাকলেও ‘আদিবাসী জনগোষ্ঠীর’ বৈশিষ্ট্য হিসেবে আমরা কয়েকটি বিষয় চিহ্নিত করতে পারিঃ-
 কোন দেশের বৃহত্তর এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রভাবশালী সংস্কৃতির জনগোষ্ঠীর তুলনায় তাদের জনসংখ্যা কম হতে পারে। অনেকক্ষেত্রে জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বা অর্ধেক হলেও তারা রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রভাবশালী নয় ।
 আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর অবশ্যই ‘স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ থাকবে যেগুলো এখনো তারা পালন করে থাকে।
 তাদের জীবনাচরণ ঐচ্ছিকভাবে উপনিবেশায়ন প্রভাবিত নয় বরং নিজস্ব আদিমধারায় বহমান (যা হয়তো বর্তমানে হুমকির স্বীকার) ।
 তাদের নিজস্ব অঞ্চলে (মূলত নগরায়ন-পূর্ব প্রান্তিক অঞ্চল) তারা ‘গোষ্ঠীবদ্ধভাবে’ বসবাস করে থাকে।
 তারা নিজেরা নিজেদেরকে ‘আদিবাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করে।অর্থাৎ তারা বলপ্রয়োগের দ্বারা আত্তীকরণে(assimilation) অনাগ্রহী।

এবার সরাসরি বাংলাদেশের আদিবাসী প্রসঙ্গে আসি। শব্দগতভাবে আদি-বাসী শব্দটির সরল অর্থ(আদি থেকে বাস যাদের) বের করে যারা বাংলাদেশের অবাঙ্গালি নৃতাত্ত্বিকগোষ্ঠীদেরকে আদিবাসী মানতে নারাজ তারা উপরের বৈশিষ্ট্যগুলো একটু লক্ষ্য করুন। যারা মানচিত্রগতভাবে পুরো বাংলাদেশকেই বাঙালিদের ‘অধিকার বা অধিনস্ত’ বলে মনে করেন , তারা নিজেদের চরিত্রের সাথে কি উপরের সেই প্রভাবশালী বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কোন মিল পাচ্ছেন ? নাকি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নিয়ে এবং কলোনাইজেশনের হ্যাংওভারে ঝুলে তথাকথিত সিভিলাইজেশনের দিকে দৌড়াতে দৌড়াতেও নিজেদেরকে ‘বাঙালি আদিবাসী’ বলে দাবি করতে যাচ্ছেন ?

বাংলাদেশে পাহাড়ে এবং সমতলে যে বর্ণাঢ্য অবাঙ্গালি জাতিগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে , তাদের কেউ কেউ ইউরোপিয়ান উপনিবেশায়নের অনেক আগে থেকেই বা পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন এলাকা থেকে বিতারিত হয়ে বর্তমান বাংলাদেশের মানচিত্রের অধীনস্ত বিশেষ অঞ্চলে নিজস্ব সাংস্কৃতিক ধারা বজায় রেখে গোষ্ঠীবদ্ধভাবে বসবাস করছে । তারা কোন বাঙালি অধ্যুষিত এলাকা দখল করে নিজেদের গোড়াপত্তন করে নি । আবার বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ড থেকেও আসে নি ।তারা যে প্রান্তিক অঞ্চলগুলোতে বসবাস করছে সেখানে বাঙ্গালিরা নয় বরং তারাই নেটিভ। অনেক বাঙালি নৃতাত্ত্বিকও এরকম প্রশ্ন তুলে থাকেন যে যেহেতু আমেরিকান ইণ্ডিজেনাস বলতে প্রি-কলাম্বাস যুগ থেকেই আমেরিকার ভূখণ্ডে বসবাসরত জনগোষ্ঠীকেই বোঝায়।তাহলে বাংলাদেশের কোন একটি জনমানবশূন্য এলাকায় এখন নতুন করে যদি কেউ বসতি গড়ে তোলে তাহলে তাদেরকে সে এলাকার আদিবাসী বলা যায় কিনা ? এক্ষেত্রে উল্লেখ করা যেতে পারে , সিভিল ওয়ারের সময় মায়া আদিবাসীরা যখন নিজেদের দেশ গুয়াতমালা থেকে নর্থ আমেরিকায় পালিয়ে এসেছে তখন কি তারা আর আদিবাসী ছিল না ?একারনে আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে অভ্যন্তরীণ, আন্তর্জাতিক এবং সীমান্তব্যাপী বর্ধিত …এসব ভাগে ভাগ করা হয়।তাই ‘আদিবাসী’ কেবল নির্দিষ্ট মানচিত্রগত নয় বরং একটি বৈশ্বিক বিষয়।

কলোনাইজেশন, ইম্পেয়ারিলিজম এবং তথাকথিত সিভিলাইজেশনের প্রতাপে বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির আদিবাসী জনগোষ্ঠী এবং তাদের স্বতন্ত্র সংস্কৃতি ক্রমশঃই সঙ্কটাপন্ন হয়ে পড়ছে । রাষ্ট্রেরই উচিত আদিবাসী জনগোষ্ঠীদের নিজেদের মত বিকশিত হবার সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা , তাদের নিজস্ব ভূমি সংরক্ষণ এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার নিশ্চিত করা ।অথচ আদিবাসী জনগোষ্ঠী যখন নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের মানচিত্রের আওতাভুক্ত হয়ে পড়ে তখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকা প্রভাবশালী জনগোষ্ঠী তাদেরকে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন রাখার জন্য সেসব এলাকায় পরিকল্পিতভাবে নিজেদের সেটলারের অনুপ্রবেশ ঘটানো, আদিবাসীদের উচ্ছেদ ,একীভূতকরণ, শোষণ, প্রান্তিকীকরণ কিংবা হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে থাকে।পৃথিবীর অনেক দেশেই আদিবাসীদের অধিকার স্বীকৃতি পেলেও বাংলাদেশ তাদের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করে আসছে।’পার্বত্য শান্তি-চুক্তি’-র বাগাড়ম্বর থাকলেও সাংবিধানিক পরিচয়ে তারা আদিবাসীই নয়। এরকম বর্ণাঢ্য সংস্কৃতির এতগুলো আদিবাসীগোষ্ঠী থাকা সত্ত্বেও কোন রাষ্ট্র কতটা নির্লজ্জ্ব হলে তাদের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করতে পারে !

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৬ thoughts on “আদিবাসী বিতর্কঃ রাষ্ট্রীয় মানচিত্রের আদি নিবাসীরাই কি আদিবাসী ?

    1. খেয়াল করে পড়ুন, ‘আদিবাসী’
      খেয়াল করে পড়ুন, ‘আদিবাসী’ জনগোষ্ঠীর যে কয়েকটি বৈশিষ্ট্য লেখাটিতে চিহ্নিত করা হয়েছে । সেসব কি বাঙালিদের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ?

    1. আসল পরিচয়য়ের কথা বলছেন ?
      আসল পরিচয়য়ের কথা বলছেন ? রাষ্ট্রের নাম আর মানচিত্র তো হাজার বছরে হাজার বার বদলায়।কিন্তু জাতিগত পরিচয় তো আর বদলায় না। তাই আমরা যেমন আগে বাঙালি তারপর বাংলাদেশি , তেমনি আদিবাসীরাও বাংলাদেশি হবার আগে তাদের নিজস্ব জাতির (যেমনঃ ওঁরাও,সাঁওতাল , মারমা , চাকমা … ইত্যাদি)

  1. তাই ‘আদিবাসী’ কেবল নির্দিষ্ট

    তাই ‘আদিবাসী’ কেবল নির্দিষ্ট মানচিত্রগত নয় বরং একটি বৈশ্বিক বিষয়। – See more at: https://istishon.blog/?q=node/21917#sthash.Q7iG4N1B.dpuf

    এই কথাটা আদিবাসী বিষয়টা নিয়ে অন্যভাবে ভাবতে বাধ্য করলো। এতকাল বিষয়টাকে ঠিক এভাবে দেখিনি, বিষয়টাই ভাসাভাসা গোছের ছিল। ভালো লিখেছেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

98 − = 92