**** রক্তাক্ত ১৫ই আগস্ট, ১৯৭৫এর পথে – পর্ব – ৩ ****

?w=640&h=361″ width=”600″ />
তবে শেষ পর্যন্ত তাজউদ্দীন আহমেদ যা বললেন তা অনেকটা আলৌকিক শক্তিসম্পন্ন কোন মানুষের মত পরবর্তীতে সত্য বলে প্রমানিত হবে। তিনি বললেন,

– “ আপনি এই পথ বেছে নেবার কারনে আপনি শান্তিপূর্নভাবে আপনাকে ক্ষমতা থেকে সরাবার সব পথ বন্ধ করে দিলেন। আমি আমার সারাজীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই আপনাকে এটা বলছি। যদি কেউ আপনাকে ক্ষমতা থেকে সরাতে চায় তাহলে আপনি তাদের সামনে কোন ধরনের গনতান্ত্রিক পথ খোলা রাখছেন না। একটামাত্র পথই আপনার বিরোধীদের সামনে উন্মুক্ত থাকবে, আর সেটা হচ্ছে বন্দুকের নল।“

অপরপ্রান্তে বঙ্গবন্ধুও খুব উত্তেজিত ছিলেন তা ফোনের রিভিভারে ভেসে আসা অস্পষ্ট কন্ঠস্বর থেকেই বোঝা যাচ্ছিলো। যার উত্তরে তাজউদ্দীন আহমেদ অনেকটা অনুনয়ের সুরেই বললেন,

– “কিন্তু মুজিব ভাই, আপনি কি জানেন সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের ব্যাপার কি হবে? বন্দুকের নল কেবল আপনাকেই খুঁজে নেবেনা, আমাদেরও খুঁজে নেবে। যদিও আমরাও আপনাকে এই পথ বেছে না নিতে হাতজোড় করছি, আর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হবে এই দেশ।“

?w=640&h=361″ width=”600″ />
পর্ব – ২ এখানে
৯ ফেব্রুয়ারী, ১৯৭৪
ঢাকা, বাংলাদেশ

জাতীয় সংসদে বিশেষ ক্ষমতা আইন পাস হয়েছে আজ। এই আইনের ২ এবং ৩ নম্বর ধারার আওতায় সরকার যেকোন ব্যক্তিকে কোন ধরনের কারন প্রদর্শন ছাড়াই প্রয়োজন বোধ করলে কিংবা বেআইনী কাজ থেকে বিরত রাখবার জন্য আটক করবার ক্ষমতা অর্জন করলো।

আইন বহির্ভুত কিংবা বে-আইনী কাজ বলতে বোঝানো হলোঃ

– বাংলাদেশের স্বার্বভৌমত্ব কিংবা নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর যেকোন কাজ।
– কোন বিদেশী রাষ্ট্রের সাথে বন্ধুত্বপূর্ন সম্পর্ক নষ্ট করবে এমন কোন কাজ।
– বাংলাদেশের নিরাপত্তা কিংবা জনগনের নিরাপত্তা কিংবা আইনশৃংখলা রক্ষার জন্য ক্ষতিকর হবে এওন কোন কাজ।
– ভিন্ন ভিন্ন সম্প্রদায়, গোষ্ঠী অথবা জনগনের কোন অংশের প্রতি উস্কানীমুলক অনুভুতির সৃষ্টি করে এমন কর্মকান্ড।
– আইন শৃংখলা পরিপন্থী যেকোন কাজ যা প্রশাশনের কাজকর্মে বাঁধা সৃষ্টি করবে।
– জনগনের স্বার্থে কিংবা সেবায় নিয়োজিত কোন কর্মকান্ডে বাঁধার সৃষ্টি করলে।
– জনগন কিংবা জনগনের কোন অংশের মনে ভীতি কিংবা আতংকের উদ্রেক ঘটাতে পারে এমন কাজ।
– দেশের আর্থিক কিংবা অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে বাঁধা সৃষ্টি করে এমন কোন কাজ।

এই আইনের অধীনে কোন ব্যক্তিকে অনির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আটক রাখতে পারবে সরকার। আটক ব্যক্তিদের একমাত্র ভরসার ব্যাপার এটাই যে এই আটক পুনঃবিবেচনা করা যাবে। প্রাথমিকভাবে সেটাও ১২০ দিন পর এবং এরপর থেকে ৬ মাস অন্তর অন্তর সরকারের নিয়োগকৃত উপদেষ্টা পরিষদের মাধ্যমে যাদের দুইজন হবেন হাইকোর্টের বিচারপতি এবং আরেকজন উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মকর্তা। এই বোর্ডের সামনে উপস্থাপন করা কর্মবিবরনী গোপনীয় এবং আটককৃত ব্যক্তির কোন অধিকার থাকলোনা কোন আইনজীবি দিয়ে পরিচালিত হবার অথবা সাক্ষ্যপ্রমান সম্পর্কে প্রশ্ন করবার। আইনী সাহায্য লাভের এমন বিধিনিষেধের কারনে আটককৃত ব্যক্তির একমাত্র আশা ছিলো হয় সরকার এই আদেশ প্রত্যাহার করে নেবে কিংবা এডভাইজারী বোর্ড নিজের উদ্যোগে কোন ধরনের প্রমান না থাকবার কারনে আটকাদেশ প্রত্যাহার করে নেবে।

এই বিশেষ ক্ষমতা আইনের উদ্দেশ্য ছিলো কিছু মারাত্মক অপরাধের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা। যদিও তা ব্যবহার করা হতে লাগলো বিরোধিদের দমনের কাজেই। এবং মজার ব্যাপার হচ্ছে এই আইন আজ পর্যন্ত বহাল তবিয়তেই আছে। প্রতিটা সরকারই নির্বাচনের পূর্বে প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেছে এই আইন পরিবর্তন করবে কিন্তু কেউ করেনি। বরং জরুরী ক্ষমতা আইন, ২০০৭, সেকশন ২১ এর আওতায় বিশেষ পরিস্থিতিতে নিবৃতকরনের জন্য আটকের মেয়াদ আরো বাড়ানো হয়।

এরপর থেকে এই দেশের ইতিহাসের একটা অংশ হবে এই আইন অপব্যবহারের ইতিহাস। যারা এই আইন প্রয়োগ করবে তাদের এই আইনের ৩৪ নং ধারা দিয়ে সুরক্ষার ব্যবস্থাও আছে, যাতে বলা আছে,

“কোন ধরনের অভিযোগ, বিচার প্রক্রিয়া কিংবা অন্য কোন ধরনের আইনী প্রক্রিয়া থেকে সরকার এবং এর কোন কর্মচারী মুক্ত থাকবে যদি তা এই আইনের অধীনে সরল বিশ্বাসে করা হয় কিংবা করবার চেষ্টা করা হয়।“

কারনটা জানা নেই, কিন্তু আমাদের দেশের কোন দলই কেন জানি ক্ষমতায় গেলে জনগনের স্বার্থের চেয়ে দলীয় সুফল আর বিরোধীদের দমনে রাখবার চিন্তা বেশি করে গেছে। এই আইনের বহাল তবিয়তে থাকা তার একটি আদর্শ উদাহরন হয়ে রইবে।

৬ মে , ১৯৭৪
ঢাকা, বাংলাদেশ

শেখ মুজিবুর রহমান আজকে রক্ষী বাহিনী অর্ডারের সংশোধনী জারী করেছেন। এর কিছুদিন আগে ১৭ বছরের এক তরুনকে রক্ষী বাহিনী ধরে নিয়ে যাবার পর থেকে সে নিখোজ ছিলো। পরিবার থেকে দাবী করা হয়েছে তাঁকে চারদিন ধরে নির্যাতনের পর সে মারা গেলে তাঁকে গুম করে ফেলা হয়েছে। সেই তরুনের পরিবার বেশ প্রভাবশালী, এটা নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠলে সুপ্রীম কোর্ট স্বতঃপ্রনোদিত হয়ে এর কারন জানতে চায় এবং এই বলে সমালোচনা করলো যে জাতীয় রক্ষী বাহিনী আইন বহির্ভুত কাজ করছে এবং কোন ধরনের বিধি বিধানদ্বারা তাদের কর্মপদ্ধতি নির্ধারিত নয়। তবে সকলকে অবাক করে দিয়েই শেখ মুজিব সুপ্রীম কোর্টের রক্ষী বাহিনীর ব্যাপারে নাক গলাবার পথও রুদ্ধ করে দিলেন। এর মাধ্যমে এ বাহিনীর সদস্যরা যেকোন ধরনের বিচার এবং আইনী বাধ্যবাধকতার বাইরে চলে গেলো।

এই সংশোধনীতে ছিলোঃ

“Article-2,
“8A. Notwithstanding anything contained in, the Code of Criminal Procedure, 1898 (V of 1898), or in any other law for the time being in force, any officers may, while performing any function under article 8, without warrant –
a) Arrest any person whom he reasonably suspects of having committed a cognizable fence under any law;
b) Search any person, place, vehicle or vessel, and seize anything found in the possession of such person or in such place, vehicle or vessel in respect of which or any means of which he has reason to believe an offence punishable under any law has been committed.”
Article 3,
“No suit, prosecution, or other legal proceedings shall be against any member of the Bahini for anything which is in good faith done or intended to be done in pursuance of this order or rule made there under.”

এর মাধ্যমে রক্ষী বাহিনী যে কাউকে ইচ্ছামাফিক গ্রেফতার করবার ক্ষমতা লাভ করে এবং তাদের সকল বিচারিক পদক্ষেপ থেকে মুক্ত করে দেয়া হয় যতক্ষন পর্যন্ত তাদের সব কার্যক্রম ‘সরল বিশ্বাসে’ পরিচালিত হচ্ছে। রক্ষী বাহিনী এর মাধ্যমে আরো বেপরোয়া হয়ে কার্যক্রম পরিচালনার সাহস পায়। তাদের পেছনে আছেন স্বয়ং সরকার প্রধান, যিনি বিশ্বাস করেন রক্ষী বাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে কারো ক্ষতি করতে পারেনা। তারা তো তাঁর আদর্শেই দীক্ষিত।

মে মাস, ১৯৭৪
ঢাকা, বাংলাদেশ

শেখ মুজিবুর রহমানের মন্ত্রীসভায় জেঃ ওসমানীর অস্বস্তিকর অবস্থানের অবসান ঘটেছে। তিনি এই মাসে তাঁকে সকল পদ থেকে অব্যাহতি দেবার জন্য আবেদন জানালেন। জানুয়ারী মাসের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েম করবার তিনি বিরোধী ছিলেন। বাকশাল ধারনারও প্রকাশ্যে প্রতিবাদ জানান তিনি, তারই ফল এই পদত্যাগ। তিনি কেবল মন্ত্রীত্ব থেকেই পদত্যাগ করলেন না, সংসদ থেকেও পদত্যাগ করলেন এবং আওয়ামী লীগের প্রাথমিক সদস্যপদ ফিরিয়ে দিলেন। তার পথ ধরে একই সাথে পদত্যাগ করলেন ব্যারিষ্টার মইনুল ইসলাম।

তার এই পদত্যাগ সারা দেশের আলোচনার বিষয় হয়ে গেলো। জনতা কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলো না যে জেঃ ওসমানীর মত লোকও বঙ্গবন্ধুর সাথে দুরত্ব তৈরী করেছেন। তবে সবচেয়ে বড় চমকটা তখনো অপেক্ষা করছিলো।

সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী ১৯৭৫ সালের ২৫শে জানুয়ারী পাস হয়। বেশ বড় ধরনের কিছু পরিবর্তন এই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে নিয়ে আসা হয়। সেগুলো হলোঃ

-প্রেসিডেন্সিয়াল পদ্ধতির সরকার গৃহিত হয় পার্লামেন্টারী পদ্ধতির সরকারের বদলে।
-বহুদলীয় ব্যবস্থার বদলে একদলীয় ব্যবস্থা চালু করা হয়।
– জাতীয় সংসদের ক্ষমতা খর্ব করা হয়। প্রেসিডেন্টের হাতে তুলে দেয়া হয় প্রায় সর্বময় ক্ষমতা।
– প্রথম জাতীয় সংসদের মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়।
– বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অনেকটাই কেড়ে নেয়া হয়।
– জনগনের মৌলিক অধিকারগুলো সুরক্ষা এবং নিশ্চিতকরনের মত ব্যাপারগুলোকে সুপ্রীম কোর্টের এখতিয়ারের বাইরে নিয়ে আসা হয়।

১৯৭৪ সাল (মধ্যবর্তী সময়)
ঢাকা, বাংলাদেশ

বেশ কয়মাস আগে মেজর শাহরিয়ার সেনাবাহিনীর চাকরী থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়েছেন। এখন তিনি পুরোনো ফ্রিজ টিভি বিক্রির ব্যবসা করেন। মেজর ডালিম পুর্ব পরিচয়ের সুত্রে তার অফিসে এসেছেন। তিনি মেজর শাহরিয়ারকে বললেন তার মত মুক্তিযোদ্ধারা কোন ধরনের ন্যায়বিচার পাচ্ছেনা, যার কারনে তাদের টিকে থাকাই মুস্কিল হয়ে পরেছে। রাস্তায় মরে পরে থাকলেও তাদের দেখবার কেউ নেই। তিনি মেজর শাহরিয়ারকে আরো বললেন,

– “একদিকে সেখ মুজিবকে ব্রেইনওয়াশ করে রাখা হয়েছে, আরেকদিকে তাকে সারাক্ষন মানুষজন এমনভাবে ঘিরে থাকে যে তিনি সত্যটা জানবার সুযোগ পর্যন্ত পাননা। এই অবস্থার পরিবর্তন করতেই হবে।“

গত কয় বছরে সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্তকৃত কিংবা অবসরে চলে যাওয়া বেশ কিছু সেনা অফিসার এভাবেই নিজেদের মধ্যে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে একটা সংযোগ গড়ে ওঠে এবং বেশ কয়জন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা আর মাত্র এক বছরের মধ্যেই দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম সেনা অভ্যুত্থানে নিজেদের জড়িত করে ফেলবেন।

১৯৭৪ সাল (মধ্যবর্তী সময়)
বাংলাদেশ

এই বছরটাই শেখ মুজিব সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষার সময়। বাংলাদেশের জনগন শুধু অনাহারে প্রানই হারায়নি, জাতির সম্মানেও লেপে দেয় কলঙ্ক। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক অমর্ত্য সেনের মতে এই দুর্ভিক্ষের কারন ছিলো সরকারি নজরদারী ও ব্যবস্থাপনার অভাব এবং গনতন্ত্রের সঠিক চর্চা না থাকা। স্বাধীনতাই যেন দুর্ভগের আরেক কারন হয়ে দাড়ালো জনগনের জন্য। রাস্তায় বের হলেই দেখা যেতো অভুক্ত মানুষের দঙ্গল। সাধারনত স্বাধীনতার লাভের কোন জাতির সমৃদ্ধির পথে উত্তোরন ঘটে, নতুন উদ্যমে দেশ গঠনে ঝাপিয়ে পরে সবাই। কিন্তু বাংলাদেশের বেলায় ঘটলো উলটো ব্যাপার। পুরো দেশটাই যেন দুর্ভিক্ষের এই সময়ে ভিক্ষায় নেমে পরল কিংবা দুঃখের গান গাইতে শুরু করলো। অথবা ক্ষুধার তাড়নায় কি বলে যে চিৎকার করছিলো তারা নিজেরাও তা জানতোনা।

এক সাক্ষাতকারে শেখ মুজিব নিজেই স্বীকার করেন যে না খেয়ে ৫০০০০ মানুষ মারা গেছেন, কিন্তু প্রকৃত সংখ্যা ছিলো আরো অনেক অনেক বেশি। এর পেছনে প্রধানত দায়ী ছিলো সরকারী অব্যবস্থাপনা। দুর্ভিক্ষ মোকাবেলায় সরকারের প্রচেস্টা ছিলো দুর্বল এবং অকার্যকর। সরকারের কর্মচারিদের অবস্থাও এমন ছিলো যে তারা কারো দুঃখ কস্টে সম্ভবত আর গা লাগাচ্ছিলোনা। এর মধ্যেও চলে দলীয় ভুঁইফোঁড় নেতাকর্মী এবং অসাধু কর্মচারীদের লুটপাট। বৈদেশিক সাহায্য যাও আসছিলো তাও চলে যাচ্ছিলো কালোবাজারে, নাহলে বিতরনের মাঝ পথেই উধাও হয়ে যাচ্ছিলো অজানা গন্তব্যে। এরমধ্যে সরকারের জন্য সবচেয়ে বিব্রতকর অবস্থার জন্ম দেয় একটা ঘটনা। দুর্ভিক্ষ মোকাবেলায় সরকারের পদক্ষেপের অংশ হিসেবে প্রায় ৫০০০০ মানুষকে ঢাকায় একটা ক্যাম্পে এনে জড়ো করে প্রায় আটকে রাখা হয়। সেই ক্যাম্প কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা ছিলো। সেখানে ছিলনা কোন ধরনের চিকিৎসা কিংবা শৌচকার্য্যের ব্যবস্থা। বিদেশী সাংবাদিকদের একটা অংশ সেই ক্যাম্প পরিদর্শনে গেলে সেখানকার একজন প্রথমেই তাদের বলে,

– “হয় আমাদের খাবার দাও, নাহলে গুলি করে মেরে ফেলো।“

এমন অনেক ঘটনা আন্তর্জাতিক গনমাধ্যমেও ব্যাপকভাবে প্রচারিত হচ্ছে। মাওলানা ভাসানীর সাপ্তাহিক হক কথা এবং এমন কিছু পত্রিকা এই কথা জনগনকে প্রায় বিশ্বাস করিয়ে ফেলেছে যে, আওয়ামী লীগের সময় ভারতীয়রা যে পরিমান সম্পদ লুট করে নিয়ে গেছে তা ব্রিটিশরা ২০০ বছরের শাসনেও পারেনি। তবে বিরোধী রাজনৈতিক দল এটা বললো না যে স্বাধীনতার যুদ্ধের সময় ভারত কত সাহায্য করেছে। স্বাধীনতার পরপরই শতশত ব্রিজ কালভার্ট স্বল্প সময়ে মেরামত করে দিয়ে গেছে। কোন বিরোধী পক্ষ এটা বললো না যে ভারতীয় বাহিনী মাত্র তিনমাসের মধ্যেই নিজ দেশে ফেরত গিয়েছে। কারনটা ভারত ছিলো না, ছিলো আমাদের দেশেরই কিছু মানুষ, কিছু খারাপ মানুষ।

২২ শে সেপ্টেম্বর, ১৯৭৪
ঢাকা, বাংলাদেশ

শত শত অভুক্ত মানুষের মিছিল ঢাকার রাস্তায় রাস্তায়। কেউ নেই তাদের দিকে নজর দেবার। আজ বঙ্গবন্ধুর ৫৫তম জন্মদিন, এই দিন উদযাপন না করলেই নয়, হোক না সেটা এই আকালের সময়। দলের পক্ষ থে উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। নিয়ে আসা হয়েছে ৫৫ পাউন্ড ওজনের বিশাল বড় নৌকাকৃতির এক কেক। গনভবনে বঙ্গবন্ধু নিজে সেই কেক কাটলেন। তাঁকে ভালোবেসে তার কাছের মানুষগুলো এই কেক নিয়ে এসেছে, না কাটলেতো ওরা মনে কষ্ট পেতো। উনি আজীবন বুঝতে পারেননি যে এদের আসপাশ থেকেই নয়, দেশ থেকে বের করে দেয়া দরকার ছিলো। বঙ্গবন্ধু এদের খুব সুন্দর একটা নাম অবশ্য দিয়েছিলেন, ‘চাটার দল’!

এমন কাহিনী গোপন থাকেনি। সরকার বিরোধী প্রচারনা সঙ্গত কারনেই আরো জোরালো মাত্রা পাচ্ছিলো। বিরোধী পক্ষে থেকে হিসাব করে বুঝিয়ে দেয়া হচ্ছিলো যে ৫৫ পাউন্ড কেকের দামে কয় কেজি চাল পাওয়া যেতো। অবশ্য সেটাও বেশি হতো না। চালের কেজিও যে তখন ৮ টাকায় পৌছে গেছে, যেখানে জনগনের মাথাপিছু আয় ১০০ টাকাও না। সারাবিশ্বে তখন কি চালের এতোই অভাব ছিলো?

১৩ অক্টোবর, ১৯৭৪
ঢাকা, বাংলাদেশ

৩৭ দিনের বিদেশ সফর শেষে তাজউদ্দীন আহমেদ দেশে ফিরেছেন। কিছুদিন তিনি মুক্তি চেয়েছিলেন সবকিছু থেকে। সরকারের অংশ হয়েও তিনি সরকারের দুর্যোগ সামাল দেবার ব্যবস্থা এবং সরকারী পলিসির তীব্রভাষায় নিন্দা জানালেন। উনি বললেন,

– “এভাবে আর কত সবকিছু জেনেও অস্ট্রিচ পাখির মত বালিতে মুখ গুজে রাখবো।“

সরকারের ব্যর্থ অর্থনৈতিক নীতিমালার সমালোচনা করায় বেশ ভালোই সুযোগ পেলেন খন্দকার মোশতাক আহমেদ। তিনি বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার স্বামী ডঃ ওয়াজেদ মিয়াকে বললেন,

– “মন্ত্রীসভার সদস্য হয়ে উনার কোন অধিকার নেই সরকারের নীতিমালা নিয়ে মন্তব্য করবার। উনাকে বঙ্গবন্ধুর কেবিনেট থেকে পদত্যাগ করতে হবে। নাহলে উনাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হবে যদি উনি স্বেচ্ছায় তা না করেন।“

বঙ্গবন্ধুর কান এদিক সেদিক থেকে অনেকেই ভারী করে তুলছিলেন। সারাজীবন যে মানুষটা তাঁকে ছায়ার মত সঙ্গ দিয়ে গেছেন, তিনি তার কথা না শুনে শুনছিলেন চাটুকারদের কথা। এই চাটুকারদের বেশিরভাগই আবার বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর নতুন সরকারের মন্ত্রীসভায় স্থান পাবেন।

অক্টোবর (তৃতীয় সপ্তাহ), ১৯৭৪
ঢাকা, বাংলাদেশ

তাজউদ্দীন আহমেদের একটা স্বভাব হচ্ছে চিন্তিত থাকলে দুই হাতের আঙ্গুলের তর্জনী বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে স্পর্শ করা। উনি ঠিক তাই করছেন এখন। তার এই অবস্থা দেখে ব্যক্তিগত সহকারী আবু সায়িদ চৌধুরী বুঝতে পারলেন কিছু একটা চলছে উনার মনে। উনি কোন কথা না বলে চুপ থাকবারই সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু তাজউদ্দীন আহমেদ নিজেই মিনিট পাঁচেক পর মুখ খুললেন। উনি বললেন,

– “চৌধুরী সাহেব, আমার মনে হয় আমি ধৈর্য্যের শেষ সীমায় পৌছে গেছি। আমি এভাবে চলতে পারবো না। আমার পক্ষে এখন উনার সাথে চলা অসম্ভব। আওয়ামী লীগের বেশিরভাগ লোকেরই মনে হয় মানবিক বোধ লুপ্ত হয়ে গেছে। তারা যে পথ বেছে নিয়েছে, যেসব কাজ করছে, আমি সেগুলো আর মেনে নিতে পারছিনা।“

সায়িদ সাহেব নীরবতা বজায় রাখাকেই ভালো মনে করলেন। তাজউদ্দীন আহমেদ তাও বলে উঠলেন,

– “আপনি জানেননা ভেতরে কি চলছে। অসম্ভব! আমি এদের সাথে কাজ করতে পারবো না।“

উনি কিছুদিন আগেই বেশ কিছু দেশ ঘুরে এসেছেন। সেখানে প্রায় সব রাস্ট্রদুতদের মুখেই তার শুনতে হয়েছে যে,

– “স্যার, আমরা এসব আর সহ্য করতে পারছিনা। সংবাদপত্রগুলো আমাদের নিয়ে তামাশা করছে, শিরোনামে কেবলই বাংলাদেশ। ওরা প্রশ্ন করছে, কৌতুক করছে যেগুলো আমাদের পক্ষে মেনে নেয়া খুব কষ্টকর। “

তবে উনি আর কিই বা করতে পারতেন? উনার পক্ষে তেমন কিছু করাও সম্ভব হচ্ছিলো না, আবার মেনেও নিতে পারছিলেন না চারপাশের এত এত অসঙ্গতি।

২০ শে অক্টোবর, ১৯৭৪
ঢাকা, বাংলাদেশ
তাজউদ্দীন আহমেদ তার সহকারী কর্মকর্তা আবু সায়ীদ চৌধুরীকে ডেকে বললেন,

– “চৌধুরী সাহেব, আমি আপনার সামনে আজ কিছু কথা বলবো এবং আপনি এই ঘটনার একমাত্র সাক্ষী হবেন।“

সায়ীদ সাহেব অবাক হলেন, উনি জিজ্ঞেস করলেন,

– “স্যার, আমাকে সাক্ষী বানিয়ে কি লাভ হবে? আমি সামান্য একজন সরকারী কর্মচারী। আপনি যদি এখান থেকে চলে যান তবে আমাকে পরদিনই অন্য জায়গায় চলে যেতে হবে। আপনি আপনার রাজনৈতিক অঙ্গনের কোন বন্ধুকে ডাকুন।“

তাজউদ্দীন আহমেদ বললেন,

– “না, আপনাকেই শুনতে হবে।“

এরপর তিনি তার পাশে থাকা লাল ফোনটা (প্রেসিডেন্টের সাথে যোগাযোগের সরাসরি নাম্বার, রঙ লাল নয়) তুলে নিলেন এবং কথা বলা শুরু করলেন,

– “মুজিব ভাই, আমার মনে হয় আপনার সাথে কিছু জরুরী ব্যাপারে কথা বলা দরকার। আপনার অফিসে আমি কথা বলার তেমন কোন সুযোগই পাইনা যেহেতু আপনাকে সবসময় আপনার লোকেরা ঘিরে রাখে। মন খুলে কথা বলবার কোন উপায় নেই সেখানে। তাই আমি লাল ফোনের সাহায্য নিলাম আমার কিছু চিন্তা আপনার কাছে প্রকাশ করতে। আপনি একটা একদলীয় ব্যবস্থা কায়েম করতে চাইছেন আর আমি তার বিরুদ্ধেই কথা বলতে চাইছি। আজকে আমি আপনাকে আমার চূড়ান্ত মতামত জানাবো। আমি আপনার এই একদলীয় পথের ব্যাপারে সম্মত নই।“

অপর পাশ থেকে কিছু বলা হচ্ছিলো দেখে তাজউদ্দীন আহমেদ কিছুটা বিরতি নিলেন। এরপর আবার বললেন,

– “প্রথমত, আমি আপনার যুক্তিতে সন্তুষ্ট হতে পারিনি। দ্বিতীয়ত, এটা কোন প্রশ্ন না, বক্তব্য। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আপনার অনেক ক্ষমতা আছে যে কারনে আমার মনে হয় না আপনার আরো ক্ষমতার দরকার আছে একদলীয় কিংবা অন্য কোন ব্যবস্থা তৈরী করে। তাই আপনি যেসব যুক্তি দিচ্ছেন সেগুলো আমার কাছে যথেষ্ঠই ফাঁকা মনে হচ্ছে। তৃতীয়ত, স্বাধীনতার আগে ২৪-২৫ বছর ধরে এমন কোন জায়গা নেই যা আমি আর আপনি মিলে একসাথে কাজ করিনি। যখনই আমরা মানুষের সাথে কথা বলেছি, তখনই আমরা একটা সমৃদ্ধিশালী দেশের আশা দেখিয়েছি যার ভিত্তি হবে গনতন্ত্র। এই গনতন্ত্রের জন্যই আমরা আজীবন সংগ্রাম করেছি। আর এই গনতন্ত্র আপনার কলমের একটামাত্র খোঁচায় মুছে যেতে বসেছে এই একদলীয় সরকার ব্যবস্থার ধারনার কারনে। আমি আপনার এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করছি।“

এরপর উনারা আরো কিছু কথা বললেন। তবে শেষ পর্যন্ত তাজউদ্দীন আহমেদ যা বললেন তা অনেকটা আলৌকিক শক্তিসম্পন্ন কোন মানুষের মত পরবর্তীতে সত্য বলে প্রমানিত হবে। তিনি বললেন,

– “ আপনি এই পথ বেছে নেবার কারনে আপনি শান্তিপূর্নভাবে আপনাকে ক্ষমতা থেকে সরাবার সব পথ বন্ধ করে দিলেন। আমি আমার সারাজীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই আপনাকে এটা বলছি। যদি কেউ আপনাকে ক্ষমতা থেকে সরাতে চায় তাহলে আপনি তাদের সামনে কোন ধরনের গনতান্ত্রিক পথ খোলা রাখছেন না। একটামাত্র পথই আপনার বিরোধীদের সামনে উন্মুক্ত থাকবে, আর সেটা হচ্ছে বন্দুকের নল।“

অপরপ্রান্তে বঙ্গবন্ধুও খুব উত্তেজিত ছিলেন তা ফোনের রিভিভারে ভেসে আসা অস্পষ্ট কন্ঠস্বর থেকেই বোঝা যাচ্ছিলো। যার উত্তরে তাজউদ্দীন আহমেদ অনেকটা অনুনয়ের সুরেই বললেন,

– “কিন্তু মুজিব ভাই, আপনি কি জানেন সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের ব্যাপার কি হবে? বন্দুকের নল কেবল আপনাকেই খুঁজে নেবেনা, আমাদেরও খুঁজে নেবে। যদিও আমরাও আপনাকে এই পথ বেছে না নিতে হাতজোড় করছি, আর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হবে এই দেশ।“

এই আলাপচারিতার কিছুদিন পর সাইদ সাহেব তাজউদ্দীন আহমেদকে জিজ্ঞেস করবেন,

– “স্যার, যদি পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয় যে আপনি আর এসব সহ্য করতে পারছেন না, তবে আপনি কেন সরাসরি বঙ্গবন্ধুর কাছে গিয়ে তাঁকে বলছেন না যে আপনি আপনার এই পদে আর থাকতে ইচ্ছুক নন?“

তাজউদ্দীন আহমেদ একটু ভারাক্রান্ত কন্ঠেই উচ্চারন করলেন,

– “চৌধুরী সাহেব, মুজিব ভাইকে এই কথা বলতে আমার কিছু সমস্যা আছে।“

সাইদ সাহেব জিজ্ঞেস করলেন,

– “কি সেই সমস্যা স্যার, আমাকে বলবেন?”

তাজউদ্দীন আহমেদ জবাব দিলেন,

– স্বাধীনতার আগে আমরা লম্বা সময় একসাথে ছিলাম। হয় উনি আমার পাশে ছিলেন নাহলে আমি উনার পাশে ছিলাম। কেবলমাত্র জেলে গেলেই আমরা আলাদা থাকতাম। আমাদের সম্পর্কটা আসলে অনেক গভীর আর সেটা একধরনের আনুগত্যের মত তৈরী করেছে যা আমি আপনাকে বুঝিয়ে বলতে পারবো না। এখন উনি যদি আমাকে চলে যেতে বলেন তবে আমি চলে যাবো, কিন্তু আমার পক্ষে উনাকে এই কথা বলা খুব কঠিন, যদিও আমি এখন সেটাই চাই।“

তাজউদ্দীন আহমেদ অনেকটা বামপন্থী, ভারত, রাশিয়ার প্রতি ঘেষা বলে পরিচিত ছিলেন। সেই কারনে হয়তো বঙ্গবন্ধুও পশ্চিমাদের সাথে সুসম্পর্কের সৃষ্টি করতে তাঁকে সরিয়ে দিতে অনেকের পরামর্শের প্রতি কান দিচ্ছিলেন। তবে অন্য অনেকে কি বলবেন জানিনা, আমি নিজে আমার জীবনে তাকেই বিশ্বাস করবো যাকে আমি সারাজীবন ধরে চিনি এবং জেনে এসেছি যে সে আমার ক্ষতি চাইতে পারেনা। অপছন্দের কোন কাজ করলেও বুঝবো যে সে আমার ভালো চাইছে বলেই সেটা করছে। কিন্তু বন্ধবন্ধুকে স্বাধীনতার পরপরই ঘিরে ফেলে তোফায়েল আহমেদ, শেখ মনির মত তরুনেরা যারা তখনো দেশ চালনা কি জিনিস সেটার প্রশিক্ষনকালও শেষ করেনি। কিন্তু তেমন নবীশ লোকেদেরই বঙ্গবন্ধু বানিয়ে ফেলেন সবচেয়ে কাছের মানুষ, সবচেয়ে বড় উপদেষ্টা।

২৬ শে অক্টোবর, ১৯৭৪
ঢাকা, বাংলাদেশ

কেবিনেট সেক্রেটারী তৌফিক ইমাম এবং যুগ্ম সচিব হাবীবুল হক সচিবালয়ে প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে দুটি খামে বন্দী পত্র বহন করে নিয়ে এসেছেন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদের জন্য। তাজুদ্দীন আহমেদ পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান নুরুল ইসলামের কক্ষে ছিলেন। সেখান থেকে তাঁর ব্যক্তিগত সচিব আবু সায়িদ চৌধুরী তাঁকে উপরতলায় আসবার অনুরোধ করলেন। সেখানে তারা তাজউদ্দীন আহমেদের সাথে দেখা করলেন। সায়িদ সাহেব জানতেন না যে কি ঘটছে। তিনি নির্লিপ্তকন্ঠে সায়িদ সাহেবকে বললেন,

– “আমি আর এখানে থাকতে পারছিনা। আমাকে চলে যেতে হবে।

কেউ তখনো আন্দাজ করতে পারেনি আসলে কি ঘটেছে। এর মাত্র দশ মিনিট পর উনি তার সচিব খলিফুদ্দীন মাহমুদকে ডেকে পাঠালেন এবং একটা সংক্ষিপ্ত চিঠি পড়োতে দিলেন। চিঠিটা ছিলো প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের তরফ থেকে। তাতে লেখা ছিলো,

“Best wishes to you. In the greater interest of the country you should no longer remain in charge of the Finance Ministry. This is why you are being asked to offer your resignation (or something like that). Attached please find a letter of resignation awaiting your signature. Yours truly, Shaikh Mujibur Rahman.”

খলিফুদ্দীন মাহমুদ সেটা পড়ে শোনালেন আবু সায়িদ চৌধুরীর হাতে দেবার আগে। এরপর উনার আবেগের বাঁধ ভেঙ্গে গেলো। উনি চীৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকলেন,

– “ও আল্লাহ, ও আল্লাহ!”

তবে তাজউদ্দীন আহমেদ আবেগ প্রকাশ করলেন না। উনি পদত্যাগপত্রে সাক্ষর করে দিলেন। হয়তো উনার হাত একটূ হলেও কাঁপছিলো। ভয়ে নয়, অপমানে নয়, তীব্র মন খারাপের কারনে।

হাবীবুল হক এবং তৌফিক ইমাম চিঠিটা সংগ্রহ করলেন এবং বললেন অপরাধ হলে ক্ষমা করে দিতে। তারা কেবল এই অপ্রীতিকর কাজটা করবার জন্য দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা এ সময় পুরো মন্ত্রনালয় ঘিরে রাখে। তাদের পরিস্থির উপর কড়া নজর রাখতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তবে তাজউদ্দীন আহমেদ বললেন,

– “আমি পুরো মন্ত্রনালয় ঘুরে সবার কাছ থেকে বিদায় নেবো, এরপর বাসায় যাবো। দয়া করে আমার বন্ধু আরহাম সিদ্দিকীকে অনুরোধ করো তার গাড়িটা পাঠাতে। আমি আর সরকারী গাড়ি ব্যবহার করবো না।“

মন্ত্রনালয় থেকে বেরিয়ে যাবার মুহুর্তে আবু সায়িদ চৌধুরী তাঁকে শেষবারের মত জিজ্ঞেস করলেন,

– “স্যার, আপনি এখন কি করবেন? আপনার কি কোন ধরনের পরিকল্পনা আছে?”

তাজউদ্দীন আহমেদ জবাব দিলেন,

– “আমি আমার নীতি বিসর্জন দেবো না। আমি নিজেকে সবকিছু থেকে দূরে রাখবো এবং এমন কিছু করবো না যা আমার অগোচরেই মুজিব ভাইয়ের ক্ষতির কারন হবে।“

বঙ্গবন্ধু এভাবেই হারালেন তাঁর সবচেয়ে বড় সঙ্গী, বন্ধু কিংবা শুভাকাংখীকে। তিনি হয়তো অভিমানের কারনেই বুঝতে পারলেননা যে সে মানুষটা সারাজীবন তার সাথে ছায়ার মত ছিলেন, পৃথিবীর অন্য কেউ তাঁর ক্ষতির চিন্তা করলেও উনার পক্ষে সেটা সম্ভব হতোনা। যারা প্রিয় মানুষের ভালো কামনা করে কেবল তারাই প্রিয় মানুষগুলার সামনে অপ্রিয় সত্যটা উচ্চারন করে। কারন তারা জানে তাদের প্রিয় মানুষটার ভালো হতে পারে তা বললেই।

এইদিনই বঙ্গবন্ধু এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন। পুরো সংবাদ সম্মেলনে তাঁকে ভীষন বিমর্ষ আর মনমরা দেখাচ্ছিলো। এই সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায় কর্মরত আবু সায়িদ চৌধুরীর আত্মীয় জাওয়াদুল করীম নামের একজন সাংবাদিক। সায়িদ সাহেবের সাথে দেখা হবার পর উনি তাঁকে বলবেন,

– “জানো সায়িদ, তাজউদ্দীন সাহেবের পদত্যাগের পরের সংবাদ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুকে কেমন যেনো অপরাধীর মত দেখাচ্ছিলো। মনে হচ্ছিলো খুব ভেঙ্গে পরেছেন। কেবলমাত্র একটা লোকের মুখে আমি আত্মতৃপ্তি আর হাসির ছোঁয়া দেখেছি, যা সে লুকাতে বিন্দুমাত্র চেস্টাও করছিলোনা। মনে হচ্ছিলো যে আনন্দে সে সবাইকে জড়িয়ে ধরবে। সে সবদিকে ছুটে বেড়াচ্ছিলো আর এই আচরন সবাই খেয়াল করছিলো।“

আলোচনার এক পর্যায়ে জাওয়াদুল করিম এটাও বললেন,

– “বঙ্গবন্ধু আর তাজউদ্দীন সাহেবের মধ্যে এই বিরোধ এই খন্দকার মোশতাক ছাড়া আর কারো কাজ নয়। আমি তোমার সাথে বাজী লাগতে পারি, এই লোকটা বঙ্গবন্ধুকে একদিন না একদিন ডুবিয়ে ছাড়বে।“

জাওয়াদ সাহেব নির্ভুল ছিলেন তার পর্যবেক্ষনে। তাজউদ্দীন আহমেদের চলে যাওয়া আওয়ামী লীগের শক্তির একটা স্তম্ভকে সরিয়ে নেয়। এর বাইরে জাসদও যে ধীরে ধীরে শক্তিশালী হচ্ছিলো এর পেছনেও ছিলো আওয়ামী লীগের দলত্যাগী একটা মেধাবী অংশ যারা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছিলো তাদের চরমপন্থার মাধমে। তবে আফসোসের ব্যাপার এটাই যে বঙ্গবন্ধু এইসব চাটুকারদের জীবনের শেষদিন পর্যন্ত চিনতে পারেননি।

তাজউদ্দীন আহমেদ তার জীবনের শেষদিন পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখেন। তিনি আওয়ামী লীগের প্রতিও অনুগত থাকেন। তিনি দলের প্রতি কোন ধরনের বিরুপ মন্তব্য করেননি কিংবা অন্য কোন দলে যোগ দেননি যেটা আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনীতির একটা অন্যতম বৈশিষ্ট্য। উনি বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্তই ছিলেন এবং সময়ের সাথে সবকিছুর অন্তরালে চলে যান। বঙ্গবন্ধুও উনার সাথে ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক বজায় রাখেন। উনি তাজউদ্দীন আহমেদের ছেলে সোহেল তাজের জন্য একজোড়া সাদা খরগোশ পাঠান এ খবর জেনে যে সে খরগোশ খুব পছন্দ করে। বঙ্গবন্ধু নিজে উনার বাসায় গিয়ে উনার ছেলেদের বিয়ের দাওয়াত তাজউদ্দীন আহমেদের কাছে পৌছে দেন।

তবে ইতিহাসের একটা অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তা মাঝে মাঝে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটায়। আহমেদ পরিবারের সদস্যদের সরিয়ে দেবার ঐতিহ্য এরপরেও বজায় থাকবে। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা তার সরকারের প্রথম মেয়াদে তাজউদ্দীন আহমেদের ছোটভাই আফসারউদ্দীন আহমেদকে অনধিকার চর্চার অভিযোগে সরিয়ে মন্ত্রীসভা থেকে সরিয়ে দেন। ৩১ শে মে, ২০০৯ সালে তাজউদ্দীন আহমেদের একমাত্র ছেলে সোহেল তাজও স্বরাস্ট্র মন্ত্রনালয়ের দ্বায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেন এবং সংসদের আসনও ছেড়ে দিয়ে প্রবাসী হয়ে যান। আবার ১০ কিংবা ২০ বছর পর এমন কিছু ঘটবে নাকি সময়ই তার জবাব দেবে।

ইতিহাসের শৃংখল ভেঙ্গে ফেলাও খুব কঠিন।

চলবে…

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৩ thoughts on “**** রক্তাক্ত ১৫ই আগস্ট, ১৯৭৫এর পথে – পর্ব – ৩ ****

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

4 + = 6