সর্বজয়া

আমি তো তোমার কাছেই ফিরে এসেছি।তুমি তোমার শেষ নোটটাই লিখেছিলে, “ভালোবাসি, প্রিয়তম! ভালোবাসি এতসবের পরও!আমি শুধু তোমার হতে চেয়েছিলাম। ”
সত্যি এতসবের পরও ভালোবাসতে পেরেছ, অথচ অপেক্ষা করতে পারলে না।
আজ পৃথিবী জানে আমি নির্দোষ। তোমাকে জানানোর একটি পথও তুমি খোলা রাখলে না। এতটা ভালবেসেছ কেন? প্লিজ বলে যাও …।
ইতি….
তোমারই প্রিয়তম।

সর্বজয়া
তোমাকে সর্বজয়া নাম দেওয়ার পর তুমি বলেছিলে, লোক হাসাবে নাকি? আমি বলেছিলাম, নাতো!
তবে এই নাম কেন?
কারণ তুমিই তো আমার সবটাই জয় করেছ!
সর্বজয়া, অবাক হবে শুনে, লোকে বলে আমি নাকি ফুল-ফল-লতা-পাতা-প্রেমিকা নিয়েই লিখি! এই দুর্নাম শুনে কি তুমি হাসবে না? হ্যাঁ, মনে আছে সেই ছেলের কথা, যে বনলতা সেন এর প্রেমে মত্ত ছিলো ? হ্যাঁ, সেই ছেলে এখন বিয়ে করেছে, দুটো যমজ কন্যা হয়েছে। কি আদুরেই না বাচ্চা দুটো!
আমাদের প্রথম সন্তান হলে তার নাম কি দিবে বলেছিলে মনে আছে? থাকবেই তো! কি ঝগড়াই না করেছিলে আমার সাথে! সেই ঝগড়ার কথা ভাবলে এখনো আমার হাসি পায়। বিশ্বাস করো, “বিন্দু ” নামটি আমার ও বেশ পছন্দ! বিন্দু থেকেই সবকিছুর সূচনা।
মনে আছে?- তারও একবছর আগে পহেলা ফাল্গুনের দিনের কথা? বাসন্তী রঙ কি আমি চিনতাম না তখনো। তুমি বাসন্তী রঙা শাড়ি পরে এসেছিলে বলেই বসন্তের জন্ম হয়েছিল ইট -কাঠ -পাথরের এই নগরীতে। সেই হতচ্ছাড়া রঙ যেনো বসন্তবরণ উৎসবজুড়ে আমার পিছু নিয়েছিলো। কিছুতেই না, কিছুতেই পারি নি, তোমার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলি -এই মেয়ে, তুমি কি আমার সঙ্গী হবে? তুমি কি আমার দুঃখ নেবে? অত সাহস আমার ছিলো না। গলির মোড়ের মাস্তানটা, ক্লাসের নার্ড ছেলেটা, ভার্সিটির ছাত্রনেতা- বলো -কে ছিলো না তোমার প্রণয়প্রত্যাশী?
সেই উনিশবছরের যুবকের রাত জুড়ে ছিলো অপ্সরীদের ফ্যান্টাসি -হ্যাঁ, তাদের কথায় তো বলছি আটলান্টিকের ওপারে বাড়ি হলেও রাত কাঁপাত বাংলার সন্তানদের। অথচ আমিই ছিলাম কিনা বৃত্তের বাইরে -যখন সবাই সিগারেট জ্বেলে ইতিহাসের জন্ম দিচ্ছিলো নিকোটিন স্রোতে, যখন উঠতি কবি সাহিত্য আড্ডায় কবিতার ব্যবচ্ছেদ এ ব্যাস্ত ছিলো, আমি তখন শুধু একজনের কথায় ভাবতাম -আমার সর্বজয়ার কথা।
আমার কোটি টাকায় কেনা সেক্সী গাড়ি ছিলো না, স্পাইক করা চুল ছিলো না, গীটার বাজিয়ে রূপসীদের হৃদয়ে প্রেমের জোয়ার তোলবার মতো গানও ছিল না। ও হ্যাঁ, পাঞ্জাবি পরা, কাঁধে ঝোলানো ব্যাগওয়ালা কোনো তরুণ কবিও আমি ছিলাম না। আমি ছিলাম খুবই সাধারণ, এর চেয়ে বেশি সাধারণ হয়তো হওয়া আর সম্ভব না। এই সাধারণের জীবনেই তুমি যে কি রহস্য খুঁজে পেয়েছিলে সেটাই আমার কাছে বিরাট রহস্য!
চৈত্র মাসের দ্বিতীর দিনটি ছিলো আমার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ দিন।হয়তো পৃথিবীর কাছে মনে রাখার মতো শ্রেষ্ঠ কোনো দিন নয়। বরাবরের মতোই ক্লাস শেষে ভার্সিটির বাসে উঠে হলে যাচ্ছিলাম। জানোই তো ভার্সিটির বাস ছাড়া হলে যাওয়া কি দুঃসাধ্য। কিন্তু তুমি ডাক দিয়েছ এই খুশিতেই তো আমি সারারাত রাস্তায় কাটিয়ে দিতে পারি!
এরপর তোমার সাথেই তো হেঁটে হেঁটে ভার্সিটি পেরিয়ে এলাম মনপুরাতে। এদিকটাই একেবারেই নিরিবিলি তা বলা যায় না। সামনে লেকটাতে অত পানি ছিলো না। তারপরও আমার মনে হচ্ছিল পুরো জায়গা বাঁশির সুরে কাঁপছে! পড়ন্ত সূর্য যেন ডুবতে ভুলে গিয়েছিলো, প্রেম হয়ে গিয়েছিলো আগুনের সাথে জলের। আমি জানতামই না,কবে তুমি আমার হাতটা ধরে রেখেছ। আমি ভ্যাবলার মতো জিজ্ঞাসা করলাম, কিছু বলবে?
তুমি বলেছিলে, কিছু কি আর বলতে হবে?
আমি বলেছিলাম, “জানো, কতবার তোমার কাছে যেতে চেয়েছি আমি?”
তুমি বলেছিলে,” জানি আমি সবই জানি। এবার থেকে আর লুকিয়ে, বইয়ের ফাঁকে আমার দিকে তাকিয়ে থাকা বন্ধ করবে। ও হ্যাঁ লাইব্রেরিতে আর দু’ঘণ্ঠা রোজ বসে থাকবে না। ”
আমি জানতামই না, তোমার সামনে পিছনে এতগুলো চোখ থাকতে পারে।সেদিনও তুমি বলো নি, আমাকে ভালোবাসো।
ওইদিনই তো প্রেম ছিলো, এরপর আর প্রেম ছিলো কই? ছিলো শাসন, ছিলো বারণ! আরে, রাগ করো না। মজা করলাম। তোমার সাথে রোজ ঘুরতে না গেলেই মনে হতো দিনটা প্রেমের দেবী আফ্রোদিতির রোষানলে পড়েছিলো! এতপ্রেম সম্ভবত প্রেমদেবও কোনোদিন পান নি।
বাঙালির ভ্যালেন্টাইনস ডে সরস্বতী পুজো, আর গ্লোবাল ভ্যালেন্টাইনস ডে কোনোটাতেই তো তুমি আমাকে বলো নি, ভালোবাসি! কতবার বলেছিলাম , আমি কি বেশি কিছু শুনতে চেয়েছিলাম বল? তুমি বলেছিলে, সেইদিন এখনো আসে নি!
সত্যিই সেদিন যে এইভাবে আসবে আমি কখনোই ভাবি নি।বিশ্বাস করো, তাহলে আমি কখনোই তোমাকে বলতাম না, “সর্বজয়া, বল ভালোবাসি!” তুমি এভাবে চলে না গেলেও পারতে। দ্যাখো, এতবছর একসাথে থাকার পরও জানতাম না তুমি বিষাক্ত ক্ষোভ পুষে রেখেছ। বিশ্বাস করো সব মিথ্যে, সব মিথ্যে। আমার নামে যেসব স্ক্যান্ডাল বের হয়েছে তার কানাকড়িও সত্যি নয়। সব বানানো, সব ষড়যন্ত্র। তোমাকে যা বিশ্বাস করানো হয়েছিলো সব মিথ্যা। আমি এই জনমুখর টোকিও এর অফিসে যতদিন ছিলাম, একটা দিনও শান্তিতে ছিলাম না। শুধু বসে ছিলাম দেশে ফিরব, তোমার কাছে যাব…..
আমি তো তোমার কাছেই ফিরে এসেছি।তুমি তোমার শেষ নোটটাই লিখেছিলে, “ভালোবাসি, প্রিয়তম! ভালোবাসি এতসবের পরও!আমি শুধু তোমার হতে চেয়েছিলাম। ”
সত্যি এতসবের পরও ভালোবাসতে পেরেছ, অথচ অপেক্ষা করতে পারলে না।
আজ পৃথিবী জানে আমি নির্দোষ। তোমাকে জানানোর একটি পথও তুমি খোলা রাখলে না। এতটা ভালবেসেছ কেন? প্লিজ বলে যাও …।
ইতি….
তোমারই প্রিয়তম।
জাপানপ্রবাসী ত্রিশবছরের এক রুদ্র প্রেমিকের লেখা শেষ চিঠি। যুবকটি তখন ত্রিশের কৌঠায়। স্বপ্ন নিয়ে গিয়েছিলো জাপানে। প্রেমিকা ছিলো দেশেই। জাপানে গিয়ে প্রেমিকটির বিরুদ্ধে নারীকেলেংকারির খবর শোনা গিয়েছিলো। ফলে তার জেল হয়! কিন্তু সব ভুল প্রমাণ করে ফিরে আসে দেশে! ততদিনে অনেক দেরী হয়ে যায়, অনেক দেরী। ও হ্যাঁ, কয়েকদিন পর পত্রিকায় খবর আসে, ছেলেটির লাশ ঢাকার একটি অভিজাত ফাইভ স্টার হোটেল থেকে উদ্ধার করা হয়। ব্যক্তিগত কারণেই কারণে কারো নাম, হোটেলের নাম প্রকাশ করা হয় নি।

***************

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

40 + = 41