অনন্তকাল অপেক্ষা

প্রতিদিন বিকেল পাঁচটায় ভার্সিটির (bup) এর ক্লাস শেষ হয়। সবাই দৌঁড়ে দৌঁড়ে বাসে ওঠে সীট যাতে না হারায়। আর সবচেয়ে ব্যতিক্রম ছেলেটি রাফি। বাসের সামনে দাঁড়িয়ে থাকবে যতক্ষণ না পর্যন্ত বাস না ছাড়ে। তাকে এডভ্যান্সার প্রিয় বলা যায় না মোটেও কারণ সে যথেস্ট পরিমাণ ভীতু, এতই ভীতু যে ছয় মাস ধরে ঋতু যতক্ষণ বাসে ওঠে না, ততক্ষণ সে এক পায়ে বাসের সামনে দাঁড়িয়ে থাকবে অথচ সামনে গিয়ে বলবে না, “এই মেয়ে এভাবে আর কতদিন দাঁড়িয়ে থাকব?”

আমার চলা শুরু করলেই দৌঁড়ে উঠবে সোজা মেয়েদের সীটের সামনে দাঁড়াবে। এটা তার অভ্যাস, শখ সবই বলা চলে। প্রতিদিন হয়তো ঋতুর সামনে দাঁড়াতে পারে না তবে তার চোখের আড়াল হতে কিছুতেই দেয় না। রাফি হোস্টেলেই থাকে। হোস্টেল ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এ। এটিই বাসের সর্বশেষ গন্তব্য। আর ঋতু আরোও আগে ইসিবি চত্বর এ নেমে যায়।

আর ইসিবি চত্বরে ঋতু নেমে গেলে, রাফি শূণ্য দৃষ্টিতে জানালার ওপারে তাকিয়ে থাকে। যতক্ষণ না পর্যন্ত ঋতুকে দেখা যায়। এরপর তার বন্ধু নওফেল তার পাশের সীটে রাফিকে বসতে দেয়। রাফী চোখে বুজে, আর নওফেল কানে হেডফোন লাগিয়ে তার প্রেয়সীর সাথে দীর্ঘ প্রেমালাপ করে। রাফির বিরক্ত লাগলেও, কিছু বলে না। বলার অধিকার নেই। সে ও স্বপ্ন দেখে, একদিন ঋতুকে নিয়ে অনেক দূর হারিয়ে যাবে।। একদিন ঋতু তার পাশে বসবে। দুজনের মাঝখানে একটুও ফাঁক থাকবে না। পাশের সীটের সিনিয়র ভাইয়াটার কাঁধে আপুটা যেভাবে মাথা টা হেলিয়ে দিয়েছে ঠিক সেভাবে।
বন্ধুরা রাফির এই অবস্থা দেখে প্রায়ই মশকারি করতে ছাড়ে না! “বিশেষ করে বাসে উঠলেই দোস্ত তোর ঋতুকালীন সময় কেমন কাটছে রে?”

আজকেও সেরকম একটি বিকেল। রাফীর পাশের সীটেই ঋতু। ঋতু পালাজো পড়েছে। পায়ের ওপর পা তুলে বসে আছে। তার শুভ্র পায়ে আলতা লাল বুনো রক্তজবার মতো হৃদয়ে রক্তক্ষরণ করাতে যথেস্ট। শহুরে একটা মেয়ে আলতা কেন লাগাবে? আচ্ছা! ঋতু বেশ ভালো নাচ করে। আজকে তো ভার্সিটিতেই নাচের অনুষ্ঠান ছিলো। রাফি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ, আজকে বলবে, তাকে জানাবেই। এই ধরনের মেয়েরা প্রপোজাল পেতে পেতে অভ্যস্ত। এই গাড়িতে সবার সামনে না আবার সিন ক্রিয়েট হয়ে যায়, রাফির সাহসে কুলালো না। বেশ তো পাশের সীটেই তো ঋতু। তবু দুজনের মাঝে দু ইঞ্চি ফাঁক যেনো পুরো সাহারা মরুভূমির চেয়ে বিশাল ব্যবধান। রাফি ভাবছে, ইশশশ ঋতুটা যদি একটা একটা সাদা শাড়ি, আর বড়ো একটা লালটিপ পরে আসতো। আর সে এবার নতুন কেনা পাঞ্জাবিটা পরে আসতো। স্বীকার করতেই হয় দুজনকেই বেশ মানাত।

এরপরদিন সত্যিই ঋতু একটি সাদা শিফনের শাড়ি পরে এসেছিলো। কপালে লাল টিপ। ট্যালিপ্যাথিক ক্ষমতা নাকি? প্রিয়জনের মনের কথা, প্রিয়জনের মনে পৌঁছে যায় সত্যি। রাফি নির্বাক। বিশ্বাসই করতে পারছে না, এটা কেমনে হয়! রাফির অবাক হওয়ার আরোও একটি ব্যাপার তখনো বাকি ছিলো!

আজকে ঋতু একা নয়, ঋতুর সাথে এক পরিচিত সিনিয়র ভাই। তারা দুজনে কি একই সাথে বাসে উঠছে?ঋতুর হাত কি ভাইয়াটা ধরেছে?
রাফির চোখ ঝাপসা। রাফি আজকে আর সেই বাসে উঠে নি। উঠতে পারে না।
****************

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “অনন্তকাল অপেক্ষা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 9 = 1