সে একা ছিলো না

সে একা ছিলো না

নতুন কালোরঙা ব্লেজারটা গায়ে দিয়েই বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনাল (bup) এর দিকে রওনা দিলাম। ভাইবা দিতে। যদিও ভাইবা দেওয়া আজকাল আমার কাছে খাওয়াপড়ার মতোই স্বাভাবিক ঘটনা। তাই বেশ ফুরফুরেই ছিলাম। টাই পরায় তেমন নিপুণ হয়ে উঠতে পারি নি তখনো। সবসময় ভয়ে ছিলাম “সানডে মানডে ” হয়ে না যায় আবার!
ওয়ারী থেকে মীরপুর12 এ নেমেই ক্যান্টনমেন্ট! এর পর সবুজ ক্যান্টনমেন্ট এরিয়ার বুক ছিরে পিচঢালা রোড! ঢাকায় তখনো শীত না পড়লে, শীতের আগমনী হাওয়ার অভ্যর্থনা তো ছিলোই সেই উঁচু নিচু পথেই!
বিউপি এখনো নবীন ভার্সিটি, তবে মিলিটারি বনেদিয়ানা সর্বত্রই চোখে পড়ার মতো! পাশে মোহনীয় লেক -জল, নৌকা, মাছরাঙা সবই ছিলো। এখানে এতো পাখির কিচিরমিচির! ভুল হতে পারে এই ভেবে -আমি কি পিকনিক এ এলাম নাকি!
হাস্যকর, অপ্রয়োজনীয় কিছু ফর্মালিটি শেষ করে দুই তলায় উঠে এলাম। অনেক গুলো ভাইবা বোর্ড। আমার ভাইবা বোর্ডে এর সামনে তখন দেখি তখন কয়েকটা চেয়ার খালি! একেবারেই দরজার পাশে যেয়ে বসতেই এক মেয়ে চিৎকার করে বলল, “এই দিকে বসো না! সিরিয়াল ওয়াইজ বসতে হবে! ”
“ওকেই! গট ইট “বলে আমি আমার সিরিয়াল এর আগের জনের পাশে বসলাম!সৌভাগ্যক্রমে অথবা দুর্ভাগ্যক্রমে মেয়েটি দেখতে এত রূপবতী ছিলো, চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়া সুন্দর! অতিরিক্ত সুন্দরীদের থেকে সাবধানে থাকতে হয় -সে কথা আমি জানতাম!
পাশের বোর্ডগুলো থেকে ছেলে মেয়ে ইন্টারভিউ দিয়ে বের হয়ে আসছে! অথচ আমার টা তে তো শুরুই হলো না! ভাইবা বোর্ডের সামনে সেই আদিমকাল থেকে চলে চিরাচরিত দৃশ্য চলছে! কেউ বের হয়ে আসলে তাকে সবাই ঘিরে ধরে! কি জিগ্যাসা করেছে, কি বলেছে-এই রকমের একটা পরিবেশ!
কে যেনো বলল, বাংলাদেশের জিডিপি কত, কোন সেক্টর থেকে কত রেভিনিউ আসে, একাউন্টিং এর পিতা কে এই টাইপ হাবিজাবি প্রশ্ন করছে!
সত্যি বলতে, বাংলাদেশর কোন কোম্পানির বার্ষিক আয় দূরে থাক, দেশের মাথাপিছু আয় কত -সেই তথ্য ও আমার অজানা ছিল! আমি তবে চিন্তিত না, আমি দুশ্চিন্ত!
আমার যদিও মোবাইল ছিলো সাথে, মোবাইলে গুগল ও ছিলো! তারপরও কেনো যেনো সে কথা ভুলে গিয়ে, পাশের মেয়েটিকে জিগ্যাসা করলাম, “Excuse me, do you know the GDP of our country? per capita….?”
পৃথিবীর কি ভয়ানক সত্য, রূপবতীরা প্রথম জীবনে সাইয়েন্স পড়ে, শেষ জীবনে বিবিএ, ইংরেজি, ইকোনোমিক্স পড়ে!
সে বলল, এগুলো আসবে না!
আমি বললাম, “how can you be so sure? ”
সে বলল, “cause, we are from science! they won’t ask us any questions from Business studies! .”
আমি জাস্ট শুনছিলাম তার সুললিত কন্ঠ, আমার মতো ফেইক আমেরিকান একসেন্ট নয়, পশ একসেন্ট!
স্বাভাবিকভাবেই কথা এগিয়ে নিতে হয় বলেই আমি বললাম, “You from……?”
তার আগেই সদাপ্রস্তুত উত্তর, “আমি ভিকারুননিসা! তুমি কোন কলেজ থেকে এইসএচসি পাস করেছ? ”
“আমি মনে মনে, সে কি শান্তি নিকেতনী ঢং এ বাংলা বলছে ক্যানো? ”
আমি, “চট্টগ্রাম কলেজ থেকে! আগে কখনো ভাইবা দিছ? ”
“নাহ, আমি আগে দিই নি! তুমি দিয়েছ? ”
“হ্যাঁ, কয়েকবার তো দিলাম, বাঁশ খাইলাম, দিলাম! এইতো! Just relax! ”
তাকে অনেক শান্ত দেখাচ্ছিল,অতিরিক্ত টেনশনে হয়তো কেউ নীরব হয়ে যায়, হতে পারে!
আমি বললাম, “feeling nervous!? ”
সে বলল, “yeah, it’s my first time! “tongue emoticon
আমি বললাম, “ও এই কথা! কোচিং কোথায় করেছ? ”
“হ্যাঁ, আমি বুয়েটে ঠিকি নি, তাই এখানে পরীক্ষা দিতে এসেছি! ”
আমি, আগ বাড়িয়ে, “আমি বুয়েটে তো পরীক্ষায় দিই নি! ”
“ও আচ্ছা! বুঝেছি! ”
“You from English Version..right? ”
“হ্যাঁ তো! তাতে কি ! আমার কোনো আইডিয়া নেই! বাবা জোর করলো বলেই এলাম! ”
এরপর আমি কি কি জিগ্যাসা করতে পারে, এরকম কিছু প্রশ্ন শোনানো দায়িত্ব মনে করেলাম!রূপবতী বলেই হয়তো! আমি বলালাম শেষে, “বুঝেছ, কিভাবে বলবে? ”
“okay ..Got it dear! Don’t behave like my father, I already got one! ”
আমি বললাম, “তুমি তো অনেকটা আমার মায়ের মতোই! ”
এট বলায়, সে জাস্ট আমার গায়ে একটু চিমটি দিয়ে দিলো, “যাহ! এভাবে বলো না!
এরপর যেনো আমার কাঁধে মাথা ঝুঁকিয়েই যেন বাইরে জানলার ওপারে তাকিয়ে আছে! সত্যিই আমি কি এত নির্ভরযোগ্য! এতোটা নির্ভরযোগ্য নই হয়তো যতোটা সে ভাবছে!
আমি হঠাৎ, “এই কি করছ! সবাই দেখছে! “যদিও আমাদের বোর্ড এর সামনে মাত্র পাঁচজন ছিলো, ওরা ব্যাস্ত, চিন্তিত, টিপিক্যাল, “কি জিগ্যাসা করছে, কি জিগ্যাসা করছে “টাইপ!
এরই সুখের কাল যেনো নিরুপদ্রব হতে পারে না, স্রষ্টা চান না! আর্মি ডাক দিলো তাকে, “নিশাত কে!ভিতরে যাও! ”
নিশাত মেয়েটির নাম! “শোনো, আমার ব্যাগটা রেখো! ”
আমি, “All the best! ”
সে আমার দিকে তাকাল, আমি যেন আরো বেশি কিছুই বলতে চেয়েছিলাম!
প্রায় পনের মিনিট পর বের হল!কিন্তু আমাকে ঢুকতে হবে! সে আমার দিকে আসতেই দারোয়ান আর্মি টা, “আপা, ইন্টারভিউ থেকে বের হয়ে কথা বলা যাবে না! “আমি নরকে না যাওয়ার আগেই যেন যমদূতের দেখা পেলাম!সে বললো, ব্যাগটা নিয়ে আসছি ওখান থেকে!
আমি ইন্টারভিউ বোর্ডে ঢুকলাম! অনিশ্চা সত্ত্বেও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অজস্র প্রশংসা করে বের হয়ে এলাম!
বাইরে দেখি কোথাও কেউ নেয়! আমার ব্যাগটা পড়ে আছে! দারোয়ান ব্যাটা হাসছে!
আমি তাকে বাংলা অভিধানের নিকৃষ্টতম কিছু গালি দিলাম, ঈশ্বরের দোহায়, কেউ শুনে নি!
অনেক খুঁজেছি তাকে, সিংহল সমুদ্র থেকে নিশিথের অন্ধকারে মালয় সাগরে অনেক ঘুরেছি আমি! বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে সেখানে ছিলাম আমি, আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে, আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন, আমারে দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিল বারিধারার নিশাত! ”
জীবনানন্দ দাশ মাফ করবেন, আপনার থেকে কথা ধার না করলেও চলতো, কিন্তু আমার হৃদয়ের ব্যাথা শুধু আপনার কথাতেই প্রকাশিত হয়! সত্যি সারা লন খুঁজে পেলাম না, আমি সত্যি এই ভরা রোদে এতটা মৃত হয় নি আগে কখনো! আমি ভাবলাম, সত্যিই এমন হয় ঢাকায়! না কোনোভাবেই মানতে পারছিলাম না!রিকশা নিয়ে মিরপুর বারোর পথে আবার অগস্ত্য যাত্রা!
আজ হঠাৎ অনেক দিন পর ব্যাগটা খুলতেই,যা পেলাম আমি প্রস্তুত ছিলাম না তার জন্য! একটা চিরকুট, “প্রিয় সৌমেন! আমার জীবনটা অত বড়ো নয়,কিন্তু এরি মাঝে আমি আর কাউকে পাই নি, পাব না তোমার মতো! জানি, যখন আমাকে দেখবে না কস্ট পাবে! কিন্তু হতচ্ছাড়া আর্মিটা বললো চলে যেতে! প্লিজ ফোন করবে এই নাম্বারে xxxxxxxxxxx এই দেখো রাতে ফোন করবে না, রাতে সবাই বাসায় থাকে!
অপেক্ষা করব! হ্যাঁ জয় গোস্বামী আমারও খুব প্রিয়!
ইতি
নিশাত”

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 2 = 2