**** রক্তাক্ত ১৫ই আগস্ট, ১৯৭৫এর পথে – পর্ব – ৪ ****

?w=640&h=361″ width=”600″ />
সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দিষ্ট করে বলা হলো যে যখন একটি জাতীয় দল ঘোষনা করা হবে তখন নিম্নলিখিত ধারাগুলো কার্যকর হবেঃ

– যদি কেউ সংসদের সদস্য হন, তবে যেদিন থেকে জাতীয় দলটি গঠিত হবে, তার সদস্যপদ শুন্য বলে গন্য হবে যদিনা তিনি প্রেসিডেন্টের নির্দিষ্ট করে দেয়া সময়ের মধ্যে সেই জাতীয় দলটির সদস্যপদ গ্রহন করেন।
– প্রেসিডেন্ট অথবা সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচনের জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হবেননা যদিনা প্রার্থী হিসেবে জাতীয় দলের দ্বারা মনোনীত হন।
– কেবলমাত্র জাতীয় দলটি ছাড়া অন্য কোন দলের রাজনৈতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহন করা যাবেনা, বা অন্য কোন রাজনৈতিক দল গঠন করা কিংবা তার সদস্যও হবার অধিকার বাতিল বলে গন্য হবে।

সংসদে এই সংশোধনীর বিস্তারিত পাঠ করা কিংবা কোন ধরনের আলোচনা ছাড়াই তা পাস করা হলো। কারন এর আগেই সংসদের কার্যবিধির সাধারন নিয়মাবলী স্থগিত করা হয়েছিলো। মাত্র আধঘন্টার মধ্যেই এই সংশোধনী পাসের প্রক্রিয়া সমাপ্ত হয়ে গেলো। আর এভাবেই একদলীয় শাসন ব্যবস্থার সুচনা হলো জনগন কিংবা ভোটারদের মতামত ছাড়াই।

?w=640&h=361″ width=”600″ />
পর্ব-৩ এখানে
১৯৭৪ সাল (সম্ভবত শেষের দিকে)
টঙ্গী, ঢাকা
বাংলাদেশ

বেঙ্গল ল্যান্সারের আরেক মেজর তার ইউনিট সহ দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছেন আইনশৃংখলা রক্ষায় অভিযান পরিচালনার। চিরুনী অভিযানের সময় তিনজন গুন্ডাকে ধরে নিয়ে আসা হলো। একটূ ধোলাই দেবার পরেই তারা স্বীকার করে নিলো যে এক নববধুকে তারা ধর্ষন করেছে তার স্বামীকে এবং এক ট্যাক্সী ড্রাইভারকে হত্যা করবার পর। তারা সম্ভবত কোথাও যাচ্ছিলেন কিংবা বাড়ি ফিরছিলেন।

তবে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করার পরপরই এই ব্যাপারে তদন্ত প্রক্রিয়া বাদ দেয়া হলো। জানা গেলো যে এই তিনজনের গুরু হচ্ছে মোজাম্মেল নামের একজন, যিনি টঙ্গী আওয়ামী লীগের সভাপতি। তবে ক্ষুব্ধ মেজর নাসের তাকেও এরেস্ট করে ঢাকায় নিয়ে আসলেন বিচারের জন্য। তবে মোজাম্মেল তাকে তিন লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে ছেড়ে দেবার প্রস্তাব দেন এবং বলেন যে এই ব্যাপারটা যেন কেউ না জানতে পারে। এর বাইরে মোজাম্মেল মেজর নাসেরকে এটাও বলেন যে,

– “আজ নাহয় কাল তো ছেড়ে দিতেই হবে, টাকা না নিয়ে লাভ কি হবে আপনার?”

তবে মেজর নাসের প্রতিজ্ঞা করলেন যে বিচারের মুখে দাড়া করাবেন এবং ফাঁসিতে ঝুলাবেন। তবে মোজাম্মেল ঢাকায় পুলিশ হেফাজত থেকে ছাড়া পেয়ে গেলেন বঙ্গবন্ধুর সরাসরি হস্তক্ষেপে। কেউ একজন নিশ্চয়ই উনাকে বুঝিয়েছিলো যে মোজাম্মেল তাঁর দলেরই লোক। সে এই কাজ করতেই পারেনা, নিশ্চিতভাবেই তাকে ফাসানো হয়েছে।

মুক্তি পাবার পর মোজাম্মেল মেজর নাসেরকে বললেন,

– “আমি আপনাকে বলেছিলাম টাকা নিতে। আপনারই লাভ হতো। আমিতো ছাড়া পেয়েই গেলাম আর আপনি কিছুই পেলেননা। “

বেঙ্গল ল্যান্সারে এই ঘটনার খবর পৌছালে তারা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। মেজর ফারুক তৎক্ষণাৎ বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করতে চাইলেন। তিনি ক্যাপ্টেন শরিফুল হোসেনকে বললেন,

– “শরিফুল, এর কোন মানে নেই। চলো গিয়ে এই লোকটাকে টপকে দেই।“

ক্যাপ্টেন শরিফুল জবাব দিলেন,

– “ঠিক আছে স্যার। তবে আরেকটু ভাবতে পারেন।“

মেজর ফারুক জবাব দিলেন,

– “আচ্ছা, আমি ভেবে দেখবো।“

সেই মুহুর্ত সম্পর্কে মেজর ফারুক এন্থনী ম্যাসকারেনহাসের কাছে পরবর্তীতে বলবেন,

– “আমার সাথে আমার সেনারা ছিলো। আমি জানতাম কিভাবে অস্ত্র ব্যবহার করতে হয়, কিভাবে চমকে দিয়ে হয়, কিভাবে গুলি করতে হয় অথবা এমবুশ করতে হয়। ওই মুহুর্তে বেঙ্গল ল্যান্সারের সেনারাই শেখ মুজিবের বাড়ির প্রহরার দ্বায়িত্বে ছিলো। আমি ভাবছিলাম গাড়ী চালিয়ে চলে যাবো, এরপর গার্ডদের বলবো, ‘ঠিক আছে, ওমরা আরাম করো!’, এরপর ভেতরে গিয়ে গুলি করে চলে আসবো।

এরপর আমি বুঝলাম এটা গর্ধবের মত কাজ হতো। আমি ভাবছিলাম না, আমি আবেগে চলছিলাম। আমি এতোদুর কল্পনা করিনি, তাই আমি আমার সেনাদের উপর এত ভরসা করছিলাম। তারা আমার অনুভুতি জানতো, ওরা আমাকে ধোঁকা দিতনা।“

মেজর ফারুক এ ব্যাপারে এন্থনি ম্যাসকারেনহাসকে আরো বলেছিলেন,

-“আপনার কি মনে আছে যেদিন শেখ মুজিব দেশে ফিরেছিলেন সেদিন কেমন আনন্দ করেছিলাম? সারা দেশ, দেশের মানুষ পাগল হয়ে গিয়েছিলো। আমরা তাকে ঈশ্বর বানিয়ে ফেলেছিলাম প্রায়! ১৯৭২ এ যদি উনি বলতেন সব আওয়ামীলীগার আর সব ব্রিগেড কমান্ডারকে বেঁধে নদিতে ফেলে দাও, তাহলে জনতা তাই করতো। কেউ কোন প্রশ্ন তুলোতোনা। আমিও তুলতামনা। কেন? কারন শেখ মুজিব তা বলতেন। কিসের জন্য? কেউ জিজ্ঞেসই করতোনা। আমিও জিজ্ঞেস করতামনা। আমরা ভাবছিলাম আমরা একটা দেশ পেয়েছি, একজন নেতা পেয়েছি। আমরা সবকিছু করতে রাজী ছিলাম। কোন সমস্যাই আমাদের কাছে বাঁধা হতোনা। সৈনিক, মানুষ, পদবী কিছুই ব্যাপার ছিলনা। এটা এমন এক চরম অনুভুই ছিলো এবং এটা কেবল একজনের ছিলনা, হাজার হাজার মানুষের মধ্যেই ছিলো। সব পার্থক্য দূর হয়ে গিয়েছিলো। আর এ কারনেই ব্যাপারটা এমন তিক্ত লাগছে। আমি বলবো, এই লোকটা এই শতাব্দীর সবচেয়ে বড় অপরাধ করেছে বিশাল এক জনগোষ্ঠীর অনুভুতি ধ্বংস করে।

টঙ্গীর ঘটনার পর আমি আর পদোন্নতিতে, কোর্স, ক্যারিয়ার কিংবা অন্যকিছুত আগ্রহী ছিলাম না, আমি কেবল ভাবছিলাম, কিভাবে এই সরকারের পতন ঘটানো যাবে।“

বঙ্গবন্ধু এই সময়ে সেনাবাহিনীর মধ্যম স্তরের অফিসারদের নিয়ে বিন্দুমার চিন্তিত ছিলেন না। তার মাথায় ছিলো সেনাবাহিনীর উপরের স্তরের কর্মকর্তাদের সামলে রাখা, আর এই কারনে তিনি তাদের উপর সার্বক্ষনিক গোয়েন্দা নজরদারী জারি রেখেছিলেন। কিন্তু সবচেয়ে বেশি বিক্ষুব্ধ ছিলো মধ্যম শ্রেনীর কর্মকর্তারাই।

এই সময়ে তার ভায়রা মেজর রশীদ ১৪ মাসের গানারী কোর্সে ভারতের বোম্বেতে (মুম্বাই) ছিলেন। তার এই বন্ধু, আত্মীয় এবং সহকর্মীর অনুপস্থিতিতে মেজর ফারুক অন্য অফিসার, ব্যক্তি এবং রাজনৈতিক দলের নেতাদের সাথে যোগাযোগ করছিলেন তাদের মতামত জানতে। উনি কর্নেল আমিন আহমেদ, মেজর হাফিজ (ব্রিগেড মেজর ৪৬তম পদাতিক ব্রিগেড, ঢাকায় অবস্থিত), মেজর সুলতান (আর্টিলারী), মেসর নাসের, মেজর গাফফার এবং স্কোঃ লীঃ ইয়াকতের সাথে কথা বলেন গোপনে।

মেজর ফারুকের মতে তিনি বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার সিদ্ধান্তে পৌছেন নানা দিক চিন্তা করে। এর মধ্যে ছিলো, যেহেতু তারা পুরো সেনাবাহিনীর অংশ না, সে কারনে তাদের বিদ্রোহ দমনে এবং শেখ মুজিবকে উদ্ধারে রক্ষী বাহিনী সহ সেনাবাহিনীর অন্যান্য অংশ থেকে তাকে উদ্ধারে সেনা প্রেরন করা হতে পারে। ভারতও সেই সুযোগে বাংলাদেশে সেনা পাঠাতে পারে। তার মতে তিনি বেঁচে থাকলে বিপদ থেকে রক্ষা পেতে বাইরের শক্তির সাহায্যও চেয়ে বসতে পারতেন, যদিও তা গৃহযুদ্ধ শুরু করতে পারতো। এই সকল কারনে তিনি সিদ্ধান্ত নেন শেখ মুজিবকে হত্যাই করতে হবে।

ডিসেম্বর মাস (মধ্যবর্তী সময়), ১৯৭৪
ঢাকা, বাংলাদেশ

এই মাসের মাঝামাঝি সময়ে শেখ মুজিবের হেলিকপ্টার হাইজ্যাকের পরিকল্পনা বাতিল করে দিলেন মেজর ফারুক। তবে সামরিক কায়দায় বিকল্প পরিকল্পনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন উনি। প্রথমে তিনি নামের তালিকা করলেন যে কারা শেখ মুজিবকে মেরে ফেললে হুমকী হতে পারেন। মেজর ফারুক তার চাচা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদ এবং মনসুর আলী সহ আরো কিছু ব্যক্তিকে এই হুমকীর লিস্টে রাখলেন। সামরিক বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে তালিকায় রাখলেন জেঃ শফিউল্লাহ, জেঃ জিয়া এবং তার মামা ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফকে। এর বাইরেও রক্ষী বাহিনীর কথা মাথায় রইলো।

তবে যখন সকল তালিকা করা শেষ হলো এবং এদের কাবু করতে প্রয়োজনীয় সেনার হিসেব করলেন, তখন দেখলেন ছোটখাট একটা সেনাবাহিনীরই দরকার হবে। এরপর তিনি শেখ মুজিবের বাসভবনে ৫০ জনের একটা দল নিয়ে কমান্ডো স্টাইলে অপারেশনের পরিকল্পনা করলেও পরের পরিনতির কথা ভেবে তা বাদ দিলেন। এরপর থেকে মেজর ফারুক রাত জেগে চার্ট তৈরি করতেন, পরিকল্পনা টুকে নিতেন এবং টার্গেট ঠিক করে তা কাবু করতে প্রয়োজনীয় সেনার হিসেব করতেন এবং সকাল হলেই এই সংক্রান্ত সকল কাগজপত্র পুড়িয়ে ফেলতেন।

ফারুক উর্ধতন সেনা কর্মকর্তাদের, বিশেষ করে সেনাবাহিনীর সিজিএস ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের ব্যাপারে বিশদ পরিকল্পনা করেন। খালেদ মশাররফ ছিলেন বুদ্ধিমান এবং ব্যক্তিত্বসম্পন্ন একজন মানুষ। উনি প্রতিক্রিয়া দেখাবেন সেটা ফারুক ধরেই নিয়েছিলেন। তবে পরিকল্পনার একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে ফারুক বুঝতে পারবেন, খালেদ মোশাররফ কিংবা জিয়া, কেউ তার এই কাজে তেমন কোন প্রতিক্রিয়া দেখাবেন না, যার মানে আসলে কেউই কোন প্রতিক্রিয়া দেখাবেন না, কেউই না।

এই পর্যবেক্ষন ভীষনভাবে সঠিক বলে প্রমানিত হবে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সারাদেশ জুড়ে এতো এত নেতাকর্মী, এতো এতো যুদ্ধজয়ী নায়কোচিত যোদ্ধা কিংবা সেনা তখনো বর্তমান ছিলো, তাদের কেউই টু শব্দটা পর্যন্ত করবে না। কেউ না, প্রায় কেউই না!

মেজর ফারুক এরপর তাই চূড়ান্ত পরিকল্পনায় তিনজন মানুষকে রাখলে। শেখ মুজিবুর রহমান, তাঁর ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মনি এবং বোনের স্বামী আব্দুর রব সেরনিয়াবাতকে। এদের মধ্যে শেখ মনি বঙ্গবন্ধুর ডানহাত হয়ে উঠেছিলেন এবং তার সেনাবাহিনীর প্রতি বিদ্বেষ সবারই জানা ছিলো। আব্দুর রব সেরনিয়াবাতও ছিলেন বেশ প্রভাবশালী এবং উচ্চাকাংক্ষী একজন।

এরপরের প্রায় পুরো শীতকাল জুড়েই মেজর ফারুক তার পরিকল্পনা মোতাবেক রেকী করে কাটালেন নানা স্থান। এর মধ্যে ছিলো শেখ মুজিবের দৈনন্দিন রুটিন পর্যবেক্ষন করাও। এই লক্ষ্যে উনি একটা রিক্সা নিয়ে ধানমন্ডির দিকে চএ যেতেন প্রায় রাতেই এবং ধানমন্ডি লেকের পাশে কিছুক্ষন হাটার পর অলস ভঙ্গীতে ৩২ নম্বর অড়কের পাশ দিয়ে চলে যেতেন। মেজর ফারুক কারো উপর ভরসা করেননি। নিজেই বুঝে নিতে চাইলেন বঙ্গবন্ধুর জীবনের গতিবিধি। যদি শেষ মুহুর্তে সেনাসহ হাজির হবার পর দেখা যায় তিনি বাসায় নেই তাহলে বাঁচবার উপায় ছিলনা।

এর বাইরে ভাগ্যক্রমে মেজর ফারুকের ১ম বেঙ্গল ল্যান্সারের সেনাদেরই নিয়োজিত করা হয় বঙ্গবন্ধুর বাড়ির নৈশ প্রহরার কাজে। তিন স্তরের নিরাপত্তা ছিলো বাড়িটিতে। একেবারে বাইরে পুলিশ চেকপোস্ট বসিয়ে সশস্ত্র পুলিশেরা পাহারায় থাকতেন বাড়ির দুইদিকেই। তাদের ব্যাকআপ হিসেবে সেনাবাহিনীর প্রহরীরা বাড়ির গেটে এবং দেয়ালের চতুর্দিকে প্রহরায় থাকতেন। বঙ্গবন্ধুর নিজের পছন্দকৃত দেহরক্ষীরা সশস্ত্র অবস্থায় বাড়ির নিচতলার করিডরে সবসময় পাহারায় থাকতেন।

নিজের ইউনিটের সৈনিকদের সাথে কথা বলে উনি নিশ্চিত হবেন আসলে বাড়ির ভেতরে ঠিক কিভাবে চলে সবকিছু। এরপর তিনি আসেপাশের এলাকা ঘুরে সড়কের প্রতিবন্ধকতা এবং অন্যান্য বিষয় সম্পর্কে অবগত হবেন। একই পদ্ধতিতে শেখ মনি এবং আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের বাসভবনের ব্যাপারেও রেকি করা হবে। যদিও সেখানে কোন সেনা প্রহরা ছিলো না, তাই অনেকটা অনুমানের উপরেই নির্ভর করতে হবে।

রক্ষী বাহিনী ব্যাপকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠছিলো। তাই হয়তো বঙ্গবন্ধু নিজেই সেনাবাহিনীকে আর সেভাবে হুমকী মনে করছিলেন না। তবে ভেতরে ভেতরে সামান্য একজন মেজর তার পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। মার্চের মধ্যবর্তী সময়ে মেজর রশীদও ভারত থেকে ফিরে আসলেন। তার কাছেও বিশদ পরিকল্পনা তুলে ধরলেন মেজর ফারুক। তাদের মধ্যে ফয়সালা করবার মত এখন কেবল একটাই বিষয় বাকী আছে। আর সেটা হচ্ছে শেখ মুজিবকে টপকে দেবার পর দেশের নেতার আসনে কে বসবেন?

মেজর ফারুক রহমান, সিও, ১ম বেঙ্গল ল্যান্সার (তখন পর্যন্ত দেশের একমাত্র ট্যাঙ্ক রেজিমেন্ট) এবং মেজর খন্দকার আব্দুর রশীদ, সিও, সেকেন্ড ফিল্ড আর্টিলারী রেজিমেন্ট তাদের পরিকল্পনায় এগিয়ে যাচ্ছিলেন।

১ লা জানুয়ারী, ১৯৭৫
ষোলশহর, চট্টগ্রাম
বাংলাদেশ

জরুরী অবস্থা জারী করে চিরুনী অভিযান শুরুর মাত্র চারদিনের মাথায় ধরা পরেছেন সিরাজ শিকদার। তাঁকে সরাসরি উড়িয়ে নিয়ে আসা হলো ঢাকায়। বিমানবন্দর থেকে সাভারের রক্ষী বাহিনীর ক্যাম্পে নেবার পথে উনি পালাতে গিয়ে মারা গেলেন। যদিও পরে তার বাবা যখন ছেলের মৃতদেহ দেখবেন তখন দেখবেন তার ছেলের বুকের সামনের দিক থেকে ছয়টি গুলিবিদ্ধ হবার কারনে ক্ষত রয়েছে। কি অসাধারন দক্ষতা ছিলো সেই সময়ের পুলিশ অথবা রক্ষী বাহিনীর সদস্যদের। নিখুত নিশানা বুককেই খুঁজে নিয়েছিলো কাছাকাছি অবস্থানে, তাও আবার পালাবার সময় উনি দুর্ভাগ্যবশত সামনাসামনি ধরা পরে গিয়েছিলেন। পুলিশের পক্ষ থেকে অফিসিয়ালী ঘোষনা করা হয়,

– “পালাবার সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন।“

আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই ধরনের বক্তব্য আমাদের যুগ যুগ ধরে অতি চেনা বক্তব্য হয়ে উঠবে। আর এভাবেই হত্যা করা হলো প্রথম বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনকারী মানুষটিকে। ধরে নেই সিরাজ শিকদার লুটেরাই ছিলেন, সন্ত্রাসী ছিলেন। কিন্তু তিনি সম্ভবত নিজের পকেট ভারী করেননি। লুটের সম্পদ কিংবা খাদ্য বিলিয়ে দিতেন ক্ষুধার্ত মানুষের মধ্যে। যদিও এ লক্ষ্যে যে পথ ইনি বেছে নিয়েছিলেন তা ছিলো ভুল পথ। সহিংসতা কেবল সহিংসতাই বাড়ায়। তবে হত্যা করলে প্রথমে তাদের এমন ক্রসফায়ার কিংবা বিচার বহির্ভুত হত্যার আওতায় আনা উচিত ছিলো যারা ক্ষুধার্ত মানুষের মুখের খাবার কেড়ে নিচ্ছিলো।

২৫শে জানুয়ারী ১৯৭৫
ঢাকা, বাংলাদেশ

দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি ধীরে ধিরে খারাপ হচ্ছিলো। গত বছরের ডিসেম্বরের ২৮ তারিখ থেকে দেশে জরুরী অবস্থাও জারী করা হয়েছে। দেশ জুড়ে চলছে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সেনাবাহিনীর যৌথ অভিযান। এরই মধ্যে আজ সংসদে চতুর্থ সংশোধনীর আওতায় নিজেকে দেশের প্রেসিডেন্ট ঘোষনা করেছেন শেখ মুজিবুর রহমান। সংবিধান সংশোধনী কার্যকরের দিন থেকে পাঁচ বছরের জন্য উনি নির্বাচিত হলেন প্রেসিডেন্ট। স্বরাস্ট্রমন্ত্রী মনসুর আলী হলেন নতুন প্রধানমন্ত্রী। এর মাধ্যমে উনি এগিয়ে যাচ্ছিলেন পার্লামেন্টারী পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা থেকে একদলীয় শাসন ব্যবস্থার অধীনে অনেকটা একনায়কতান্ত্রিক প্রেসিডেন্সিয়াল পদ্ধতির দিকে।

সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দিষ্ট করে বলা হলো যে যখন একটি জাতীয় দল ঘোষনা করা হবে তখন নিম্নলিখিত ধারাগুলো কার্যকর হবেঃ

– যদি কেউ সংসদের সদস্য হন, তবে যেদিন থেকে জাতীয় দলটি গঠিত হবে, তার সদস্যপদ শুন্য বলে গন্য হবে যদিনা তিনি প্রেসিডেন্টের নির্দিষ্ট করে দেয়া সময়ের মধ্যে সেই জাতীয় দলটির সদস্যপদ গ্রহন করেন।
– প্রেসিডেন্ট অথবা সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচনের জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হবেননা যদিনা প্রার্থী হিসেবে জাতীয় দলের দ্বারা মনোনীত হন।
– কেবলমাত্র জাতীয় দলটি ছাড়া অন্য কোন দলের রাজনৈতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহন করা যাবেনা, বা অন্য কোন রাজনৈতিক দল গঠন করা কিংবা তার সদস্যও হবার অধিকার বাতিল বলে গন্য হবে।

সংসদে এই সংশোধনীর বিস্তারিত পাঠ করা কিংবা কোন ধরনের আলোচনা ছাড়াই তা পাস করা হলো। কারন এর আগেই সংসদের কার্যবিধির সাধারন নিয়মাবলী স্থগিত করা হয়েছিলো। মাত্র আধঘন্টার মধ্যেই এই সংশোধনী পাসের প্রক্রিয়া সমাপ্ত হয়ে গেলো। আর এভাবেই একদলীয় শাসন ব্যবস্থার সুচনা হলো জনগন কিংবা ভোটারদের মতামত ছাড়াই।

চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে আইনগতভাবেই শেখ মুজিব তার বিরোধীদের মুখ বন্ধ করে দেবার চরম পথটি বেছে নিলেন। কেউ কোন ধরনের রাজনৈতিক কর্মকান্ডে অংশ নিতে পারবেনা যদি না সে এই জাতীয় দলটির সদস্য হয়। এবং সেই দলটির সদস্যপদও দলের সংবিধান অনুযায়ী দলের চেয়ারম্যান শেখ মুজিবুর রহমানের সম্মতি ছাড়া পাওয়া যাবে না। কেবলমাত্র একটা দল কিংবা শেখ মুজিবুর রহমান সিদ্ধান্ত নেবেন কারা কারা নির্বাচনের প্রার্থী হতে পারবেন আর ভোটারেরা তাদের মধ্যে থেকেই একজনকে বেছে নিতে বাধ্য থাকবেন। এই ব্যাপারে শেখ মুজিব বলেছিলেন,

– “আমি একজন, দুজন কিংবা তিনজনকে মনোনীত করবো সংসদের আসনে নির্বাচনের জন্য। জনগন বেছে নেবে এদের মধ্যে কে ভালো কে খারাপ।“

একটা মানুষ অতিমানব হলেও তার পক্ষে কিভাবে জানা কিংবা বোঝা সম্ভব ৩০০ থেকে ৯০০ মানুষকে, যাদের তিনি নিজে সংসদের আসনের জন্য পছন্দ করতেন?

এইদিনই বঙ্গবন্ধু জাতীয় সংসদে বক্তব্য দিলেন। দুস্কৃতিকারীদের নিঃচিহ্ন করা হচ্ছে বলে তিনি উচ্চারন করলেন,

– “কোথায় আজ সিরাজ শিকদার?”

উনি তখনো জানতেন না, উনিও খুব কম সময় পরেই আর থাকবেন না। উনারও সময় শেষ হয়ে আসছিলো দ্রুতই।

সিরাজ শিকদারও একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। যদিও তিনি রাজনৈতিক ভাবে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গীতে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। উনি ১৯৭১ সালের ৩ জুন পুর্ববাংলা সর্বহারা পার্টি গঠন করেন। যারা প্রধানত সাধারন মানুষের মুক্তির জন্য যুদ্ধে অংশ নেন। বামপন্থী নেতা একটি গেরিলা বাহিনীর প্রধান হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহন করেন। তবে স্বাধীনতার পরপরই উনি শেখ মুজিব সরকারকে দেশের প্রধান শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং নিজের গেরিলা দলকে সংগঠিত করেন। সরকার কোন পথে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এটা কিছু সময় দেখবারও প্রয়োজনবোধ করেননি তিনি। তার দলের সদস্যরা প্রায়ই সরকারি গুদাম ভেঙ্গে খাদ্যশস্য জনতার মাঝে বিতরন করতো। ঠিক যেন রবিনহুড। এই ধরনের কার্যক্রমের জন্য একেবারে নিম্নশ্রেনীর মানুষের কাছে এবং মার্ক্সবাদীদের কাছে কিছুটা জনপ্রিয়তাও পাচ্ছিলেন। আবার তার দলের নানা জায়গায় সস্শস্ত্র হানার জন্য জীবন দুর্বিসহও হয়ে উঠছিলো। ২৮ শে ডিসেম্বর ১৯৭৪ সালে মুজিব সরকার জরুরী অবস্থা জারী করে অভিযান শুরু করলে উনি আত্মগোপন করেন।

ফেব্রুয়ারী মাস, ১৯৭৫
ঢাকা, বাংলাদেশ

সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং অন্যান্য নানা কারনে রক্ষী বাহিনীর ভাবমুর্তি জনসাধারনের কাছে অসহনীয় হয়ে উঠেছিলো। শেখ মুজিব একরকম বাধ্য হয়েই জাতীয় রক্ষী বাহিনীকে সংস্কারের উদ্যোগ নিলেন। পাস হলো জাতীয় রক্ষী বাহিনী (সংশোধনী) অধ্যাদেশ, ১৯৭৫। এর মাধ্যমে লঘু এবং গুরু নানা অপরাধের বর্ননা দিয়ে তার অধীনে এই বাহিনীর কর্মকর্তা এবং সদস্যদের শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা হলো। এখন থেকে আদালতে তাদের বিচার করা যাবে।

তবে একটু বেশিই মনে হয় দেরী হয়ে গেলো এই সংশোধনীর প্রয়োজনীয়তা বুঝতে। ইতিমধ্যেই অন্যান্য অপরাধের বাইরে কেবল ১৯৭৩ সালেই প্রায় দুই হাজারের মত রাজনৈতিক হত্যা করে ফেলেছে এই বাহিনী, যাদের মধ্যে বেশ কয়জন সংসদ সদস্যও রয়েছেন।

স্বাধীনতার পর দেশের অবস্থা এবং প্রাসঙ্গিক কিছু কথাঃ
১৯৭২ সাল শেখ মুজিব সরকারের প্রথম বছর ছিলো, বিচ্ছিন্ন সহিংসতা এবং নানা পুনর্গঠনমুলক কাজ শুরু হয় এই সময়। তবে সময়টা শেখ মুজিব সরকারের জন্য এতোটা খারাপ ছিলো না। সমস্যার শুরু হয় ১৯৭৩ সাল থেকে, নানা ক্ষেত্রে ব্যর্থতার অভিযোগ আসতে থাকে, প্রত্যাশা ছিলো অনেক, তবে পুর্নতা না পেয়ে রাজনৈতিক ইন্ধন ও ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকে শুরু হয় ব্যাপক সহিংসতা। সরকার এবং বিরোধী দুই পক্ষই সহিংসতা অথবা নৃশংসতার আশ্রয় নেয়। এর পরের বছর ছিলো দুর্ভিক্ষের। প্রায় লাখ খানেক লোক মারা যায় এই দুর্ভিক্ষে। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি সরকারী এবং দলীয় লোকেদের লুটপাট এবং অব্যবস্থাপনাও এর পেছনে দায়ী ছিলো। আর শেষ বছর বা ১৯৭৫ সাল ছিলো বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম ঘটনাবহুল বছর। বঙ্গবন্ধু ষাটের দশক থেকে শুরু করে দেবতাতুল্য আসনে ছিলেন বাঙ্গালীর মনে। তবে এই সময় এই ভাবমুর্তির অনেকটাই নষ্ট হয় নানা কারনে। যার অন্যতম একটা কারন ছিলো রক্ষী বাহিনী এবং আওয়ামী লীগের একশ্রেনীর নেতাকর্মীদের ব্যাপক অনাচার।

স্বাধীনতার পরপরই অতিরিক্তমাত্রায় চোরাচালান শুরু হয় ভারতের নাগরিকদের মাধ্যমে। এর পেছনে একটা কারন ছিলো মুজিব সরকারের ভারতীয় রুপীকেও গ্রহনযোগ্য মুদ্রা হিসেবে ঘোষনা করা। যদিও টাকা ছাপা হয়েছিলো পর্যাপ্ত পরিমানেই এবং জনগনের হাতে পৌছে গিয়েছিলো। বাংলাদেশ পরিনত হয় বিশাল একটা সেতুতে যেটা শেষ হয়েছে ভারতে গিয়ে। অসাধু ব্যবসায়ী এবং কর্মকর্তারা খাদ্যশস্য, পাট, আমদানীকৃত যন্ত্রপাতি এবং বৈদেশিক ত্রানের মালামাল সহ যা পারতো সবই ভারতে পাচার করা শুরু করে। এমনিতেই যুদ্ধের কারনে মুখ থুবড়ে পরা অর্থনীতি এগিয়ে যায় সম্পুর্ন ধ্বংসের পথে। যদিও অর্থনীতির অবস্থা এমন হবার কথা ছিলোনা, দেশের প্রথম বাজেটই ছিলো উদ্বৃত্ত বাজেট এবং এর পরের তিনবছরেও সেই সময়ের প্রায় দুই বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক সাহায্য আসে দেশে। ১৯৭৩ সালের শেষের দিকে এসে সরকার প্রায় দেউলিয়া অবস্থায় ছিলো। এমন না যে সরকার জনগনের কল্যানে কোন ব্যয় করেনি, কিন্তু শুরুতেই, কিংবা বিতরনের পথে কিংবা একেবারে শেষ পর্যায়ে চলা লুটপাটের কারনে জনগন আসলে কিছুই পায়নি।

এই লুটপাটে জড়িত বেশিরভাগই আবার গায়ে চড়িয়েছে আওয়ামী লীগের ট্যাগ। কয়েকবছর আগেও যারা সাচ্চা পাকিস্তান প্রেমী ছিলো তারাও আওয়ামী লীগ, তা না হলেও তাদের আত্মীয়ের মধ্যে কেউ না কেউ আওয়ামী লীগ, কর্মকর্তাদের সবাই আওয়ামী লীগ, আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হতে থাকা ব্যবসায়ীদের সবাই আওয়ামী লীগ। সত্যি পৃথিবীর নানা দেশ পায় ভাগ্যক্রমে সোনার খনি, আর শেখ মুজিব পেয়েছিলেন চোরের খনি। বঙ্গবন্ধু নিজেই হয়তো হতাশায় উচ্চারন করেছিলেন,

– “আমার কম্বল কই?”

১৯৯২ সালে জাতীয় সংসদে এই কথা মনে করিয়ে দিয়ে যখন খালেদা জিয়া টিপ্পনী কাটবেন, তখন বিরোধীদলের নেত্রী শেখ হাসিনা প্রতিবাদ করেননি। উনি নিজেও এই কথা শুনেছিলেন নাকি আমার জানা নেই। বিরোধীদের প্রতি রক্ষী বাহিনীর মাধ্যমে নির্দয় হওয়ার সাথে সাথে নিজের দলের লোকেদের প্রতিও নির্দয় হওয়া উচিত ছিলো। ত্রান কিংবা সাহায্য বিতরনের সাথে বিরোধীরা জড়িত ছিলো বলে আমার সাদামাটা যুক্তিতে মনে হয়নি। পরিবর্তনটা যে নিজের ঘর থেকেই শুরু করতে হয় সবসময়ের জন্যই এ কথাটা ভীষনভাবেই সত্যি।

বঙ্গবন্ধুর কৃষক শ্রমিক জনতার অংশ মুক্তিযদ্ধাদের প্রতি বিশেষ মমতা ছিলো, যারা সকল মায়া ত্যাগ করে যুদ্ধে অংশ নেন। স্বাধীনতার পর এদের একটা বড় অংশকে সেনাবাহিনীর অংশ করা হয়। সেনাবাহিনীর প্রায় অর্ধেকই গঠিত হয় এদের নিয়ে। সেনাবাহিনীতে পাকিস্তান প্রত্যাগতদের আগমনের আগ পর্যন্ত অংশ ছিলো দুইটা। একটা সাধারন জনগনের অংশ মুক্তিযোদ্ধা, যাদের যথার্থ সামরিক প্রশিক্ষন, আর সামরিক মানসিকতার অভাব ছিলো যেটা খুবই স্বাভাবিক। আরেকটা অংশ ছিলো পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অংশ, যারা দীর্ঘ্যদিন থেকে এই জীবনে অভ্যস্ত ছিলো। এই দুই অংশের মধ্যে একটা পার্থক্য ছিলো, যদিও প্রথম দুই বছর এই ভেদাভেদ প্রকট ছিলোনা। ধীরে ধীরে এই ভেদাভেদ বাড়তে থাকে।

এর পরে অবস্থা আরো জটিল হয় পাকিস্তান থেকে আটকে পরা সামরিক বাহিনীর সদস্যরা যোগদান করলে। তারা দেখতে পান তাদের সহকর্মীরা জেনারেল, ব্রিগেডিয়ার, কর্নেল হয়ে গেছেন আর সর্বক্ষেত্রেই তাদের কর্তৃত্ব। সেনাবাহিনী সহ প্রশাসনে সর্বক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের দেয়া হয়েছিলো বেশ কয় বছরের পশ্চাদ জেষ্ঠ্যতা। এদিকে প্রত্যাগত অফিসারদের প্রধানত সাধারন দ্বায়িত্বে দেয়া হয়। তাদের প্রধান কাজহয় অস্ত্র উদ্ধার, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের নির্মুল করা এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ওএসডি করে রাখা হয়। বেসামরিক ক্যাডারের অফিসারদেরও কিছুটা একই অবস্থা ছিলো। বংবন্ধুর সরকার মুক্তিযদ্ধা অফিসারদের বিশেষ সুবিধা এবং দ্রুত প্রমোশন প্রদান করে তাদের অনেক উচুতে নিয়ে যান। পাকিস্তান ফেরত অফিসারদের মধ্যে এই ব্যাপারে ব্যাপক অসন্তোষ ছিলো। মুক্তিযোদ্ধা অফিসার সহ সরকারও এদের তরফ থেকে ক্যু এর আশংকা করতো।

এরই মধ্যে শেখ ফজলুল হক মনি, যিনি ইতিমধ্যে জাতির ভাগ্নে হিসেবে পরিচিতি পেয়ে গিয়েছিলেন, তার মস্তিস্কপ্রসুত হয়ে জন্ম নেয় মুজিববাদ। জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা,গনতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্র ছিলো এর মুল ভিত্তি। বঙ্গবন্ধু আশা প্রকাশ করেন এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গন এবং বন্ধু রাস্ট্র ভারত উভয়ের সাথেই সম্প্রিতির সম্পর্ক বজায় থাকবে। উনি ধর্মভিত্তিক রাজনীতিও নিষিদ্ধ ঘোষনা করলেন। তবে বাস্তবতা এটাই ছিলো যে বাংলাদেশের মানুষ ধর্মভীরু। সরকার এবং বিরোধীদল সবাই এই ব্যাপারে সতর্ক ছিলো সবসময়। এমনকি বামপন্থীরাও ধর্ম নিয়ে কোন ধরনের মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকতো। তবে এই মুজিববাদও ধর্মান্ধ রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচারনার অংশ হয়ে দাঁড়ায়।

বঙ্গবন্ধুর একমাত্র ভাই শেখ নাসের সাধারন একজন মধ্যবিত্ত থেকে দেশের প্রধান ধনীদের কাতারে নাম লেখান। তাকে দেয়া হয় সরকারী নানা কাজ যার মধ্যে ছিলো বৈদেশিক সাহায্যের ত্রান পরিবহন এবং বিতরনের দ্বায়িত্বও। বঙ্গবন্ধুর এক বোনের স্বামী এইএম সাইদ হোসেন ১৯৭০ সালে ছিলেন সচিবালয়ের সামান্য একজন সেকশন অফিসার, সেখান থেকে ৭২ সালে সরাসরি জয়েন্ট সেক্রেটারী এবং ১৯৭৫ সালে অতিরিক্ত সচিব হয়ে যান সংস্থাপন মন্ত্রনালয়ের। যার কাজ ছিলো সকল ধরনের পদ বন্টন, পদোন্নতি এবং বদলির ব্যাপারে কাজ করা। এ সময় পছন্দের লোকদের উপর পক্ষপাতিত্বের অভিযগ ওঠে এবং ব্যাপক প্রচারনা পায়। উনার আরেক বোনের স্বামী আবদুর রব সেরনিয়াবাতকে বানানো হয় কেবিনেট মন্ত্রী, যদিও এর আগে তেমন কোন পরিচিতি ছিলনা উনার। শেখ ফজলুল হক মনির উত্থান ছিলো সবচেয়ে বিস্ময়জনক। একজন সামান্য রিপোর্টার থেকে স্বাধীনতার পর সরকারী দৈনিক বাংলাদেশ টাইমসের সম্পাদক এবং যুবলীগের প্রধান হয়ে বসেন। উনার পরিচিতি ছিলো জাতির ভাগ্নে নামে। এর বাইরে মাত্র ২৪ বছর বয়সী উনার চতুর্থ বোনের ছেলে শহীদুল ইসলামকে ৭৫ সালে মন্ত্রীর পদ দেয়া হয়। যদিও তিনি ছিলেন খুবই মেধাবী একজন ছাত্র এবং অন্যদের চেয়ে ভাবমুর্তি অনেক উজ্জ্বল ছিলো। তবে প্রচারনা ভালো হলে সবই হার মানে। সাধারন জনগনের কাছে শহীদুল ইসলামও ভিলেন রুপেই পরিচিত হলেন।

এর বাইরে বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে প্রচারনা কিংবা অপপ্রচার চলচতেই থাকে। শেখ মুজিবের বড় ছেলে শেখ কামালের বিরুদ্ধে ব্যাঙ্ক ডাকাতির প্রচারনা চলে। যদিও এই অভিযোগ কতটা সত্যি সেটা নিয়ে সন্দেহের যথেষ্ঠ অবকাশ আছে। সেই সময়ে মুজিব পরিবারের যে ক্ষমতা ছিলো, তাতে অর্থের জন্য ব্যাঙ্ক ডাকাতির মত ঝুকিপুর্ন কাজের দরকার ছিলনা। বঙ্গবন্ধুর আরেক ছেলে শেখ জামালকে পাঠানো হয় স্যান্ডহার্স্টের ঐতিহ্যবাহী সামরিক একাডেমীতে। এ ব্যাপারে সরকারী প্রভাব খাটানো হয় এবং সরকার বড় একটা অর্থের বিনিময়ে এই প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করেন। এর পেছনে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিলো যে একসময় শেখ জামাল সেনাবাহিনীতে নেত্বৃত্বের ভুমিকা নেবেন, যাকে শেখ মুজিব বলতেন, “আমার সেনাবাহিনী”। শেখ জামালের সেনাবাহিনীতে ঢুকবার এই ব্যাপারটা সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের একটা বড় অংশের পছন্দ ছিলনা। তারা মনে করতেন এর মাধ্যমে প্রভাব খাটিয়ে অন্যদের বাদ দিয়ে শেখ জামালকে সেনাবাহিনীর উপরের আসনে বসানো হবে দ্রুতই।
.
পরিবারের ভাবমুর্তি নষ্ট করবার পেছনে সম্ভবত সবচেয়ে বড় হাত ছিলো জাতির ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মনির। স্বাধীনতার পর উনি যুবলীগের তরুন একটা অংশকে নিয়ে একটা সশস্ত্র সংগঠন গড়ে তোলেন। তার ক্যাডারেরা অস্ত্র বহন করতো নির্ভয়ে যদিও বঙ্গবন্ধু অস্ত্র সমর্পনের আহবান জানিয়েছিলেন সকলকেই। ৭২-৭৫ এর মধ্যবর্তী সময়ে শেখ মনি সরকারী মুখপাত্র বাংলাদশ টাইমসের সম্পাদক হন এবং বেশ কিছু সাপ্তাহিক ম্যাগাজিনের মালিক ছিলেন। ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিলো তার ব্যাপক প্রভাব। বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের মালিকও ছিলেন তিনি, যেগুলো বিদেশ থেকে রিলিফের মালামাল আমদানিতে নিয়োজিত ছিলো। রিলিফের মাল ছিলো সেই সময়ে বেশ সুস্বাদু খাদ্য, আকর্ষনীয় জিনিস। এই ব্যবসা কিংবা কাজ তাঁকে দেয় অগাধ সম্পদ। দেশের সেই দৈন্যদশায় বেশ কয়টি গাড়ি এবং বাড়ির মালিক বনে যান তিনি।

এর বাইরে শহীদুল ইসলামের বিরুদ্ধে প্রচারনা চলে যে তিনি বেশ কিছু ব্যাঙ্ক ডাকাতিতে অংশ নিয়েছেন তার মামাতো ভাই কামালের সাথে। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ৭ জন ছাত্রকে হত্যার অভিযোগও ওঠে তার বিরুদ্ধে। প্রচারনা চালানো হয় যে একটী সরকারী ব্যাঙ্কের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের মেয়েকে বঙ্গবন্ধুর সরাসরি চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে তিনি বিয়ে করেন। যদিও তিনি যেমন মেধাবী আর সুদর্শন ছিলেন, সেই তরুনীর স্বেচ্ছায়ই তাঁকে বিয়ে করবার কথা যদিনা অন্য কোথাও সম্পর্ক থেকে থাকতো।

প্রথমদিকে বঙ্গবন্ধু ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকে পাত্তা দিতেন না। পাকিস্তানীদের দোসর হিসেবে কাজ করেছে এই ধারনার কারনে ইসলামিক ফাউন্ডেশনকেও নিষিদ্ধ করেন। অন্য ধর্মভিত্তিক দলকে কোন ধরনের পাত্তা দেননি। বঙ্গবন্ধু পরে সম্ভবত পরে এই অবস্থানকে ভুল মনে করেছিলেন, এবং তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শেষদিকে তিনি তার ট্রেডমার্ক ‘জয় বাংলা’ শব্দযুগলের সাথে সাথে ‘আল্লাহ হাফেজ’, ‘খোদা হাফেজ’ এমন ইসলামী সম্বোধন এবং শব্দের ব্যবহারও করা শুরু করেন। ইসলামিক একাডেমী নতুন করে গঠন করেন। ইসলামিক দেশগুলো এবং পশ্চিমাদের সাথে সম্পর্কের উন্নতিরও চেষ্টা চালান উনি। ২২শে ফেব্রুয়ারী, ১৯৭৪ সালে লাহোরে ওআইসির সম্মেলনে যোগ দেন এবং যুক্তরাস্ট্র সফর করেন ওয়াশিংটনে। এরই মাঝে আবার উনি বিশেষ কিছু শর্তের মাধ্যমে রাজাকার, যুদ্ধাপরাধী এবং তাদের দোসরদের সাধারন ক্ষমা ঘোষনা করে মুক্তি দেন। এর উদ্দেশ্য ছিলো বহুমুখী। পাকিস্তানে আটকে পরা বাঙ্গালীদের নিরাপত্তার বিধান করা, ধর্মীয় কিছু রাজনৈতিক দলকে খুশী করা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শক্তিশালী কিছু দেশের সাথে সম্পর্ক জোরদার করা এর অন্যতম কারন ছিলো। এর বাইরে এদের বন্দী রাখবার পেছনে সরকারের বিশাল অর্থ ব্যয় হচ্ছিলো। তবে সাধারন মানুষ এবং বামপন্থীরা এই সিদ্ধান্তে খুশী ছিলনা। যদিও এই ক্ষমার মানে এই ছিলনা যে সকলের নিশর্ত মুক্তি। জনগনের কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ চাইলে আদালতে তারা বিচার চাইতে পারতো। তবে নির্মম সত্য হলো এইযে, এরা যে একবার বের হলো জেল থেকে, এরপর থেকে এরা আরো অনেক শক্তিশালী এবং সংগঠিত হয়ে উঠবে।

আমার মতে বঙ্গবন্ধুর জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিলো তাঁর পরীক্ষিত সঙ্গীদের থেকে দূরে সরে যাওয়া। তাজউদ্দীন আহমেদের ব্যাপারে বঙ্গবন্ধুর কাছে কান ভারী করবার কাজটা ঠিকমতই এগিয়ে নিচ্ছিলেন শেখ ফজলুল হক মনি, তোফায়েল আহমেদ এবং মোশতাক আহমেদরা। বঙ্গবন্ধুর প্রধান রাজনৈতিক উপদেষ্টা এখন তোফায়েল আহমেদ, শেখ মনি এরাই। এর আগেও মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়েই তাজউদ্দীন আহমেদের অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হবার ব্যাপারে উনারা প্রকাশ্যেই উচ্চকন্ঠ ছিলেন। তাদের ধারনা ছিলো তাজউদ্দীন আহমেদ অতিরিক্ত ক্ষমতাধর হয়ে উঠছেন এবং তার বামপন্থী চিন্তাধারা বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান থেকে মুক্তি পেয়ে ফিরে এলে সমস্যার সৃষ্টি করবে।

এর আগেও তারা মুজিব নগর সরকার গঠনের সময় তার প্রধানমন্ত্রী হবার ব্যাপারে আপত্তি তুলে কিন্তু তাদের সেই কথায় ভারত সরকার কান দেয়নি। তারা পরে আলাদা ভাবে মুজিব বাহিনী গঠন করে যা সরাসরি ভারতীয় সেনাবাহিনী দিয়ে পরিচালিত এবং প্রশিক্ষিত হতো। স্বাধীনতার পরেও এই দ্বন্দ্ব চলতে থাকে এবং এই কারনেই তাঁকে কেবিনেট থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। যার স্থলাভিষিক্ত হন শেখ মনি, ১৯৭৩ সালে। শেখ মুজিবের উত্তরসুরী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে আপ্রান চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন উনি।

একমাত্র তাজউদ্দীন আহমেদই ছিলেন শেখ মুজিবের প্রকৃত শুভাকাংখী। তিনি ছাড়া আর কেউ সত্য বলবার সাহস করতেন না। অর্থমন্ত্রী থাকাকালীন সময়ে তিনি অনেক প্রতিকুলতার পরেও সেসব দেশ স্বাধীনতার বিরোধীতা করেছিলো তাদের থেকে সাহায্য নিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এইসব ব্যাপারে প্রধানত ডানপন্থীরা বঙ্গবন্ধুর কান ভারী করে।

চলবে…

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 6 = 4