**** রক্তাক্ত ১৫ই আগস্ট, ১৯৭৫এর পথে – পর্ব – ৫ ****

?w=640&h=361″ width=”600″ />
১৫ই আগস্ট, ১৯৭৫
ঢাকা ক্যান্টোনমেন্ট, ঢাকা
রাত ১টা

১ম বেঙ্গল ল্যান্সারের গ্যারেজের সামনে প্রায় ৬০০ সৈনিক অপেক্ষা করছিলো পুর্ন প্রস্তুতিতে। আর এদিকে অফিসারেরা প্রথমে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে নিলেন। দুই ইউনিটের কোন অফিসারই আপত্তি করলেন না প্রাথমিকভাবে। আর এরপর মেজর ফারুক সেনাদের সামনে এগিয়ে গেলেন। উনি সৈনিকদের মাঝে কাজ করা ভীতিগুলোকেই কাজে লাগালেন। উনি বললেন,

– “সেনাবাহিনীকে ভেঙ্গে দেয়া হবে, ল্যান্সার, আর্টিলারী বলে আর কিছু থাকবেনা আর তোমরা হবে দাস। দেশের থেকে ইসলামের নাম মুছে ফেলবার চেস্টা করা হচ্ছে। দেশ, সেনাবাহিনী আর ইসলামকে রক্ষা করতে আমাদের সবার উচিত এখনই এর জবাব দেয়া। রাজনৈতিকভাবে সবকিছু মেজর রশীদ তার পরিচিতদের মাধ্যমে সামলে নেবে এবং শেখ মুজিবের পর খন্দকার মোশতাক আহমেদ দ্বায়িত্ব নেবেন।“

এরপর ফারুক অফিসারদের উদ্দেশ্য করে বললেন,

– “তোমরা কি আমার সাথে আছো?”

অফিসাররা কেউ আপত্তি করলেন না।

?w=640&h=361″ width=”600″ />
পর্ব – ৪ এখানে
২০শে মার্চ, ১৯৭৫
ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট
ঢাকা, বাংলাদেশ

বেশ অনেকদিনের চেষ্টার পর মেজর ফারুক উপ সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানের সাক্ষাত লাভের সুযোগ পেয়েছেন। পিএমএ তে প্রশিক্ষক থাকবার সময় এবং পরবর্তিতে জেড ফোর্সের সাথে যুদ্ধ করবার কারনে তিনি জিয়াউর রহমানের পুর্ব পরিচিতই ছিলেন। সকাল সাড়ে সাতটার সময় তিনি জিয়ার বাংলোয় উপস্থিত হলেন। যেহেতু তাদের পেছনে সেভাবে সেনাবাহিনীর সমর্থন নেই এবং তারা অনভিজ্ঞ। তাই এই ব্যাপারে সেনাবাহিনীতে সেই সময়ে বেশ জনপ্রিয় অফিসার জিয়াউর রহমানের সাথে পরামর্শ এবং তার সুদৃষ্টি লাভের চেষ্টার অংশই এই সাক্ষাতের চেষ্টা। সেনাবাহিনীর অন্য অনেক জুনিয়র অফিসারের মত তারাও জেঃ জিয়াকে অনেক পছন্দ করেন।

জেঃ জিয়ার সাথে দেখা হবার পর মেজর ফারুক সতর্কতার সাথে দেশের নানা প্রসঙ্গ টানলেন। সরাসরি যদি কিছু বলতে চাইতেন, তবে এমনটাও হতে পারতো যে জেঃ জিয়া সরাসরি তাকে গ্রেফতারের নির্দেশ দিতেন প্রহরীদের ডেকে। মেজর ফারুক দেশের দুর্নীতির প্রসঙ্গ টেনে আনলেন এবং বললেন যে দেশের কোনকিছুই ঠিকমত হচ্ছেনা। এর একটা পরিবর্তন আনা দরকার।

জবাবে জেঃ জিয়া তাকে কেবল বললেন,

– “হ্যা, তুমি ঠিক বলছো। চলো, বাইরে গিয়ে কথা বলি।“

এরপর তারা লনের দিকে চলে গেলেন। সেখানে মেজর ফারুক তাকে বললেন,

– “স্যার, আমরা পেশাদার সৈনিক। আমরা কোন ব্যক্তিকে সেবা করি না, দেশের জন্য কাজ করি। সেনাবাহিনী এবং বেসামরিক প্রশাসন উচ্ছনে চলে যাচ্ছে। আমাদের এটা ঠেকাতে হবে। আমরা জুনিয়র অফিসারেরা এ ব্যাপারে একটা পরিকল্পনা করেছি। আমরা আপনার সহযোগিতা এবং নেত্বৃত্ব চাই।“

জবাবে জেঃ জিয়া বললেন,

– “দুঃখিত, আমি এমনকিছুর সাথে নিজেকে জড়াতে পারবোনা। তোমরা যদি কিছু করতে চাও তবে তোওরা জুনিয়র অফিসাররাই সেটা করো। আমাকে এর বাইরে রাখো।“

পরিকল্পনার শুরুতেই জিয়া এ ব্যাপারে অবগত হয়ে গেলেন। যদিও তিনি বললেন তিনি এর সাথে নেই, তবুও তার যেটা করা উচিত ছিলো, সেটা উনি করলেন না। তার উচিত ছিলো তখনই মেজর ফারুককে গ্রেফতারের নির্দেশ দেয়া। তবে সেটা না করে তিনি নীরব দর্শকের ভুমিকা নিলেন। দেখা যাক সময় তাকে কোথায় নিয়ে যায়। এরপর মেজর ফারুক চলে গেলে জেঃ জিয়া তার এডিসিকে ডাকলেন, এবং বললেন,

– “কোন অবস্থাতেই আর এই মেজরকে আমার সাথে সাক্ষাতের সুযোগ দেবেনা।“

জেঃ জিয়া সেই আগের মেজর জিয়ার মত হিসেবী এবং ধুর্তই রয়ে গেলেন। কোন অযাচিত ঝুঁকি তিনি নিতে চাননি। তবে মনে মনে তিনিও নিশ্চয়ই চাইছিলেন শেখ মুজিবের পতন ঘটুক। সবকিছু জেনে যাবার পরেও তার কোন ধরনের পদক্ষেপ না নেয়া এমন কিছুই নির্দেশ করে।

১৯৭৬ সালের জুলাই মাসে লন্ডনে একটা টিভি অনুষ্ঠানে এন্থনী ম্যাসকারেনহাস জেঃ জিয়াকে জিজ্ঞেস করবেন যে মেজর ফারুক যা বলেছেন উনার সম্পর্কে তা সঠিক কিনা। জেঃ জিয়া তা অস্বীকারও করলেন না, আবার স্বীকারও করলেন না। তিনি কোন ধরনের উত্তর দেয়া থেকেই বিরত রইলেন। তবে তিনি জোরাজুরি করলে জেঃ জিয়া এন্থনী ম্যাসকারেনহাসকে তার শাসনামলে আর বাংলাদেশে প্রবেশের অনুমতি দেননি।

একটা প্রবাদ আমরা সবাই সত্য বলেই মনে করি, ‘মৌনতা সম্মতির লক্ষন’! তবে শক্তি দিয়ে সাহায্য করবার ক্ষমতা জেঃ জিয়ার সম্ভবত ছিলনা। কারন উপ প্রধান সেনাপতি হলেও উনার সরাসরি নিয়ন্ত্রনে কোন সেনা ইউনিট ছিলনা। আর এর বাইরে এই ধরনের কোন ইচ্ছা থাকলেও তাদের শক্তি সম্পর্কে কোনকিছু না জেনে উনি সম্ভবত নিজেকে জড়াতে চাননি। জেঃ জিয়া সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা হিসেবে খুবই হিসেবী ছিলেন সবকিছুতে। আর উপপ্রধান সেনাপতি হিসেবে থাকবার কারনে উনার জানবার কথা যে সকল উর্ধতন কর্মকর্তার দিকে সরকারের গোয়েন্দাদের নজরদারী রয়েছে।

মার্চ মাস (শেষ সপ্তাহ), ১৯৭৫
ঢাকা, বাংলাদেশ

জেঃ জিয়ার কাছ কোন ধরনের সাহায্য না পেয়ে মেজর ফারুক তার বন্ধু স্কোঃ লীঃ লিয়াকতের (ঢাকার ফ্লাইট কন্ট্রোল অফিসার) সাথে দেখা করলেন। তিনি স্কোঃ লীঃ লিয়াকতকে বললেন,

– “তুমি কিছু মিগ দিয়ে শেখ মুজিবের বাড়ির উপর দিয়ে চক্কর দিতে পারবে? আমি বাড়ি ঘিরে রাখবো আর তুমি বিমান দিয়ে বাকী সবকিছু নিয়ন্ত্রনে রাখবে?”

স্কোঃ লীঃ লিয়াকত উত্তর দিলেন,

– “চলো তাহলে!”

তবে এই পরিকল্পনার কথা যখন কর্নেল আমিন, মেজর হাফিজদের বললেন, তারা পিছিয়ে গেলেন। সেনাবাহিনীর বড় কোন অংশের সমর্থন আর মানসিকতা তারা জানতেননা বলে কোন ধরনের ঝুঁকি নিতে রাজী হলেননা।

মেজর ফারুকের কাছে সবকিছু অন্ধকার মনে হলো। মেজর ফারুকের মতে, এতোদিনের পরিশ্রম বৃথা হয়ে যাচ্ছিলো মানুষের চরিত্রের অদ্ভুত খেয়ালের কারনে। তারা যখন বুঝতে পারলেন শেখ মুজিবকে হত্যা করতে হবে, তখনই তারা ভয়ে পিছিয়ে গেলেন। শেখ মুজিব তখনো যে একাই ছিলেন একটি প্রতিষ্ঠানের মতন।

২রা এপ্রিল, ১৯৭৫
হালিশহর, চট্টগ্রাম
বাংলাদেশ

মেজর ফারুক কিছুদিনের ছুটি জোগাড় করেছেন আন্ধা হাফিজের সাথে দেখা করতে। এপ্রিলের ৭-১১ তারিখ বেঙ্গল ল্যান্সারের হাটহাজারী ফারায়িং রেঞ্জে নিয়মিত মহড়ার জন্য যাবার কথা ছিলো। তবে তা দুইদিন এগিয়ে আনা হয়।

মেজর ফারুকের ধারনা, জন্মান্ধ এই বিহারী পীর আন্ধা হাফিজের ভবিষ্যত বলতে পারবার আশ্চর্য্য ক্ষমতা আছে। অদ্ভুত জীবনযাপন করেন আন্ধা হাফিজ। মেজর ফারুকের শ্বশুরবাড়ির সবাই এই আন্ধা পীরের মুরিদ, অন্ধ ভক্ত। তার সাথে দেখা করে পরামর্শ চাইবার এই সুযোগটিই মেজর ফারুক গ্রহন করলেন। সকল পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে বসেছে। এখন খোদা ছাড়া কেউ তাকে এই ব্যাপারে সাহায্য করতে পারবে না।

আন্ধা হাফিজের কাছে গিয়ে মেঝেতে বসে তার হাত জড়িয়ে ধরলেন। আন্ধা হাফিজও আস্তে হাত ধরে লম্বা সময় বসে থাকলেন। মেজর ফারুক অনুভব করছিলেন তার পুরো শরীর কেঁপে উঠছে। অপার্থিব অনুভুতিতে আপ্লুত হলেন তিনি। পীরের বংশধরদের এমন অনুভুতির মধ্যে যাওয়া অস্বাভাবিক কিছু না।

তবে মেজর ফারুক কিছু বলার আগেই আন্ধা হাফিজ বলে উঠলেন,

– “আমি জানি তুমি ভয়ঙ্কর কিছু করতে যাচ্ছো। তোমার যা করবার তা করতে পারো, তবে তার জন্য আমি যা বলবো সেগুলো তোমাকে অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে। নাহলে তুমি ধ্বংস হয়ে যাবে।“

মেজর ফারুক বললেন,

– “আমি সেগুলো অবশ্যই মেনে চলবো।“

আন্ধা হাফিজ তাকে বললেন,

– “ নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থে কিছু করতে যেওনা। যা করবার আল্লাহ এবং ইসলামের জন্য করবে। সাহস রেখো এবং সঠিক সময়ের অপেক্ষা করো।“

আন্ধা হাফিজ আরো বললেন,

– “তিনমাস অপেক্ষা করো, এরপর তোমার সফল হবার সম্ভাবনা বেশি, যদিও তোমাকে তার জন্য কঠিন পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে যেতে হবে।“

মেজর ফারুক গভীরভাবে আপ্লুত হলেন। আন্ধা হাফিজ যখন বলছেন তবে নিশ্চয়ই নিয়তিও চায় যে তিনি সেই পথেই চলবেন। আন্ধা হাফিজ তাকে যে তিনমাস অপেক্ষা করতে বললেন সেই তিনমাস তিনি পরিকল্পনা ঘষামাজা করবার কাজে ব্যয় করবেন। তিনি এখন মন থেকে জানেন, এই পরিকল্পনা ব্যর্থ হতেই পারেনা।

৭ই জুন, ১৯৭৫
ঢাকা, বাংলাদেশ
আজ বঙ্গবন্ধু তার স্বপ্নের বাকশাল (বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ) গঠন করলেন এবং ঘোষনা দিলেন দ্বিতীয় বিপ্লবের। সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীয় (আর্টিকেল ১১৭-ক) আওতায় এই দলটি গঠিত হলো। রাশিয়াপন্থী কমরেড মনি সিং এর দল এবং ন্যাপ (মোজাফফর) এর অংশ হয়। এই দলের ধারনার জন্ম দেন শেখ ফজলুল হক মনি এবং মনসুর আলী। সৌভিয়েত রাশিয়ার সরাসরি অনুকরনে এই দলটি গঠিত হলো। তবে সৌভিয়েত রাশিয়া ভেঙ্গে পড়তে আরো কয়েক দশক লাগলেও এই দলটির স্থায়ীত্ব মাসখানেকও হবে না।

বাকশাল প্রতিষ্ঠার সাথে সাথেই মাওলানা ভাসানীর ন্যাপ সহ সকল দল নিষিদ্ধ বলে গন্য হলো। যদিও মাওলানা ভাসানী তার এই দ্বিতীয় বিপ্লবের প্রতি সমর্থন জানালেন। উনিই আবার খন্দকার মোশতাক সরকার গঠন করবার পরে তাকে অভিনন্দন জানিয়ে পত্র পাঠান। কিছু না কিছু কালিমার বাইরে এই দেশের কোন মহান নেতাই যেতে পারেননি। এর বাইরে সংসদের বিরোধীদলীয় আটজন সদস্যের চারজন বাকশালে যোগ দিলেন।

এমনিতেও বঙ্গবন্ধুর ক্ষমতার কোন অভাব ছিলনা, তবে কেন তিনি এই ধরনের ধারনা মেনে নিলেন এবং তা বাস্তবায়নের পথেই এগিয়ে গিয়েছিলেন তা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটা রহস্যই হয়ে রইবে।

১৫ সদস্যের এক্সিকিউটিভ কমিটিতে পরিবার এবং আওয়ামী লীগের সদস্যদের দেখেই বোঝা যায় যে তা ছিলো বঙ্গবন্ধুর আসেপাশের লোক এবং আওয়ামী লীগেরই একটা পরিবর্তীত নাম। জেঃ ওসমানী বঙ্গবন্ধুকে এ ব্যাপারে বলেছিলেন,

– “আমি আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খানকে দেখেছি। আমি চাইনা আপনি মুজিবুর রহমান খানে বদলে যান।“

যারা উনার ভালো চাইতো সবারই এভাবে বলা উচিত ছিলো। কিন্তু তাকে যারা ঘিরে রেখেছিলো তারা দেশের প্রকৃত অবস্থা তার থেকে বেশ ভালোভাবেই আড়াল করে রাখতে সক্ষম হয়েছিলো এবং আওয়ামী লীগের নেতারা কেউ এ ব্যাপারে কোন ধরনের প্রশ্নই তুললেন না।

২২শে জুন, ১৯৭৫
ঢাকা, বাংলাদেশ
বাকশালের এক্সিকিউটিভ কমিটি গঠিত হবার পরপরই আজ ঘোষনা করা হলো যে দেশের বিদ্যমান ১৯টি জেলা ভেঙ্গে ৬০ টি জেলা গঠিত হবে। রাস্ট্রপতির এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে তা কার্যকরও করা হবে। এই জেলাগুলো ১লা সেপ্টেম্বর থেকে নিজেদের আলাদা পরিচিতি নিয়ে যাত্রা শুরু করবে। এই জেলা সমুহের প্রশাসকদের শেখ মুজিবুর রহমান নিজে নির্বাচিত করলেন। এদের মধ্যে ছিলেন ৩৩ জন এমপি, ১৩ জন বেসামরিক কর্মকর্তা, একজন সেনা কর্মকর্তা এবং আইনজীবি, রাজনৈতিক এবং উপজাতির সদস্যরা।

তাদের জন্য ২৭ দিনের বিশেষ রাজনৈতিক কর্মশালার ব্যবস্থা করা হলো এবং তা শেষ হবার তারিখ নির্ধারন করা হয় ১৬ আগস্ট। তাদের অধীনে আধা ব্যাটালিয়ান করে রক্ষী বাহিনির সদস্য মোতায়েন করবার সিদ্ধান্ত এয়া হয় প্রাথমিক পর্যায়ে এবং ১৯৮০ সালের মধ্যে তাদের অধীনে এক রেজিমেন্ট করে রক্ষী বাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

এই গভর্নর কিংবা প্রশাসকদের পছন্দ করেন শেখ মুজিব, শেখ মনি এবং আব্দুর রব সেরনিয়াবাত। নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের থেকেও তাদের দেয়া হয় অঢেল ক্ষমতা। সকল ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা দেয়া হয় তাদের। আর এভাবেই যে মানুষটা মাত্র চার বছর আগে দেশের মানুষের স্বাধীনতা এবং মুক্তির জন্য নেত্বৃত্ব দিচ্ছিলেন, সেই মানুষটিই অনির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে জনগনের ভালোমন্দ ঠিক করবার দ্বায়িত্বভার তুলে দিচ্ছিলেন।

২৬ শে মার্চের এক ভাষনে বঙ্গবন্ধু বলেন,

– “বাকশালের লক্ষ হচ্ছে রাষ্ট্রের চার মুলনীতি অনুসারে দুর্নীতির মূল উতপাটন, কলকারখানা এবং কৃষিক্ষেত্রে উতপাদন বৃদ্ধি করা, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রন এবং জাতীয় ঐক্য।“

বঙ্গবন্ধুর বাকশালের ব্যাপারে বক্তব্যগুলো কখনোই স্ববিরোধী ছিলো না। কিন্তু তাঁর যে প্রশাসনিক এবং সার্বিক ক্ষমতা ছিলো তারপরেও একদলীয় ব্যবস্থায় যাবার পেছনের যুক্তিগুলো সেভাবে গ্রহনযোগ্য হয় না।

১৬ জুন, ১৯৭৫
ঢাকা, বাংলাদেশ
আজ পাস করা হলো সংবাদপত্র বাতিল আইন। এর মাধ্যমে সরকার গনমাধ্যমের উপরেও নিয়ন্ত্রন আরো করলো। বাংলাদেশ অবজারভার এবং দৈনিক বাংলা ছাড়া সকল সংবাদপত্র নিষিদ্ধ ঘোষনা করলো। এর বাইরে দৈনিক ইত্তেফাক এবং বাংলাদেশ টাইমসের প্রকাশনার ভার নিয়ে নেয় সরকার। এ ধরনের পদক্ষেপ কেবল বিরোধীদেরই না, সরকারের নানা আমলা, সেনা কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিকদেরও মনে মনে অসন্তুষ্ট করে তোলে। যদিও সরাসরি কিছু বলার সাহস তাদের ছিলনা।

৩ জুলাই, ১৯৭৫
ঢাকা, বাংলাদেশ
আন্ধা হাফিজের বেঁধে দেয়া তিনমাস সময় পার হয়েছে আজ। মেজর ফারুক তার পকেট ডায়রীতে বড় বড় করে লাল অক্ষরে লিখলেন,

“START WORK”

মেজর ফারুক ঠিক করলেন একাই হোক আর সবাইকে সাথে নিয়ে, তিনি তার কাজ শেষ করবেনই। আর এই ব্যাপারে ১৫ আগস্টের বেশি সময় অপেক্ষা করবেননা।

তিনি তার ডায়রীতে নোট করে রাখা ১ম বেঙ্গল ল্যান্সার আর ২য় ফিল্ড আর্টিলারীর নিয়মিত সামরিক রাত্রীকালীন প্রশিক্ষনের সময় দেখলেন ১৫ই আগস্ট, শুক্রবার।

শুক্রবার মেজর ফারুকের জীবনে বিশেষ অর্থ বহন করে। তার জন্ম হয়েছে শুক্রবার আজানের সময়, উনি পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে পালিয়ে এসেছিলেন এক শুক্রবারে, তার বিয়েও হয় শুক্রবারেই। এছাড়াও শুক্রবার মুসলমানদের জন্য এক পবিত্র দিন। মেজর ফারুকের মতে, তিনি শুক্রবারটিকেই ইসলামের সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দেবার জন্য সঠিক দিন বলে স্থির করেছিলেন।

মেজর ফারুক তার ভায়রা মেজর রশীদকেও এই দিন ঠিক করে ফেলবার ব্যাপারঈ জানালেননা। উনিও শেষ মুহুর্তে পিছলে যাবেন নাকি সে সম্পর্কে মেজর ফারুক নিশ্চিত নন। কিন্তু তাদের আলোচনার সময় দুজনেই একমত হলেন যে দিনটা ১লা সেপ্টেম্বরের আগেই হতে হবে। ওই দিন থেকেই বাকশালের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হতো। জেলা প্রশাসকেরা ওইদিন থেকেই ৬০টি জেলার নিয়ন্ত্রন নিয়ে নিতেন। রক্ষী বাহিনী, সেনাবাহিনী সহ সকল শক্তি তাদের অধীনে ৬০ টি জেলায় ছড়িয়ে পরতো। শত্রুকে ঢাকায় কেন্দ্রীভুত অবস্থায় না পেয়ে তাদের লড়তে হতো সারা দেশে।

এর আগেই শেখ জামাল সেনাবাহিনীর অফিসার হিসেবে কমিশন লাভের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তাকে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিলো যুগোশ্লাভিয়ার সামরিক একাডেমীতে প্রশিক্ষনের জন্য। তবে সেখানে টিকতে না পেরে উনি দেশে ফেরত আসলে তাকে ব্রিটেনের স্যান্ডহার্স্ট মিলিয়ারী একাডেমীতে পাঠাবার ব্যবস্থা নেয়া হয়। জেঃ শফিউল্লাহকে এ ব্যাপারে টেলিফোন করে ব্যবস্থা নিতে বলেন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধুর ভাষায় প্রশিক্ষন শেষে এই ২০ বছরের তরুন কোন একদিন তার সেনাবাহিনীর প্রধান হতে পারবেন।

তবে নিয়মিত দীর্ঘ্যমেয়াদী প্রশিক্ষনের বদলে চারমাসের স্বল্পমেয়াদী প্রশিক্ষন শেষে শেখ জামাল ২য় বেঙ্গলে কমিশন্ড অফিসার হিসেবে যোগদান করেন। তবে গুজব ছড়িয়ে পরে যে বঙ্গবন্ধু সকল নিয়ম ভঙ্গ করে তাকে সরাসরি লেঃ কর্নেল পদে পদোন্নতি দিতে যাচ্ছেন এবং সেনাবাহিনীও বাকশালের নিয়ন্ত্রনাধীন হয়ে যাচ্ছে। বড় ভাই শেখ কামালের সম্পর্কে আসদাচরন এবং নৃশংসতার নানা অভিযোগ থাকলেও তার ভাই শেখ জামাল খুবই ভদ্র এবং সুশীল অফিসার হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। সেনাবাহিনীর কারো পক্ষ থেকে তার ব্যবহার কিংবা শৃংখলা নিয়ে কোন ধরনের অভিযোগ কিংবা গুজব শোনা যায়নি।

১৭ জুলাই, ১৯৭৫
ঢাকা, বাংলাদেশ
আজ বঙ্গবন্ধুর দুই ছেলে শেখ কামাল এবং শেখ জামালের বিয়ে একত্রে অনুষ্ঠিত হলো। শেখ কামালের বিয়ে হলো সুলতানা আহমেদ খুকীর সাথে যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিলেন এবং একজন এথলেট হিসেবে পরিচিত ছিলেন। লং জাম্প সহ নানা ইভেন্টের রেকর্ড তখন পর্যন্ত তার দখলে ছিলো। শেখ জামাল বিয়ে করলেন তার খালাতো বোন পারভীন রোজীকে। সুলতানা আহমেদ খুকীর ভাইও একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তার নাম ছিলো বাবুল। ঢাকার কাছে খন্ডযুদ্ধে গুলিবিদ্ধ হয়ে স্বাধীনতার মাত্র একদিন আগে তিনি মারা যান। তার বাবা দবিরুদ্দীন আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চীফ ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। পারভীন রোজীর বাবা বাকশাল সরকারের অধীনে সংস্থাপন মন্ত্রনালয়ের অতিরিক্ত সচিব ছিলেন।

এই বিয়ের আয়োজন করা হয় গনভবনে, বঙ্গবন্ধুর অফিশিয়াল বাসভবনে। এরপর আগস্টের দশ তারিখ বঙ্গবন্ধুর আরেক ভাগ্নীর বিয়ের অনুষ্ঠান ছিলো আর এই দুই বিয়ে উপলক্ষ্যেই পরিবারের সকল সদস্য একত্রিত হয়েছিলেন। নাহলে হয়তো এভাবে ধানমন্ডীতে এবং মিন্টোরোডে তাদের পরিবারের সকল সদস্যকেই একত্রিত অবস্থায় পেতো না হত্যাকারীরা।

মার্চ মাস, ১৯৭৫
ঢাকা, বাংলাদেশ
বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করছিলেন ‘র’ প্রধান আর এন কাও এর আগেই গত ডিসেম্বর মাসে। তবে এবার ব্যবসায়ীর ছদ্মবেশে ঢাকা সফরে পাঠিয়েছেন তার বিশ্বস্ত কিছু কর্মকর্তাকে। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীকে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করে সেনাবাহিনীর কিছু সদস্যের দিক থেকে তাঁকে উৎখাতসহ তাঁর ক্ষতিসাধনে তৎপরতার কথা জানিয়ে তাঁকে সতর্ক থাকতে বললেন তারা। তারা এটাও বললেন জেঃ জিয়ার এ ব্যাপারে জড়িত থাকতে পারেন। বঙ্গবন্ধু এ ব্যাপারে আর এন কাওয়ের সন্দেহ বাতিল করে দিয়ে বললেন,

– “বাঙালিরা আমাকে হত্বযা করবে এ কথা আমি বিশ্বাস করিনা।”

সময়ই বলে দেবে উনি কতটা ভুল ছিলেন।

২রা আগস্ট, ১৯৭৫
৫৪, আগামসি লেন
ঢাকা, বাংলাদেশ
মেজর রশীদ বাকশালের তৃতীয় প্রধান ব্যক্তি এবং বানিজ্যমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমেদের সাথে দেখা করছেন আজ। দলের মধ্যে উনার ডানপন্থী হিসেবে পরিচিতি থাকলেও কিভাবে যেন টিকে গেছেন সরকারে। হয়তো বঙ্গবন্ধুর উপাধি দেয়া চাটার দলের একজন চতুর সদস্য বলেই।

মোশতাক আহমেদের পিতাও পীর হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সকল পীর ফকির ধীরে ধীরে এক হচ্ছিলো একি ফন্দিতে। যদিও মোশতাক আহমেদ বঙ্গবন্ধুর দির্ঘ্যদিনের সাথী ছিলেন। পাকিস্তান আমলে মোশতাক আহমেদ ছয়বার গ্রেফতার হন এবং সাত বছর জেলও খাটেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবার সময় এই মানুষটা ছিলেন আওয়ামী লীগের ভাইস প্রেসিডেন্ট। এরপর মুজিবনগর সরকারের পররাস্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। সেখানে মার্কিন পররাস্ট্রমন্ত্রী হেনরী কিসিঞ্জারের বুদ্ধিতে তিনি আওয়ামী লীগকে বিভক্ত করবার প্রচেস্টাও চালান যাতে পাকিস্তান না ভেঙ্গে যায়। আর এই কারনেই মুজিবনগর সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকায় তার যাত্রা শুরু করবার পর তাকে মন্ত্রীত্ব থেকে বরখাস্তও করা হয়। তবে এরপর কিভাবে যেন আবার শেখ মুজিবের কাছে চলে আসেন।

মেজর রশীদ এবং খন্দকার মোশতাক দুইজনে পাশাপাশি গ্রামের ছিলেন। তাদের দুজনেরই পরিচিত একজন ছিলেন মোশাররফ হোসেন। এই মোশাররফের মাধ্যমে মেজর রশীদ খন্দকার মোশতাকের সাথে সাক্ষাতের সুযোগ পেলেন। এ সময় রশীদ স্কুটার কেনার জন্য আনুমতি চেয়ে একটা আবেদনপত্র সাথে করে নিয়ে যান কোন প্রশ্ন এড়াতে।

খন্দকার মোশতাকের বাসার উপরের তলায় মেজর রশীদকে অভ্যর্থনা জানালেন খন্দকার মোশতাক। কিছু সময় নিয়ে তারা নানা ব্যাপারে কথা বলেন। এরপর ধীরে ধীরে মেজর রশীদ তার আসল উদ্দেশ্যের কথা বলতে শুরু করেন। মেজর রশীদ তাকে জিজ্ঞেস করেন,

– “বঙ্গবন্ধুর কাছের লোক এবং আওয়ামী লীগের প্রথম সারির নেতা হিসেবে আপনি কি মনে করেন উনার নেত্বৃত্বে দেশ সামনে এগিয়ে যেতে পারবে?”

জবাবে মোশতাক আহমেদ বলেন,

– “না, দেশ এগিয়ে যাবে না।“

রশীদ পাল্টা প্রশ্ন করেন,

– “তাহলে আপনি পদত্যাগ করছেন না কেন?”

মোশতাক আহমেদ জবাব দেন,

– “সেটা সহজ নয়।“

রশীদ তাকে বললেন,

– “যদি কেউ দেশের ভালোর জন্য শেখ মুজিবকে সরাতে চায় সেটা কি যুক্তিসংগত হবে?”

জবাবে মোশতাক আহমেদ বললেন,

– “হয়তো দেশের স্বার্থে সেটা ভালোই হবে, তবে তা খুব কঠিন কাজও হবে।“

এরপর খন্দকার মোশতাক নিজেই জিজ্ঞেস করলেন,

– “যদি কেউ তাকে সরিয়েই দেয় তবে কে বঙ্গবন্ধুর জায়গা নেবে?”

জবাবে মেজর রশীদ এড়িয়ে গিয়ে উত্তর দিলেন। তিনি বললেন,

– “কেউ যদি তাকে সরিয়েই দেয় তবে নিশ্চয়ই তারা যোগ্য কাউকেই বেছে নেবে। এমন কেউ যে রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করতে পারবে।“

জবাবে মোশতাক আহমেদ বললেন,

– “কারো যদি তা করবার সাহস থাকে তবে ভবিষ্যতের জন্য একজন নেতাকে বেছে নেয়াও ভালো ব্যাপার হবে।“

মেজর রশীদও এমন পাপেট নেতাই খুজছিলেন মনে মনে। উনি খন্দকার মোশতাককে ইঙ্গিত দিয়ে বুঝাতে চাইলেন সেটা খন্দকার মোশতাকের উপরই নির্ভর করবে। রশীদ বললেন,

– “আমার মনে হয় আপনি ঠিক বলছেন। এটা আপনাদের ব্যাপার।“

এরপর মেজর রশীদ খন্দকার মোশতাকের সাথে আগস্টের ১২,১৩ এবং ১৫ তারিখও দেখা করবেন। বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রীসভার একজন এই মোশতাক আহমেদও জানতেন সবকিছু এবং অপেক্ষা করছিলেন কখন সেই মুহুর্ত আসবে।

১২ই আগস্ট, ১৯৭৫
ঢাকা, বাংলাদেশ
মেজর ফারুক তার তৃতীয় বিবাহ বার্ষিকীর জন্য এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন ঢাকা গলফ ক্লাবে। অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে মেজর ফারুক তার ভায়রা মেজর রশীদকে একপাশে ডেকে নিয়ে গেলেন এবং বললেন,

– “আমি ১৫ তারিখেই আঘাত হানবো। আমি শুক্রবার সকালেই মুজিবের পতন ঘটাবো”

মেজর রশীদ ভীত চোখে এদিক সেদিক তাকিয়ে ফিসফিস করে বললেন,

-তুমি কি পাগল হয়েছো? এতো তাড়াতাড়ি কিভাবে সব করবো? আমাদের সাথে কোন অফিসার নেই, কোন অস্ত্র নেই। আমরা কিভাবে এটা করবো?”

মেজর ফারুক কঠিন গলায় বললেন,

– “এটা আমার সিদ্ধান্ত। আমার সব কৌশলগত পরিকল্পনা করা হয়ে গেছে। একা একাই সবকিছু করতে হলেও আমি তা করবোই। তবে মনে রেখো, আমি ব্যর্থ হলে অরা তোমাকেও ঝুলিয়ে দেবে।“

বেশ কিছুক্ষন নীরবতার পর দ্বিধাগ্রস্থ গোলন্দাজ সেনা মেজর রশীদ বললেন,

– “ঠিক আছে। যদি এটা করতেই হয় তবে করেই ফেলি। কিন্তু আমাদের আগে কথা বলতে হবে। আমাদের আরো কিছু অফিসারকে সাথে নিতে হবে।“

ঠিক সেই মুহুর্তে শেখ মুজিব তার বাড়িতে পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলছিলেন। শেখ পরিবারের সবাই তার ভাগ্নীর বিয়ে উপলক্ষ্যে আবার তার বাড়িতে জড়ো হয়েছে। তার ছেলেদের বিয়ে উপলক্ষ্যে নিজের পরিবার আগেই একত্রিত হয়েছিলো। তবে কথাবার্তার বেশিরভাগই হচ্ছিলো দেশ নিয়েই।

তার ভাগ্নে আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ সেই স্মৃতির বর্ননায় বলবেন,

– “মামা দেশে আবারো বন্যা হবার ব্যাপারে চিন্তিত ছিলেন। ধানের ব্যাপক ক্ষতির আশংকা করছিলেন তিনি। উনি আমার বাবাকে বললেন ভারত থেকে ক্রয়কৃত ড্রেজারটি তিনি খুব দ্রুতই কাজে লাগানোর ব্যবস্থা করবেন।

যারা উনার কথা শুনছিলেন, তাদের তিনি আরো বলেন,

– “আমি যখন ছোট ছিলাম, নদীর পাড়ে ব্রিটিশদের ড্রেজার কোম্পানীর লোকদের সাথে ফুটবল খেলতাম। এরপর যুদ্ধ শুরু হয় আর ড্রেজারগুলোকে নিয়ে বার্মা ক্যাম্পেইনের জন্য বার্জ বানানো হয়। এরপর আর সেগুলো ফিরে আসেনি। যেখানে আমি খেলতাম সেখানে এখন আর নদী নেই, চর পরে গেছে। প্রতি বছর বন্যায় দেশ ডুবে যায়।“

উনি বন্যা নিয়ন্ত্রনে তার ধারনা সম্পর্কে বললেন,

– “আমাদের বন্যা নিয়ন্ত্রনের জন্য টাকা নেই কিন্তু আমি আমার ড্রেজার পাচ্ছি। দেখে নিও তোমরা আমি কিভাবে খনন করি নদীগুলোকে আবার। আমার বাকশাল এটা করে দেখাবে।“

এরপরই বঙ্গবন্ধুর মন কেমন যেন হয়ে যায়। উনি কেন যেন বলে উঠলেন,

– কেউ বোঝেনা আমি দেশের জন্য কি করছি।“

উনি তখনো জানতেন না যে উনি নিজেও দেখে যেতে পারবেন না বাকশাল আসলে কি করতে পারতো। বাকশাল ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবার আগেই বাতিল হয়ে যাবে। দেশের প্রতি উনার মমত্ববোধ যে অসীম ছিলো সেটা কেউ অস্বীকার করতে পারবেনা। বিশাল হৃদয়ের অধিকারী ছিলেন তিনি। তিনি নিজেই নিজের দুর্বলতা সম্পর্কে বলে গিয়েছিলেন। উনি বলেছিলেন,

– “আমার শক্তি হচ্ছে যে আমি আমার মানুষকে ভালোবাসি। আর আমার দুর্বলতা হচ্ছে আমি তাদের খুব বেশি ভালোবাসি।“

আর তাদের অনেকেই এই ভালোবাসার সুযোগও নিচ্ছিলো!

১৩ আগস্ট, ১৯৭৫
ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট
ঢাকা, বাংলাদেশ
আগে থেকেই নিশ্চিত ছিলো যে ১৫ আগস্ট খন্দকার মোশতাক দেশেই থাকবেন। এর বাইরে মেজর ফারুক এবং মেজর রশীদ আরো অফিসারদের তাদের দলে ভেড়াবার চেস্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এর আগ্র প্রচেষ্টা থেকে তারা বুঝে গিয়েছিলেন কর্মরত সেনা কর্মকর্তাদের সাথে পাওয়া যাবেনা। তাই তারা অবসরপ্রাপ্ত অফিসারদের দলে টানবার চেস্টা করলেন। মেজর রশীদ আগে থেকেই পরিচিত মেজর ডালিমকে ফোন করে কথা বলার জন্য আমন্ত্রন জানালেন। রাত দশটার দিকে মেজর ডালিম তাদের সাথে দেখা করলেন। সবকিছু শোনার পর মেজর ডালিম বললেন তিনি তাদের সাথে থাকবেন এবং অবসরপ্রাপ্ত মেজর নুর চৌধুরীকেও তাদের সাথে নিতে বললেন। রাত একটার দিকে নুর চৌধুরী সেখানে পৌছালে আরো আলোচনা হয় এবং মেজর রশীদ বলেন শেখ মুজিবকে টপকে দেবার পর খন্দকার মোশতাককে তাদের দরকার হবে। তবে নুর চৌধুরী এ কথা শুনে বিশ্বাস না করলে পরদিন তিনি নুর চৌধুরীকে খন্দকার মোশতাকের বাসায় নিয়ে গিয়ে সাক্ষাত করে তাকে বিশ্বাস করার মোশতাকের সাথে তার কেমন সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছে।

তবে এর আগে তিনি নুর চৌধুরীর সাথে আরেক অবসরপ্রাপ্ত মেজর সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খানকে দেখতে পান। তিনি নুর চৌধুরী সম্পর্কে সন্দিহান হলেও সেই মুহুর্তে আর পিছিয়ে যাবার সুযোগ ছিলো না। মেজর রশীদ মেজর ডালিমকে এরপর মেজর নুর এবং মেজর শাহরিয়ারকে নিয়ে সেদিনই রাত দশটায় নতুন বিমানবন্দরের কাছে চলে আসতে বললেন। সেখানেই ১ম বেঙ্গল ল্যান্সারের রাত্রিকালীন প্রশিক্ষনের জন্য জড়ো হবার কথা ছিলো।

১৪ই আগস্ট, ১৯৭৫
চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ
চট্টগ্রাম বাজারের কাছে ভাড়া করা ট্যাক্সীর ভেতর বসে মেজর ফারুকের স্ত্রী ফরিদা টেনশনে ঘামে ভিজে যাচ্ছেন। প্রায় এক ঘন্টা ধরে উনি হালিশহরের পথে রয়েছেন। তার জন্য জরুরী বার্তা আছে। সকাল প্রায় ১১টার মত বাজে। তার হাতে সময় নেই, একেবারেই নেই।

এর আগেরদিন ফরিদা ঢাকা থেকে বন্দর নগরীতে এসে পৌছেছেন তার মায়ের সাথে। ফারুক তাকে আন্ধা হাফিজের কাছে পাঠিয়েছিলেন পরামর্শের জন্য। আন্ধা হাফিজ তাকে পরোক্ষ কিছু নির্দেশনা দিয়েছে। ফারুক ফরিদাকে বলেছিলেন,

– “উনাকে গিয়ে বলো যে আমি নিজের স্বার্থের জন্য কিছু করছিনা। আমি খোদার রাস্তায় চলতে প্রস্তুত, উনি যেভাবে চাইবেন সেভাবেই। আমি চাই উনি আমাকে জানাবেন আমি ঠিক করছি নাকি ভুল করছি অথবা এমনকিছু আছে কিনা যা আমার করা উচিত।“

মেজর ফারুক তার স্ত্রী ফরিদাকে বলেছিলেন দুপুরের মধ্যেই টেলিফোনে তাকে আন্ধা হাফিজের উত্তর জানাতে। ফরিদা চিন্তিত ছিলেন যে সঠিক সময়ের মধ্যে আন্ধা হাফিজের উত্তর মেজর ফারুককে জানাতে পারবেন নাকি। ফরিদা আন্ধা হাফিজের কাছে পৌছে দেখলেন উনি লুঙ্গি আর সুতী গেঞ্জী পরে আছেন। আর ক্রসলেগে কাঠের চৌকীর উপর বসে ধ্যান করছেন। প্রায় সব পীর মনে হয় এমনটাই করেন। ফরিদা তার সামনে একটি টুল টেনে বসলেন। ফরিদা অনুভব করলেন শীতল বাতাস তাকে ছুঁয়ে চলে গেলো। সেই বাতাস বয়ে নিয়ে আসছিলো অজানা কোন ফুলের সুবাস। আসেপাশে কোন ফ্যান দেখতে পেলেননা ফরিদা। উনি ধরে নিলেন নিশ্চয়ই বেহেস্তের সাথে এই কামেল পীরের কোন সংযোগ আছে। সেই কারনে বেহেস্তও তার শরীর ঠান্ডা রাখতে শীতল বাতাস এদিকে পাঠিয়ে দিচ্ছে। মনে অন্ধ বিশ্বাস থাকলে মানুষ এমনিতেই অনেককিছু অনুভব করে, তাই অনুভব করে যা সে অনুভব করতে চায়। তাই কল্পনা করে যা সে দেখতে চায়। শিক্ষা এসব ধারনার থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে রাখতে সক্ষম হয়, কিন্তু একেবারে মুছে ফেলতে পারেনা।

আন্ধা হাফিজ ফরিদার হাত ধরে নীরবে মেজর ফারুকের কথাগুলো শুনলেন। বেশ অনেকক্ষন অপেক্ষা করবার পর আন্ধা হাফিজ একটা দীর্ঘ্যশ্বাস ফেললেন। উনি উর্দুতে বললেন,

– “সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। তাকে বলো যা করবার তাই করতে কিন্তু খুব গোপনে।“

এরপর কিছুক্ষন বিরতি নিয়ে আন্ধা হাফিজ আরো বললেন,

– “কাজ করতে যাবার আগে তাকে বলো খোদার কাছে সম্পুর্ন বিশ্বাস নিয়ে প্রার্থনা করে তার অনুগ্রহ চাইতে। তার সাথীরাও যেন ঠিক তাই করে।“

এর বাইরে আন্ধা হাফিজ মেজর ফারুককে দুটা সুরা পড়বার জন্য নির্দেশনা দিলেন যাতে তার হৃদয় ঈমানী শক্তিতে বলীয়ান হয়। একটা হচ্ছে মুসলমানদের মৃত ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যে পড়া দোয়া আর আরেকটা হচ্ছে শয়তানের হাত থেকে সুরক্ষিত থাকবার দোয়া বা শয়তান তাড়াবার দোয়া। তবে আন্ধা হাফিজ সম্ভবত জানতেন না তিনি এক মুর্তিমান শয়তানকেই শয়তান তাড়াবার দোয়া পড়বার উপদেশ দিচ্ছিলেন যার পরিকল্পনায় ঘাতক দল এমন এক উদ্দেশ্যে এগিয়ে যাচ্ছিলেন যার থেকে নিরপরাধ নারী আর শিশুরাও রক্ষা পাবেনা।

ফরিদা তার স্বামী এবং তার সঙ্গীদের জন্য দোয়া চেয়ে বেরিয়ে আসবার সময় আন্ধা হাফিজ তাকে বললেন,

– “চিন্তা করোনা, আমি ওদের আল্লাহর হাতে তুলে দিয়েছি। উনার ইচ্ছা হলে উনিই তাদের খেয়াল রাখবেন।“

তবে ফরিদার কাজ এখানেই শেষ হয়নি। বাবার বাসায় আসবার পর ফরিদা আবিস্কার করলেন ঢাকার সাথে টেলিফোন লাইন কাজ করছেনা। প্রায় দুই ঘন্টা চেস্টার পরেও যখন ওপাশ থেকে উত্তর পাওয়া গেলোনা তখন ফরিদা তার বোনের বাসায় ফোন করেও বাজে সংযোগের কারনে কোন কথা বুঝতে পারছিলেন না। এরপর ফরিদা সরাসরি তার শ্বশুরকেই ফোন করে তার সাথে দ্রুত যোগাযোগ করতে বলেন। মেজর ফারুকের বাবা মেজর ফারুককে যখন গিয়ে জানায় তখন প্রায় ৫ টা বাজে। এই সময়ে কিছু করার না পেয়ে মেজর ফারুক ঘুমাচ্ছিলেন। এরপর ঘুম থেকে উঠে গোসল করবার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

এর আগেও বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সহচর রুহুল কুদ্দুস যিনি নিজেও একজন নামী হস্তরেখাবিদ ছিলেন, তিনি বঙ্গবন্ধুর আসন্ন বিপদ সম্পর্কে তাকে সতর্ক করেন। উনি বঙ্গবন্ধুর হাত দেখে এতটাই ভীত হয়ে পড়েন যে স্ত্রীর চিকিৎসার নাম করে ইউরোপে চলে যান। এই পদক্ষেপ তার গর্দান রক্ষা করে পরবর্তীতে মোশতাক সরকার সহ জিয়ার সরকারও তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে চেস্টা চালায়, কিন্তু তা সম্ভব হয়নি।

১৫ আগস্ট, ১৯৭৫
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ঢাকা, বাংলাদেশ
সমাবর্তন অনুষ্ঠানের জন্য সাজানো হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে। এই অনুষ্ঠানে আচার্য্য হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান। উনিও একসময় এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। সাজ সাজ রব চারিদিকে। উপাচার্য্য ডঃ আব্দুল মতিন প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরী স্কুলের ১০ বছর বয়সী ছাত্র রাসেলও ছয়জন ছোটবালকের একজন হয়ে বঙ্গবন্ধু কিংবা তার বাবাকে ফুল দিয়ে স্বাগত জানানোর জন্য মনে মনে তৈরি হচ্ছিলো।

বঙ্গবন্ধু অতিরিক্ত অর্থ অপচয় পছন্দ করতেন না। সে কারনে কোন ধরনের তোরন নির্মান করা না হলেও চারুকলা অনুষদের ছাত্র শিক্ষকেরা মিলে পুরো এলাকা অলংকৃত করে ফেলছিলো। আর বিরোধীদের কেউ যেনো দেয়াল লিখন কিংবা অন্য কিছু করে এসব নষ্ট করতে না পারে সেই লক্ষ্য ছাত্রদের পক্ষ থেকে সারারাত ধরে পাহারাও দেয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের মালীরা প্রায় ১০০ টি মালা গেথে ফেলেন রাত জেগে। সমাবর্তন নুষ্ঠানের পর ভিসির বাসভবনে কেক কাটবার কথা ছিলো। স্ন্যাক্সের জন্য চা এবং হোটেল পুর্বানীর থেকে নাস্তার ব্যবস্থা করা হচ্ছিলো। তবে বঙ্গবন্ধুর জন্য পিঠা এবং সিঙ্গারা প্রস্তুত করা হয় বিশেষভাবে। উনি খাবার দাবারের ব্যাপারেও ছিলেন সাদামাটা।

বোমা বিস্ফোরন একটা সাধারন ঘটনা ছিলো সে সময়ে। তাই পুলিশের আইজি নিজে সেনাপ্রধানকে টেলিফোন করে সেনাবাহিনীর বোম ডিসপোজাল ইউনিটকে দিয়ে পুরো এলাকা চষে মুক্ত করবার ব্যবস্থা করলেন।

বঙ্গবন্ধু রাত সাড়ে আটটার দিকে গনভবন থেকে ধানমন্ডীতে ফিরলেন। শেখ কামাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে ফিরলেন মধ্যরাতে।

এই সময়ে ব্রিগেডিয়ার জামিল ছিলেন বঙ্গবন্ধুর প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা। উনার স্ত্রী অসুস্থ ছিলেন। তবুও সারাক্ষন উনি বঙ্গবন্ধুর সাথেই ছিলেন। উনাকে ফিল্ড ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের প্রধান করা হয়েছিলো কিছুদিন আগে, যদিও দ্বায়িত্ব বুঝে নেননি তখনো। রাত অনেক গভীর হবার পরেও যখন উনি ঘুমাতে যাচ্ছিলেন না, তখন উনার স্ত্রী তাকে ঘুমাবার অনুরধ করলে উনি বললেন,

– “কেন যেনো ঘুম আসছেনা।“

এই মুহুর্তে আর একজন নির্ঘুম রাত পার করছিলেন। উনি হচ্ছেন খন্দকার মোশতাক আহমেদ।

১৪ আগস্ট, ১৯৭৫
ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট
ঢাকা, বাংলাদেশ
১ম বেঙ্গল ল্যান্সার এবং ২য় ফিল্ড আর্টিলারী রেজিমেন্টের সেনাদের রাত্রিকালীন প্রশিক্ষন ঠিকমতই চলছিলো। তখনো কেউ নতুন বিমানবন্দরের কাছে জড়ো হয়নি সন্দেহের উদ্রেক করতে পারে সে কারনে। আন্ধা হাফিজের নির্দেশনা মোতাবেক সম্পুর্ন গোপনীয়তা বজায় রাখছিলেন মেজর ফারুক এবং মেজর রশীদ। কেবলমাত্র একটাই ব্যতিক্রমী ঘটোনা ঘটলো সাধারন নিয়মের বাইরে। সেটা হচ্ছে, ফিল্ড আর্টিলারীর তিনটা কোম্পানীকে তাদের রাইফেল এবং গোলাবারুদ নিতে বলা হলো। এরপর তাদের ১২টি ট্রাকে করে প্রশিক্ষন শুরুর স্থানে চলে যেতে বলা হলো। এই নির্দেশ কারো মনে কোন ধরনের প্রশ্নের জন্ম দিলনা, কারন মেজর রশীদ মাঝে মাঝেই প্রশিক্ষন সুচীতে ইচ্ছামাফিক পরিবর্তন করতেন।

এই সময়ে কাদের সিদ্দিকী পিজি হাসপাতালে অসুস্থ মাকে দেখতে যাচ্ছিলেন। পথে উনি কারওয়ান বাজারের কাছে একটি ট্যাঙ্ক দেখলেন, আরেকটি ট্যাঙ্ক দেখলেন রেডিও ভবনের উল্টা দিকে। আবার ফেরবার পথে মতিঝিলের কাছাকাছি প্রায় কাছাকাছি দুরত্বে তিনটি ট্যাঙ্ক দেখতে পেলেন। উনি পেছনে ফিরে এলেন, ইঞ্জিনিয়ারিং ইনষ্টিটিউটের কাছে আর একটি ট্যাঙ্ক দেখতে পেলেন। রত সম্ভবত সাড়ে এগারটা বাজে তখন। কাদের সিদ্দিকী গাড়ি চালিয়ে চলে গেলেন সেকেন্ড ক্যাপিটাল শেরে-বাংলা নগরের রক্ষী বাহিনীর ক্যাম্পে। সেখানে গিয়ে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করলে রক্ষী বাহিনীর ডেপুটি ডিরেক্টর আনোয়ারুল আলম শহীদ তাকে জানালেন বেঙ্গল ল্যান্সারের তিনটি ট্যাঙ্ক বের করবার অনুমতি আছে।

কাদের সিদ্দিকী বললেন,

– “কিন্তু আমি ও চারটা ট্যাঙ্ক দেখলাম।“

শহীদ সাহেব তাকে বললেন,

– ‘আপনি নিশ্চয়ই একটা ট্যাঙ্ক দুবার দেখেছেন।“

কাদের সিদ্দিকী শহীদ সাহেবের কথা বিশ্ব্বাস না করবার কোন কারন খুঁজে পেলেননা।

(তবে কাদের সিদ্দিকী মিথ্যা বলেছেন নাকি মেজর ফারুক মিথ্যা বলছিলেন আমি জানিনা। কারন রাত দুটার আগে উনার কোন ট্যাঙ্ক দেখতে পাবার কথা না মেজর ফারুক যে ঘটনা প্রবাহের কথা বলছিলেন সে অনুসারে।)

মেজর রশীদ পর্যাপ্ত গোলাসহ যুগোশ্লাভিয়ার তৈরী ছয়টি ১০৫মিমি হাউইতজার (কামান) বিমানবন্দরের সীমানায় এনে জড়ো করলেন। যদিও সেনারা কিছু বুঝতে পারলেন না, তবুও প্রশিক্ষনের জন্য তিনি কামানগুলোকে রক্ষী বাহিনীর সদর দফতরের দিকে তাক করতে বলে আর্টিলারী ক্রুদের স্ট্যান্ডবাই রাখলেন। এর বাইরে আরো এগারটি কামান ইউনিট হেডকোয়ার্টারে ক্রু সহ স্ট্যান্ডবাই ছিলো। আর আঠারোতম কামানটি ১ম বেঙ্গল ল্যান্সারের গ্যারেজে ক্রু সহ নিয়ে যাবার নির্দেশ দিলেন।

এদিকে মেজর ফারুকও তার ট্যাঙ্কবহর নিয়ে প্রস্তুত হচ্ছিলেন। ৩০টি ট্যাঙ্কের মধ্যে ২৮ টি ট্যাঙ্ক কার্যক্ষম ছিলো, বাকী দুটা রক্ষনাবেক্ষনের জন্য গ্যারেজে ছিলো। এক বিমান চা পাতার বিনিময়ে পাওয়া ট্যাঙ্ক ছিলো এসব।

সমবেত হবার জায়গায় প্রতি ইউনিটের চারজন করে মোট আটজন অফিসার উপস্থিত ছিলেন। দুজন অফিসার কোনভাবেই এ ধরনের কিছু রাজী হবেননা ভেবে তাদের প্রশিক্ষন থেকে দূরে রাখা হয়। তাদের বলা হয় যে তাদের আসবার প্রয়োজন নেই।

আরেকটা ব্যাপার ছিলো সাধারন সৈনিকদের বাগে আনা। ইউনিটের প্রতিটি সৈনিককে জড়ো করা হয়। শেখ মুজিবের মলীন হতে থাকা ভাবমূর্তি কিংবা অন্য নানা কারনে ক্ষোভের ফলে মেজর ফারুক এবং মেজর রশীদ নিশ্চিত ছিলেন যে তারা কেউ বিরুদ্ধাচরন করবেনা। সেনাবাহিনীতে সাধারনত আদশ ন্যায় হোক আর অন্যায়, সৈনিকেরা আগে সেটা পালন করে। ‘স্যার বলছে, করতেই হবে’ ধরনের একটা ধারা দেখা যায়। আর সেই ব্যাপারগুলোও সবকিছুকে তাদের মনমতো হতে সাহায্য করবে।

তবে মেজর রশীদ অন্তত একটা পদাতিক ইউনিট সাথে নেবার চেস্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তেমনটা হলে ক্যুর পরে সেটাকে আর্মির একটা বড় অংশকেই সামনে নিয়ে আসতো। এ কারনে উনি সকালেই তার বন্ধু ১৬তম বেঙ্গলের ভারপ্রাপ্ত সিও মেজর শাহজাহানকে ফোন করে তাকে তার সেনাদের রাতে একটী অনির্ধারিত প্রশিক্ষনে যোগ দিতে বলেন। মেজর রশীদ নিশ্চিত ছিলেন যে পদাতিক সেনা ইউনিট ঢাকায় চলে আসলে তাদের বুঝিয়ে রাজী করাতে কোন সমস্যাই হবেনা। এই প্রস্তাবে সকালে মেজর শাহজাহান রাজী হলেও রাত ১০টার পর মেজর শাহজাহান টেলিফোনে জানান তার সেনারা ক্লান্ত, তাই তিনি প্রশিক্ষনের জন্য আসছেন না। মেজর ফারুককে এ খবর জানালে উনি বললেন,

– “বেঙ্গল টাইগাররা মনে হয় বিড়াল হয়ে গেছে।“

এদিকে মেজর ডালিম আর অন্যদেরও আসবার কোন লক্ষন দেখা যাচ্ছিলো না। মেজর ফারুক তাদের অপেক্ষা না করে নিজের অফিসার আর সেনাদের বিস্তারিত জানাবার সিদ্ধান্ত নিলেন। তবে রাত ১১টার দিকে মেজর ডালিমরা সবাই এসে পরলেন। মেজর রশীদও তার লোকেদের দিয়ে ল্যান্সারের গ্যারেজে চলে গেলেন।

১৫ই আগস্ট, ১৯৭৫
ঢাকা ক্যান্টোনমেন্ট, ঢাকা
রাত ১টা
১ম বেঙ্গল ল্যান্সারের গ্যারেজের সামনে প্রায় ৬০০ সৈনিক অপেক্ষা করছিলো পুর্ন প্রস্তুতিতে। আর এদিকে অফিসারেরা প্রথমে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে নিলেন। দুই ইউনিটের কোন অফিসারই আপত্তি করলেন না প্রাথমিকভাবে। আর এরপর মেজর ফারুক সেনাদের সামনে এগিয়ে গেলেন। উনি সৈনিকদের মাঝে কাজ করা ভীতিগুলোকেই কাজে লাগালেন। উনি বললেন,

– “সেনাবাহিনীকে ভেঙ্গে দেয়া হবে, ল্যান্সার, আর্টিলারী বলে আর কিছু থাকবেনা আর তোমরা হবে দাস। দেশের থেকে ইসলামের নাম মুছে ফেলবার চেস্টা করা হচ্ছে। দেশ, সেনাবাহিনী আর ইসলামকে রক্ষা করতে আমাদের সবার উচিত এখনই এর জবাব দেয়া। রাজনৈতিকভাবে সবকিছু মেজর রশীদ তার পরিচিতদের মাধ্যমে সামলে নেবে এবং শেখ মুজিবের পর খন্দকার মোশতাক আহমেদ দ্বায়িত্ব নেবেন।“

এরপর ফারুক অফিসারদের উদ্দেশ্য করে বললেন,

– “তোমরা কি আমার সাথে আছো?”

অফিসাররা কেউ আপত্তি করলেন না।

এরপর ১ম বেঙ্গল ল্যান্সারের স্কোয়াড্রন অফিসের টেবিলে ঢাকা শহরের ট্যুরিস্ট ম্যাপ নিয়ে সবাইকে পরিকল্পনা বোঝাতে বসলেন মেজর ফারুক। পরিকল্পনা মোতাবেক নিম্নলিখিত সিদ্ধান্তগুলো নেয়া হয়,

– একটা ট্যাঙ্ক রানওয়ে ব্লক করে ফেলবার কাজে ব্যবহৃত হবে, যাতে কোন জঙ্গী বিমান আকাশে উড়তে না পারে। ঢাকায় রানওয়ে তখন একটাই। একটা ট্যাঙ্ক জায়গামত ফেলে রাখলেই তা জঙ্গী বিমান উড্ডয়ন বন্ধ করে দিতে সক্ষম ছিলো।
– আরেকটা দল যাবে মিরপুর রোডের দিকে। সেখান থেকে তারা মিরপুর ব্রিজে গিয়ে তার নিয়ন্ত্রন নেবে যাতে সাভার থেকে রক্ষী বাহিনী কিংবা অন্য কোন সামরিক ইউনিট রিইনফর্সমেন্ট পাঠাতে না পারে।
– আরেকটা দল যাবে বাংলাদেশ বেতারের দিকে, রেডিও ষ্টেশনের দখল নিতে।
– একটা দল যাবে বঙ্গভবনের দিকে।
– আরেকটা দল যাবে নিউ মার্কেট এবং পিলখানার দিকে।

– তবে ৭৫-১৫০ জনের সবচেয়ে বড় তিনটি দল যাবে প্রধান লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য। আর তা হচ্ছে শেখ মুজিবুর রহমান, শেখ ফজলুল হক মনি এবং আব্দুর রব সেরনিয়াবাতকে টপকে দেয়া।

মেজর ডালিমকে প্রথমে বলা হলো শেখ মুজিবের বাসভবনে আক্রমনের দ্বায়িত্ব নিতে। কিন্তু পারিবারিক সম্পর্কের কারনেই উনি তা মানতে রাজী হলেননা। মেজর ডালিম এরচেয়ে আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের বাসভবনে আক্রমনে যেতে চাইলেন। ঠিক করা হলো মেজর বজলুল হুদা শেখ মুজিবের বাড়িতে আক্রমনের দ্বায়িত্বে থাকবেন, কারন মেজর বজলুল হুদা কর্মরত অফিসার এবং বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে প্রহরার কাজে নিযুক্ত থাকা ১ম ফিল্ড আর্টিলারীর এডজুটেন্ট ছিলেন মেজর হুদা। মেজর হুদার নির্দেশ তাদের শুনবার কথা ছিলো। মেজর একেএম মহিউদ্দীন, মেজর নুর চৌধুরী এবং মেজর মহিউদ্দীন থাকবেন মেজর হুদার সাহায্যকারী হিসেবে। পুরো এলাকা ঘিরে ফেলবার পরিকল্পনা করা হয় সেনাদের নানা দলের এবং মেজর ফারুকের ট্যাঙ্কের সাহায্যে।

-রক্ষী বাহিনীকে সামলাবার এবং মিরপুর ব্রিজের নিয়ন্ত্রন নেবার সবচেয়ে বড় আর কঠিন দ্বায়িত্ব নিলেন মেজর ফারুক নিজে।

-মেজর ফারুকের বিশ্বস্ত নন-কমিশন্ড অফিসার, রিসালদার মুসলেউদ্দীনকে দ্বায়িত্ব দেয়া হলো শেখ মনির বাসভবনে আক্রমনের।

-মিন্টো রোডে অবস্থিত আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের বাসভবন আক্রমন করা সহ মন্ত্রীদের এলাকা নিয়ন্ত্রনের দ্বায়িত্বে থাকলেন মেজর ডালিম, মেজর রাশেদ চৌধুরী, ক্যাপ্টেন মোস্তফাসহ পাঁচজন অফিসার।

প্রামথিকভাবে তাদের নির্দেশ দেয়া হলো প্রধান তিন টার্গেটকে শেষ করে দিতে। শেখ মুজিবকে হত্যা করে শেখ কামাল আর শেখ জামালকে গ্রেফতার করতে বলা হলো। বাকীদের ব্যাপারে কিছু বলা হলোনা। তবে এর বাইরে কেউ তাদের বাঁধা হয়ে দাড়ালে তাদেরও সরিয়ে দেবার নির্দেশ দেয়া হলো।

মেজর ফারুক এ ব্যাপারে বললেন,

– “পথে কেউ বাঁধা হয়ে দাড়ালে সাথে সাথে উপড়ে ফেলবে তাদের।“

আসলে এই কথার মাধ্যমে উনি বেপরোয়া যে কাউকে হত্যা করবার নির্দেশনাই দিয়ে দিলেন।

মেজর শাহরিয়ারকে দেয়া হলো রেডিও স্টেশন দখলের দ্বায়িত্ব। এখান থেকেই শেখ মুজিবকে হত্যা করবার এবং খন্দকার মোশতাকের দ্বায়িত্বভার নেবার খবর প্রচারের খসড়া প্রস্তুত করতে বলা হলো।

মেজর রশীদের প্রধান দ্বায়িত্ব হলো রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামলানো। অপারেশন শুরু হবার সাথে সাথে তিনি স্কোঃ লীঃ লিয়াকতের সাথে কথা বলবেন এবং যাতে তিনি তার মিগগুলো নিয়ে সেনাবাহিনীর বাইরের কোন ইউনিট ঢাকার দিকে আগাতে চাইলে সেগুলোকে বাঁধা দেবেন। এর বাইরেও রশীদ খন্দকার মশতাক আহমেদকে রেডিও সেশনে নিয়ে গিয়ে শেখ মুজিবকে অপসারন ও প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বায়িত্ব নেবার কথা ঘোষনা করাবেন। এবং এর মাঝেই ব্রিগেড হেডকোয়ার্টার এবং অন্যান্য বড়ো অফিসারদের বুঝিয়ে বাগে আনতে চেস্টা করবেন।

এই অপারেশনের সাফল্য ছিলো প্রায় নিশ্চিত। কারন এর প্রথম লক্ষ্য ছিলো বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা। যেহেতু অনেকস্থান থেকে সাবধান করবার পরেই নিরাপত্তার তেমন কোন ব্যবস্থা নেননি তিনি, তাই পথে রক্ষী বাহিনী বাঁধা না হয়ে দাড়ালে আর কেউ কিলিং মিশন ঠেকাতে পারতোনা। আর খবর পাবার পর সাহায্য পৌছাতে অন্তত দুই ঘন্টা সময় লাগতোই, আর ততক্ষনে কাজ শেষ হয়ে যেতো। বঙ্গবন্ধু সেনাবাহিনীর উপরের স্তরের সবার উপর নজর রাখছিলেন, মধ্যমসারির অফিসারদের থেকে কোন হুমকির আশংকা করছিলেননা। উনি জানতেন না যে সামরিক বাহিনীতে সৈনিকদের উপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব থাকে এই মধ্যমস্তরের অফিসারদের এবং অপারেশনাল কাজকর্ম এদের দিয়েই চলে।

পরিকল্পনার কথা জানানো শেষ হলে মেজর ফারুক, মেজর মহিউদ্দীনকে দ্বায়িত্ব দিলেন সৈনিকদের মধ্যে যারা বেসামরিক পোশাকে ছিলো তাদের আর্মার্ডের কালো পোষাক এবং গোলাবারুদ সরবরাহ করতে। মেজর ফারুক এই বলে শেষ করলেন যে, ট্যাঙ্কগুলো তার নির্দেশ মোতাবেক এগিয়ে যাবে এবং ফিল্ড রেজিমেন্টের সেনারা ট্যাঙ্কের আগেই রওনা দেবে তাদের লক্ষ্যে।

ভাগ্যও মেজর ফারুকদের সাথেই ছিলো সম্ভবত। রক্ষী বাহিনীর প্রধান ব্রিগেডিয়ার নুরুজ্জামান সরকারী সফরে ইউরোপে গিয়েছিলেন। তার জায়গায় দ্বায়িত্ব নেন একজন জুনিয়র কর্নেল যিনি রক্ষী বাহিনীর কাজ কর্ম সম্পর্কে তখনো সেভাবে পরিচিত ছিলেননা। এ কারনে তার পক্ষে কোন দ্রুত সিদ্ধান্ত দেয়া কঠিন ছিলো যেটা ব্রিগেডিয়ার নুরুজ্জামান করতে পারতেন। উনি ছিলেন শেখ মুজিবের খুবই বিশ্বস্ত।

১৫ আগস্ট, ১৯৭৫
ঢাকা, বাংলাদেশ
ভোর চারটা
সাড়ে চারটার মধ্যে মেজর ফারুক তার সকল গ্রুপকে একত্রিত করে ফেললেন। তারা সকলে নিজের লক্ষ্য যাত্রা করবার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। ল্যান্সারের গ্যারেজে সারিবদ্ধভাবে দাড় করানো আছে ২৮টি ট্যাঙ্ক, ১২ টি ট্রাক, তিনটি জীপ এবং একটি হাউইতজার। কিছু সেনা ইতিমধ্যেই চলে গেছে নানা দিকে। তবে প্রধান স্ট্রাইক গ্রুপগুলোর প্রায় ৪০০র বেশি সেনা অপেক্ষা করছে শেষ নির্দেশের। এদের বেশীরভাগই আর্মার্ডের কালো ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায় আছে। এই কালো ইউনিফর্ম বাংলাদশের ইতিহাসে এক বিভীষিকার মত হয়ে থাকবে।

আর এসবই হচ্ছিলো ফিল্ড ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের সদর দফতরের মাত্র ৩০০ গজ দূরে। যাদের সার্বক্ষনিক পর্যবেক্ষনে থাকবার কথা। মেজর ফারুক কোন ইনফর্মার যাতে ধারে কাছে আসতে না পারে সেজন্য কিছু লোক নিয়োগ করেছিলেন সীমানা প্রাচীরের চারদিকে। কেউ এগিয়ে আসলে যাতে তাদের গুম করে দেয়া যায়। তবে কেউ সে রাতে এদিকে নজর দেয়নি।

ভোর পাঁচটার মধ্যেই তাদের প্রথম গ্রুপটি রওনা দিলো তাদের লক্ষ্যস্থলে। সেই মুহুর্তে আজানের ধ্বনি প্রচারিত হচ্ছিলো। এমনই এক শুক্রবারে আজানের সময় মেজর ফারুকের জন্ম হয়েছিলো। মেজর ফারুক আবার আন্ধা হাফিজের বলে দেয়া দোয়া পড়ে নিলেন। এরপর সকল গ্রুপকে নির্দেশ দিলেন যার যার লক্ষ্যের দিকে মোড় নিতে।

প্রায় একঘন্টার মধ্যেই নতুন সংসদ ভবনের কাছের রক্ষী বাহিনীর ক্যাম্পে পৌছে গেছেন মেজর ফারুক। স্বাভাবিক হিসেবে ২৮টা ট্যাঙ্কের পক্ষে রক্ষী বাহিনীর প্রায় ৩০০০ সেনাকে পরাজিত করা অসম্ভব ব্যাপার ছিলো। এর বাইরে সবচেয়ে বড় ব্যাপার ছিলো যে এই ট্যাঙ্কগুলোর একটিতেও কোন গোলা ছিলনা। এমনকি মেশিনগানগুলোরও কোন গোলা ছিলনা। ট্যাঙ্কের গোলাগুলো জয়দেবপুরের অর্ডন্যান্স ডিপোতে মজুদ করা ছিলো। শেখ মুজিব টয়াঙ্ক তাদের হাতে তুলে দিলেও গোলাগুলো তুলে দেবার নির্বুদ্ধিতা করেননি। তবে এটা সরকার আর সেনাবাহিনীর উপরের স্তরের কিছু মানুষ জানতো, আর কারো জানবার কথা ছিলনা। মেজর ফারুক এই সুযোগটাই কাজে লাগিয়ে মানসিকভাবে তাদের ভেঙ্গে দিতে চাইলেন। যুদ্ধ কিংবা শান্তির যেকোন সময় যেকোন মানুষের কাছে ট্যাঙ্ক দর্শনেই একটা ভীতিকর অনুভুতির জন্ম নেয়।

যাত্রাপথে তারা কেবল ক্যান্টনমেন্টের এমুনিশন সাব-ডিপোতে থেমেছিলেন। ডিপো ভেঙ্গে তারা দেখেছিলেন কোন ট্যাঙ্কের গোলা আছে নাকি, কিংবা মেশিনগানের গুলির কোন বেল্ট। কিন্তু কিছুই ছিলনা সেখানে। তাদের কাছে অস্ত্র বলতে স্টেনগান আর রাইফেলই ভরসা করবার মত ছিলো। গোলাবিহীন ট্যাঙ্কের ধোঁকা কাজ না করলে সমুহ বিপদ ছিলো সামনে।

ট্যাঙ্কের কলাম বনানীর রাস্তা ধরে এগিয়ে ডানে মোড় নিয়ে ক্যান্টনমেন্টের চেকপোস্টের দিকে এগিয়ে গেলো। যাবার পথে তারা নিয়মিত পিটিতে যেতে দেখলেন ১ম ও ৪র্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেনাদের। তাদের কেউও কোন সন্দেহ করলোনা। বরং পিটি বাদ দিয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ছিলো। এতো ট্যাঙ্ক একসাথে অরাও মনে হয় আগে দেখেনি।

ক্যান্টনমেন্ট পার হতেই ট্যাঙ্কগুলো দ্রুতগতিতে এগিয়ে চললো শেরে বাংলা নগরের দিকে। সংক্ষিপ্ত পথে যেতে বর্তমান পুরাতন বিমানবন্দরের দেয়াল ভেঙ্গে এগিয়ে গেলো। একটা ট্যাঙ্ক আগের পরিকল্পনা মতো বাক নিয়ে হেলিপ্যাডের দিকে চলে গেলো যেখানে বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টারগুলো সারিবদ্ধভাবে রাখা ছিলো। ঢাকার কোন বিমানবন্দর থেকে সামরিক কোন বিমান উড্ডয়ন আর সম্ভব ছিলনা। শেরে বাংলানগরে প্রবেশের মুহুর্তে মেজর ফারুক তার ঘড়ী দেখলেন। সময় ৫টা ১৫ মিনিট। কিলার টীমগুলো সম্ভবত তাদের লক্ষ্যে পৌছে গেছে।

বিমানবন্দর পার হবার সময়ই উনি খেয়াল করলেন যে পেছনে মাত্র একটা ট্যাঙ্ক তাকে ফলো করছে। বাকীগুলো সম্ভবত তাকে হারিয়ে ফেলেছে দ্রুতগতির কারনে। তবে মেজর ফারুক থেমে গেলেননা। উনি রক্ষী বাহিনীর ক্যাম্পের দেয়াল ভেঙ্গে ট্যাঙ্কগুলো নিয়ে ঢুকে পরলেন রক্ষী বাহিনীর ব্যারাকের দিকে। আর ঢুকে যা দেখলেন তাতে তার অন্তর কেঁপে উঠলো। উনি দেখলেন রক্ষী বাহিনীর পুরো ব্রিগেডটাই সারিবদ্ধভাবে ছয় সারিতে দাঁড়ানো। স্টিলের হেলমেট, রাইফেল, বিগপ্যাক সবসহ তারা নিয়মিত সমাবেশে উপস্থিত ছিলো। তবে এমন নিয়মিত সমাবেশ কিংবা প্যারেডে গুলি বহন করবার কথা নয়। আর পিছিয়ে যাবারও কোন উপায় ছিলনা। ট্যাঙ্কের ডাইভার তাকে জিজ্ঞেস করলো,

– “এখন আমি কি করব?”

মেজর ফারুক বললেন,

– “ওদের নাকের আধহাত সামনে দিয়ে ট্যাঙ্ক চালিয়ে নিয়ে যাও।“

উনি গানারকে বললেন,

– “ট্যাঙ্কের গানব্যারেল সমবেত রক্ষী বাহিনীর সেনাদের দিকে তাক করে রাখবে।“

ট্যাঙ্কের টারেটের উপরের কালো পষাকের সেনাদের উনি বললেন,

– “ওদের দিকে কঠিন চোখে তাকিয়ে থাকবে, তোমাদের যেন সাহসী দেখায়।“

তারা ধীরে রক্ষী বাহিনীর সেনাদের সামনে দিয়ে চলে গেলেন কঠিন দৃষ্টি বজায় রেখে। মেজর ফারুক ডাইভারকে বললেন,

– “ওরা যদি কিছু করবার চেষ্টা করে তবে ট্যাঙ্ক সোজা ওদের উপর দিয়ে চালিয়ে দেবে।“

আসপাশ থেকেই গুলির শব্দ ভেসে আসছিলো আর এখানে হুট করেই ট্যাঙ্ক এসে উপস্থিত। কেউ আঙ্গুল নাড়াবার সাহসও করলোনা। আর যখন কোন সেনাদল প্রথমেই পদক্ষেপ না দিয়ে ভাবা শুরু করে, তাদের পক্ষে দ্রুত আর কিছু করা সম্ভব হয়ে ওঠেনা। যখনই কেউ পরিস্থিতি বুঝে ব্যবস্থা নেবার কথা ভাবে, তখন তার পক্ষে আর কোন পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হয়না। আর এভাবেই ফারুক রক্ষী বাহিনীর শক্তিশালী একটা ব্রিগেডকে তার গোলাশুন্য ট্যাঙ্ক দিয়ে কাবু করে ফেললেন।

এরপর রক্ষী বাহিনী আর কিছু করবেনা ধরে নিয়ে মেজর ফারুক বাকী ট্যাঙ্কগুলোকে তাদের নজরে রাখবার নির্দেশ দিয়ে ধানমন্ডীর দিকে ছুটলেন।

১৫ আগস্ট, ১৯৭৫
ঢাকা, বাংলাদেশ
বঙ্গবন্ধুর বাসা থেকে মাত্র আধ মাইল দুরত্বের আব্দুর রব সেরনিয়াবাত এবং দেড় মাইল শেখ মনির বাসায় আক্রমন চালালো ঘাতকের দল। মেজর ডালিমের নেতৃত্বে মেজর শাহরিয়ার রশীদ, মেজর আজিজ পাশা, ক্যাপ্টেন মাজেদ এবং ক্যাপ্টেন নুরুল হুদার দল আব্দুর রব সেরিনিয়াবাতের ২৭ নং মিন্টো রোডের বাসা ঘিরে ফেললো একেবারে ভোরের দিকেই। মাত্র একজন পুলিশ পাহারায় ছিলেন সেখানে। তাকে ভয় দেখিয়ে তাড়াতে ঘাতক সেনারা শুন্যে আর বাড়ি লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া শুরু করে। গুলির শব্দে বাড়ির বাসিন্দারা জেগে উঠলেন। আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের ৩০ বছর বয়সী ছেলে আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ আর কক্ষের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখলেন যে কালো পোশাকের সেনারা তাদের বাড়ি লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ছে। সবসময় কাছেই রাখা স্টেনগানটা নিয়ে উনি নীচতলায় তার বাবার কাছে ছুটে গেলেন তাকে জাগাতে। তবে উনি ততক্ষনে জেগে গিয়েছিলেন এবং টেলিফোনে বঙ্গবন্ধুকে এ কথা জানিয়ে সাহায্য চাইবার এবং সতর্ক করবার জন্য চেস্টা করছিলেন। টেলিফোনটি ব্যস্ত পাওয়া গেলো, তবে এরপরে আবার চেস্টা করে উনাকে পাওয়া গেলো।

আব্দুর রব সেরনিয়াবাত বঙ্গবন্ধুকে তার বাড়ি আক্রমনের খবর জানালেন এবং সাহায্য পাঠাবার জন্য অনুরোধ করলেন। তবে ওই মুহুর্তে আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহও টেলিফোনের অপরপ্রান্ত থেকে গুলির শব্দ ভেসে আসতে শুনলেন। তার বাবাও শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলেন। উনি বুঝতে পারলেন ঘাতকেরা ইতিমধ্যে বঙ্গবন্ধুর বাড়িও আক্রমন করে বসেছে। উনি কোন কথা না বলে টেলিফোন রেখে দিয়ে বিছানার উপর বসে পরলেন এবং তার ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন নির্বাক হয়ে।

আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ এরপর জানালার কাছে গেলেন এবং স্টেনগান বের করে ট্রিগার চেপে ধরে রাখলেন যতক্ষন ম্যাগাজিন খালি না হয়। ম্যাগাজিন খালি হয়ে গেলে তিনি আরো গুলির সন্ধানে উপরতলায় ছুটে গেলেন। উপরে চলে যাওয়াতেই হয়তো তার জীবন বেঁচে গেলো। কারন মুহুর্ত পরেই কালো পোশাকের সেনারা প্রথমতলায় চলে আসে এবং দরজা ভেঙ্গে ফেলে। তারা আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের শয়নকক্ষে ছুটে গিয়ে তাকে দেখামাত্র বিছানার উপরেই গুলি করে মেরে ফেলে।

হাসনাত চিলেকোঠায় আছেন এই মুহুর্তে। প্রানপন চেস্টা করছিলেন ট্রাঙ্কের তালা ভেঙ্গে গুলির ম্যাগাজিন বের করতে। তবে গুলির আর উপরে উঠবার কারনে বুটজুতার আওয়াজ শুনে উনি স্টেনগান ফেলেই ছাদে চলে গিয়ে অন্ধকারে লুকাতে চাইলেন। তবে সেখান থেকে সরে যেতে পারলেননা। তাই তিনি চিলেকোঠার মেঝেতেই শুয়ে পরে আত্মগোপনের চেস্টা করেন এবং অপেক্ষায় থাকলেন যে কখন ঘাতকের দল এদিকে এসে তাকেও মেরে ফেলবে। তবে কেউ আর আসেনি এদিকে।

এই সময়ে প্রায় ১৫-২০ মিনিট ধরে তান্ডব চালালো ঘাতকের দল। তারা বাড়ির যাকে যেখানে পেলো একত্র করে নীচতলার ড্রয়িং রুমে এনে ঠান্ডা মাথায় গুলি করে হত্যা করলো। হাসনাত মাঝে মাঝেই গুলির শব্দ আর উচ্চস্বরে কথা বলতে শুনছিলেন ঘাতকদের। এরপর সব স্তব্ধ হয়ে গেলো এবং ঘাতকের দল রাস্তায় বেরিয়ে এলো। হাসনাত অনেকয়া সময় অপেক্ষা করলেন নীচে নেমে এসে সবকিছু দেখবার জন্য। উনি নীচতলার ড্রয়িং রুমে এসে দেখতে পেলেন সারা কক্ষ রক্তে ভেসে আচ্ছে। তার স্ত্রী শাহানারা, মা আমেনা বেগম, ভাই আবুল খায়ের সেরনিয়াবাত, ২০ বছর বয়সী ছোটবোন বিউটি, বোন রীনা সেরনিয়াবাত, গৃহকর্মী রানা, রফিকুল ইসলাম, লতিফ দাশ এবং গোলাম মাহমুদ ভীষনভাবে আহত এবং তাদের রক্তক্ষরন হচ্ছিলো। তার ছোট্ট দুই মেয়ে সোফার পেছনে লুকিয়ে ছিলো এবং এই তান্ডব থেকে বেঁচে যায়। তবে তার চার বছরের ছেলে সুকান্ত আব্দুল্লাহ বাবু, কিশোরী বোন বেবী সেরনিয়াবাত, ১১ বছরের ভাই আরিফ, বাড়ির আয়া পটকা ও লক্ষীর মা এবং তার ভাই শহীদুল ইসলাম সেরনিয়াবাতের লাশ দেখতে পেলেন মেঝেতে। শহীদুল ইসলামের আবুল হাসনাতের মতই বড় গোফ ছিলো, আর তা দেখে ঘাতকেরা সম্ভবত তাকে আবুল হাসনাত ভেবে হত্যা করে। এর বাইরে তার বনের বিয়ে উপলক্ষ্যে ১০ জন বন্ধু এসেছিলেন। আদের একজন আবু নাঈমকে হত্যা করা হয় এবং আরো পাচজন আহত হন। আবুল হাসনাত এরপর বাড়ি থেকে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেবেন।

ঠিক একই সময়ে রিসালদার মুসলেহউদ্দীনের অধীনে ২৫-৩০ জনের এক ঘাতক দল ১৩/১ ধানমন্ডীতে শেখ মনির বাসায় হামলা করেন। এখানে তান্ডব ছিলো সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য। তারা কালো পোশাকে বাড়ির প্রথম তলায় উঠেই যাকে সামনে পায় গুলি করতে থাকে। শেখ মনির সাত মাসের গর্ভবতী স্ত্রী আরজু মনি স্বামীকে বাচাতে তার সামনে এসে দাড়ালে তাকেও গুলি করা হয় প্রথমেই।

বর্তমানে আওয়ামী লীগ নেতা ব্যারিস্টার ফজলে নুর তাপস তিনজন ভাগ্যবানের একজন ছিলেন যারা সেদিনের হত্যাকান্ড থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন। উনি সেইদিন তার কক্ষে ভাইয়ের সাথে ঘুমাচ্ছিলেন। এরপর তিনি তার বাবার আগমনের পদধ্বনি শুনতে পান সিড়িতে। উনি নীচে নেমে সম্ভবত কোন পত্রিকা আনতে যাচ্ছিলেন। নিচে নামবার সাথে সাথেই রিসালদার মুসলেহউদ্দিন তাকে বলে,

– “আপনাকে গ্রেফতার করা হলো।“

এরমধ্যেই বেগম আরজু মনি চলে আসেন। ঘাতকেরা তাকে গুলি করতে নিলে উনি সামনে এসে দাঁড়ান স্বামীকে বাচাতে। তবে তাদের দুজনকেই গুলি করা হয়। ঘাতকেরা চলে গেল তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে আদের মৃত ঘোষনা করা হয়। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় বেগম আরজু মনি শেষবারের মত বলেন,

– “আমাকে তোমরা বাচাও। আমার ছোট দুটা বাচ্চা আছে।“

১৫ আগস্ট, ১৯৭৫
ঢাকা, বাংলাদেশ
ভোর ৪ টা ৪০ মিনিট
বোনের বাড়িতে আক্রমনের খবর পেয়েই বঙ্গবন্ধু রক্ষী বাহিনীর হেডকোয়ার্টারে ফোন করলেন, কিন্তু রক্ষী বাহিনী প্রধান ব্রিগেডিয়ার নুরুজ্জামান এবং পরিচালক অপারেশন্স কর্নেল শাহাবুদ্দীন বিদেশ থাকবার কারনে অন্য কোন উর্ধতন কর্মকর্তাকে জানাতে পারলেননা। এরপর উনি সেনাপ্রধান জেঃ শফিউল্লাহ এবং উনার সামরিক সচিব ব্রিগেডিয়ার মাশুরুল হককেও টেলিফোন করলেন, তাদের উনি শীঘ্রই সাহায্য পাঠাতে বললেন। উনাদের কেউই শেষ পর্যন্ত কোন সাহায্য পাঠাননি।

উনি শেষ কলটি করলেন কর্নেল জামিল উদ্দীন আহমেদকে। উনি মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানে আটক ছিলেন এবং পরে প্রত্যাগত অফিসার হিসেবে সেনাবাহিনীতে যোগদান করে। বঙ্গবন্ধু এই চৌকস অফিসারকে সামরিক সচিব হিসেবে নিয়োগ দেন। আর কিছুদিন আগেই তাকে ডিরেক্টরেট অফ ফোর্সেস ইনেলিজেন্সের ডিরেক্টর হিসেবে নিয়োগ দিয়ে প্রেসিডেন্টের সুরক্ষার দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্য্যালয়ে দ্বায়িত্বপালনের সময়ও উনি বঙ্গবন্ধু সহ বাকী সবার খুব পছন্দের মানুষ ছিলেন তার চারিত্রিক বৈশিষ্টের কারনেই।

ভোর ৪ টা ৪৫ মিনিটের দিকে বঙ্গবন্ধু তাকে টেলিফোন করলেন। বঙ্গবন্ধু তাকে বললেন,

– “আমরা বিপদের মধ্যে আছি। কারা যেনো আমার বাসায় আক্রমন করেছে। জামিল, আমাকে বাচাও।“

কর্নেল জামিল বললেন,

– “স্যার, আমি এখনই আসছি।“

এরপর সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

সাথে সাথেই কর্নেল জামিল সেনাপ্রধানকে ফোন করে তাকে সেনা পাঠাতে বললেন। উনি রক্ষী বাহিনীকেও ফোন করে তাদের ফোর্স পাঠাতে বললেন। এরপর উনি পিজিআর কে নির্দেশ দিলেন ধানমন্ডী ৩২ নাম্বারে রওনা দিতে। উনি হয়তো ভেবেছিলেন তারাও ছুটে যাবে সাথে সাথেই। কিন্তু কোন এক অজানা কারনে কোন জায়গা থেকেই সাহায্য আসেনি।

যখন মিসেস আঞ্জুমানারা জামিল জিজ্ঞেস করলেন,

– “তুমি কি সত্যি যাচ্ছো?”

কর্নেল জামিল সাথে সাথেই বললেন,

– “বঙ্গবন্ধুর জীবন হুমকীর মুখে, আমাকে যেতেই হবে।“

উনি দ্রুত পোষাক বদলে নিজের রিভলবার বের করে আরেকবার বঙ্গবন্ধুকে ফোন করেও পেলেন না। এরপর নীচে নেমে গিয়ে সেনাদের ৩২ নাম্বারের দিকে রওনা দিতে বললেন। উনি নিজেও তাদের সাথে যেতে চেয়েছিলেন কিন্তু সেখানে তাদের পরিবহনের জন্য অতিরিক্ত জীপ ছিলনা। তিনি তাদের জন্য নিজের জীপটী ছেড়ে দিয়ে নিজের লাল রঙের নিশান প্রিন্স গাড়িতে উঠে বসলেন। এর আগে গনভবনের বাসা থেকে বের হবার সময় শেষবারের মত মিসেস জামিল আবার বলেছিলেন,

– “তোমার না গেলে হয়না?”

কর্নেল জামিল বললেন,

– “তুমি কি পাগল হয়েছো? বঙ্গবন্ধু বিপদে আছেন আর আমি যাবো না?”

এরপর উনি একটা সিগারেট ধরালেন। এক গ্লাস পানি খেয়ে উনার স্ত্রীকে বললেন,

– “আমার মেয়েদের দেখে রেখো।“

এরপর গাড়ি ছেড়ে দিলে মিসেস জামিল এবং তার বড়ো মেয়ে কঙ্কা গড়িটি অদৃশ্য না হওয়া পর্যন্ত তাকিয়ে থাকলেন। গনভবনের গার্ড মিসেস জামিলকে জিজ্ঞেস করলো,

– “ম্যাডাম, আপনি স্যারকে যেতে দিলেন?”

এরপর মিরপুর রোড ধরে সোবহানবাগ মসজিদের সামনে এসে দেখলেন যে পিজিআর এর কনভয় থমকে আছে। উনি জানএ চাইলেন যে কেন তারা থেমে আছে এখানে। জবাবে তারা জানালো যে সামনে একটা আর্মি ইউনিট রাস্তা আটকে রেখেছে এবং ব্যাপক গোলাগুলি হচ্ছে সামনে। কেউ একজন বললো,

– “সামনে অনেক সমস্যা স্যার। ট্যাঙ্ক নিয়ে রাস্তা আটকে রেখেছে।“

কর্নেল জামিল রেগে গেলেন। উনি তখনই বাঁধা সরিয়ে সামনে আগাতে বললেন। উনি প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে রাখা সেনাদের উদ্দেশ্যে বললেন,

– “আমি কর্নেল জামিল। আমার আদেশ মেনে ব্যারিকেড সরিয়ে নাও এবং পিজিআর এর সেনাদের যেতে দাও।“

ব্যারিকেড তৈরী করা সেনাদের একজন অফিসার বললেন,

– “আমাদের উপর নির্দেশ আছে কেউ এই পথ দিয়ে যেতে চাইলে তাকে গুলি করবার।“

কর্নেল জামিল তাদের বুঝিয়ে রাজী করাতে চাইলেন। উনি ব্যারিকেডের দ্বায়িত্বে থাকা সুবেদার মেজরকে প্রায় রাজী করিয়েও ফেলেছিলেন। উনি মোনতাকে সম্মতির লক্ষন ধরে নিয়ে নিজের গাড়ির দিকে চলে গেলেন এবং তার ড্রাইভার আইনুদ্দীনকে বললেন রাজী চালাতে।

আইনুদ্দীন কাতর স্বরে বললেন,

– স্যার, প্লিজ যাবেননা।“

ক্ররনেল জামিল জবাব দিলেন,

– “ভয় পেলে নেমে যাও। আমিই ড্রাইভ করবো।“

ঠিক এসময়ই মেজর বললুল হুদা সেখানে চলে আসলেন। মেজর হুদা জিজ্ঞেস করলেন,

– “আপনি কে?”

কর্নেল জামিল জবাব দিলেন,

– “আমি কর্নেল জামিল।“

মেজর হুদা কোন সময় নিলেন না। সেই সুবেদার মেজরকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

– “গুলি করো।“

সেই সুবেদার মেজর জবাব দিলো,

– “না স্যার, আমি পারবো না।“

মেজর হুদা তার হাত থেকে স্টেনগানটা কেড়ে নিয়ে গাড়ির পেছন দিক থেকে এক পশলা গুলি করলেন। কর্নেল জামিল তিনবার উচ্চারন করলেন,

– “লা ইলাহা ইল্লালাহ!”

উনি শহীদ হয়ে গেলেন। ন্যায়ের পথে যিনি নিজের জীবন নাশের আশংকা আছে জেনেও এগিয়ে গিয়ে মৃত্যুবরন করেন তাকে নিশ্চয়ই শহীদ বলা যায়। এই ঘটনার একমাত্র বেসামরিক সাক্ষী হয়ে রইবেন সোবহানবাগ মসজিদের ইমাম সাহেব।

আমি জানিনা কর্নেল জামিলের এই সামান্য ঘটনাটা মানুষ কিভাবে দেখবেন। খুব বেশি বীরত্বের হয়তো কিছু খুঁজে পাওয়া যাবেনা। যে দ্বায়িত্ববোধ এবং নিজের কর্তব্যের প্রতি নিষ্ঠা উনি দেখালেন তা এই সময়ে আর কেউ দেখাননি, আর একজনও না। তবে এই একজনের কথাও যদি আমরা না জানি তবে সেটা উনার মত মানুষের প্রতি অন্যায় করা হবে। ইতিহাসের যেকোন সময়ে ভালোর উপর মন্দের আধিপত্যের সময়ে ভালো কখনোই হারিয়ে যায়না, কেউ না কেউ ন্যায়ের পথে নিজেকে ধরে রাখে।

১৫ আগস্ট, ১৯৭৫
ধানমন্ডী ৩২ নম্বর সড়ক
৬৬৭ নম্বর বাড়ি
ঢাকা, বাংলাদেশ
ভোর এখনো হয়নি। সুর্য্য তার দুর্বল লালচে আভা ছড়াতে শুরু করেছে কেবল। এখন গার্ড ডিউটির পালাবদলের সময় আর বাড়ির বাকী সবাই গভীর ঘুমে। বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সহকারী এএফএম মুহিতুল ইসলামের আজ নাইট ডিউটি ছিলো। উনিও রাৎ একটার দিকে ঘুমিয়ে পরেছিলেন। এই সময়ে ফোন বাজার আওয়াজে তার ঘুম ভাংলো। বঙ্গবন্ধুর গলা শোনা গেলো রিসিভার ধরতেই। ঘড়ির কাটা পাঁচটা ছুই ছুই করছে। বঙ্গবন্ধু তাকে বললেন,

– “পুলিশ কন্ট্রোলরুমে মিলাও।“

বঙ্গবন্ধু তার বোন জামাই আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের বাসভবন থেকে খবর পেয়েছিলেন যে তাদের বাসভবন আক্রমন করা হয়েছে।

মুহিতুল পুলিশের নাম্বারে ডায়াল করলেন কিন্তু সংযগ পেলেননা। এরপর তিনি গনভবনের একচেঞ্জে ফোন করলেন। কেউ একজন ফোন তুললো কিন্তু কথা বললোনা। বঙ্গবন্ধু অধৈর্য্য হয়ে উঠছিলেন। উনি জিজ্ঞেস করলেন,

– “পুলিশ কন্ট্রোলরুমে যোগাযোগ করছোনা কেন?”

মুহিতুল জবাব দিলেন,

– “স্যার, কাউকেই পাচ্ছিনা ফোনে।“

চিন্তিত এবং বিরক্ত বঙ্গবন্ধু নিজেই হ্যান্ডমাইকের রিসিভার তুলে নিলেন এবং বললেন,

– “আমি প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিব বলছি।“

ঠিক এই সময়েই এক পশলা গুলি বৃষ্টি করা হলো মুহিতুলের অফিস লক্ষ্য করে। বঙ্গবন্ধু তখনো জানতেননা হত্যাকারীরা তাদের মিশন শুরু করে ফেলেছে।

হাবিলদার কুদ্দুস শিকদারের অধীনে সাতজন গার্ড এসময় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করছিলেন। তারা লেকের কাছ থেকে গুলির শব্দ শুনতে পেলেন। এরপরেই তারা দেয়ালের ভেতরে চলে এসে বিভ্রান্ত অবস্থায় যখন গুলি ভরছিলেন পালটা জবাব দেবার জন্য, ঠিক তখনই কালো এবং খাকী ইউনিফর্মে কিছু সৈনিক এসে তাদের ঘিরে ফেললো এবং বললো,

– “হাত উপরে তোলো।“

এদিকে মুহুতুল ইসলামের অফিস কক্ষের ভেতর বঙ্গবন্ধু একটা টেবিলের পেছনে আশ্রয় নিলেন এবং মুহিতুল ইসলামকে টেনে মেঝেতে শুইয়ে দিলেন। তখনই গৃহভৃত্য আব্দুল বঙ্গবন্ধুর জন্য তার পাঞ্জাবী এবং চশমা এনে দিলেন উপরতলা থেকে। উনি সেগুলো পরে নিলেন এবং বারান্দায় এসে দাড়ালেন।
বঙ্গবন্ধু সেখান থেকে সেন্ট্রিদের উদ্দেশ্যে চীৎকার করে বললেন,

– “চারদিকে গোলাগুলি হচ্ছে। তোরা কি করছিস?”

এরপর তিনি উপরের তলায় চলে গেলেন যেখানে আর স্ত্রী, ছেলে শেখ রাসেল, শেখ কামাল, শেখ জামাল এবং শেখ জামালের স্ত্রী রোজী ও তার ভাই শেখ নাসের অবস্থান করছিলেন। উনি তখনো জানতেন না এটাই তাদের সাথে উনার শেষ দেখা হবে।

গৃহকর্মী রমা তখন বঙ্গবন্ধুর বেডরুমের সামনে বারান্দায় ঘুমাচ্ছিলো। হুট করে দরজা খুলে বেগম মুজিব উপস্থিত হলেন। উনি বললেন,

– “দুস্কৃতিকারীরা সেরনিয়াবাতের বাসায় হামলা করেছে।“

রমা লাফিয়ে উঠে গেলেন এবং ভীত হয়ে দৌড়ে সামনের গীর বাইরে গিয়ে দেখতে পেলেন কিছু সেনা তাদের বাড়ির দিকে এগিয়ে আসছে অস্ত্র উপরের দিকে তাক করে গুলি করতে করতে। ভয় পেয়ে রমা দৌড়ে গিয়ে শেখ কামালকে তার উপরতলার কক্ষে গিয়ে জানাতে চাইলেন। সেখানে শেখ কামাল এবং সুলতানা কামালকে ঘুম থেকে ডেকে তুললেন এবং জানালেন যে আর্মিরা তাদের বাড়ি আক্রমন করেছে। কামাল দ্রুত একটি পাজামা এবং শার্ট পড়ে নীচতলায় ছুটলেন। রমা সুলতানা কামালকে দ্বিতীয়তলায় পরিবারের সবার কাছে নিয়ে গেলেন।

রমা শেখ জামালকেও ডেকে তুললেন এবং তিনিও পাজামা আর শার্ট পরে মায়ের কক্ষে চলে গেলেন স্ত্রী সহ। চারদিক থেকে বৃষ্টির মত গুলি ছুটে আসছিলো। রমা নীচতলায় কারো গোঙ্গানীর শব্দ শুনতে পেলেন। রমা তখন জানতেননা সেটা এটা শেখ কামালের গোঙ্গানোর আওয়াজ, যাকে কিছুক্ষন আগেই গুলি করা হয়েছে।

এদিকে মুহিতুল দেখছিলেন যে শেখ কামাল উপরতলা থেকে নীচতলায় নেমে এসেছেন। উনি বারান্দায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বললেন,

– “আর্মি আর পুলিশের লোকেরা আমার সাথে আসেন।“

উনি প্রহরীদের খঁজে বের করতে চাইছিলেন। তবে ঠিক সে সময়েই তিন থেকে চারজন সেনা কালো এবং খাকী পোষাকে তার সামনে উপস্থিত হয়। তারা কোমর বরাবর অস্ত্র তাক করে শেখ কামাল, মুহিতুল ইসলাম এবং নুরুল ইসলাম নামের একজন পুলিশ কর্মকর্তার সামনে দাড়ালো। খাকী পোষাক পরিহিত মেজর বজলুল হুদাকে মুহিতুল ইসলাম চিনতে পারলেন। তাকে মুহিতুল আগেই দেখেছিলেন। মেজর বজলুল হুদা এসেই শেখ কামালের পা লক্ষ্য করে গুলি করলেন। শেখ কামাল লাফিয়ে মুহিতুল ইসলামের কাছে সরে আসলেন। মুহিতুল ইসলামকে উদ্দেশ্য করে শেখ কামাল বললেন,

– “ওদের বলেন যে আমি শেখ মুজিবের ছেলে শেখ কামাল।“

মুহিতুল বললেন,

– “উনাকে গুলি করবেন না। উনি শেখ কামাল, শেখ মুজিবের ছেলে।“

হত্যাকারীরা সে কথা কানে নিলোনা। তারা আবারো গুলি করলো এবং সেগুলো শেখ কামালকে বিদ্ধ করলো নির্ভুলভাবে, শেখ কামাল মারা গেলেন। শেখ কামালকে দিয়ে ঘাতকেরা তাদের খেলা কেবল শুরু করলো। তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিলেন বঙ্গবন্ধু।

ঘাতকেরা কিছু সেনাকে বললো মুহিতুল আর পায়ে গুলিবিদ্ধ এক পুলিশ অফিসারের উপর নজর রাখতে। বুট পরা অবস্থায় ভারী পায়ে তারা দৌড়ে উপরের তলায় ছুটে গেলো যেখানে বঙ্গবন্ধু থাকতেন। এর কিছুক্ষন পরই মুহিতুল বঙ্গবন্ধুর ভারী গলার আওয়াজ শুনলেন। আর সেইসাথে গুলির শব্দ। মুহিতুল প্রার্থনা করছিলেন বঙ্গবন্ধুর যেন কিছু না হয়। কিন্তু ওই মুহুর্তেই হাবিলদার আব্দুল কুদ্দুস তার চোখের সামনে ঘটতে দেখছিলেন নৃশংস দৃশ্য।

হাবিলদার কুদ্দুসকে ঘাতকেরা আটকে রেখেছিলো যখন তারা বাড়ির দেয়ালের ভেওরে প্রবেশ করে। এখন ঘাতকেরা তাকে বললো তাদের সাথে উপরের তলায় যেতে। তাদের নির্দেশ মেনে নেয়া ছাড়া তার উপায় ছিলনা।

এদিকে একটা দল যে কক্ষে সবাই ছিলেন সেই কক্ষের দরজায় লাত্থি দিতে শুরু করে। তারা ধাক্কা দিয়ে একটা দরজা ভেঙ্গে ফেলে। এই সময়ে বঙ্গবন্ধু বললেন,

– “দেখি ওরা কি চায়।“

১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ রাতের মতই উনি নিজের কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলেন। সেই সময়ে পশ্চিমা সেনারা তাকে গ্রেফতার করে, আর এরা তো নিজেরই লোক।

মেজর মহীউদ্দীন উপরের তলায় উঠবার জন্য সিঁড়ির গড়ায় পা রাখতেই দেখলেন উপরে বঙ্গবন্ধু দাঁড়িয়ে আছেন। উনার পরনে একটা সাদা পাঞ্জাবী, ধুসর চেকের লুঙ্গি এবং হাতে ধরে রাখা আছে একটি তামাকের পাইপ। যদিও মেজর মহীউদ্দীন বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করতে এসেছিলেন, তবুও উনার মুখোমুখি হতেই তাঁর কঠিন ব্যক্তিত্বের সামনে উনি ঘাবড়ে গেলেন। মেজর মহীউদ্দীন বঙ্গবন্ধুকে বললেন,

– “স্যার, আপনি আসেন।“

বঙ্গবন্ধু তাকে জিজ্ঞেস করলেন,

– “কি চাও তোমরা? তোমরা কি আমাকে মারতে এসেছো? ভুলে যাও, পাকিস্তান আর্মি আমাকে মারতে পারেনি। তোমরা আবার কে যে মনে করো আমাকে মারতে পারবে?”

মেজর মহীউদ্দীন ঘাবড়ে গেলেন আরো। উনি বারবার বলছিলেন,

– “স্যার, আপনি আসেন।“

ঠিক এই সময়েই মেজর নুর আর মেজর হুদার দল সেখানে এসে পৌছায়। মেজর হুদা এবং মেজর নুর যখন সিঁড়ির দোরগোড়ায় পা রাখলো, তখনই তারা দেখতে পেলো মেজর মহীউদ্দীন বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে সিঁড়ির উপরের অংশে চলে এসেছে। তারা নীচে নামছিলেন। কুদ্দুস মেজর হুদা আর মেজর নুরের পেছনে ছিলেন। মেজর নুর বঙ্গবন্ধুকে উদ্দেশ্য করে ইংরেজীতে কিছু বললেন যা কুদ্দুস বুঝতে পারলেননা। তবে তা শুনে মেজর মহীউদ্দীন আর তার সাথে সেনারা পাশে সরে গেলেন। সম্ভবত মেজর নুর বলছিলেন যে উনি গুলি করতে যাচ্ছেন এবং তারা যাতে পাশে সরে যায়। বঙ্গবন্ধু মেজর হুদাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

– “ও তুমি? কি চাও তোমরা?”

কেউ উত্তর দিলোনা। তবে হঠাৎ করেই মেজর নুর এবং মেজর হুদা তাদের স্টেনগানের ট্রিগার চেপে ধরলেন। এক পশলা গুলি বঙ্গবন্ধুকে বিদ্ধ করলো। বঙ্গবন্ধু গুলির ধাক্কায় পিছনের দিকে পরে গেলেন। উনি মারা গেলেন সাথে সাথেই। রক্তের ধারা সিঁড়ির ধাপগুলো বেয়ে নীচ পর্যন্ত চলে এলো। উনার একহাতে তখনো ধরা ছিলো উনার প্রিয় তামাকের পাইপ আর আরেক হাতে ম্যাচবাক্স।

মেজর মহিউদ্দীন, মেজর নুর এবং মেজর হুদা নীচে নেমে গেটের বাইরে চলে গেলেন বাড়ির উত্তর দিক দিয়ে। তাদের কাছে ততক্ষনে মিশন সফল হয়ে গিয়েছিলো। ঠিক পাঁচটা চল্লিশে বঙ্গবন্ধু মৃত্যুবরন করেন।

এদিকে রমা বঙ্গবন্ধুকে গুলি করে মেরে ফেলবার দৃশ্য সচক্ষে দেখেছিলো। উনি মেজর মহীউদ্দীনের গ্রুপের পেছনে ছিলেন যারা বঙ্গবন্ধুকে নিজ কক্ষ থেকে বের করে নিয়ে এসেছিলো। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করবার পর ঘাতকেরা রমাকে পালিয়ে যেতে বলে।

উদ্ভ্রান্ত আর ভীত রমা বেগম মুজিবের কক্ষের বাথরুমে গিয়ে আশ্রয় নেয়। বেগম মুজিব, সুলতানা কামাল, শেখ জামাল, রোজী জামাল, শেখ রাসেল এবং শেখ নাসের ছিলেন সেখানে। তারা সবাই সেখানে একসাথে ছিলেন। রমা কাঁদতে কাঁদতে বেগম মুজিবকে জানান যে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে। তবে ঘাতকদের একটা দল আবারো ফিরে এসে দরজা ধাক্কানো শুরু করে। তারা অপেক্ষা করতেও রাজী ছিলনা। তারা দরজা লক্ষ্য করে গুলি চালালো। বেগম মুজিব সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

– “যদি মরতেই হয় তবে সবাই একসাথে মরবো।“

এরপর উনি দরজা খুলে দিলেন এবং অনুরোধ করলেন যেনো তার পরিবারের সদস্যদের হত্যা না করা হয়। তবে সেনারা বেগম মুজিব, শেখ নাসের, শেখ রাসেল এবং রমাকে সিঁড়ির দিকে নিয়ে গেলো।

বেগম মুজিব সিঁড়ির গোড়াতে এসে বঙ্গবন্ধুর মৃতদেহ দেখে থেমে গেলেন। উনি কান্নায় ভেঙ্গে পরলেন। হত্যাকারীদের উদ্দেশ্যে বললেন,

– “আমি আর সামনে যাবোনা। আমাকে এখানেই মেরে ফেলো।“

ঘাতকেরা বেগম মুজিবকে আবার তার কক্ষে নিয়ে গেলো। হাবিলদার আব্দুল কুদ্দুস এখানেই তার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ আর হৃদয়বিদারক দৃশ্যটি দেখবেন। মেজর আজিজ পাশা এবং রিসালদার মুসলেহউদ্দীন তাদের স্টেনগানের রিগার চেপে ধরলো। বেগম মুজিব, শেখ জামাল, রোজী জামাল এবং সুলতানা কামাল গুলিবিদ্ধ হয়ে মেঝেতে পরে গেলেন। রক্তে ভেসে যাচ্ছিলো পুরো কক্ষের মেঝে।

এরপর ঘাতকেরা শেখ নাসের, শেখ রাসেল এবং রমাকে নীচতলায় নিয়ে গিয়ে মুহিতুল ইসলামের পাশে দাড় করিয়ে রাখলো।

শেখ নাসের ঘাতকদের উদ্দেশ্য করে বললেন,

– “আমি রাজনীতি করিনা। আমি ব্যবসা করে খাই।“

একজন আর্মি অফিসার তাকে বললেন,

– “আমরা আপনার ক্ষতি করবোনা। আপনি ওইরুমে চলে যান।“

সেই অফিসার শেখ নাসেরকে মুহিতুল ইসলামের অফিসের বাথরুমে নিয়ে গেলেন এবং গুলি করলেন।

মুহিতুল ইসলাম শুনতে পেলেন শেখ নাসের পানির জন্য আর্তনাদ করছেন। সেনাদের মধ্যে একজন আরেকজনকে চোখ টিপে বললো,

– “যাও, উনাকে একটু পানি দিয়ে আসো।“

সের সেনা আবার বাথরুমের মধ্যে গেলো এবং আরেক পশলা গুলি করে চলে আসলো।

তবে নৃশংসতা আর অমানবিকতা সকল মাত্রা অতিক্রম করা তখনো বাকী রেখেছিলো। মুহিতুল ইসলামকে ছোট্ট রাসেল ভীত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

– “ভাইয়া, ওরা কি আমাকেও মেরে ফেলবে?”

মুহিতুল হয়তো তখনো বিশ্বাস করতেন যে এই ছোটো শিশুটাকে ঘাতকেরা কিছু করবেনা। উনি বললেন,

– “না ভাইয়া, ওরা তোমাকে মারবেনা।“

তবে খাকী ইউনিফর্মের এক সেনা টেনে শেখ রাসলকে মুহিতুলের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিলো। রাসেল বলছিলো,

– “আমাকে মায়ের কাছে নিয়ে চলো।“

মেজর পাশা তার সেনাদের নির্দেশ দিলো,

– “ওকে ওর মায়ের কাছে নিয়ে যাও।“

একজন পুলিশ অফিসার ওইসময় বলে উঠলেন।

– “ওকে ছেড়ে দিন। ও একটা বাচ্চা!”

তাকেও তৎক্ষণাৎ গুলি করে মেরে ফেলা হলো। এরপর এক ঘাতক ক্রুর হাসি দিয়ে একহাতে রাসেলকে ধরে উপরের তলায় নিয়ে গেলো। রাসেল গোঙ্গাচ্ছিলো। এই ছোট্ট নিস্পাপ বাচ্চাটা কাতর স্বরে বলছিলো,

– “আমাকে মেরোনা, আমাকে মেরোনা।“

ঘাতকের মন বিন্দুমাত্র নরম হলোনা। আরেক পশলা গুলি করা হলো। ছোট্ট রাসেলও মারা গেলো।

কিছুক্ষন পর মেজর ফারুক গেটের কাছে এসে মেজর হুদার সাথে দেখা করে খবর জানতে চাইলেন। মেজর হুদা বললেন,

– “সব খতম করে দিয়েছি।“

চলবে…

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 3 = 6