ডারউইনের ‘Survival of the Fittest’ তত্ত্বটির ভ্রান্ত মার্ক্সবাদী ব্যাখ্যা

ডারউইন তার যুগান্তকারী বিবর্তনবাদ তত্ত্বে প্রাণীজগতে বিবর্তন কিভাবে ঘটে সে সম্পর্কে ‘Survival of the Fittest’ বলে একটি প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ করেছেন, যার মোটামুটি মানে হচ্ছেঃ টিক-সই প্রজাতিগুলো জীবজগতে টিকে থাকবে; বাকীরা বিলীন (Extinct) হয়ে যাবে।

ডারউইনের দুর্ভাগ্য যে, তার বিবর্তনবাদ তত্ত্বটি জনপ্রিয় হয়ে উঠার পাশাপাশি বিল্পবী মার্ক্সপন্থী আন্দোলন সক্রিয় হয়ে উঠছিল। মার্ক্সের হানাহানিমূলক ধ্বংশাত্মক সমাজ তত্ত্বটিকে জায়েজ করতে, জনপ্রিয় করতে, মার্ক্সপন্থীদের হাতে ডারউইনের ‘Survival of the Fittest’ বৈজ্ঞানিক তত্ত্বটি ধারালো তলোয়ারের মত কাজ করে, তবে তত্ত্বটির ভ্রান্ত ব্যাখ্যার মাধ্যমে। এবং বিগত ৩-৪ দশকে মলিকিউলার বায়োলোজি ও জিনেটিক্স তত্ত্বের সুবিশাল অগ্রগতির সাথে ডারউইনের তত্ত্বটির বোঝাপড়া ও বাস্তবতা অনেক গভীর হওয়া সত্ত্বেও ভ্রান্ত মার্ক্সিস্ট ব্যাখ্যাটি আজও প্রচার করে বেড়াচ্ছে অনেকেই। তত্ত্বটির মার্ক্সিস্ট ব্যাখ্যাটিকে আমার প্রিয় ফেসবুক বন্ধু Md Zahid Hossain উপস্থাপন করেছেন এভাবেঃ

“(জীবজগতে) গায়ের জোরে সবলেরা দুর্বলদের খেয়ে বেঁচে থাকে| এতে করে উন্নততর জীব তৈরি হচ্ছে এবং টিকে থাকছে| আর দুর্বলেরা হারিয়ে যাচ্ছে| এভাবেই বিবর্তন এগিয়ে চলছে| ডারউইনের survival of the fittest.”

জুলুমকারী ধনীক শোষক শ্রেণীর উৎখাত সম্পর্কিত মার্ক্সের তত্ত্বটিকে বৈজ্ঞানের আলোকে বৈধতা দিতে আর কি চাই? জীবজগতে সবলেরা যেভাবে দুর্বলদের চিবিয়ে খেয়ে নিজদেরকে টিকিয়ে রাখছে, ঠিক সেভাবেই মানব প্রজাতিতে ধনীরা দরিদ্রদেরকে লুটপাট করছে, চুষে খাচ্ছে। এবং অন্যায়কারী, আগ্রাসী ধনীক শ্রেণীর উৎখাত বিনা প্রলেতারিয়াত গোষ্ঠির কোন বিকল্প নাই। ফলাফল আমরা দেখেছি নিজ চোখেই – মানবজাতির সবচেয়ে বড় বিপর্যয়। ইতিহাসে কোন কালেই, অন্য কোন আদর্শেই কারণেই এত বেশী মানব প্রাণের হানি ঘটেনি, যতটা ঘটেছে মার্ক্সিস্ট বিপ্লবের কারণ ও ফলশ্রুতিতে।

‘Survival of the Fittest’ তত্ত্বের সঠিক ব্যাখ্যাঃ ডারউইন প্রাণী জগতের ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখতে পান যে, পৃথিবী থেকে অনেক প্রজাতি বিলীন হয়ে গিয়েছে, যেমন ডাইনোসার। আবার সে সময়ের অন্যান্য প্রজাতি টিকে আছে। সুতরাং ডারউইনের ভাবনাঃ যে প্রজাতি বেশী টিক-সই হবে সে প্রজাতি টিকে থাকবে, টিক-সই না হলে বিলীন হয়ে যাবে। ডারউইনের মতে প্রজাতির এ টিকে থাকা নির্ভর করে ন্যাচারাল সিলেকশন (প্রাকৃতিক চয়ন)-এর উপর, প্রজাতির দৈহিক শক্তির মাত্রার এখানে কোন গুরুত্ব নেই। পরিবেশ, প্রকৃতি, জলবায়ু ইত্যাদি পরিবর্তনশীল এবং পরিবর্তিত প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথে যে প্রজাতি মানান-সই (ফিট) হবে, সে প্রজাতি টিকে থাকবে, মানান-সই না হলে প্রজাতিটি বিলীন হয়ে যাবে। কোন প্রজাতির টেকা-না-টেকা (সার্ভাইভাল) নির্ভর করছে প্রধানত প্রকৃতির (নেইচার) উপর, প্রজাতির গায়ের জোর নয়।

এখানে একটা বাংলা প্রবাদ উল্লেখ্যঃ “অতিকায় হস্তি বিলুপ্ত হইয়াছে, কিন্তু তেলাপোকা দিব্যি টিকিয়া আছে।” এটা কোন বাংলা গুণীজনের ভ্রান্ত ভাবনা নয়, প্রাণী জগতের ইতিহাসের এক সঠিক বাস্তবতা। ডাইনোসারের মত বিশালকায়, শক্তিশালী ও ভয়ঙ্কর প্রজাতি লাখ লাখ বছর আগেই বিলীন হয়ে গেছে, অথচ অসংখ্য দুর্বল প্রজাতি আজও টিকে আছে, থাকবে। পৃথিবী-পৃষ্ঠের পরিবেশগত পরিবর্তনের সাথে কোন কোন প্রজাতি বিবর্তিত হতে হতে নতুন প্রজাতিতে রূপ নেমে টিকে থাকার উপায় হিসেবে – সেটাও ঘটবে প্রধানত প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার ফসল হিসেবে প্রজাতিটির ইচ্ছে-নির্ভর উদ্যোগের ফসল হিসেবে নয়। প্রজাতির গায়ের জোর তাতে কোন কাজে দেবে না রবং তা পুরোপুরি নির্ভর করবে তার শরীরে ধারণকৃত জিনোম বা জিন সমূহ পরিবর্তিত পরিবেশের সাথে প্রজাতিটিকে খাপ খাওয়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান সরবরাহ করতে পারবে কিনা, যার জন্য প্রয়োজন হতে পারে প্রজাতিটির জিনোমে নতুন জেনেটিক উপাদানের সংযোজন।

ভুলে যাই বাংলা প্রবাদটির কথা – মার্ক্সবাদীরা যদি তাদের সামনে উপস্থিত প্রাণী জগতের দিকে কিছুটা চোখ খুলে তাকাতেন, তাহলেও ডারউইনের survival of the fittest তত্ত্বটির এমন ফালতু ব্যাখ্যা দিতে পারতেন না। কেননা চোখ কিঞ্চিত খুললেই দেখতে পেতেন যে, তাদেরই চোখের সামনে দুনিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রাণী বাঘ, হিংস, হায়েনা, পাণ্ডা ইত্যাদির অস্তিত্ব সর্বাধিক হুমকির মুখে, অথচ অসংখ্য ক্ষুদ্র ও দুর্বল প্রাণী পিপিলিকা, ছারপোকা, তেলাপোকা, ইদুর ইত্যাদির অস্তিত্বের সঙ্কটের কোনই আলামত নেই এখনও।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৩ thoughts on “ডারউইনের ‘Survival of the Fittest’ তত্ত্বটির ভ্রান্ত মার্ক্সবাদী ব্যাখ্যা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

72 − = 69