পিতাকে লেখা বঙ্গবন্ধুর বাজেয়াপ্ত চিঠি


সাবিদিন ইব্রাহিম: এ এক অন্য মুজিব, আবেগী মুজিব, কষ্টে পোঁড়া মুজিব। বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠার আগের উত্তপ্ত, কঠিন ও নির্মম সময়ের মুজিব। আইয়ুবশাহী ক্ষমতায় এসেই পূর্ব পাকিস্তানের সবচেয়ে কঠিন প্রতিপক্ষকে জেলে ঢুকিয়ে দেন রাজবন্দী হিসেবে। এবার অভিযোগ ঘুষের। একজন একনিষ্ঠ, জনদরদী রাজনৈতিক কর্মীকে ঘুষের অপরাধে জেলে ঢুকিয়ে দেওয়া কত কষ্টের সেটা সহজেই অনুমেয়। চিঠিতে এটা উল্লেখ করেছেন কিভাবে তাকে ডাকাতির অভিযোগেও গ্রেফতার করেছিল একবার! ১৯৫৮ সালের ঘুষের অভিযোগে গ্রেফতার এবং রাজবন্দী হিসেবে জেলে পুড়ে দেওয়ার ঘটনাটি তাকে একেবারে নাড়িয়ে দিয়েছিল সেটা আমরা চিঠিতে টের পাবো। তিনি আরও কষ্ট পেয়েছেন এটা ভেবে যে মানুষ এটা বিশ্বাসও করেছে তিনি ঘুষ খেতে পারেন। যে মানুষের জন্য সারাজীবন এত ত্যাগ স্বীকার করেছেন তারাও যদি তাকে বিশ্বাস না করে তাহলে তার হৃদয়ে কি রক্তক্ষরণ হয়েছিল সেটা আমরা দেখতে পারবো চিঠির প্রতিটি শব্দে!

এজন্য মুজিবের মতো আজন্ম রাজনৈতিক কর্মী এবং ত্যাগী নেতাকেও বলতে শুনবো-‘যদি কোনদিন জেল থেকে বের হতে পারি তবে কোন কিছু একটা করে ছেলেমেয়ে ও আপনাদের নিয়ে ভালভাবে সংসার করব। নিজেও কষ্ট করেছি, আপনাদেরও দিয়েছি।’

তিনি কষ্টে কত ভেঙ্গে গিয়েছিলেন চিঠির এ অংশে ফুটে উঠেছে। তবে রক্তে রাজনীতি টগবগ করেছে যার সে তো আর নিরুপদ্রব সংসার যাপনে ব্যস্ত হতে পারেন না। জেলে বা জেলের বাইরে থেকে নিজেকে গড়ে তুলেছেন দেশের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে।

নিচের চিঠিটি বঙ্গবন্ধুর অন্তরঙ্গ পরিচয় তুলে ধরে, আবেগী ও সংসারের প্রতি ভালোবাসার দায়ে আবদ্ধ ব্যক্তির পরিচয় তুলে ধরে। চিঠিটি যে তিনি পাঠালেন না সেটা আবার রাজনীতির প্রতি, দেশের প্রতি, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার পরিচয় তুলে ধরে।

পিতা শেখ লুৎফর রহমানকে লেখা বঙ্গবন্ধুর বাজেয়াপ্ত চিঠি

রাজনৈতিক বন্দি

ঢাকা জেল

১২-১১-১৯৫৮

আব্বা

আমার ভক্তিপূর্ণ সালাম গ্রহণ করবেন ও মাকে দিবেন। মা এবার খুব কষ্ট পেয়েছিল, কারণ এবার তার সামনেই আমাকে গ্রেপ্তার করেছিল। দোয়া করবেন মিথ্যা মামলায় আমার কিছুই করতে পারবে না। আমাকে ডাকাতি মামলার আসামীও একবার করেছিল। আল্লা আছে, সত্যের জয় হবেই। আপনি জানেন বাসায় কিছুই নাই। দয়া করে ছেলেমেয়েদের দিকে খেয়াল রাখবেন। বাড়ি যেতে বলে দিতাম। কিন্তু ওদের লেখাপড়া নষ্ট হয়ে যাবে। আমাকে আবার রাজবন্দী করেছে, দরকার ছিল না। কারণ রাজনীতি আর নাই, এবং রাজনীতি আর করবো না। সরকার অনুমতি দিলেও আর করবো না। যে দেশের মানুষ বিশ্বাস করতে পারে যে আমি ঘুষ খেতে পারি সে দেশে কোন কাজই করা উচিত না। এদেশে ত্যাগ ও সাধনার কোন দামই নাই। যদি কোনদিন জেল থেকে বের হতে পারি তবে কোন কিছু একটা করে ছেলেমেয়ে ও আপনাদের নিয়ে ভালভাবে সংসার করব। নিজেও কষ্ট করেছি, আপনাদেরও দিয়েছি। বাড়ির সকলকে আমার ছালাম দিবেন। দোয়া করতে বলবেন। আপনার ও মায়ের শরীরের প্রতি যত্ন নিবেন। চিন্তা করে মন খারাপ করবেন না। মাকে কাঁদতে নিষেধ করবেন। আমি ভাল আছি।

আপনার স্নেহের

মুজিব

বি.দ্র.: গোপালগঞ্জের বাসাটা ভাড়া দিয়া দিবেন। বাসার আর দরকার হবে না।

Source: Govt of East Pakistan, Home Poll, F/N. 606-48PF Part-9

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

61 − 56 =