তেলাপোকার অবিলুপ্তির অন্ততঃ ১০টি কারণ

শুরু করছি কথাসাহিত্যিক শরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের “বিলাসী” গল্পের সেই অবিস্মরণীয় উক্তি দিয়ে-
‘‘ জগতে অতিকায় হস্তি লোপ পাইয়াছে, কিন্তু তেলাপোকা আজো টিকিয়া আছে ’’

সাদা হাতি বা ম্যামথের (মাস্টোডান) সবচে পুরাতন ফসিল পাওয়া গেছে ২৮ মিলিয়ন বছর আগের এবং তাদেরকে সর্বশেষ দেখা যায় আজ থেকে ৮ হাজার বছর পূর্বে। অন্যদিকে পরাক্রমশীল ডায়নোসরদের সবচে পুরনো ফসিল পাওয়া গেছে ২৪০ মিলিয়ন বছর আগের এবং বিলুপ্তি প্রায় ৬৫ বছর পূর্বে । কিন্তু তেলাপোকার সবচে পুরনো ফসিল ৩৫০ মিলিয়ন বছর আগের এবং উনারা আজও আমাদের ঘরে আমাদের সাথেই টিকে আছেন বসবাস করছেন বিন্দাস। আমাদের কারোই কোন ইন্টারেস্ট থাকার কথা না তুচ্ছ(!) তেলাপোকার প্রতি, বরং বিরক্তই হই এবং কেউ কেউ ভয়ও পায়। কিন্তু এই কথা নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি যে তাদের ব্যাপারে যত জানতে যাবেন ততই অবাক হতে হবে।

১। মাথা কেটে ফেললে কোন প্রাণীরই বেঁচে থাকার কথা নয়, কিন্তু তেলাপোকা ৮-৯ দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকে। কারণ তাদের শ্বাসকার্য চলে তাদের শরীরে অবস্থিত ছিদ্র ছিদ্র কিছু শ্বাসরন্ধ্র দিয়ে। ৮- ৯ দিন পর মারা যায় মুখ না থাকায় খেতে না পেয়ে ।

২। সমস্ত প্রাণীকুলের মধ্যে একমাত্র তেলাপোকাই পারে প্রয়োজনে ৪০-৪৫ মিনিট পর্যন্ত তাদের শ্বাসকার্য বন্ধ রাখতে।

৩। খাদ্য ছাড়া দেড়মাস ও পানি ছাড়া ৭-১০ দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে তেলাপোকা। মুখে নেয়া সম্ভব, কিন্তু তেলাপোকা খায় না এমন জিনিস খুব কমই আছেপৃথিবীতে। ময়লা আবর্জনা, মলমূত্র, কাগজ, প্লাস্টিক, আমাদের বা অন্যান্য প্রাণীদের যেকোন ধরনের খাবার, ডেডসেলস, ডেডবডিজ, ক্যামিকালস, ধুলাবালি ইত্যাদি ইত্যাদি।

৪। অন্যান্য প্রাণীদের তুলনায় তেলাপোকা সবচে বেশী অনুকূল প্রতিকূল উভয় পরিবেশে বেঁচে থাকতে পারে । ঘর, বাহির, ডাস্টবিন, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, তুষারপাত ইত্যাদি। তবে তারা নিউক্লিয়ার বা পারমানবিক বিকিরণে বেঁচে থাকতে পারে বলে যে কথাটি দীর্ঘদিন প্রচলিত ছিল, তা এখন মিথ বলে ধরা হয়। কেবলমাত্র এন্টারটিকা ছাড়া এখনো পর্যন্ত পৃথিবীর সমস্তে অংশেই তেলাপোকার বসবাসের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

৫। একটি ১দিন বয়সী বাচ্চা বা একটি বৃদ্ধ তেলাপোকাও একটি পূর্ণবয়স্ক তেলাপোকার সমান দৌড়াতে পারে যা কিনা ঘণ্টায় তিন থেকে সাড়ে তিন মাইল বা প্রায় ৫ কিমি/আওয়ার।

৬। ছোটবেলায় এক টিচার হিরোশিমা নাগাসাকির ট্র্যাজিডি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছিল যে, বিস্ফোরণের কিছুদিন আগে থেকেই নাকি আশপাশের শহরগুলোতে তেলাপোকায় ভরে গিয়েছিল। অর্থাৎ কিনা, হিরোশিমা ও নাগাসাকি থেকে তারা সময় থাকতে সরে পরেছিল। পরে আর এই ব্যাপারটা আর কোথাও পাইনি কিন্তু তেলাপোকারা তাদের এন্টেনা বা শুঁড় দিয়ে আলো বা অন্ধকারে পারিপার্শ্বিক তাপমাত্রা, বায়ু চাপ, জলবায়ু, ঘ্রাণ এবং কোনকিছুর অবস্থান ইত্যাদি নির্ণয় করে থাকে এটা সত্য। এটা অন্যান্য প্রাণীদের চেয়ে অনেক উন্নত সেন্সর হিসেবে কাজ করে। অনেক দুর্যোগ ও দুঃসময়ের পূর্বাভাস তারা পেয়ে থাকে তাদের এন্টেনার মাধ্যমে।

৭। ইউনিভারসিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া ক্র্যাম (CRAM) নামে একটি রোবট তৈরি করতে গিয়ে তেলাপোকার মুভমেন্টের উপর অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা চালান। তারা দেখেন যে, একটি তেলাপোকার উপর তার ওজনের ৯০০ গুন ওজন সম্পন্ন চাপ প্রয়োগ করার পরও সেটি বেঁচে ছিল এবং ৩ মিলিমিটার স্পেস দিয়ে বেরিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল।

৮। তেলাপোকা দলবদ্ধভাবে এবং টিমওয়ার্কের মাধ্যমে কলোনি তৈরি করে বসবাস করে, যেখানে তাদের সীমানা নির্ধারিত থাকে।

৯। বর্তমানে ৪০০০ এরও বেশী প্রজাতির তেলাপোকা পৃথিবীতে বিদ্যমান।

১০। আরেকটা ফ্যাক্ট এর ঘর খালি থাকলো পাঠকদের জন্য। কমেন্টে এই জীবন্ত কিংবদন্তী প্রাণীটিকে নিয়ে মজার কিছু জানান।

ধন্যবাদ।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

15 − 7 =