সেদিনের মোহনলাল কর্ণেল জামিল

১৫ ই আগস্ট শুধু মোশতাকের মতো মীরজাফর, ফারুক রশীদদের মতো মোহাম্মদী বেগ বা শফিউল্লাহর মতো অপদার্থদেরই জন্ম দেয়নি। জন্ম দিয়েছিল কর্ণেল জামিল বা কর্তব্যরত পুলিশের ডিএসপি সাহেবের মতো মীর মদন , মোহনলালদের ও।

সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই এর ডিজি ছিলেন তখন তিনি। আগড়তলা ষড়যন্ত্র মামলার সময় থেকেই ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ। আইএসআই এর অফিসার হিসেবে সেসময় সেই মামলার অনেক নথি পুড়িয়ে ফেলেন তিনি। ৭১ এ বন্দী ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানে। দেশে ফেরার পরে আত্মনিয়োগ করেন ডিজিএফআই কে গড়ে তোলার কাজে।

গণভবন স্টাফ কোয়াটার,কর্ণেল জামিলের বাসায় একটা ফোন আসে আনুমানিক রাত ৪.৩০ এর দিকে। ফোন রিসিভ করেন আঞ্জুম আরা জামিল,অপরপ্রান্তে বঙ্গবন্ধুর জলদ গম্ভীর কন্ঠ,কর্ণেল জামিলকে চাইছেন। কর্ণেল জামিল ফোন নিলেন।ওপাশের কথাগুলো শুনতে পারলেন না মিসেস জামিল,ফোন রাখার আগে জামিলকে শুধু বলতে শুনলেন,আমি এক্ষুণই আসছি স্যার। ফোন রেখে স্ত্রীকে বললেন, কারা যেন বঙ্গবন্ধুর বাড়ি আক্রমণ করেছে, উনার জীবন বিপন্ন,আমাকে এখনই যেতে হবে। ড্রাইভার আইনুদ্দিনকে তৈরী হবার নির্দেশ দিয়ে নিজেও সিভিল পোশাকেই তৈরী হতে শুরু করলেন।এর মাঝে সেনাপ্রধান জেনারেল শফিউল্লাহকে ফোন দিয়ে ফোর্স পাঠাতে বললেন, সেই সাথে আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায়ও ফোন করেন। রেডি হতে হতে বিড়বিড় করে বলতে থাকেন,পিজিআর এর ২০০ সৈন্যকে সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিল কে?

বাবা, মা-র কথোপকথনে এর মাঝেই ঘুম ভেঙ্গে যায় বার বছরের মেয়ে কঙ্কার। লোডেড সার্ভিস রিভলবারটি নিয়ে বাবাকে বাসা থেকে বের হতে দেখে সে। বের হবার আগে আরেক বার বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে ফোন দেন জামিল,কিন্তু ওপাশ থেকে তখন কেউ ফোন ধরছে না।
সেই রাতে কর্ণেল জামিল যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ন জায়গায় ফোন দেন তার মধ্যে পিজিআর এবং রক্ষী বাহিনীর হেড কোয়ার্টারও ছিল।সেই সময়ে ডিজিএফআই এর প্রধান ছিলেন ব্রিগেডিয়ার রউফ,যিনি ক্যান্টনমেন্ট থেকে এই সাঁজোয়া সেনাদলের মুভ করার খবরটি পেয়েও কাউকে সতর্ক না করে নিরাপদ আশ্রয়ে লুকিয়ে থাকেন।এছাড়া মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সের প্রধান ( ডিএমআই) কর্ণেল সালাহউদ্দিন অস্বাভাবিক সেনা তৎপরতার কথা বঙ্গবন্ধুর ফোনের আগেই সেনাপ্রধান শফিউল্লাহকে জানান।
কর্ণেল জামিল প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট (পিজিআর) সহ মুভ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সৈন্যদের সেখানে বহণ করার মত জীপ ছিল না বলে তাদেরকে ৩২ নম্বরের দিকে মার্চ করার কমান্ড দিয়ে নিজের লাল রঙের নিশান প্রিন্স নিয়ে আগেই রওণা হবেন বলে সিদ্ধান্ত নেন। গাড়িতে উঠার আগে মিসেস জামিল প্রশ্ন করেন, তোমাকে সত্যিই যেতে হবে? অনেকটা বিষ্ময়ভরা কন্ঠে জবাব দেন জামিল, তুমি কি পাগল হয়েছ? বঙ্গবন্ধুর জীবন বিপন্ন আর আমি যাব না?

সোবহানবাগের কাছের রাস্তার উপর ট্যাঙ্ক সহ ব্যারিকেড বসানো।গাড়ী থেকে নেমে সামনে এগিয়ে গেলেন জামিল, সেখানে দায়িত্বে আছেন একজন সুবেদার মেজর। নিজের পরিচয় দিয়ে তার সাথে বাহিনী নিয়ে এগুতে বললেন কর্ণেল জামিল। এবারে দ্বিধান্বিত দেখা যায় সুবেদার মেজরকে। এটা বলে জামিল গাড়িতে এসে বসেন এবং ড্রাইভার আইনুদ্দিনকে গাড়ী স্টার্ট করতে বলেন। আইনুদ্দিন জামিলকে ভিতরে না যেতে অনুরোধ করেন। তোমার ভয় লাগলে নেমে যাও, আমি ড্রাইভ করছি,উত্তরে বললেন জামিল।

এর মধ্যেই ঘটনাস্থলে আবির্ভাব ঘটে ঘাতক দলের অন্যতম বজলুল হুদার। গতকাল পর্যন্তও সে ক্যাপ্টেন ছিল। কিন্তু আজ গভীর রাতে ৩২ নম্বরে বিশেষ পারদর্শিতা দেখানোয় তাকে তৎক্ষণাৎ মেজর পদে প্রমোশন দেয় ফারুক। একজন জেসিও প্রমোশন পেয়ে অনারারি লেফটেন্যান্ট হয় শুধুমাত্র ফারুকের মুখের কথাতেই । কাঁধে শাপলা চকচক করছিল হুদার,চালচলনে ছিল ঔদ্ধত্ব।
কে ওখানে? হুদার প্রশ্ন। ওপাশ থেকে উত্তর আসতেই কালবিলম্ব না করে সুবেদার মেজরকে গুলি চালানোর আদেশ দেয় হুদা। এই আদেশ পালনে অস্বীকৃতি জানায় সুবেদার মেজর,না স্যার আমি পারব না। স্টেনগানটি নিজের হাতে নিয়ে গাড়ির দিকে এগুতে থাকে হুদা, বিনা বাক্য ব্যায়ে এক স্টেনগান ফায়ার করে কর্ণেল জামিলকে লক্ষ্য করে। ড্রাইভিং সিটে থাকা আইনুদ্দিন শুধু তিনবার “লা ইলাহা” শুনতে পান। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ফায়ারিং এই শেষ হয়ে যায় বাংলার ইতিহাসের এক বিশ্বস্ততা এবং কর্তব্যনিষ্ঠার অধ্যায়।

কর্ণেল জামিলের জানাজা পড়তে দেয়নি খুনীরা , কাফনের কাপড়ের পরিবর্তে বিছানার বেডশীট মুড়িয়ে দাফন করা হয় তাঁকে বনানী গোরস্তানে। কিন্তু সেদিনের এই মোহনলালের বীরত্বের স্মৃতি চির অম্লান হয়ে রইলো ইতিহাসের পাতায়।

পরবর্তীতে কর্ণেল জামিলকে মরণোত্তর বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত করা হয়। আর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে তাঁকে দেয়া হয় ব্রিগেডিয়ার জেনারেলের মর্যাদা।
ইতিহাসের এই দিনে এই বীর সৈনিকের স্মৃতির প্রতি জানাই স্যালুট , জামিলের মতো মোহনলালরা এভাবেই যেন যুগে যুগে ফিরে ফিরে আসে………………………
(কর্ণেল জামিলের মেয়ের সাক্ষাৎকার থেকে )

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

46 + = 52