‘জাতির পিতা’র মৃত্যু


এক
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবস্থান ও গুরুত্বের ক্ষেত্রে নব্বই দশকের পরে রীতিমতো বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। আওয়ামী লীগ যতোই নিজেদের দলীয় নেতা হিসাবে শেখ মুজিবের প্যাটেন্ট দাবি করুক না কেনো, অবশেষে তিনি একজন জাতীয় নেতায় পরিণত হয়েছেন। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে তার চাইতে বেশি উল্লেখযোগ্য আর কোন জাতীয় নেতাও নাই। ফলে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রধানতম জাতীয় নেতা হিসাবে তার যোগ্য অবস্থানটিই লাভ করেছেন। তবে নব্বই দশকের শুরুর ভাগেও এই পরিস্থিতি ছিল না। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বপরিবারে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ড থেকে শুরু করে ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতায় আওয়ামী লীগের পূনরাবির্ভাবের আগে পর্যন্ত জাতীয় নেতা হিসাবে তার অবস্থানটি বিতর্কিত ছিল। বিএনপি এই সময়ে পালটা একজন সমমর্যাদার অথবা তাদের দাবিতে অধিক মর্যাদার জাতীয় নেতা হিসাবে সাবেক জেনারেল ও প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে হাজির করেছিলেন। দুই নেতার সমর্থকদের মধ্যে এইসময় নিজ নেতার মহানুভবতা ও বিপক্ষ নেতার স্বৈরশাসন নিয়ে তর্ক বিতর্ক হতো। এই বিতর্ক সাধারণত ভালো/মন্দ অথবা শুভ/অশুভের ডাইকোটোমি অতিক্রম করতে পারতো না। ফলে কারো কাছে বঙ্গবন্ধু হাজির হতেন দেবতা হিসাবে, এবং কারো কাছে শয়তান। কিন্তু জিয়াউর রহমানকে বঙ্গবন্ধুর প্রতিদ্বন্দী অথবা তার চাইতেও বড় জাতীয় নেতা হিসাবে হাজির করার যে প্রজেক্ট বিএনপি হাতে নিয়েছিল তা কখনোই শক্ত ঐতিহাসিক ভিত্তির উপরে দাড়াতে পারে নাই। ফলে নব্বই দশক ও গত দশকে যেভাবে গণমাধ্যমের প্রসার, তথ্য প্রযুক্তিতে উন্নয়ন ও ইতিহাস গবেষনায় অগ্রগতি হয়েছে, তাতে রাজনৈতিকভাবে বিএনপি আওয়ামী লীগের হাতে পরাজিত হওয়ার আগেই জাতীয় নেতা হিসাবে জিয়াউর রহমানের পরাজয় ঘটে গেছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে। অর্থাৎ, যা হওয়ার কথা ছিল তাই হয়েছে।

কিন্তু অতীতে পরিস্থিতি এমন ছিল না। খুব বেশি আগের কথা না, বাংলাদেশে একসময় বিএনপি ঘরানার একটা বড় সংখ্যক মানুষ বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডকে নৈতিকভাবে সমর্থন দিয়ে বক্তব্য দিতেন। নব্বই দশকে বিএনপি বনাম লীগ সমর্থকদের মধ্যকার যে তর্কগুলো হতো তা যাদের স্মরণে আছে তাদের এই বিষয়গুলা পরিস্কার মনে থাকার কথা। বিএনপি সমর্থকদের একটা বড় অংশ বিশ্বাস করতেন যে বঙ্গবন্ধু এমন একজন স্বৈরাচারে পরিণত হয়েছিল যাকে হত্যা করা ভিন্ন কোন উপায় ছিল না, এবং এই কারনেই তার এই হত্যাকান্ড এতো সহজে হতে পেরেছে এবং জনগণের (তাদের ভাষায়) নৈতিক সমর্থন পেয়েছে। বিএনপির নেতারা হয়তো পাবলিক স্পেসে কিছুটা রাখঢাক করতেন, কিন্তু ১৫ আগস্ট ঘটা করে খালেদা জিয়ার জন্মদিন পালন মূলত ‘জাতীয় নেতা’ হিসাবে বঙ্গবন্ধুকে নূন্যতম স্বীকৃতি দিতে বিএনপি ও তার সমর্থকদের যে আপত্তি ছিল তারই একধরণের প্রতিকী বহিঃপ্রকাশ। বঙ্গবন্ধুকে জাতীয় নেতা হিসাবে স্বীকৃতি দেয়ার ক্ষেত্রে এবং তার ও তার পরিবারের হত্যাকান্ডের উপর থেকে নৈতিক সমর্থন তুলে নেয়ার ক্ষেত্রে বিএনপির নেতা কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে এখন একটা গুনগত পরিবর্তন এসেছে। এই পরিবর্তনের দরকার ছিল। এবছর খালেদা জিয়াও আর জন্মদিন পালন করছেন না। এটা খুবি গুরুত্বপূর্ণ একটা ঘটনা। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের বিচার আগেই সম্পন্ন হয়েছে, এখন বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড নিয়ে চলা রাজনৈতিক বিতর্কেরও সমাপ্তি হতে চলেছে। বলা যায়, জাতি হিসাবে আমরা একটি ঐতিহাসিক পর্বের সমাপ্তি ঘটাতে পারলাম।

দুই
কিন্তু যে জাতির পিতা আছে, সে জাতির এখনো আরো বড় ঐতিহাসিক পর্বের সমাপ্তি ঘটানো বাকি রয়ে গেছে। এবং ১৫ আগস্ট যেহেতু এখন বিতর্কের ঊর্ধে জাতীয় শোক দিবসে পরিণত হয়েছে এবং এই দিবসেই যেহেতু জাতির পিতা’ টাইটেলটির সর্বোচ্চ ব্যবহার হয়ে থাকে তাই এই দিবসটিতেই ‘জাতির পিতা’ নামক টাইটেল ও ধারণার মৃত্যু দাবি করাও একটি জরুরি কাজ হয়ে গেছে। ‘জাতির পিতা’ টাইটেল ও ধারণাটি মধ্যযুগীয়, প্রাচীন এবং খুব সম্ভবত প্রাগৈতিহাসিকও বটে। আগের কালের রাজা বাদশাহ ও সম্রাটেরা ‘জাতির পিতা’, ‘জনতার পিতা’ ইত্যাদি টাইটেল ব্যবহার করতেন। রোমে একনায়কতন্ত্র কায়েম করে জুলিয়াস সিজার ‘প্যাটার প্যাট্রিয়ে’ টাইটেল গ্রহণ করেছিলেন যার অর্থ হয় ‘দেশের পিতা’ বা ‘পিতৃভূমির পিতা’। এরপর রোমান সম্রাট অগাস্টাস সিজার এবং তার পরবর্তিতে বহু রোমান সম্রাট এই টাইটেলটি গ্রহন করেছেন। ইউরোপের মধ্যযুগীয় রাজতন্ত্রেও রাজা বা সম্রাটদেরকে ‘জাতির পিতা’ মনে করার ও টাইটেল দেয়ার প্রচলন জারি ছিল। মোট কথা, জাতির পিতা একটি মনার্কিকাল টাইটেল। এই টাইটেল একক সার্বভৌমত্বের দাবিদার একনায়কের সাথে মানায়, মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত নেতা ও স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতির সাথে মানায় না।

তার চাইতেও ভয়ঙ্কর ব্যাপার জাতির পিতা ধারণাটির উৎসগত চরিত্র। প্রাচীন রোমে ‘প্যাটার প্যাট্রিয়ে’ ধারণাটি ছিল মূলত রোমান ‘প্যাটার ফ্যামিলিয়াস’ ধারণার বিবর্তন। ‘প্যাটার ফ্যামিলিয়াস’ হলেন ‘পরিবারের পিতা’। প্রাচীন রোমে এটা একটা আইনি ক্যাটাগোরিও ছিল। রোমে একমাত্র ‘পরিবারের পিতা’রই রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করার সুযোগ ছিল। তিনিই একমাত্র নাগরিক হওয়ার অধিকার রাখতেন, পরিবারের বাকিরা তার পোষ্য মাত্র। পরিবারে তিনিই ছিলেন দন্ডমুন্ডের কর্তা। এমনকি আইনগতভাবে পরিবারের বাকি সবাই ছিল তার সম্পত্তি মাত্র। তিনি তাদের জীবন-মরনের স্বীদ্ধান্ত নিতে পারতেন, চাইলে কাউকে শাস্তি দিতে এমনকি বিক্রি করে দেয়ারও অধিকার রাখতেন। প্রাচীন রোমের প্রবল প্যাট্রিয়ার্কাল অর্থাৎ ‘পিতৃতান্ত্রীক’ সমাজে পিতাই ছিলেন পরিবারের একমাত্র ‘সার্বভৌম’। ফলে রোম সম্রাটদের ‘দেশের পিতা’ টাইটেল মূলত রাজনীতির সর্বোচ্চ পর্যায়ে পিতৃতন্ত্রের প্রবেশও ছিল। তবে পিতৃতন্ত্রের ভাষা শুধু রাজনীতিতে নয়, প্রাচীন কালের ধর্মের মধ্যেও প্রবেশ করেছিল। কোন কোন ক্ষেত্রে পিতৃতন্ত্র জিনিসটাই একিসাথে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ডিসকোর্সের জন্ম দিয়েছে। ফলে ইতিহাসে বহু ধর্মীয় আন্দোলন রাজনৈতিক আন্দোলনে অথবা বহু রাজনৈতিক আন্দোলন ধর্মীয় আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়ে যাওয়ার পরেও দেখা যায় তাতে পিতৃতন্ত্রের ভাষা একিভাবে টিকে থাকে। যেমন প্রাচীনকালে ফিলিস্তিনের জমির উপরে ইহুদীদের রাজনৈতিক দাবির মূলে ছিল তাদের জাতির পিতা ‘ইব্রাহিম’, ‘ইয়াকুব’ ও ‘ইসহাক’-এর কাছে আল্লাহর করা প্রতিজ্ঞা। এই গোত্রিয় প্যাট্রিয়ার্করা পরবর্তিতে খ্রিস্টান ধর্মের ধর্মীয় প্যাট্রিয়ার্কে পরিণত হয়েছিলেন। আজো খ্রিস্টান অর্থডক্স চার্চের সর্বোচ্চ নেতারা ‘প্যাট্রিয়ার্ক’ তথা পিতা টাইটেলে ভুষিত হয়ে থাকেন। অন্যদিকে ভারতবর্ষ ও মধ্য এশিয়ায় ধর্মীয় নেতাদেরকে ‘বাবা’ ডাকার যে ঐতিহ্য তাতো বাংলাদেশেও প্রবল।

‘জাতির পিতা’ টাইটেলটি বাংলাদেশের জনগণের জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে পিতৃতন্ত্রের অনুপ্রবেশের সবচাইতে বড় উদাহরণ। বাংলাদেশের ফেমিনিস্টরা কেনো এর বিরুদ্ধে সোচ্চার নয় আমি জানি না। পাশাপাশি বাংলাদেশে যদি জনতা সার্বভৌম হয়ে থাকে তাহলে জনতার মুক্তিযুদ্ধের নেতাকে সম্রাটদের উপযুক্ত একটি সার্বভৌম ও পিতৃতান্ত্রিক টাইটেল দেয়া গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

তিন
একটা সময় ছিল যখন কেউ ‘শেখ মুজিব নয়, ইব্রাহিম (আঃ) আমাদের জাতির পিতা’ দাবি তুললে খুবি বিরক্ত ও ক্ষুদ্ধ হতাম। পরে চিন্তা করে দেখলাম যে ‘জাতির পিতা’ যেহেতু ইব্রাহিমের মতোই একটি প্রাগৈতিহাসিক টাইটেল তাই এই ধরণের দাবি ওঠা বিচিত্র নয়। মূলত বিএনপি ঘরানার লোকজন এই টাইটেলটির ঘোর বিরোধি ছিল, ইনস্টিংক্টিভলিই তারা বঙ্গবন্ধুকে একজন সার্বভৌম জাতীয় নেতায় পরিণত হতে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল, যেহেতু জিয়া পরিবারকে কেন্দ্র করে তাদের আলাদা সার্বোভৌমত্বের দাবি ছিল। এক বনে দুই বাঘ অথবা এক দেশে দুই রাজ পরিবার তো থাকতে পারে না। শেষবার ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি সংবিধান থেকে ‘জাতির পিতা’ টাইটেলটি তুলে দিয়েছিল। সেই সময়ে আরো কিছু পরিবর্তন ঘটেছিল। ছিয়ানব্বই সালে ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা জাতির পিতার পরিবারের জন্যে কিছু সরকারি সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করেছিলেন, খুব সম্ভবত ২০০৪ সালে খালেদা জিয়া সেসবও বাতিল করে দিয়েছিলেন। আমার এখনো বঙ্গভবনের বাসভবন থেকে শেখ হাসিনাকে উৎখাত করা ও তার কান্নাভেজা চেহারার স্মৃতিটা আছে। তবে শেখ হাসিনা পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর আবার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। ২০০৯ সাল থেকে বাংলাদেশে জাতির পিতার পরিবারের সদস্যদের একটি নিরাপত্তা আইনও করা হয়েছে। যেহেতু শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা, শেখ জয় প্রমুখ বাংলাদেশের ‘জাতির পিতা’র বায়োলোজিকাল বংশধর তাই তাদের পরিবার একটি ‘জাতীয় পরিবার’ হিসাবে বাড়তি নিরাপত্তা পেতেই পারে। ঐতিহাসিকভাবেই এর প্রয়োজনও আমরা দেখেছি।

তবে বাংলাদেশে একটি রাজপরিবারের ইতিমধ্যে পরাজয় হয়ে গেছে বলে ধারণা করা যায়। এবং শেখ পরিবারই এখন বাংলাদেশের একমাত্র রাজপরিবার, ‘জাতির পিতা’র পরিবার হিসাবে। পাশাপাশি বিএনপি অনেকদিন খেটেখুটে জিয়াউর রহমানের জন্যে ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ নামক যে সার্বভৌম টাইটেলটি প্রতিষ্ঠা করেছিল, সেটাও এখন বঙ্গবন্ধুর টাইটেল হিসাবে প্রায় সর্বজন স্বীকৃতি পেয়ে গেছে। ব্যাপারটা অনেকটা পরাজিত সম্রাটের টাইটেল বিজয়ি সম্রাটের টাইটেলে অথবা ছোট দেবতার এট্রিবিউট বড় দেবতার বহু এট্রিবিউটের একটায় পরিণত হয়ে যাওয়ার মতো।

তবে ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক কারনেই ভবিষ্যতে ‘জাতির পিতা’ টাইটেলের দাবি আওয়ামী লীগ ও শেখ মুজিবুর রহামানের পরিবারকে পরিত্যাগ করতে হবে। যদি তারা রাজনীতিতে টিকে থাকতে চায় তাইলে অবশ্যই তা করতে হবে। আর জাতির পিতা টাইটেল রাখতে গেলে তাদের রাজনীতি ছাড়তে হবে। শেখ পরিবারের সদস্যদেরকে পশ্চিম ইউরোপের আধুনিক মনার্কদের মতো বিশেষ সম্মান, সুযোগ-সুবিধা, নিরাপত্তা সবকিছুই দেয়া যেতে পারে। কিন্তু সেইক্ষেত্রে পশ্চিম ইউরোপের মনার্কদের মতো তাদেরও রাজনীতিটা ছাড়তে হবে। ‘জাতির পিতা’র পরিবারের লোকজন রাজনীতি করে কিভাবে? গণতান্ত্রিক সমাজেতো এই ধরণের আনফেয়ার রাজনীতি মেনে নেয়া যায় না।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “‘জাতির পিতা’র মৃত্যু

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 2 = 4