শোক

জব্বার সাহেবের সামনে বিরিয়ানির প্যাকেট। এখনো খুলেন নি তিনি। প্যাকেটের দিকে তাকিয়ে আছেন এক দৃষ্টিতে। যে প্যাকেটের ডিজাইনটা করেছে তার প্রশংসা করতেই হয়। প্যাকেটের উপরে পিতার ছবি, সাথে শোক দিবসের বানী। নিচের কোণায় তার ছবিও আছে। সব মিলিয়ে দেখতে দৃষ্টি নন্দনই লাগছে।
-“ভাই, খাচ্ছেন না কেন? না খেয়ে এখনো বসে আছেন!” হটাত রাব্বির কথায় চিন্তার জগত থেকে ফিরে আসলেন জব্বার
– “খাই খাই! তোরা খাবি না? আমি একাই খাবো নাকি!”
-“ হ্যাঁ ভাই খাই। আমি অবশ্য খাইছি একবার রান্নার পর পরই। নাসিম চাচার বিরিয়ানি বলে কথা, লোভ সামলাইতে পারি নাই। উনার বিরিয়ানি দুনিয়ার বেস্ট। তাও তো এবার অনেক কষ্ট করে উনাকে জোগাড় করলাম! ঐ যে কালাম গ্রুপের ওরা আগেই বুকিং দিয়ে রাখছিল নাসিম চাচাকে। আমি বলছি পরে- ‘না! আজকের প্রোগ্রামে নাসিম চাচাকেই লাগবো আমাদের’ পরে কত কাহিনী করে যে নাসিম চাচাকে মানেজ করে আনলাম!”
-“আহারে এতো কষ্ট করছিস যখন তখন খাইতেই তো হয়। “ বলে হেসে হাত বাড়ালেন বিরিয়ানির প্যাকেটের দিকে
অনেক দিন আজকে এই এলাকায় আসলেন তিনি। এমপি হওয়ার পর আসলে এদিকে আসাই হয় না তেমন। রাব্বি ছেলেটা এবার এতো রিকুয়েস্ট করলো ফেলতে পারলেন না। চলে এলেন।
একটা স্মরণসভার প্রোগ্রাম ছিল। এর পড়ে কাঙ্গালি ভোজ আর বিরিয়ানি বিতরণ। এখন বিরিয়ানি বিতরণ চলছে সভাস্থলে। তিনিও প্যান্ড্যালের পিছে এসে বসে রেস্ট নিচ্ছেন আর খাচ্ছেন। সামনে মাইকে এখন ৭ই মার্চের ভাষণ হচ্ছে।
-“আহ! বিরিয়ানিটা আসলেই ভালো রে” খাওয়ার পর আত্মতৃপ্তিতে বললেন জব্বার।
-“হে হে। বলছিলাম না ভাই?” রাব্বি জবাব দেয়। “আর কিছু লাগবে?”
জব্বার সাহেবের যেটা খেতে ইচ্ছা করছে আজকের দিনে খাওয়াটা খারাপ দেখায়। অনেক দিন খান না। বিরিয়ানি খাওয়ার পর খুব খেতে ইচ্ছা করছে।
“না রে। কিছু লাগবে না” শেষমেশ আর বললেন না রাব্বিকে
রাব্বি কে বললেই অবশ্য জোগাড় করে দিবে। ছেলেটাকে এজন্যেই খুব পছন্দ তার। তিনি দ্বিধায় পড়ে গেলেন খাবেন নাকি খাবেন না!
শেষে ইচ্ছার কাছেই পরাজিত হলেন। রাব্বিকে ডাক দিলেন
-“ গলা ভিজানোর ব্যবস্থা করা যাবে?” মৃদু গলায় বললেন তিনি
– “অবশ্যই। দশটা মিনিট টাইম দেন, এনে দিচ্ছি”
ব্যাস ব্যবস্থা হয়ে গেল।
জিনিস চলেও আসলো ১০ মিনিটের মাঝে।
রাব্বি আর কিছু নেতা , ছেলেদের সাথে খেতে বসলেন।
দুই পেগ খাওয়ার পরই ধরে গেলো জব্বার সাহেবের। বেশ সুন্দর ফিলিংস। রাবিরও তখন ধরেছে। সারাদিন অনেক খাটুনি গেছে তার। তার হটাত মনে পড়ল কয়েক বছর আগে এই দিনেই জন্মদিনের কেক কাটার ঘটনা। বেশ নস্তালজিক হয়ে গেল সে।
মাইকে তখন গান বাজছে “এক সাগর রক্তের বিনিময়ে…”
জব্বার সাহেবের তখন এইসব গান শুনতে আর ইচ্ছা করছিল না। সারাদিন অনেক শুনছেন। তিনি রাব্বিকে বললেন “বেবি ডল ছাড়া যায় কিনা দেখ তো!”
বেবি ডল শুরু হওয়ার পর আরেক পেগ মারলেন তিনি। গানটা অনেক উপভোগ করছেন তিনি।
হটাত গানটা শেষ হতে না হতেই সামনে থেকে শুনলেন হট্টগোলের শব্দ। রাব্বি তার এক কর্মীকে পাঠাল দেখতে কি হয়েছে। সে দুই মিনিটের মধ্যে দৌড়ে এসে জানাল কালাম গ্রুপের পোলাপান আসছে। নাসিম চাচাকে কেন নিয়ে আসা হয়েছে এজন্যে ওরা প্রতিশোধ নিতে আসছে।
রাব্বি রেগে গেল।
-“হারামজাদা! আমি কি মরে গেছি?”
বলে সেও কর্মীদের নিয়ে মারতে গেল ওদের।
জব্বার সাহেবের সামনেই দুই গ্রুপের মারামারি চলছে… থামানোর মতো অবস্থা নেই উনার।
হটাত তার চোখ গেলো সামনে মাটিতে পড়ে থাকা বিরিয়ানির প্যাকেটের দিকে। তার মনে হল
প্যাকেট থেকে পিতা তাকে তাচ্ছিল্য করছেন। বজ্রকন্ঠে অভিশাপ দিচ্ছেন। জব্বার সাহেব তাকিয়েই রইলেন ঐ পিতার ছবির দিকে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “শোক

Taposho Disha শীর্ষক প্রকাশনায় মন্তব্য করুন জবাব বাতিল

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

71 − 70 =