একবিংশ শতাব্দীর বড় চ্যালেঞ্জ মৃত্যুকে জয়

মৃত্যু কি এবং কেমন ! সে কি আট দশটা রোগের মতো ! মৃত্যু কি নিষিদ্ধ ও অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয় ! তাকে কি আমরা কখনই জয় করতে পারবো না ! মৃত্যুঞ্জয়ী শব্দের তাৎপর্য কি সুধু স্মৃতিতে বসবাস । আমাদের সহস্র পূর্বপুরুষ তাদের বিবর্তনের ক্রমান্বয়ে মৃত্যুকে নিয়ে বয়ে চলছে। মৃত্যুর আদি এবং বর্তমান স্বতঃস্ফূর্ত রূপের এক ইঞ্চিও এদিক সেদিক করা যায়নি।

প্রকৃতি তার সম্ভাব্যতা ছড়িয়ে দিয়েছে। আমাদের সক্ষমতা এবং পদবিচরন একটা সীমানায় সীমাবদ্ধ। আমরা চাইলেই যেমন অনেক কিছু করতে পারি না, যেমন আমাদের চিন্তার সীমাবদ্ধতা, অনুভূতি ব্যক্ত করা জন্য পর্যাপ্ত শব্দ, তেমনি বলা যেতে পারে শিল্পীর ক্যানভাসে খেলা করা রং এর সীমাবদ্ধতা। মৃত্যু কি সেই সীমাবদ্ধতায় অবস্থিত ? আমরা কি মৃত্যু কে জয় করতে পারবো ? মৃত্যু আসলে কি তা নিয়ে পর্যাপ্ত বিশ্লেষণ প্রয়োজন। বিংশ শতাব্দীতে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ব্যাপক উন্নতি হয়েছে, তারপরেও সচেতনতা, পুষ্টি ও স্বাস্থ্য সেবার উন্নয়ন মৃত্যুহারকে যেমন অনেক অংশেই হ্রাস করেছে তেমনি মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে। তার মানে কি বেঁচে থাকার আয়ু-কাল অনেকটা অংশ আমাদের উপর নির্ভর করছে । বিজ্ঞানের পাশাপাশি সুস্থ খাবার এবং নিয়ম মাফিক সাবলীল দূষণ মুক্ত পরিবেশে বেঁচে থাকতে পারলে হয়তোবা আরও অনেক বছর বেশী বেঁচে থাকা যাবে। কিন্তু বিজ্ঞান চাইছে মৃত্যুকে পরাজিত করার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে বয়স বাড়ার প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করা। প্রতিদিন মানুষের বেড়ে ওঠার বিশেষ হরমোন নিয়ে গবেষণা। এই হরমোন কে কাজে লাগিয়ে বয়সকে থামিয়ে দেওয়া। বয়স থামিয়ে দেওয়ার প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে এসইএনএস রিসার্চ ফাউন্ডেশন, মেথিউলিস ফাউন্ডেশন সহ আরও অনেক প্রতিষ্ঠান। অবাক হবার বিষয় এইযে তারা অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সাফল্য অর্জনে সক্ষম হতে যাচ্ছে।

সেই ক্ষেত্রে বিজ্ঞান আমাদের অনেক কিছু দিচ্ছে। অবাক হলেও সত্যি যে বিজ্ঞানীরা এখন মৃত্যুকে উপেক্ষা করতে চেষ্টা করছে, তারা সুধু বয়সকে থামিয়ে দেওয়া মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কারণ এই বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মৃত্যুকে জয় করা, আর সেই প্রচেষ্টায় সাফল্যে রূপ দিতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে অসংখ্য সংস্থা। বিজ্ঞান বলছে স্বাভাবিক মৃত্যুকে এক ধরনের জেনেটিক ডিজিজ বলা যেতে পারে এবং বিস্ময়কর কথা হল প্রাণিজগতের বেশ কিছু প্রাণী এই রোগ থেকে মুক্ত এবং তারা রীতিমত বয়োবৃদ্ধির সাথে সাথে বয়সকে বুড়ো আঙ্গুল দেখানোতেই পারদর্শী। এই প্রাণী গুলো হল-কচ্ছপ, জেলিফিশ, কিছু প্রজাতির বড় শামুক, হাইড্রা, গলদা চিংড়ি ইত্যাদি। প্রত্যেক প্রাণী একটা নির্দিষ্ট বয়সে যাওয়ার পর থেকে সে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয় অর্থাৎ মৃত্যুর হার বাড়তে থাকে, এটা প্রাণিজগতে খুব পরিচিত ব্যাপার কিন্তু সবথেকে মজার বিষয় এই জীব গুলো একটা নির্দিষ্ট বয়স পার করার পর এদের মৃত্যুর হার কমতে থাকে, অর্থাৎ একটা প্রাপ্ত বয়স্ক কচ্ছপ আর একটি ২৫০ বছরের বুড়ো কচ্ছপ সব দিক থেকে হুবহু তরুণ কচ্ছপটির মতো। এই প্রাণীগুলো এটা কিভাবে করে তা বোঝার জন্য বিজ্ঞানীরা উঠে পড়ে লেগেছেন এবং তারা ভাবছেন কি করে এটা মানুষের ক্ষেত্রে কাজে লাগানো যায়, সামান্য কিছু ক্ষেত্রে তারা সফলও হয়েছেন। মৃত্যু নিয়ে গবেষণা মূলক প্রতিষ্ঠান গুলো মৃত্যুর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ জৈবপ্রযুক্তি, ন্যানোপ্রযুক্তি এবং শরীর ও চারপাশ নিয়ে গবেষণা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে, প্রযুক্তি ক্রমশ ছুটছে অকল্পনীয় ত্বরণে। অচিরেই প্রতি ঘণ্টায় বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি হবে অতীতের এক শতাব্দীর সমান সময়ে। অসীম জীবন হবে সময়ের বেপার মাত্র ।

মানুষ সব সময়েই চেয়েছে অমর হয়ে থাকতে। মৃত্যুর ভয় তাকে তাড়া করেছে সব সময়। সান্ত্বনা হিসেবে সে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন কল্পগাথা বানিয়েছে। সমাজে মৃত্যু নিয়ে প্রতিটি ধর্মই রংচটা এবং কাল্পনিক কিছু ব্যাখ্যা দাড় করে টিকে আছে, সব কল্পগাথার মোটামুটি কমন বিষয় হল- এই মৃত্যুর পরেও আরেকটা জীবন আছে। মিশরের ফারাওরা পিরামিডে নিজের নাম খোদাই করেছে অমর থাকার জন্য। মরগান ফ্রিম্যান জোক করে বলেছেন, আমিও অমর। আমার ফেসবুকে অ্যাকাউন্ট আছে। আমি মারা গেলেও এই অ্যাকাউন্ট থাকবে।
আর বিজ্ঞান তার সম্পূর্ণ বিপরীতে বলছে মৃত্যু মানেই মৃত্যু নয়, বাহ্যিক এবং অভ্যন্তরীণ অনেক কিছুই জীবিত থাকা। আমাদের হৃদপিণ্ড কিংবা ব্রেইন নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়ার পরেও আমাদের শরীরের সব সেল মারা যেতে কিছুটা সময় লাগে।

আমাদের অভ্যন্তরীণ ক্রিয়া কার্যপ্রণালী থমকে গেলে দেহটাকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে নিঃশেষ করে দেয়। যদি দেহটাকে রেখে দেওয়ার চেষ্টা করি তাহলে অবশেষে একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর ধীরে ধীরে পচন ধরতে শুরু করবে, কিন্তু আদতে আমরা নিঃশেষ হয়ে যাই না কারণ আমাদের স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকে পরবর্তী প্রজন্ম। এক অর্থে আমরা বেঁচে থাকি অন্যের স্মৃতিতে, অন্যের মাঝে । কোন একদিন সময়ের পালাক্রমে হারিয়ে যায় সব কিছু অসীম শূন্যতায়।
তাই সর্ব মুলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা, স্মৃতি, শূন্যতা অথবা বেঁচে থাকার জন্য বেঁচে থাকা, এই সব প্রশ্নের উর্ধে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মৃত্যুকে জয় করা।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “একবিংশ শতাব্দীর বড় চ্যালেঞ্জ মৃত্যুকে জয়

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 5 = 3