প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বঙ্গবন্ধু

আগামী ৭-৮ বছর পর বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার একটা বৃহৎ অংশের বয়স হবে ১৫-৩৫ বছর। এর সংখ্যাটাও কম হবেনা, প্রায় ৮-১০ কেটি। এরাই হবে সামনের বাংলাদেশের মূলশক্তি। প্রশ্ন হলো ঐ বিশাল জনগোষ্ঠীকে আমরা কি বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্ম সম্পর্কে জানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছি? যদি না নিয়ে থাকি তাহলে এখনো সময় ফুরিয়ে যায়নি। এমন কিছু করা প্রয়োজন যাতে আগামী প্রজন্ম বঙ্গবন্ধু ও তাঁর ত্যাগ-তিতিক্ষার বিস্তারিত জানতে পারে তার ব্যবস্থা করা। সেটি হতে পারে তার নামে একটি গবেষণা কেন্দ্র চালু করা বা ভিন্ন কোনো নামে কোনো সংস্থা।

পৃথিবীর অন্যতম প্রশিক্ষিত একটি সেনা কমান্ডো দল গুলি করতে করতে বাড়িতে ঢুকলো। বাড়ির মালিক নির্ভিক চিত্তে ঠায় দাড়িয়ে আছেন। ভয়হীন চাহনি, শিরদাড়া সোজা, সেনাদের কাছে কোনো অনুনয়-বিনয় নয়। মুখে শুধু বললেন, “অফিসার, ওয়ান মিনিট, মাই সিগার পাইপ।” তারপরে সেনাদের গাড়িতে উঠে মধ্য রাতের অন্ধাকারে মিলিয়ে গেলেন অজানা গন্তব্যে। বঙ্গবন্ধু, হ্যা মহান নেতা বঙ্গবন্ধুর পক্ষেই এমন অপরিমেয় সাহস দেখানো সম্ভব। বউ-বাচ্চা, চৌদ্দগুষ্ঠী নিয়ে বিদেশী সেনাদের পা জড়িয়ে ধরে কান্না জুড়ে দেননি। বরং এমন সংযমী সাহস দেখে সেনা সদস্যের কেউ কেউ ভড়কে গিয়েছিল। এরা একে অন্যের দিকে তাকাচ্ছিল। তারা ভেবেই পাচ্ছিল না যে, এমন পরিস্থিতিতে একজন মানুষের পক্ষে এতটা ভাবলেশহীন থাকা সম্ভব হয় কি করে। এটিই ছিল ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের মধ্যে রাতের ৩২ নম্বরের দৃশ্য।

সাত কোটি মানুষের কাছে তিনি রক্ত চেয়েছিলেন। “রক্ত আরো দেব, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ।” তাই ২৫ মার্চের রাতে তিনি কোথাও আত্মগোপনে বা পালিয়ে যাননি। তাঁর যুক্তি ছিল, আমাকে না পেলে রক্তপাত বেশি ঘটবে। কি দুরদর্শী চিন্তা। সাধারন মানুষের জীবন রক্ষায় নিজের জীবন দিতে নিজ বাড়িতে প্রস্তুত ছিলেন বঙ্গবন্ধু। এভাবে নিজের জীবন বিপন্ন জেনেও ঠায় বসে অপেক্ষা করা, শুধুমাত্র এ বিষয়টিই গবেষাণার বিষয় হতে পারে। কতবার যে মরনের জন্য প্রস্তুতি নিতে হয়েছে তার ইয়ত্তা নাই। সর্বশেষ ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের কারাগারে প্রহসনের বিচার করে তাঁকে হত্যার উদ্যোগ নেয় কর্তৃপক্ষ। কবর খুঁড়ে বঙ্গবন্ধুকে কবর দেখানোও হয়। কিন্তু স্থির ও দৃঢ়চিত্তে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের সকল প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। আপোষনামা, ওকালতনামা স্বাক্ষর না করেই ফিরিয়ে দেন। বলা হয়েছিল স্বাক্ষর না করলে নির্ঘাত ফাঁসি। তিনি জেলারকে ডেকে শুধু একটি অনুরোধই করেছিলেন, “আমার ফাঁসি হোক দুঃখ নাই, তবে আমার লাশটা আমার বাংলাদেশে, আমার বাঙালীর কাছে পাঠিয়ে দিবেন।” জেলার ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে ওকালতনামা নিয়ে বেরিয়ে যান। সেই নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও আপোষ করেননি। যেন আপোষ শব্দটি তাঁর অভিধানে ছিলই না। তিনি বাঙালী জাতির অধিকারের প্রশ্নে, মুক্তির প্রশ্নে ছিলেন আমৃত্যু আপোষহীন।

মহান এই মানুষটিকে জানার জন্য একটি আলাদা পাঠশালা দরকার, যেখানে শুধু তাঁকে নিয়েই পড়াশোনা, গবেষণা ইত্যাদি হতে পারে। কারন বঙ্গবন্ধু তার জীবন ও কর্মের ভিতর দিয়ে যে উদাহরন সৃষ্টি করে গেছেন তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। তিনি সারা পৃথিবীর নির্যাতিত মানুষের কথা বলে গেছেন বিশ্বের সর্বোচ্চ ফোরামে। সেই বিশ্ব সভায় দাড়িয়ে তিনি বলেছেন, আমি শোষিতের পক্ষে। আর কি চাই। রাষ্ট্রনেতার গুনাবলীর ষোলকলা পুর্ণ হলো এরই মাধ্যমে। ৫৫ বছর খুব দীর্ঘ সময় নয়। এই অল্প পরিসরের জীবনে তাঁর চরিত্রে ঘটেছিল অকুতোভয় সাহস, দুরদর্শীতা, ত্যাগের দীক্ষা, প্রলোভন প্রত্যাখান, নিখাদ মানুষ ও দেশপ্রেম, উদারতা ও ক্ষমার সমন্বয়। পরবর্তী প্রজন্ম যেভাবে প্রযুক্তি নির্ভর হয়ে পড়েছে তাতে তাঁকে গভীর ভাবে জানার জন্য একটি পাঠশালা চাই আমাদের।

সভ্যতার ক্রমবিকাশে বঙ্গবন্ধুর চিন্তা ও কর্ম পুরো বিশ্বের মানুষের কাছে হতে পারে বিশাল সম্পদ। যদিও এ সম্পদের মালিকানা আমাদের, কিন্ত এর যথোপযুক্ত ব্যবহারে উপকৃত হতে পারে সব দেশ ও জাতি, আর এমনটি হলে তা হবে আমাদের জন্য পরম গৌরবের বিষয়।

খোরশেদ আলম, লেখক, গবেষক ও কলামিস্ট

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

1 + 5 =