মুজিব হত্যার পরিণাম

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম সংস্কৃতির নাম রাজনীতি। মুর্খের কাছে এ উক্তি গোখরার বিষের মতো। নির্জ্ঞান হবার ফলে তাদের ভাবনার সমর্থকও কম নেই। কিন্তু তাতে রাজনীতির কি এসে যায়। বিশ্বের তাবৎ দেশ লক্ষ করলে দেখা যাবে সেদেশে সৃষ্টিকর্তা কোনো না কোনোভাবে একজন শ্রেষ্ঠ মানবসন্তানকে পাঠিয়েছিলেন। এঁদের মধ্যে রাজনীতিকদের অবস্থান শ্রেষ্ঠ। বাংলাদেশেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। দেশে বহুসংখ্যক মানুষের জন্ম হয় তথাপিও সমস্ত মানুষের জন্ম সার্থকতায় পরিগণিত হয় না। কখনো কখনো একজন মানুষের মাধ্যমে সূচিত হয় একটি জাতির ভাগ্যরেখা।

বাংলাদেশে সে রকম এক বীর বাঙালির জন্ম হয়েছিল, তিনিই এদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যাঁর জন্মের ভিতর দিয়ে একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের সৃষ্টি হয়েছিল। পৃথিবীর যা কিছু বিস্ময় তাহলো যিনি এই পৃথিবীর জন্যে তার জীবনের মূল্যবান সময় ব্যয় করবেন দেশের কল্যাণে, মানুষের কল্যাণে আর তাঁকেই হতে হবে নৃশংসতম মৃত্যুর শিকার। বিশ্বের রাজনীতির এমন বহু উদাহরণ মেলে, তার আর প্রমাণ উপস্থাপনের প্রয়োজন পড়ে না। বাংলাদেশের স্রষ্টা মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। নরপিশাচেরা হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তানকে সরিয়ে দিয়েছে মহালোভের আশায়। একদিকে যেমন দেশের মধ্যে মহাসৃষ্ট হয়ে আসে মানুষের মহাকল্যাণে মহামানবেরা অন্যদিকে আসে কতিপয় জানোয়ারেরা মহাসর্বনাশের আশায়।

ছোট্ট ভূখণ্ড বাংলাদেশের এই ধরনের ইতিহাস সবচেয়ে ঘৃণিত হয়ে আছে বিশ্বের বুকে। মহাপুরুষ বঙ্গবন্ধুর যোগ্য নের্তৃত্বের ফল ছিল কুচক্রীদের প্রচণ্ড গাত্রদাহ। ষড়যন্ত্র ছিল দেশিয় এবং আন্তর্জাতিক। সারা বিশ্বের মহান নেতা হবার পথে এইসব হিংস্রগোষ্ঠী ছিল তৎপর। একদিকে বঙ্গবন্ধুর পার্টি আওয়ামীলীগের মাধ্যমে দেশের আপামর জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দেশের স্বাধীনতার নের্তৃত্ব দান অপরদিকে স্বাধীনতার সুর্যকে জয় লাভ করার যে কৃতিত্ব তাতেও ছিল ষড়যন্ত্রীদের বিষাক্ত স্বপ্ন আর প্রতিশোধ স্পৃহা। তার ওপর যুদ্ধ বিধ্বস্ত একটি দেশকে অতি অল্প সময়ে সাজিয়ে তোলবার যে সফল মহাযজ্ঞ সেখানেও হায়েনাদের চরম বিনীদ্র রজনী। একটি দেশের কারিগর যিনি তাঁর ভিতরে থাকে মহাস্বপ্নের মহামন্ত্র। যা বঙ্গবন্ধর ভিতরে লুকায়িত ছিল। হায়েনারা তা বুঝতে পারলেও পরাজিত দেশবিরোধী হবার ফলে পিতাকে ক্ষমা করতে পারেনি। পৃথিবীর সফল রাষ্ট্রনায়ককে তাই তারা সরিয়ে দিতে একটুও কুণ্ঠাবোধ করেনি। কিন্তু নিহত নক্ষত্র বঙ্গবন্ধুর প্রস্থান বাংলাদেশের জন্যে ছিল এক মহাপরাজয়-মহাপতনের মতো। একজন মানুষের মাধ্যমে নির্মিত বহু স্বপ্নের বাংলাদেশকে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে রক্তের সাগরে। তীব্র এই দহন থেকে বাঙালি জাতি মুক্তি পাবে না কোনোদিন।

পিতার শত্রুরা তাঁর মৃত্যুতে তৃপ্তির ঢেকুর গিলে বলেছিল -তোদের স্বাধীনতার সূর্যসৈনিককে শেষ করে, তোদের এতিম করে, বিষাক্ত স্বপ্নপূরণে আমরা আমাদের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিলাম। এটা ঠিক যে মহানায়কের প্রস্থানের পর দীর্ঘকালব্যাপী উন্নতির চরম শিখর থেকে ঝড়ে পড়েছে এই দেশ। তার সেই অপূরণীয় ক্ষতি থেকে উঠে আসতে হলে বাংলাদেশকে আরো বহুকাল অপেক্ষা করতে হবে।

জাতির পিতা হত্যার পরিণাম যা তাহলো কুৎসিৎ মানুষের অসভ্য চিন্তার ফলে অন্ধকারে নিমজ্জিত এক শোকার্ত বাংলাদেশ। আর সেই অন্ধকারের রেশ টানতে হয়েছে দীর্ঘ একুশ বছরের কুশাসনের মধ্য দিয়ে। তাতে লাভ হয়েছে উচ্ছিষ্ট-দালাল-অপশক্তিদের আর অসম্ভব সামগ্রিক ক্ষতি স্বপ্নময় বাংলাদেশের মানুষের। কিন্তু একথা সত্য যে কোনো ঘটনাই রাজনীতির ইতিহাসে বিলীন হয়ে যায় না। বঙ্গবন্ধুর তিরোধানের পর সামগ্রিক ক্ষতির মধ্যে পড়ে যাওয়া, তিমিরে তলিয়ে যাওয়া বাংলাদেশকে টেনে তুলতে এখন সচেষ্ট আছেন তাঁরই যোগ্য উত্তরসূরী আত্মজা, ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া, গণতন্ত্রের মানসকন্যা জননেত্রীখ্যাত শেখ হাসিনা।

জাত শিকারিরা পিতাকে খুন করে বাংলাদেশে চির অরাজকতার যে বীজ বুনে দেবার স্বপ্ন দেখেছিল, চিরকাল ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থেকে তাঁর ত্যাগের মহিমাকে মুছে দিতে চেয়েছিল, তার কতটুকু তারা সফল হয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যার পরিণাম বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এক মহাপতন যেমন তেমনি নতুন বাংলাদেশ সৃজন ও তীব্র প্রতিশোধের দহন তেমন। হনুমানেরা বুঝতে পারেনি জীবিত বঙ্গবন্ধুর চেয়ে মৃত বঙ্গবন্ধু আরো বেশি শক্তিশালী ও ভয়ঙ্কর। সেই প্রমাণ আমরা আজ বাংলাদেশে দেখতে পাচ্ছি। ক্ষত-বিক্ষত-রক্তাক্ত এই বাংলাকে বিনির্মাণে তৎপর লৌহমানবী শেখ হাসিনা।

জাতির পিতাকে সরিয়ে দিয়ে কেবলমাত্র তাঁর দেহটাকেই সরিয়ে ফেলা গেছে বটে কিন্তু তাঁর ক্ষুরধার মস্তিষ্ক রয়ে গেছে বাংলার প্রতিটি পরতে পরতে। সে কারণেই সম্ভবত শ্লোগানে ভেসে আসে ‘এক মুজিব লোকান্তরে / লক্ষ মুজিব ঘরে ঘরে। জাতির পিতার মহাপাপিষ্ঠ খুনীরা বহাল তবিয়তের যে দিন করেছে পার সেদিন আজ ইতিহাস। পিতা হত্যার পরিণাম তাদের গলায় দীর্ঘকাল পরে হলেও পরতে হয়েছে ফাঁসির রজ্জু। সেই দানবীয় চিৎকার যাদের ‘আমরাই খুন করেছি বঙ্গবন্ধুকে’ তোমরা আজ কাপুরুষেরা আজ ঝুলে গেছে রাত বারোটায় রশিতে। সমগ্র বাংলাদেশকে অতল-অন্ধকারে ডুবিয়ে দিয়ে যে সমস্ত পামরেরা চারিদিকে দাপিয়ে বেড়াত, তাদের পরিণাম বাঙালির অবিদিত নয়।

মানুষ হয়ে মানুষের খুন ইতিহাস ক্ষমা করে না। দেশে দীর্ঘকাল যুদ্ধাপরাধীদের যে তাণ্ডব তারও ফলাফল আমরা অবকলোকন করছি। এগুলো প্রতিশোধ নয়, এ হচ্ছে পিতা হত্যা পরিণাম। দেশকে ধ্বংসযজ্ঞ থেকে টেনে তোলবার দুর্জয় সংগ্রাম। মানুষের অপমৃত্যু যে বাংলাদেশে সেই বাংলাদেশকে বাঁচাবার তীব্রদহনের লড়াই। যে লড়াই বঙ্গবন্ধুর জীবন থেকে বাঙালি জাতি গ্রহণ করেছে এবং করবে চিরকাল।

সংগ্রামের শেষ নেই, সংগ্রাম চিরন্তন। বাংলাদেশে নতুন সংগ্রামে দীপ্ত বুকে শপথ নিয়ে অগ্রসর জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা ও বাঙালি সমাজ। বঙ্গবন্ধুর হত্যার ধারা এদেশে এখনো শেষ হয়নি। বাঙালির কৃতি সন্তানদের একের পর এক খুন করছে সেই পাকি-বিজাতীয় ধারারই উত্তরসূরীরা। কারণ বঙ্গবন্ধুর পার্টি আওয়ামীলীগ এবং তার উত্তরাধিকার তাঁরই মতো সফলভাবে রাষ্ট্র পরিচালনায় অধিষ্ঠিত। রাহুগ্রহের কুচিন্তার দিন সহসাই তাই শেষ হয় না। যতদিন বাঙালি ততদিন বাঙালি বিরোধীদের সঙ্গে যুদ্ধ। নব আনন্দে জাগো। বাংলাদেশের পথে নতুন অরাজক-অপসৃষ্টধারা জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে। এরাও বাঙালিদের চিরশত্রুর উত্তরাধিকার। জাতির পিতার রক্তধারা সেই অপশক্তির অপকর্মের বিরুদ্ধে সদা তৎপর, সঙ্গে বীর বাঙালির মনোবলের হাতিয়ার। যে দেশে বঙ্গবন্ধুর জন্ম হয়েছিল, সে দেশে অপশক্তির দিন সাময়িক। সেখানে দানব-দানবীদের ঠাঁই নাই। তাই আশা করি বাঙালির দহনকালের বেলা ফুরাবে সহসাই।

খোরশেদ আলম, লেখক, গবেষক ও কলামিস্ট

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “মুজিব হত্যার পরিণাম

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

14 − = 8