বঙ্গতাজের উক্তিমালা

[তাজউদ্দীন আহমদ সারাটা জীবন লড়ে গিয়েছিলেন স্রোতের বিপক্ষে। পাকিস্তানের জন্মের পরবর্তী সময়ে বাংলার এমন কোন প্রগতিশীল আন্দোলন নেই যেখানে তাঁকে খুঁজে পাওয়া যায় নি। তাজউদ্দীন আহমদের মত নেতা আমাদের দেশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন সেটা আমাদের পরম ও চরম সৌভাগ্যের। এই নেতা আজ দেশের কাছে, এমনকি তার দলের কাছেও প্রাপ্য মূল্যায়নটুকু পান নি। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় একজন ছাত্র প্রথম শ্রেনী থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করে তাজউদ্দীন সস্পর্কে শুধু এটাই জানে যে, তিনি মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, এর বাইরে কিছুই জানে না। এটা হতাশার, দুঃখের, কষ্টের, লজ্জার! ইতিহাস জানতে হলে, ইতিহাসের চেতনাকে বুঝতে হলে, ইতিহাস স্রষ্টাদেরকেও জানতে হবে, বুঝতে হবে।

কিছুদিন আগে সিমিন হোসেন রিমির ‘তাজউদ্দীন আহমদে আলোক ভাবনা : উদ্ধৃতি সংকলন’ বইটা পড়ছিলাম। বইয়ের আমার প্রিয় কিছু উক্তি তুলে ধরলাম পাঠকের সামনে]

?oh=16462e4d03f8e21ae84cfdd3da1fd4a1&oe=5825704C” width=”400″ />

তরুণ সমাজ অদম্য শক্তির অধিকারী, এই শক্তিকে যদি সুষ্ঠু পথে পরিচালনা করা না যায়, তাহলে সেই শক্তিটা যদি বিপথে যায় বা উদ্দেশ্যবিহীন, লক্ষ্যবিহীন হয়ে যায় তবে অবস্থা মারাত্নক হয়ে দাঁড়াবে।

জনশক্তিকে সুপরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাতে পারলেই অর্থনৈতিক মুক্তি আনা সম্ভব। এ দেশের সরকারী কর্মচারীদের এক বৃহৎ অংশ চতুর্থ শ্রেণীর নিম্ন বেতনভুক্ত কর্মচারী। যাদের মাধ্যমে শুধুমাত্র শ্রমের অপচয়ই হচ্ছে। অথচ পরিকল্পিতভাবে এক বৃহৎ জনশক্তিকে কাজে লাগাতে পারলে এক দিকে যেমন তাদের ভাগ্যেরও পরিবর্তন ঘটত, অপরদিকে দেশের অগ্রগতি সাধন হত।

সংস্কৃতির আবেদন বিশ্বজনীন। এর সীমারেখা টানা ঠিক হবে না। সংস্কৃতি চির প্রবাহমান। সত্য ও সুন্দরের সাধনাই সংস্কৃতি। সংস্কৃতি কোনকালে কোন অবস্থায়ই বর্জনীয় নয়, সবকালেই গ্রহনীয়।

বঙ্গবন্ধুর কাছে খুব বেশী আশা করবেন না। শুধু এইটুকু দোয়া করবেন যে, বঙ্গবন্ধু যে, লাইনচ্যুত রেলগাড়িটি লাইনের ওপর সঠিকভাবে স্তাপন করে যেতে পারেন। কারণ অগ্রগতির প্রতীক স্বরুপ এই গাড়িতী লাইনে অবস্থান করলে যে কোন ইঞ্জিন বিলম্বে হলেও সেটি গন্তব্যস্থানে পৌছাতে সক্ষম হবে।

বর্তমানে দেশে বিবেকের সংকট দেখা দিয়েছে। একমাত্র দেশের যুব সমাজের নিষ্কলুষ মানসিকতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা নেতৃত্বের মাধ্যমে এই সংকট কাটানো যেতে পারে।

বাঙ্গালীর স্বাধীনতার ইতিহাস বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে জনগনই সৃষ্টি করেছে। একা কেউ এ ইতিহাস সৃষ্টি করেনি। এই ইতিহাসকে সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ করতে হবে।

গণতান্ত্রিক পরিবেশের পূর্ণ সুযোগ নিয়ে দেশে সুস্থ ও দায়িত্বশীল বিরোধীদল গরে তোলা প্রয়োজন। দায়িত্বশীল বিরোধী রাজনৈতিক দলই গঠনমূলক সমালোচনা করে সরকারকে রাষ্ট্র পরিচালনায় সাহায্য করতে পারে। এমনকি জনসমর্থন নিয়ে তারা সরকারও গঠন করতে পারবেন।

কৃষকরা জাতির সম্পদ; আমরা তাদের জন্য গর্ববোধ করি।

মাথার ঘাম পায়ে ফেলে বাংলাদেশকে সমৃদ্ধশালী রাষ্ট্ররূপে গরে তুলতে পারলেই স্বাধীনতা সংগ্রামের শহীদদের স্মৃতির প্রতি যথার্থ মর্যাদা দেওয়া হবে।

বাঙ্গালী জাতি বড় বেশী তাড়াতাড়ি সব কিছু ভূলে যায়। তাই আমরা স্বাধীনতা পাওয়ার মাত্র দুই বছরের মধ্যেই শোকাবহ ঘটনাকে ভুলতে বসেছি। এই মুহূর্তে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের সার্বিক ইতিহাস রচনা করতে হবে। যদি সঠিক ইতিহাস রচিত না হয় তবে আগামী দিনে জাতি আমাদেরকে কিছুতেই ক্ষমা করবে না।

যর সুন্দর ভাষা ও শব্দ দিয়ে সংবিধান লেখা হোক না কেন, জাতির জীবনে তা প্রয়োগ না হলে সেটা অর্থহীন হয়ে পড়বে।

?w=640&h=430″ width=”400″ />

সরকারের মিথ্যে সাফাই গাওয়া নয় – বুদ্ধিজীবি সম্প্রদায়কে সরকারের ত্রুটি বিচ্যুতি ধরিয়ে দিয়ে দেশ গড়ার কাজ্জে গঠনমূলক দায়িত্ব পালন করতে হবে। দেশের কোটি কোটি ভূখা নাঙ্গা মানুষের পেটে ক্ষুধা রেখে গুটিকতক সুবিধাবাদী শ্রেণীর জন্য এই স্বাধীনতা আসে নি।

সমাজতন্ত্র যান্ত্রিক উপায়ে রাতারাতি প্রতিষ্ঠা করা যায় না। জনগনের অধ্যাবসায় ও ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমে এক অর্জন ও প্রতিষ্ঠা করতে হয়। শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি প্রয়োজন। সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য নিঃস্বার্থ কর্মীদের সাহায্য প্রয়োজন। এসব কর্মীকে সকল প্রকার লোভ ও বৈষয়িক লাভের উর্ধ্বে থাকতে হবে ও আদর্শের স্বারা পরিচালিত হতে হবে।

দেশের কাছে কিছু চাওয়ার আগে দেশকে আপনি কতটুকু দিয়াছেন, তা বিচার করেন।

দুর্বৃত্ত দুর্বৃত্তই, সে যে পদেরই হোক না কেন। যদি তাজউদ্দীন কোন প্রতারণা করে অথবা একজন নক্সালি কোন দাকাতিতে জড়িত হয়, তবে তাদের রাজনীতিক না বলে দুর্বৃত্ত বলেই আখ্যা দিতে হবে। দুষ্কৃতিকারী ও সমাজবিরোধী ব্যাক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যাবস্থা নিলে তাকে রাজনৈতিক রুপ যেন না দেয়া হয়। রাজনৈতিক রুপ দিলে সে আশ্রয় পেয়ে যায়। দুষ্কৃতিকারী রাজনৈতিক নেতা বা কর্মী নয়। দুষ্কৃতিকারী সে যেই হোক তাকে ক্ষমা করা চলবে না।

সংসদীয় গণতন্ত্রের বৃহত্তর স্বার্থে গঠনমূলক সমালোচনা জরুরী।

লেখাপড়া জানতে হয় বিবেককে শান দেয়ার জন্যে। শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধুমাত্র চাকরি নয়। শিক্ষা দিয়ে বিবেককে উন্নত করা। এই ব্রত নিয়ে সামনের দিকে এদিয়ে যেতে হবে।

রাজনীতিতে সহশীলতার প্রয়োজন সমধিক। পরস্পরের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা স্বাধীন দেশের নাগরিকদের অন্যতম দায়িত্ব।

অর্থনৈতিক মুক্তি ছাড়া রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্থহীন।

সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলই বিকল্প সরকার। বিরোধী দলগুলোকে এমন হতে হবে যেন তারা জনগনের পূর্ণ আস্থা লাভ করতে পারে। তা না হলে দেশের জনগন হতাশার শিকার হবে। বাংলাদশের জনগনকে নৈরাজ্যের শিকারে পরিণত করার অধিকার কোন বিরোধী দলেরই নেই।

গণতন্ত্রে প্রত্যকের মত প্রকাশের স্বাধীনতা আছে এবং এ ক্ষেত্রে মতামতের বিভিন্নতাও একটা স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু এই পার্থক্য আমাদের জাতীয় স্বার্থ ও লক্ষ্য বিরোধী হলে চলবে না। জাতীয় প্রশ্নে আমাদের দলমত নির্বিশেষে একটা অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থাকা উচিত।

আজকের সংকট হচ্ছে বিবেক ও শৃঙ্খলাবোধের সংকট।

একটি কঠিন যুদ্ধের মাধ্যমে আমরা রাজনৈতিক ও ভৌগলিক স্বাধীনতা অর্জন করেছি। কিন্তু অর্থনৈতিক স্বাধীনতার যুদ্ধ আরও কঠিন।

আমি ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে দেশের মুক্তি সংগ্রাম পরিচালনায় যে সব সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম তা বাংলাদেশ ও এদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের স্বার্থেই নিয়েছিলাম। বাঙ্গালির আশা আকাঙ্ক্ষা আর বাচা – মরার প্রশ্নকে সেদিন সবচেয়ে উচিতে স্থান দিয়েই আমি কাজ করে গিয়েছি। আওয়ামীলীগের একজন একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে এবং একজন খাটি বাঙ্গালী হিসেবে আমার দায়িত্ব সাফল্যের সঙ্গে পালন করতে পারায় আমি খুশি।

দেশের ঐতিহাসিক নিদর্শন সংরক্ষনের জন্য আরও জাদুঘর ও গ্যালারী এবং গ্রন্থাগার প্রয়োজন।
জীবননগরের কাছে সীমান্তবর্তী টঙ্গি নামক স্থানে একটি সেতুর নিচে ক্লান্ত দেহ এলিয়ে আমি সেদিন যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম তা হলোঃ একটি স্বাধীন সরকার প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিচালনার জন্য কাজ শুরু করা।

স্লোগান দিয়ে সমাজতন্ত্র কায়েম করা যায় না, দুর্নীতি দূর হয় না, বুলি আউড়িয়ে প্রবৃদ্ধি আনা যায় না, জনসাধারণকে সর্বকালের জন্য ধোঁকা দেওয়া চলে না।

আমরা সামন্তবাদী অবস্থা ও পরিবেশ থেকে এখনও পূর্ণ গনতান্ত্রিক অবস্থায় পৌছাতে পারিনি। সামন্ত প্রভু আজ নেই সত্য – কিন্তু সামন্ত মনোবৃত্তি এখনও রয়েছে। আগে মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে।

বক্তৃতা কমাতে হবে। এখন ভেবে দেখতে হবে বক্তৃতায় যা বলা হয়েছে তা করা হয়েছে কি না।

আগে ভাবিনি যে, আমার মতো সাধারণ কর্মীর ওপর জাতির ঐতিহাসিক দায়িত্ব পড়বে। দেশবাসী সম্ভবত তা পূর্বে কখনো ভাবে নি। আসলে নেতৃত্ব হচ্ছে জনগনের মনের আশা – আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। ধনতন্ত্রের পথে কিংবা কোন যুদ্ধ জোটে যাব না – এই মনোভাব নিয়েই ১৯৭১ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠন করি। সাধীনতা সংগ্রামে কূটনৈতিক ক্ষেত্রে এটি ছিল একটি বিরাট সাফল্য।

?oh=76310e88e683f57d65e266041f761970&oe=584D82B2″ width=”400″ />

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “বঙ্গতাজের উক্তিমালা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

7 + 1 =