ধর্ষনের ঐতিহাসিক – সামাজিক প্রেক্ষাপট ও মুক্তির উপায়ঃ ভূমিকা পর্ব

“সার্বিক মানবমুক্তির লক্ষ্যে নারীমুক্তির কোনো বিকল্প নেই”। -ভার্জিনিয়া উলফ।

“ভগিনীগণ! চক্ষু রগড়াইয়া জাগিয়া উঠুন – অগ্রসর হউন! বুক ঠুকিয়া বল মা, আমরা পশু নই। বল ভগিনী, আমরা আসবাব নই; বল কন্যে, আমরা জরায়ু অলংকার- রুপে লোহার সিন্দুকে আবদ্ধ থাকিবার বস্তু নই; সকলে সমস্বরে বল, আমরা মানুষ”। -রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন।

১.
প্রাকৃতিকভাবে নারী ও পুরুষের মধ্যে শারীরিক পার্থক্য রয়েছে এটা যেমন অনস্বীকার্য; তেমনি শারীরবিদদের ব্যাখ্যা অনুসারে নারী ও পুরুষের মধ্যে শারীরিক পার্থক্যের চেয়ে মিলই বেশি সেটাও তেমনি স্বীকার্য। বিদ্যমান সমাজ ব্যবস্থায় একটা বদ্ধমূল ভ্রান্ত ধারনা এই যে, শারীরিক পার্থক্যের কারনে পুরুষ সবদিক থেকে শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী; ফলে পুরুষের অধীনস্ত হওয়া ছাড়া নারীর কোনো উপায় নেই। যৌনতার দিক থেকেও নারী এ কারনেই পুরুষের অধীন থাকতে বাধ্য। এই বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গী তৈরী হয়েছে আমাদের দীর্ঘদিনের সমাজের বিশেষ সাংস্কৃতিক ধরন ও ব্যক্তিক সম্পর্কের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের উপর ভিত্তি করে। জন্মের পর এই সমাজই নারী –পুরুষকে বেড়ে ওঠার পরিবেশ তৈরি করে দিয়েছে – যার প্রভাবেই নারী ও পুরুষের মধ্যে বিভেদের অলংঘনীয় দেয়াল তুলে দেয়া হয়েছে, নারী, শুধু নারী হয়ে উঠেছে। সিমোঁ দ্য ব্যুভোয়ার এই বেড়ে ওঠার বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করেছেন এইভাবে, “নারী হয়ে কেউ জন্মায় না, নারীকে নারী করে তোলা হয়”। অর্থাৎ সমাজ ও সংস্কৃতিই নারীকে নারী করে তোলে। এইভাবে যৌনতা ও যৌনধারনাকেও নির্মান করেছে –একই সমাজ ব্যবস্থা। সামাজিক কাঠামো ও সংস্কৃতিচর্চার ঐতিহাসিক পটভূমিতেই যৌনতার ধারনা আকার পেয়েছে। প্রকৃতপক্ষে যৌনতা কিভাবে গঠিত হয়, কিভাবে যৌনতা নারী –পুরুষের জীবনে কাজ করে এবং কিভাবে একজন পুরুষ যৌনতার মধ্য দিয়ে তার শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করে, সমাজ ও সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটেই কেবল তা বোঝা সম্ভব। আমরা জানি, আমাদের পরিচিত চলমান অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি পুরুষের যৌনতাকে ততটা নিয়ন্ত্রন করে না; বিপরীত দিকে নারীর যৌনতাকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রন করে। ফলে, অর্থনৈতিক –সামাজিক –সাংস্কৃতিক কাঠামোকে বাদ দিয়ে নারী –পুরুষের যৌনতার স্বরুপও বোঝা যাবে না। বোঝা যাবে না, স্বাভাবিক যৌনতা কিভাবে, কখন বিকৃত রুপ ধারন করে; কেন এই সমাজে ধর্ষক তৈরী হয়, নারীরা কেন যৌনসন্ত্রাসের শিকার হয়।

২.
‘ধর্ষন’ কিংবা ‘যৌনসন্ত্রাস’ সমাজ –সভ্যতার ইতিহাসে নতুন কোন ঘটনা নয়। এর ইতিহাস অনেক পুরনো। সমাজ- সভ্যতার ক্রমবিকাশের সাথে সাথে মানুষ যতই আধুনিক হয়েছে; নারীকে নিত্য –নতুন কৌশলে অধীনস্ত করে পুরুষের আধিপত্যও বিকশিত হয়েছে নতুনরুপে। অনেকক্ষেত্রে আমরা নারী প্রশ্নে এখনো আদিম –মধ্যযুগীয় ধ্যান –ধারনাই পোষন করি; কখনো সমাজের সংস্কারের নামে, কখনো ধর্মীয় বিধি –বিধানের নামে, কখনো রাষ্ট্রীয় আইনের নামে। বস্তুতঃ প্রাচিন যুগেও সমাজে ধর্ষকের মন তৈরি হওয়ার যেমন বস্তুগত উপাদান বিদ্যমান ছিল; বর্তমানেও তা বিদ্যমান ভিন্ন আঙ্গিকে।

‘মহাভারত’র সময়েও তখনকার সমাজ যৌন সন্ত্রাসীদের উপদ্রব থেকে মুক্ত ছিল না। স্বেচ্ছাচারী ধর্ষকের দৃষ্টি থেকে নারীকে নিজেদের রক্ষা করে চলতে হতো। যে সব নারী ধর্ষনের শিকার হয়ে নিপীড়িত হতেন, তাঁরা সমাজে যতটা নিন্দিত হতেন; তারচেয়ে বেশি নিন্দিত হতেন সেই পরিবারের পুরুষরা যারা তাদের নারীদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়। অর্থাৎ নারীরা তখনকার সেই সমাজে নিন্দিত হওয়ারও বিবেচ্য ছিলো না।

মহাভারতের মৌষলপর্বে দেখা যায়, বলরাম ও কৃষ্ণের দেহত্যাগের পর বসুদেব যোগস্থ হয়ে স্বর্গলাভ করে। অর্জুন সকলের সৎকার করে কৃষ্ণের ১৬ হাজার পত্নী, পৌত্র বজ্র এবং অসংখ্য নারী, বালক ও বৃদ্ধদের নিয়ে যাত্রা করলেন দ্বারকা পথে। পঞ্চনদ প্রদেশের এক স্থানে দস্যুরা নারীদের দেখে কামাসক্ত হয়ে হঠাত আক্রমন করে বসে। এমতাবস্থায় অর্জুন গাণ্ডীব নিয়েও দস্যুদের ঠেকাতে পারলেন না। অতঃপর, দস্যুরা অর্জুনের সামনেই বৃষ্ণি ও অন্ধক বংশীয় নারীদের অপহরণ পূর্বক ধর্ষন করে। এই রকম অসংখ্য উদাহরন মহাভারতে আছে; দ্রৌপদী, অহল্যা এদের কথা আমরা জানি – যারা নানাভাবে নিগৃহিত ও লাঞ্ছিত হয়েছিলেন। এমনকি অর্জুনও কৃষ্ণের পরামর্শে এক উতসবের দিন বলপূর্বক সুভদ্রাকে হরন করেছিলেন। যার ফলে সুভদ্রার অগ্রজ বলরাম অর্জুনকে আক্রমন করেছিলেন। যদিও কৃষ্ণের কথায় একপর্যায়ে বলরাম নিরস্ত হয়েছিলেন। প্রাচিন মিথ ও সাহিত্য থেকে এরকম অসংখ্য উদাহরন দেয়া যেতে পারে যেখানে নারীকে হরন করা ও জোরপূর্বক ধর্ষন করার সাক্ষ্য পাওয়া যাবে। যার মধ্য দিয়ে ততকালীন সমাজের একটা চিত্র আমরা কল্পনা করতে পারি। সেই সময়ে, এই ধরনের কাজ করা ক্ষত্রিয় পুরুষের পক্ষে বীরত্বের কাজ হিসেবেই সেই সমাজে বিবেচিত হত।

উপমহাদেশ ছেড়ে বেরিয়ে অন্যান্য দেশের উপাখ্যান, মহাকাব্যে ধর্ষন বা বলাতকারের ছড়াছড়ি। আনুমানিক ৭৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে রোমে এক ‘বীরত্বপূর্ণ ধর্ষন’ ঘটেছিল। রমিউলাস রোম নগরীর পত্তন করার পর রোমানরা সেবাইন(মধ্য ইতালীর প্রাচিন বাসিন্দা) –দের সঙ্গে আঁতাত গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়। সেই ক্রোধে এক উতসবের দিন রোমান সেনারা সেবাইন নারীদের গণ –অপহরন করে ও পরবর্তিতে ধর্ষন করে। ইউরোপের উপাখ্যানে দেখা যায়, গ্রীক প্রধান দেবতাদের অন্যতম জিউস যে শুধু নারী ধর্ষন করেছিলেন, এমন নয়; ঈগলের রুপ ধরে তিনি এক গ্রীক বীর ‘গ্যানামিড’ নামক এক মেষপালককে পর্যন্ত ধর্ষন করেছিলেন।

৩.
যুগ পরিবর্তন হয়েছে। প্রাচীন যুগ, মধ্যযুগ পেরিয়ে এখন তথাকথিত সভ্য আধুনিক যুগের মানুষ আমরা। এই যুগে এসে নারী -পুরুষের সম্পর্কের ধরনে অনেক পরিবর্তন এসেছে সত্যি; স্থান ভেদে এর পার্থক্যও আছে। তবে সকল সমাজেই এখনো নারীরা নানাভাবেই পুরুষের দ্বারা নিগৃহিত, লাঞ্ছিত ও বঞ্ছিত হয়ে আসছে। ধর্ষনের শিকার হচ্ছে, মৃত্যু বরন করছে অকালে।

পর্ণোগ্রাফি ও যৌনবৃত্তি বর্তমানে যৌনতার দুটি গুরুত্বপূর্ন দিক। পর্নোগ্রাফির সাথে যৌনবৃত্তির সম্পর্ক পরিপূরক; দুটিরই লক্ষ্য হচ্ছে যৌনতাকে বাণিজ্যিকীকরন করা। দুটি ক্ষেত্রেই পুরুষই প্রধানত পর্নোগ্রাফি ও যৌনবৃত্তির ক্রেতা ও ভোক্তা। অপরদিকে নারীকেই পর্নোগ্রাফি ও যৌনবৃত্তির নানা কাজে নানাভাবে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয়। উভয়ক্ষেত্রেই শারীরিকভাবে উপস্থাপন করা হয় নারীকে।

নারীর যৌনপেশা গ্রহনের মূল কারন দারিদ্র্য। অনেক দেশে এই পেশা আইনী হওয়ায় যৌনবৃত্তিজীবী নারীকে আরো বেশি নির্যাতিত হতে হয়। যৌনবৃত্তি বাংলাদেশের মত অধিকাংশ দেশেই পেশা হিসেবেও স্বীকৃত নয়। যৌনবৃত্তিকে কেন্দ্র করে নারীর অর্থনৈতিক অবস্থান ও পুরুষতান্ত্রিক সম্পর্ক কী দাঁড়ায় তার ব্যাখ্যা সহজেই পাওয়া যায়। এর মধ্য দিয়ে নারী পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্য, নির্যাতন, অবদমন, শোষনের শিকার হয়।

ঐতিহাসিক ও সামাজিকভাবে পুরুষতন্ত্রের আধুনিক প্রকাশ হিসেবে পর্নোগ্রাফির আবির্ভাব। বলাবাহুল্য, পুরুষের যৌনকামনার বিকৃত প্রকাশ হিসেবেই পশ্চিমি বূর্জোয়া রাষ্ট্রে পর্নোগ্রাফির আবির্ভাব ঘটে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর জন্য দেহ প্রদর্শন বা এর ব্যবহার ছাড়া অন্য কোন জীবিকার পথ খোলা না থাকার কারনেই অনেক নারী পর্নোগ্রাফির মডেল বা অভিনেত্রী হয়ে জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়েছেন। পুরুষতন্ত্রই নারীকে এ পথে টেনে এনেছে। কেননা এই সমাজে এমন একটা আবহ তৈরি করা হয়েছে যে, দৈনন্দিন জীবনের অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারীর যৌন ভূমিকা ছাড়া অন্য কোন ভূমিকা থাকে না। নারীর দেহবৃত্তির পেছনেও এটি প্রধান কারন হিসেবে কাজ করে। পর্নোগ্রাফি ও যৌনবৃত্তি তাই একই মূদ্রার এপিঠ –ওপিঠ। এই দুই –ই যৌনতার সাথে যুক্ত, উভয়ের উতস আমাদের বর্তমান এই সমাজ কাঠামো।

ইন্টারনেটে আমরা যে পর্নো প্রতিমূর্তি দেখি তার পেছনে কোনো না কোনো বাস্তবের নারী ক্রিয়াশীল থাকে। সেইসঙ্গে এটি ভাবার কোনো কারন নেই যে ক্ষমতা –সম্পর্কের বাইরে পর্নোর কোনো অস্তিত্ব আছে। অর্থাৎ আগের মতই ইন্টারনেটে প্রদর্শিত পর্নো ও যৌনতার মধ্য দিয়ে নারী –পুরুষের ক্ষমতারই বহিঃপ্রকাশ ঘটে চলেছে; এখানে পুরুষ রয়ে গেছে আধিপত্যের যায়গায়, নারী হয়েছে অধস্তন।

৪.
ধর্ষন কিংবা যৌনসন্ত্রাস সরাসরি ঘটেনা; পৌরুষত্ব ও যৌনতার বিশেষ সামাজিক –অর্থনৈতিক –সাংস্কৃতিক নির্মানই ধর্ষনকে সম্ভব করে তোলে। এভাবেই এটি পুরুষের আচরনের অংশ হয়ে উঠেছে, পুরুষের কাছে মানসিকভাবে বৈধতা পেয়ে গেছে। সুদীর্ঘকাল ধরে চলে আসা পুরুষের আধিপত্যবাদী সমাজ কাঠামোর কারনে পুরুষ যে আচরনে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে সেটির কারনেই এটি সম্ভব হয়েছে। ধর্ষক, খুনি, নির্যাতকেরাও এই সমাজের প্রতিনিধি হিসেবেই এই আচরন রপ্ত করেছে আরো নিষ্ঠুরভাবে। যুগ যুগ ধরে একই নিয়ম চলে আসার কারনে এই আচরন সে স্বাভাবিকভাবে নিয়ে আত্মস্থ করেছে। এর পিছনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে পুরুষের আধিপত্যকামী সংস্কৃতি; যা পুরুষেরাই তৈরি করেছে নারীকে অধীনস্ত করার মানসিকতা থেকে। এই সংস্কৃতির বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবেই পুরুষ নারীর শরীরকে দখল করেছে, একে যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করেছে, নির্যাতনের যাঁতাকলে অসহনীয় করে তুলেছে।

দেখা যাচ্ছে, প্রাচীন সমাজেও পুরুষেরা তাদের বীরত্বের প্রদর্শনপূর্বক বিকৃত কামনা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে নারীর উপর নিপীড়ন চালাতো; আজকে সময় ও অবস্থার পরিবর্তন হলেও সেই মানসিকতা অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। কিংবা বলা যায়, সমাজ –রাষ্ট্রে সেই বস্তুগত উপাদানগুলো এখনো বিদ্যমান বলেই এখনো নারীরা পুরুষের দ্বারা যৌনসন্ত্রাস ও ধর্ষনের শিকার হচ্ছে। উপরন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে এই সকল ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার না হওয়ার ফলে এই ধরনের প্রবনতা আরো প্রকট আকার ধারন করছে।

ধর্ষন কিংবা যৌনসন্ত্রাস রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক নিয়ন্ত্রনের একটা রুপবিশেষ। যে পুরুষ যৌননির্যাতন করে তাতে শক্তিপ্রদর্শনের বিষয়টিই প্রধান হয়ে ওঠে। ধর্ষনের মধ্য দিয়ে পুরুষের এই বিকৃত মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ ঘটে থাকে। যৌনসম্পর্কের এই প্রক্রিয়ার মধ্যে ‘ক্ষমতার’ই প্রতিফলন ঘটে। ক্ষমতার এরকম যৌনকরণ চূরান্তভাবে পুরুষকে নারী হত্যায়ও প্ররোচিত করে। ধর্ষন ও ধর্ষন পরবর্তি হত্যা স্বাভাবিক কোন নারী নির্যাতন বিবেচনা করা যায় না। আধিপত্যকামী সমাজব্যবস্থা এর মধ্য দিয়ে আধুনিক সমাজে ‘পৌরুষত্ব’কে নির্মাণ করে। অপরদিকে নারীরা যে অধস্তন, অসহায়, ক্ষমতা কাঠামোর বাইরের বিষয় সেই অবস্থানও এর মধ্য দিয়ে নির্ধারিত হয়।

৫.
“মাতৃ –অধিকারের উচ্ছেদ হচ্ছে নারীদের বিশ্ব ঐতিহাসিক পরাজয়”। -ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস এই কথা বলে, আরো বলেছেন, “পুরুষদের একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েমের মাধ্যমে পিতৃপ্রধান পরিবারের একটি উদীয়মান মধ্যবর্তি রুপ তৈরি হলো”। এর পরের ইতিহাস আমরা জানি –পুরুষ গৃহস্থালীর কতৃত্বও দখল করলো, নারী হলো পদানত, শৃঙ্খলিত, পুরুষের লালসার দাসী, সন্তানসৃষ্টির যন্ত্রমাত্র। নারীদের এই অবনত অবস্থা যা বিশেষভাবে ততকালীন বীর যুগের এবং ততোধিক চিরায়ত যুগের গ্রীকদের মধ্যে পরিস্ফূট হয়েছিলো, পরিস্ফুটিত হয়েছিলো মহাভারতে; নানা মহাকাব্যে –উপাখ্যানে। তাকেই ধীরে ধীরে পোলিশ করে এবং কিছুটা রুপান্তর করে মোলায়েম করা হয়েছে; আধুনিক যুগে সভ্যতার এত অগ্রগতি সত্বেও তা মোটেই লুপ্ত হয়নি”।

‘ধর্ষকের মন’ তৈরির বস্তুগত উপাদান আমাদের সমাজ- রাষ্ট্রে এখনো বিদ্যমান; খুব ভালভাবেই বিদ্যমান। এ কারনেই ধর্ষক ও যৌনসন্ত্রাসের বিষয়টা শুধু ব্যক্তিক নয়; একে ঐতিহাসিকভাবে –সামাজিকভাবে –অর্থনৈতিকভাবে –সাংস্কৃতিকভাবে বিচার করতে হবে। বর্ষবরনে সংঘবদ্ধ যৌনসন্ত্রাস; ইয়াসমিন, কল্পনা চাকমা, তনু কিংবা আফসানা এরকম হাজারো নারীকে ধর্ষন –আমাদের এই সমাজ ব্যবস্থার আধিপত্যবাদী ক্ষমতাকাঠামোর উগ্র প্রতিফলন। এই সকল অনাচারের বিরুদ্ধে যেমন সোচ্চার হতে হবে, তেমনি সকল খুনি, ধর্ষককে বিচারের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি আমরা তৈরি করেছি, সেখান থেকে বেরিয়ে এসে সমাজে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। এখানেই থেমে থাকলে চলবে না, সমগ্র এই কাঠামোটিকে ভেঙ্গে ফেলতে হবে। সম্পূর্ন নতুন একটি ‘মানুষের সমাজ’ নির্মানের লড়াইয়ের জন্য সর্বাত্বক প্রস্তুতি নিতে হবে।

‘এঙ্গেলস’ যেভাবে ভেবেছিলেন, সেই রকম একটা সমাজ নির্মান করতে হবে। যে সমাজে- “নতুন ধরনের মানুষ তৈরি হবে। যে সমাজের পুরুষদের কখনো টাকা বা অন্য কোন সামাজিক ক্ষমতা দিয়ে কোন নারীকে খরিদ করার কারণ থাকবেনা। ভয় দেখিয়ে, জোর খাটিয়ে কিংবা অন্য কোন কৌশল অবলম্বন করে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করার প্রয়োজনীয়তা থাকবেনা। আর এমন সব নারী যারা সত্যিকার প্রেমের অনুভূতি ছাড়া আর কোন কারনে পুরুষের কাছে আত্মদানে বাধ্য হবেনা। অথবা কোন সামাজিক ও অর্থনৈতিক ফলাফলের ভয়ে ভালবাসার মানুষের কাছে কাউকে আত্মদানে বিরত হতে হবেনা। যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন শুধু এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না যে, এই সম্পর্ক বৈধ বা অবৈধ; এই প্রশ্নও আবশ্যকীয় যে, সেটা পরস্পর ভালবাসা থেকে নাকি নয়। এই ধরনের সব লোক একবার আবির্ভুত হলেই তারা নিজেরাই চালু করবে নিজেদের আচার এবং ব্যক্তি আচরন বিষয়ে সামাজিক মত; যা তার সঙ্গেই মিলবে, ব্যস”।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “ধর্ষনের ঐতিহাসিক – সামাজিক প্রেক্ষাপট ও মুক্তির উপায়ঃ ভূমিকা পর্ব

  1. খুব ভাল লাগছে আপনি এ বিষয়ে
    খুব ভাল লাগছে আপনি এ বিষয়ে আলোকপাত করেছেন। এই সমাজে মানুষ হিসেবে নারীর অবস্থান বরাবরই পুরুষের নিচে- এভাবেই ভাবানো হয়। এই অবস্থা থেকে উত্তোরণের জন্য এখনো দীর্ঘ সংগ্রামের পথ পাড়ি দিতে হবে আমাদের সবাইকে। অনেক লেখা, অনেক শিল্প-সাহিত্য, অনেক মিছিল, অনেক স্লোগান দরকার।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

83 + = 91