“ছাত্রলীগের” নেতৃত্ব কেন এখন আবর্জনাদের দখলে

“ছাত্রলীগের” নেতৃত্ব কেন এখন আবর্জনাদের দখলে
সাইয়িদ রফিকুল হক

মহান ভাষাআন্দোলনের আগে যে-সংগঠনটির জন্ম হয়েছিলো তার নাম ‘ছাত্রলীগ’। ১৯৪৮ সালের ৪ঠা জানুআরি এই ঐতিহাসিক-সংগঠনটির জন্ম হয়। আর এর প্রতিষ্ঠাতা হলেন আমাদের স্বাধীন-বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
ছাত্রলীগপ্রতিষ্ঠার প্রায় দেড়-বছর পরে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী-সংগঠন বাংলাদেশআওয়ামীলীগ। বাংলাদেশের ইতিহাসে ‘ছাত্রলীগ’ ও ‘আওয়ামীলীগ’ অবিস্মরণীয় দুইটি নাম। ১৯৫২ সালের ভাষাআন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে এই দুইটি সংগঠনের অবদান চিরস্মরণীয়।
আগে আওয়ামীলীগ ও ছাত্রলীগ পরিচালিত হতো সমাজের সবচেয়ে অভিজাত, সম্ভ্রান্ত ও শিক্ষিত মানুষদের দ্বারা। এখানে, দেশপ্রেমিক মানুষের সমাবেশ ঘটেছিলো। আর এখন আওয়ামীলীগ ও ছাত্রলীগের সুবিশাল আদর্শবাদী কর্মীগণ ভণ্ডনেতাদের দৌরাত্ম্যে সীমাহীন দিশেহারা। মদীয় আজকের লেখা ছাত্রলীগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

পঞ্চাশের দশকে, ষাটের দশকে, সত্তরের দশকে, আশির দশকে, আর নব্বইয়ের দশকে ছাত্রলীগ ছিল এক আদর্শের নাম। এইতো আশি-নব্বইয়ের দশকে ছাত্রলীগ ‘স্বৈরাচারবিরোধী’ আন্দোলনে অসামান্য কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছে। আর এখনকার ছাত্রলীগ ছিনতাই হয়ে গেছে কতকগুলো বিবেকহীন-আদর্শহীন অমানুষের হাতে।

এখন ছাত্রলীগের নেতৃত্বে কারা?
বর্তমানে বাংলাদেশছাত্রলীগের কেন্দ্রীয়-নেতৃত্ব থেকে শুরু করে বিভাগীয় ও জেলাপর্যায়ের নেতৃবৃন্দ অযোগ্যতার মধ্য থেকেই নিজেদের নেতৃত্বলাভ করেছে। বর্তমানে দেশের জেলা-উপজেলা, থানাপর্যায়সহ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ-নামধারী একশ্রেণীর নিম্নস্তরের নেতৃত্ব পরিলক্ষিত হচ্ছে। আর দেশের সরকারি-বেসরকারি কলেজগুলোতেও ছাত্রলীগের নেতৃত্ব আদর্শহীন-ভণ্ডদের হাতে সমর্পিত হচ্ছে। এখানে, দেশের সর্বস্তরে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে কারা রয়েছে—তার একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা তুলে ধরা হলো:

১. ছাত্রলীগের নেতৃত্বে আত্মীয়তার ও স্বজনপ্রীতির ছাপ সুস্পষ্ট। এখানে, স্বার্থের জন্য অনেকেই এখন ভিড় জমাচ্ছে। আর তাদের ধারণা: যেকোনোভাবে যেকোনোস্থানে ছাত্রলীগের একটা নেতৃত্ব পেলে সারাজীবন বসে খাওয়ার মতো অবস্থা করে নেওয়া যাবে। আওয়ামীলীগের একশ্রেণীর ভণ্ডনেতা নিজেদের পছন্দমতো অযোগ্য, অদক্ষ, অথর্বকে বেছে নিচ্ছে ছাত্রলীগের নেতা হিসাবে। এদের উদ্দেশ্য ভালো নয়। এরা অর্থলোভী-নরপশু।
২. জামায়াত-শিবির থেকে দেদারসে লোকজন ছাত্রলীগে ঢুকে পড়ছে। এবং তারা সরাসরি নেতৃত্বও পেয়ে যাচ্ছে। কারণ, তাদের অর্থ আছে। এই অর্থলোভে আওয়ামীলীগের একশ্রেণীর ভণ্ডনেতা দেশের স্বার্থ বাদ দিয়ে নিজের স্বার্থে দেশবিরোধীসংগঠনের ক্যাডারদের ছাত্রলীগের নেতৃত্ব পাইয়ে দিচ্ছে।
৩. ভদ্রলোকের ও ভদ্রঘরের সন্তানরা এখন ছাত্রলীগের নেতৃত্বে যেতে পারছে না। তাদের হাতে নেতৃত্ব দেওয়া হচ্ছে না। তারা লবিংটবিং করতে পারছে না। কিংবা তাদের অর্থবিত্ত কম থাকায় তথাকথিত কাউন্সিলের সময় নিজেদের অবস্থার শোডাউন করতে পারছে না বলে—তারা বড় কোনো পদও দখল করতে পারছে না।
৪. স্বাধীনতাবিরোধীদের হাইকমান্ডের নির্দেশে এখন প্রচুর পরিমাণে জামায়াত-শিবিরের ক্যাডার ছাত্রলীগে ঢুকে পড়ছে। আর এদের অর্থ আছে বলে অর্থলোভে উন্মত্ত হয়ে আওয়ামীলীগের একশ্রেণীর দেশপ্রেমবর্জিত নেতা-নামধারী-নরপশু এদের দলে ঢুকিয়ে আবার তাদের নিকট থেকে মোটাঅঙ্কের উৎকোচগ্রহণ করে তাদের ছাত্রলীগের বড়-বড় পদও পাইয়ে দিচ্ছে। দেশের জেলা-কমিটি থেকে শুরু করে জেলার বিভিন্ন কমিটিতে এদের আধিপত্য সবচেয়ে বেশি।
৫. রাজধানী ঢাকা, দেশের সকল বিভাগীয় শহর ও জেলা-শহরসহ স্থানীয় সকল পর্যায়ে আওয়ামীলীগের একশ্রেণীর ভণ্ড-ষণ্ড-পাষণ্ড-প্রকৃতির নেতা নিজেদের আধিপত্যবিস্তারের লক্ষ্যে ও আধিপত্য ধরে রাখার স্বার্থে নিজেদের ‘ভাই-ভাতিজা-ভাগ্নে’ জাতীয় অসৎ, লম্পট, বদমাইশ ও চরিত্রহীন লোকদের এখন ছাত্রলীগে নিয়োগ করছে। আর এরাই এখন সমগ্র ঢাকা-শহরসহ সারা বাংলাদেশে শুধু নিজেদের স্বার্থে দেশবিরোধী চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, নারীধর্ষণ, ছিনতাই, মাস্তানি, পাতিমাস্তানি, ভণ্ডামি ইত্যাদি শয়তানী-কর্মকাণ্ডে নিজেদের নিয়োজিত করেছে। আর এই লম্পটশ্রেণী একমুহূর্তের জন্যও বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসেনি। এরা শুধু বিভিন্ন দিবসে লোকদেখানোভাবে মিটিং-মিছিল ও পুষ্পঅর্পণ করে নিজেদের আওয়ামীলীগার বা ছাত্রলীগার মনে করে থাকে। আসলে, এরা শুধু নিজেদের স্বার্থে ছাত্রলীগের নেতৃত্বদখল করেছে। ঢাকা-শহরে স্থানীয়ভাবে একশ্রেণীর হাজীপাজী এখন রাতারাতি আওয়ামীলীগের নেতা সেজে নিজেদের আখের গোছানোর ধান্দায় তাদের আগাছা-পরগাছা-জাতীয় আত্মীয়স্বজনকে ছাত্রলীগে ঢুকিয়ে সংগঠনের ভাবমূর্তি ভয়ানকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
৬. কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় বখাটে, লম্পট, অভদ্র, ইতর ও অসভ্য জাতীয় ছেলেছোকরা এখন ছাত্রলীগের নেতৃত্বদখল করার জন্য মরীয় হয়ে উঠেছে। এরা দেখছে, একবার কোনোরকমে ছাত্রলীগের একটা পদ পেয়ে গেলে আর পায় কে? তাহলে, তারা নিজেদের স্বার্থে সন্ত্রাস করে, দলের ক্ষতি করে, কর্মীদের লাঞ্ছিত করে নিজের আখের গোছাতে পারবে!
৭. নিম্নস্তরের ও নিম্নবংশের ছাত্র-নামধারী অনেক নরপশু এখন ছাত্রলীগের পতাকাতলে সমবেত হয়ে আওয়ামীলীগ কিংবা ছাত্রলীগকে ভালো-না-বেসে শুধু নিজের আখের গোছানোর জন্য ছাত্রলীগের নেতৃত্বদখল করার জন্য অপরাজনীতি করছে। আর এই অমানুষগুলোই দেশের বিভিন্নস্থানে খুন, ধর্ষণ, রাহাজানি, চাঁদাবাজিসহ যাবতীয় অন্যায়-অপকর্ম করার পরও নিজেদের একজন ছাত্রলীগার ভাবছে। আর এই নরপশুদের পিছনে রয়েছে আওয়ামীলীগ-নামধারী একজাতীয় নরপশু। এরা অর্থের বিনিময়ে যেকোনো খারাপ কাজ করতে দ্বিধা করছে না।
৮. বংশীয় ও ভদ্রপরিবারের সন্তানরা ছাত্রলীগ করলেও তারা নিম্নবংশের অজাত-কুজাতের সঙ্গে টিকতে না পেরে তারা ছাত্রলীগের নেতৃত্ব থেকে ছিটকে পড়ছে। আর এই সুযোগে দলের ভিতরে ভালোলোক থাকাসত্ত্বেও একশ্রেণীর অমানুষ এখন রাতারাতি ছাত্রলীগের নেতা হয়ে যাচ্ছে।
৯. জামায়াত-শিবিরের টাকাখাওয়া—মানে, জামায়াত-শিবিরের অর্থে লালিতপালিত নেতা-নামধারী আওয়ামীলীগের অনেক আবর্জনাই এখন নিজেদের নেতৃত্ব ঠিক রাখার পাশাপাশি ছাত্রলীগের পদবাণিজ্যে রমরমা-ব্যবসা করে যাচ্ছে। আর এদের মতো নষ্টচরিত্রের লোকদের কারণে ছাত্রলীগের ভিতরে এখন ভেজাল-নেতার আধিক্য।
১০. নিজের যোগ্যতায় এখন কারও ছাত্রলীগের নেতা হওয়ার কোনো সুযোগ নাই। তাই, পদলোভী, নেতৃত্বলোভী সর্বপ্রকার পাষণ্ড চেয়ে থাকে উর্ধ্বতন অসৎ-ঘুষখোর-নেতৃবৃন্দের দিকে। এরা ছাত্রলীগকে তার স্বমহিমা থেকে দিনে-দিনে টানতে-টানতে একেবারে খাদের কিনারে নিয়ে আসছে। আর এই ভণ্ডনেতৃত্বের ছাত্রলীগ বর্তমানে দেশের জন্য কোনো কাজ করতে পারছে না। এরা শুধুই আওয়ামীলীগের লেজুড়বৃত্তি করে ঐতিহ্যবাহীসংগঠনটির বোঝা ছাড়া আজ আর-কিছু নয়।

ছাত্রলীগের নেতৃত্ব কেন এমন হচ্ছে? এর মূল কারণ হলো:
১. এখানে, প্রকৃত-শিক্ষিতরা কোনো সুযোগ পাচ্ছে না। সর্বস্তরের টাউট-বাটপাড়-ভণ্ড এখন লাভের আশায় ছাত্রলীগের নেতৃত্বকে টার্গেট করে অপরাজনীতিতে শামিল হচ্ছে।
২. নিয়মিত বই পড়ে—এধরনের একজনকেও আজ ছাত্রলীগের নেতাদের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। যে-কর্মী বই পড়ে, এলাকার ভালো-ছেলে, ভদ্র, মার্জিত সে কখনও ছাত্রলীগের নেতা হতে পারছে না। কারণ, সে এই টাউটদের সঙ্গে টিকতে পারছে না।
৩. অনেকে এখন শুধু সরকারি-চাকরির আশায় ছাত্রলীগ করছে।
৪. এলাকায় নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখার জন্য অনেকেই ছাত্রলীগের নেতৃত্বও ধরে রাখার জন্য একেবারে মরীয়া। আর এই আবর্জনাশ্রেণীই এখন ছাত্রলীগের নামভাঙ্গিয়ে দেশের ভিতরে নানারকম গর্হিত-অপকর্মে লিপ্ত।
৫. যোগ্য-কর্মীদের নেতৃত্বে নিয়ে আসা হচ্ছে না।
৬. দেশপ্রেমিক-গ্রন্থপ্রেমিক-বঙ্গবন্ধুপ্রেমিকরা এখন ছাত্রলীগে নির্বাসিত। শুধু লোকদেখানো-ভণ্ডরা এখন সর্বত্র দাপটের সঙ্গে নিজেদের আধিপত্যবিস্তারে ব্যস্ত। আর এরা দেশের কাজ করবে কীভাবে?
৭. সত্যিকারভাবে আওয়ামীলীগ ও ছাত্রলীগকে ভালোবাসে এধরনের ছেলে-মেয়েদের সংখ্যা এখন খুবই কম। শুধু লাভের আশায় বেশির ভাগ ছেলে-মেয়েই এখন ছাত্রলীগ করছে।
৮. এখন যারা নামকাওয়াস্তে ছাত্রলীগ করছে—তাদের বেশির ভাগেরই একমাত্র টার্গেট হলো: পদ, পদবী আর যেকোনো কমিটিতে বড়সড় একটা নেতৃত্বের আসন।
৯. যোগ্যদের হাতে নেতৃত্ব তুলে দেওয়ার মতো মনমানসিকতা নেই এইসব নামকাওয়াস্তে নিয়োজিত ছাত্রলীগারদের। আর এই নরপশুরাই এখন নিজেদের মধ্যে স্বার্থের কারণে গ্রুপিংয়ে ব্যস্ত।
১০. প্রকৃত-শিক্ষিত ও প্রকৃত-মেধাবী ছেলে-মেয়েরা এখন ছাত্রলীগে একেবারে উপেক্ষিত।

ছাত্রলীগের নেতৃত্ব বর্তমানে ছিনতাই হয়ে গেছে কতকগুলো স্বার্থপর, ভূঁইফোঁড়, অর্বাচীন পাষণ্ডের হাতে। এরা এখন বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাদ দিয়ে যার-যার নিজেদের বংশীয় অপআদর্শধারণ করে নিজেদের স্বার্থের ছিনতাই, রাহাজানি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ যাবতীয় অপকর্মে লিপ্ত। আর ভণ্ডশ্রেণীর নেতৃত্ব দেশে জঙ্গিবাদবিরোধী কোনো ভূমিকাও রাখতে পারছে না।
দেশের স্বার্থে এখনই ভেবে দেখা দরকার—ঐতিহ্যবাহী-ছাত্রলীগের নেতৃত্ব এখন কাদের হাতে? আর কেনইবা এমনটি হচ্ছে। জাতির বৃহত্তর স্বার্থে ঐতিহ্যবাহী-ছাত্রলীগকে তার স্বমহিমায় ফিরিয়ে এনে এদের জঙ্গিবিরোধী কাজে নিয়োজিত করা উচিত।

সাইয়িদ রফিকুল হক
মিরপুর, ঢাকা, বাংলাদেশ।
১৮/০৮/২০১৬

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on ““ছাত্রলীগের” নেতৃত্ব কেন এখন আবর্জনাদের দখলে

  1. আমি ছাত্রলীগের একজন কর্মী।
    আমি ছাত্রলীগের একজন কর্মী। আমার ব্যক্তিগত মতামত আপনার লেখার সাথে পুরোপুরি মিলে যাচ্ছে। অনেক সুন্দর করে লিখেছেন। অনেক ধন্যবাদ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

18 − = 11