রাজনীতি এখন কারও-কারও কাছে কেন বেশ্যানীতি (প্রথম পর্ব)

রাজনীতি এখন কারও-কারও কাছে কেন বেশ্যানীতি (প্রথম পর্ব)
সাইয়িদ রফিকুল হক

১৯৪৭-৪৮-এর রাজনীতি ছিল বাংলার ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা আদর্শিক রাজনীতি। এরপর ১৯৪৯ সাল থেকে বাঙালির নিজস্ব একটি সংগঠনের যাত্রা শুরু হয়। আর এসবের মূল-উদ্দেশ্য ছিল দেশসেবা। আমাদের দেশে পঞ্চাশের দশকে, ষাটের দশকে, আর সত্তরের দশকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত সুস্থধারার রাজনীতির প্রচলন ছিল। এসময় যারা রাজনীতি করতেন তাঁরা ছিলেন দেশের সূর্যসন্তান। একমাত্র দেশই ছিল এদের ধ্যান-জ্ঞান। তবে এসময় যে গোলাম আজম, সবুর খান, মোনায়েম খান ও এজাতীয় আগাছা ও আবর্জনা ছিল না—তা কিন্তু নয়।
আর এখনও দেশে কিছুসংখ্যক আদর্শবাদী রাজেনৈতিক নেতা রয়েছেন। যাঁরা রাজনীতি শিখে রাজনীতি করতে-করতেই বড় হয়েছেন। আর তাঁরা নিজেদের ইমেজেই এখন রাজনৈতিক ক্ষেত্রে স্থায়ীআসন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন। আর তাঁরা রয়েছেন বলেই এখনও বাংলাদেশটা আমাদের বাংলাদেশই রয়েছে। এছাড়াও আমাদের দেশের অনেক কর্মী-সমর্থক এখনও সৎ রয়েছেন। কিন্তু অনেকের নেতৃত্বের ক্ষেত্রে দেখা দিয়েছে একরকম ভয়ানক আদর্শহীনতা। আর এর থেকেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে সৃষ্টি হচ্ছে অপরাজনীতি আর রাজনীতির নামে বেশ্যানীতি।

ভারতীয় উপমহাদেশে রাজনীতির সবচেয়ে নিষ্ঠুর ও পাষণ্ড খলনায়ক হলো পাকিস্তানের শয়তানপুত্র জিন্না। তার হাতেই ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতিতে সর্বপ্রথম আনুষ্ঠানিক দুর্বৃত্তায়ন ঘটে। এরপর বাংলার অনেক আগাছা রাষ্ট্রক্ষমতাদখলের স্বার্থে ও রাজনীতিতে টিকে থাকার কৌশলগত কারণে বাংলাদেশে রাজনীতির নামে একপ্রকার বেশ্যানীতির জন্ম দিতে থাকে। মূলত সামরিক-সরকারের ছত্রচ্ছায়ায় গড়ে ওঠা রাজনৈতিক দলগুলোতে রাজনীতির বদলে বেশ্যানীতির আধিক্য ঘটতে থাকে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনেকেই রাজনীতি না-বুঝে কিংবা বুঝেও নিজেদের স্বার্থে একপ্রকার বেশ্যানীতির জন্ম দিয়ে জনগণের মধ্যে বিষবাষ্প বা জীবাণুবাহী-ভাইরাসের জন্ম দিচ্ছে। আর এই শ্রেণীটি কখনও-কোনোদিন রাজনীতি বেঝেনি, রাজনীতি শেখেনি, আর কখনও রাজনীতি করেনি। কিন্তু এরা জোরপূর্বক বন্দুকের নল দিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতাদখল করা-সহ সাধারণ মানুষের ‘মগজ-ধোলাই’ করে অপরাজনীতির ধারক-বাহক হতে কালবিলম্ব করেনি। আর এই শ্রেণীটির পথিকৃৎ সামরিকজান্তা জিয়াউর রহমান। তার হাতেই সর্বপ্রথম বাংলাদেশের রাজনীতি কলুষিত হতে থাকে। তার নীতি ছিল এজিদের মতো। আর তার চরিত্র ছিল মীরজাফরের মতো। বাংলার এই মীরজাফর রাজনীতি বুঝতো না। কিন্তু রাষ্ট্রক্ষমতা বুঝতো। আর সে রাজনীতির নামে শঠতা বুঝতো। তাই, ১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনে তার সরাসরি হস্তক্ষেপ রয়েছে। আর এই সময় তৎকালীন সেনাপ্রধান একজন অথর্ব মেজর জেনারেল কেএম শফিউল্লাহ—রায়দুর্লভ আর ইয়ার লতিফদের মতো কাজ করেছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রথম ও সর্বাপেক্ষা কুখ্যাত বেশ্যা হলো খন্দকার মোশতাক আহমেদ। এর অনুসারীরা এবং এর দেখাদেখি বাংলাদেশের অনেক রাজনৈতিক নেতা-নামধারী নরপশু একরাতের মধ্যে বেশ্যার মতো লাভের আশায় খন্দকার মোশতাকের দলে নাম-লিখিয়ে নিজেদের আখের গোছানোর কাজে নেমে পড়েছিলো। সেই থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একপ্রকার বেশ্যানীতির উদ্ভব ঘটে। আর পরবর্তীকালে এর ধারক-বাহকগণ হলো: একজন জিয়াউর রহমান, মশিউর রহমান যাদুমিয়া, রাজাকার শাহ আজিজ, গোলাম আজমগং, লে. জেনারেল এরশাদ ইত্যাদি।

বেশ্যার কোনো ধর্ম নাই। সে অর্থের বিনিময়ে যে-কাউকেই তার দেহদান করতে পারে। এক্ষেত্রে তার কাছে কারও-কোনো সম্পর্কের পিতা-পুত্র, ভাই-ভাগ্নে, চাচা-ভাতিজা ইত্যাদি দেখার কিছুই নাই। বেশ্যার চাই অর্থ আর অর্থ। তাই, সে যে-কারও কাছে দেহদান করতে কুণ্ঠাবোধ করে না। জীবনে বেঁচে থাকার জন্য তার চাই কিছু অর্থ। জীবন ও জীবিকার স্বার্থে অনেকেই মনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বেশ্যাবৃত্তি করছে। কিন্তু আমাদের দেশের আজকের রাজনীতিতে অনেকেই এখন বুঝেশুনে, দেখেশুনে, আর জেনেশুনে রাজনীতির নামে দেশজুড়ে বেশ্যাবৃত্তি করছে। আর এদের উপদ্রবেই আজ বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থান। এদের কাপুরুষোচিত ভূমিকা ও অপরাজনীতির কারণে দেশটা যে উচ্ছন্নে যেতে বসেছে—সেদিকে এদের কারও কোনো খেয়াল নেই। এরা শুধু বেশ্যার মতো দু’হাতে অর্থউপার্জনের জন্য দিনের-পর-দিন মরীয়া হয়ে উঠেছে। এই দেশে রাজনীতির ডামাডোলে অনেক বেশ্যাও রাজনীতি করে এমপি-মিনিস্টার পর্যন্ত হয়েছে। অথচ, এদের অনেকেরই পুরাতন ও বংশীয় পদ ও পদবী হলো: মৎসবিক্রেতা, গোরখোদক, পাক-হানাদারবাহিনীর মুরগীসরবরাহকারী, আর পাকিস্তানের চিহ্নিত-দালাল। এরা এখনও বাংলাদেশের রাজনীতিতে অস্থিরতার জন্ম দিচ্ছে। আর এরা এখনও রাজনীতির নামে আমাদের স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশে সক্রিয়।

বাংলাদেশের রাজনীতি এখনও কারও-কারও কাছে কেন বেশ্যানীতি—তা এখানে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:

১. যেকোনো-একটা দলে ঢুকে একটা বড়সড় বা মাঝারি-আকৃতির পদ ও পদবী দখল করতে পারলেই বিরাট লাভ। এর ফলে তার জীবনে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে বিবিধ আয়-রোজগারের পথ খুলে যাবে। শুধু অর্থোপার্জনের জন্য একশ্রেণীর নরপশু ১৯৭৫ সালের পর দেশবিরোধী নতুন-নতুন অপরাজনৈতিক দলে নিজেদের নাম-লিখিয়ে রাতারাতি একেকজন ‘খানে সবুর’ হওয়ার প্রচেষ্টা চালায়।
২. অনেকেই রাজনীতি না-শিখে কিংবা না-বুঝেই নতুন রাজনৈতিক দলগুলোতে যোগদান করতে থাকে। সম্পূর্ণ লাভের আশায় এরা জিয়া-এরশাদের নবসৃষ্ট দেশবিরোধী অপরাজনৈতিক দলে নিজেদের নামলখিয়ে নিজেকে ধন্য মনে করতে থাকে। লাভের আশা ছাড়া জিয়া–এরশাদের দলে এদেশের একটা মানুষও যোগদান করেনি। আর ষোলোআনা লাভের আশায় হন্যে হয়ে এদেশের নষ্ট-পচা-গলা বামপন্থী অনেক নেতা-কর্মীও জিয়ার দলে যোগদান করে দেশউদ্ধার করতে চেয়েছে! এরা এমনই বেশ্যা যে, নিজেদের লাভের কারণে বাংলাদেশটাকে ধ্বংস করতে একমুহূর্তও বিলম্ব করেনি। এদের জন্যই দেশের আজ এই দুরাবস্থা।
৩. সদ্যো-স্বাধীন দেশে রাতারাতি নেতা হওয়ার বাসনা অনেকের মধ্যেই সৃষ্টি হয়েছিলো—আর তারাই কোনোপ্রকার চিন্তাভাবনা না করে বঙ্গবন্ধুর মতো জাতীয় নেতাকে অবজ্ঞা করে আর তাকে ভারতীয় দালাল আখ্যায়িত করার মতো ধৃষ্টতাপ্রদর্শন করে জিয়ার দলে নামলেখানো এই পাতিনেতাগুলো নিজেদের বেশ্যানীতি সমানে চালিয়ে যেতে থাকে। এরা রাতারাতি একেকজন হয়ে ওঠে এমপি-মিনিস্টার—আর আরও কতকিছু। এদের মনোরঞ্জনের জন্য সামরিকজান্তা জিয়াউর রহমান সবসময় সাজিয়েগুছিয়ে রাখে রাষ্ট্রীয়-প্রমোতরী ‘হিজবুল বাহার’।
৪. একজন পাপিষ্ঠ-সামরিকজান্তা জিয়ার মুখে সবসময় ছিল ‘মানি ইজ নো প্রবলেম!’ আর এই টাকার লোভেই আর প্রমোদতরী ‘হিজবুল বাহারে’ কয়েকদিন খুব আয়েশ করে কাটিয়ে এসে সে সময়কার অনেকেই আজকের ছাত্রদলে ও বিএনপিতে নাম-লেখাতে কোনো দ্বিধাবোধ করেনি। এরা চোখের সামনে শুধু লাভ আর লাভ দেখেছে।
৫. এখনও লাভের আশায় একদল অমানুষ নিজেদের ব্যবসাবাণিজ্যের পাশাপাশি রাজনীতি-ব্যবসাও করে যাচ্ছে। এরাও সেইসব বেশ্যার মতো! এদের চোখে-মুখে শুধু লাভ আর লাভ! আর সেই লাভ ও লোভের আগুনে পুড়ে নিজেদের স্বার্থহাসিলের খেলায় এরা দেশ ও জাতিকে ভোগাচ্ছে আর পোড়াচ্ছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই বেশ্যাশ্রেণীটি সর্বাপেক্ষা ক্ষতিকর-জীব।

(চলবে)

সাইয়িদ রফিকুল হক
মিরপুর, ঢাকা, বাংলাদেশ।
১৯/০৮/২০১৬

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “রাজনীতি এখন কারও-কারও কাছে কেন বেশ্যানীতি (প্রথম পর্ব)

  1. বেশ কয়েক বছর আগে
    বেশ কয়েক বছর আগে নিউজিল্যান্ডে বিভিন্ন পেশার র‍্যাংকিং-এ রাজনীতি বেশ্যাবৃত্তিরও নীচে স্থান পায়। তার আগে প্রতি বছর রাজনীতি থাকত বেশ্যাবৃত্তির ঠিক উপরে। উল্লেখ্য, নিউজিল্যান্ড দুনিয়ার সবচেয়ে সুষ্ঠ ও স্বচ্ছ ভাবে পরিচালিত দেশগুলোর একটি।
    তবে রাজনীতি দুনিয়ার সবচেয়ে কঠিন পেশা এটা স্বীকার করতেও দ্বিধা নেই। আমরা যেখানে সম-মনের ৫-১০জন মিলে একটা প্রজেক্ট শুরু করে দু’দিন পর মারামারি শুরু করে দেই, সেখানে হাজার ভাবনার লাখ-লাখ, কোটি-কোটি মানুষের মন যোগানো কতটা কঠিন আন্দাজ করা কঠিন না।

    1. মানুষের মন যোগানোকে গুরুত্ব
      মানুষের মন যোগানোকে গুরুত্ব দেয় বলেই রাজনীতিকে বেশ্যাবৃত্তির চেয়েও খারাপ মনে করা হয়। রাজনীতি হওয়া হওয়া উচিত মানুষের কল্যানমূখী। কল্যানমুখী রাজনীতি মানুষ এমনিতেই গ্রহন করবে।

      1. সমস্যা হচ্ছে — আমার কাছে যা
        সমস্যা হচ্ছে — আমার কাছে যা কল্যান, তা আরেকজনের কাছে কল্যান নাও হতে পারে। মানুষের/দেশবাসীর কল্যানের নামে রাজনীতি করেছে মুসোলিনী, হিটলার, স্ট্যালিন, মাও প্রমুখ বড় বড় নেতা/রাজনীতিবিদ। ফলাফল আমরা জানি। অন্যদিকে ইউরোপীয়, উত্তর আমেরিকান, অস্ট্রেল-এশীয় ও অন্যান্য উদারবাদী দেশে রাজনীতিকরা জনগণের চাওয়াকে বাস্তুবায়িত করতে চেষ্টা করেন এবং সে কারণে তারা বেশ্যাবৃত্তির সমতূল্য গণ্য হন।

  2. এই লেকায় বার বার “জিয়ার দল”
    এই লেকায় বার বার “জিয়ার দল” শব্দটা বলেচেন। খূদ আওয়ামীলীগের নেতা পাতিনেতারা চর্ব্য চোষ্য লেহ পেয় কুনোটাই বাদ রাকচেন না। বিম্পি যাত্রাপাটি জামাতে হাইব্রীট কয়ডা? আওয়ামীলীগের হাইব্রীটেরা যত না মাথা ঝুকাইয়া দিচে তারচে ধান্দাবাজ নেতারা তাগোরে জামাই আদরে ডাইকা নিচে। এই উফশী নেতাগোর নাম না নিয়া জিয়ার দল নিয়া টানাটানি কর্লে একটু চোক টাঁটায়। একচোকা লাগে!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

43 − = 42