মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ্ – একজন অন্যরকম মুক্তিযোদ্ধা

১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন তীব্রতর হলে ২১ ফেব্রুয়ারী ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক ছাত্র-জনতা সমাবেত হল সেদিন। ১৪৪ ধারা ভাঙ্গবে। ক্যাম্পাসের বাইরে পুলিশের গুলি তাঁক করা। বেরিয়ে এলেই গুলি করা হবে। তখন সমাবেশে সিদ্ধান্ত হলো দশজন দশজন করে মিছিল বের করবে। প্রথম ব্যাচে কারা যাবে, হাত তুলতে বলা হলো। মাত্র আটটা হাত উঠলো। এদের মধ্যে ছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছাত্র একজন, যার নাম মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ্। বাড়ি ফেনী জেলার মজুপুর গ্রামে। বেড়ে উঠেছেন কলকাতায়। দেশভাগে এপারে চলে এসেছেন। এর আগেও ১৯৪৫-এ ভিয়েতনাম দিবসে মিছিল করে জেলে যেতে হয়েছে।

অন্য অনেকে পুলিশের গুলিতে শহীদ হলেও জহিরুল্লাহ্ সেদিন প্রথম দশজনের সাথে মিছিলে গিয়েও বেঁচে গিয়েছিলেন। তবে সেদিন পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। তার বছরখানেক পর কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান করেন। বড় ভাই শহীদুল্লাহ্-ও কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন, পাশাপাশি সাংবাদিকতা করতেন, গল্প-উপন্যাসও লিখতেন।

জহিরুল্লাহ্ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় অনার্স করেন। মাস্টার্সেও ভর্তি হয়েছিলেন। সাংবাদিকতায় ঢুকে পড়ে প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে বেশিদিন ছিলেন না। বামপন্থী রাজনীতির প্রতি দুর্বলতা রয়ে যায়। নিয়মিত কমিউনিস্ট পার্টিতে চাঁদাও দিতে বলে জানা যায়।

এসময় চলচিত্র নির্মানে এসে পাকিস্তানের প্রথম রঙ্গীন সিনেমা ‘সঙ্গম’ -এর পরিচালনা করেন তিনি। এর মাঝে কয়েকটি বাংলা ছবিও নির্মান করেন। কয়েকটা উপন্যাস লিখেও জহিরুল্লাহ্ তখন জনপ্রিয় ব্যাক্তি।

৭১-এর উত্তাল সময়ে অন্যান্য পরিচালকরা যখন নিজেদের ফিল্মের প্রিন্ট বিক্রি করে আর্থিক সাচ্ছল্য আনতে সচেষ্ট, ঠিক তখন জহিরুল্লাহ্ তার ‘জীবন থেকে নেয়া’র ভারতে বিক্রয়লব্ধ সমুদয় অর্থ বাংলাদেশ সরকারকে দান করেন নিজের অর্থকষ্ট থাকা সত্ত্বেও। ঘরে স্ত্রী সুচন্দা জ্বরে অজ্ঞান, বড় ছেলে অপুও অসুস্থ। তিনি ঘরে নেই। স্টুডিওতে। রাত নেই, দিন নেই, ঘুম নেই- ‘স্টপ জেনোসাইড’ তৈরি করেছেন। তখনো তিনি জানতেন বাংলার স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রচারই যথেষ্টভাবে হচ্ছে না।

‘স্টপ জেনোসাইড’ বানানো শেষ করে কমিউনিস্ট পার্টির সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলেন। চলে গেলেন কলকাতায়, সেখানে আওয়ামী লীগ প্রধান সরকারের রোষানলে পড়েন। তার সেক্টরে যাতায়াত সীমিত করা হয়। সরকার থেকে পশ্চিমবঙ্গে সেন্সর বোর্ডকে ‘স্টপ জেনোসাইড’-এর ছাড়পত্র না দিতে অনুরোধ করেন। কারণ প্রথমত এ ছবিটি লেনিনের কোটেশন দিয়ে শুরু এবং আন্তর্জাতিকতার সুরে শেষ। এ ছাড়াও ছবিটিতে সরাসরি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা রয়েছে- এ দিকে আওয়ামী নেতারা তখনো কামনা করছেন মার্কিন সাহায্য। এদিকে জহিরুল্লাহ্ মার্কিনবিরোধী হলেও তখনকার চীনের ভূমিকাকে সমর্থন করতেন না। তিনি কোন মাওবাদী উপদলেও যোগ দেননি। তিনি চেয়েছিলেন দীর্ঘ জনযুদ্ধ হোক, চীন কিংবা মার্কিনীদের কারো সাহায্য নিয়ে দ্রুত স্বাধীনতা না। শোনা যায় স্টপ জেনোসাইডের প্রথম প্রদর্শনী হয় এক অজ্ঞাত স্থানে, যেখানে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রিপরিষদের সদস্যবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য বিশ্বব্যাপী জনমত তৈরি করার ক্ষেত্রে স্টপ জেনোসাইড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে এখন পর্যন্ত নির্মিত ছবিগুলোর মধ্যে শিল্পগত ও গুণগত সাফল্যের দিক থেকে এই চলচ্চিত্রটিকে শীর্ষে স্থান দেওয়া হয়ে থাকে।

এছাড়াও যুদ্ধের সময় কলকাতায় তার নির্মিত চলচ্চিত্র জীবন থেকে নেওয়ার বেশ কয়েকটি প্রদর্শনী হয় এবং চলচ্চিত্রটি দেখে সত্যজিত রায়, মৃণাল সেন, তপন সিনহা এবং ঋত্বিক ঘটক প্রমুখ ভূয়সী প্রশংসা করেন।

জহিরুল্লাহ্ নামের এই চলচিত্রকার আসলে জহির রায়হান নামে পরিচিত এখন। কমরেড মনি সিংহ তাকে ‘রায়হান’ নামটা দিয়েছিল পঞ্চাশের দশকের গোড়ায়। তার বড় ভাই শহীদুল্লাহ্ কায়সারকে স্বাধীনতা যুদ্ধের শেষদিকে ১৪ ডিসেম্বর কুখ্যাত আল-বদর বাহিনী কর্তৃক নিজ বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।

” width=”400″ />

বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরে জহির রায়হান ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর ঢাকা ফিরে আসেন। ফিরে এসে শুনলেন অগ্রজ শহীদুল্লাহ কায়সার নিখোঁজ। তিনি পাগলের মতো তাকে খুঁজে বেড়াতে লাগলেন। সাংবাদিক সম্মেলনে দৃপ্ত কন্ঠে বললেন, “বুদ্ধিজীবী নিধনের পেছনে এক আন্তর্জাতিক চক্রান্ত আছে এবং এই চক্রান্তের সমস্ত রহস্য তিনি অচিরেই ভেদ করবেন।” তার উদ্যোগে বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন- কমিটি গঠিত হয়। তিনি নিজে তদন্তের কাজে নেমে পড়েন। এমনি সময়ে কোনো একটি সূত্র থেকে সংবাদ পেলেন শহীদুল্লাহ কায়সার জীবিত অবস্থায় মিরপুরে আটক হয়ে আছেন। জহির রায়হান ৩০ জানুয়ারি সার্চ পার্টির সঙ্গে মিরপুরে যান। এরপর তার আর কোনো সংবাদ পাওয়া যায়নি। নিখোঁজ ভাইকে খুঁজতে গিয়ে তিনি নিজেই চিরকালের জন্যে নিখোঁজ হয়ে গেলেন।

আজ জন্মদিন জহির রায়হানের জন্মদিন। বেঁচে থাকলে আজ তাঁর বয়স হতো ৮১ বছর। তিনি বেঁচে আছেন তার কর্ম দিয়েই।

জহির রায়হানের প্রথম প্রকাশিক কবিতা, ‘ওদের জানিয়ে দাও’। কবিতাটিঃ
ওদের জানিয়ে দাও
ওরা আমার ভাইবোনকে
কুকুর বিড়ালের মত মেরেছে।
ওদের ষ্টীম রোলারের নীচে…

ওদের জানিয়ে দাও।
ওরা দেখেও যদি না দেখে
বুঝেও যদি না বুঝে
আগুনের গরম শলাকা দু’চোখে দিয়ে

ওদের জানিয়ে দাও,
মরা মানুষগুলোতে কেমন জীবন এসেছে।

রেফারেন্সঃ
১. গুণিজন ডট কম http://www.gunijon.com/2460248924952480-248024942527248924942472.html
২. সামহয়্যার http://www.somewhereinblog.net/blog/Arahf09/30009989
৩. https://amin20002000us.wordpress.com/2015/08/19/%E0%A6%9C%E0%A6%B9%E0%A6%BF%E0%A6%B0-%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A7%9F%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A6%A8-%E0%A6%93-%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%9F%E0%A6%AA-%E0%A6%9C%E0%A7%87%E0%A6%A8%E0%A7%8B%E0%A6%B8%E0%A6%BE/

৪. রাজীব নুরের ব্লগ http://www.somewhereinblog.net/blog/rajib128/29628575

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 5 = 11