ভাইফোঁটা

সামাজিক প্রয়োজনে বা সামাজিক সুসম্পর্ক বজায় রাখার জন্য কতগুলো সামাজিক বিধানের উপর শাস্ত্রীয় সিলমোহর লাগানর প্রয়োজন হয়। ভাইফোঁটা তেমনি এক সামাজিক পর্বের নাম।

পুরাণে উল্লেখ আছে যম ও যমুনা হলেন সূর্যের ছেলে ও মেয়ে। কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয় তিথিতে যমুনা তার ভাই যমকে নিজের বাড়িতে খাওয়া-দাওয়া করার আমন্ত্রন জানান। যমরাজ সেইদিন তার বোন যমুনার বাড়িতে খেয়েছিলেন বলে সেই তিথির নাম ভ্রাতৃদ্বিতীয়া বা যম-দ্বিতীয়া। সেই ঘটনা উপলক্ষে শাস্ত্র পুরাণ বার বার বলে যে এই দিনে ভাইয়েরা কেউ নিজেদের বাড়িতে খাবেন না। এই দিনটি তারা বোনদের বাড়ির রান্না খাবেন। বলা হয়েছে- স্নেহেন ভগিনীহস্তদ্ ভত্তব্যং পুষ্টিবর্ধনম্।

এই দিনটিতে বোনদের জন্য ভাইয়েরা নানান উপহার সহ সোনা গহনা, কাপড় ইত্যাদি নিয়ে যাবেন। পুরাণ বলছে এই সমস্ত দিনটি বোনদের। এই দিনে তাদের প্রীতি ঘটাতে হবে যে ভাবেই হোক। যদি নিজের বোন না থাকে তবে চাচাতো, মামাতো, ফুফাতো এমনকি বন্ধুর বোন বা পাতানো বোনদের যোগ্য সমাদর করতে হবে এবং তাদের বাড়িতে খাবে।এই ক্ষেত্রে বলা হয়েছে- সর্বা ভগিন্যঃ সম্পূজ্য অভাবে প্রতিপত্তিগাঃ।
শাস্ত্রে উল্লেখ আছে এই দিনটি সম্পূর্ণ বোনদের এবং আদর যত্ন, উপহার সব বোনদের প্রাপ্য। কিন্তু নামটি হয়েছে যমরাজের নামে। এর মূল কারন যমরাজ মৃত্যুর দেবতা হলেও ভাইয়ের দীর্ঘায়ু কামনা করে যমুনার মুখ দিয়ে উচ্চারিত হয়েছে বিশেষ মন্ত্র। এতে অবশ্য কিছুটা পুরুষত্রন্ত্রের ঘ্রাণ বিদ্যমান।

ভাইফোঁটার এই রীতিটি পুরোপুরি শাস্ত্রীয় বিধান না হয়েও সামাজিক বিধানের মর্যাদা পেয়েছিলো। তাই ভাই বোনদের নির্মল সম্পর্কটি সবচেয়ে বড় কথা। আগে বোনদের বিয়ে হয়ে যেতো দূরদূরান্তে। শ্বশুরবাড়ি চাপে বাপের বাড়ি ফেরা হত কদাচিৎ। তখন পুরাতন সমাজব্যবস্থা চমৎকার এই ভাইফোঁটার ও আনুসাঙ্গিক রীতি প্রচলন শুরু করে। দুর্গা পূজোর দিনগুলো মেয়েরা বাপের বাড়িতে কাটাবে। তারপর পূজো কাটিয়ে শ্বশুরবাড়িতে ফিরে গিয়ে লক্ষ্মী পূজোয় যোগ দেবে। কিন্তু শ্বশুরবাড়ি যাবার আগে অবশ্যই ভাইকে নিমন্ত্রন করে যাবে ভাইফোঁটা উপলক্ষ্যে। এরপর ভাই উপহার সামগ্রী নিয়ে বোনের বাড়িতে উপস্থিত হবে ভাইফোঁটা উপলক্ষ্যে। তারা বোনদের বাড়িতে যাবে এই বিশ্বাসে যে, ভাইফোঁটা না পেলে তাদের চলবে না। তার আয়ু কমে যাবে।
এই রীতির মাধ্যমে ভাই বোনদের মাঝে বিয়ের পরেও একটি সামাজিক সম্পর্ক ও সম্প্রীতি বজায় থাকতো। মা বাবা ছাড়াও ভাইয়েরা যে বোনদের দেখাশুনা করার ক্ষমতা ও মানসিকতা রাখে তা এই পর্বের মাধ্যমে বুঝিয়ে দেওয়া হতো। বুঝানো হতো বাপ মা ছাড়াও বোনদের সমাদর পাবা ও আশ্রয়স্থল আছে।

কিন্তু মহাকাল ঘাড়ে শাস্ত্রীয় বিশ্বাস নামক ভুত মুলত চেপে বসেছে। অনেক ক্ষেত্রে ভাইয়েরা স্নেহের বলে বিশ্বাস করে ভাইফোঁটা না পেলে তাদের আয়ু কমে যাবে। তাই তাদের ভাইফোঁটা চাই চাই। সামাজিকতার ঘাড় থেকে বিশ্বাসের এই ভুত মেনে পর্বটি আর সামাজিক ও ভাই বোনদের সামাজিক ভালবাসা ও সম্প্রীতির পর্ব হয়ে উঠুক।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৫ thoughts on “ভাইফোঁটা

  1. সাংস্কৃতিক ধর্মগুলোর প্রায় সব
    সাংস্কৃতিক ধর্মগুলোর প্রায় সব আচার ও বিধানই এই প্রকৃতির। প্রথমে সামাজিক আচার বা রীতি, পরে ধর্মীয় শাস্ত্রে নিবন্ধন। শুধুমাত্র ইসলাম এবং কিছু অংশে বৌদ্ধ ও খৃষ্ট ধর্মের ক্ষেত্রে বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন।

  2. আসলে খ্রিষ্টান আর ইসলাম একদম
    আসলে খ্রিষ্টান আর ইসলাম একদম হাতে ধরে তৈরি করা ধর্ম। এরা আগের সংস্কৃতিকে ধর্ম তৈরির সময় ধর্মে সংযুক্ত করেছে নয়তো নিষিদ্ধ করেছে। হিন্দু ধর্মের সাথে এই দুই ধর্মের পার্থক্য আসলে এখানে। আপনার কথার সাথে একমত। আর বৌদ্ধ মুলত নাস্তিক্য দর্শন ছিল। যা সৃষ্টি হয়েছিল উচ্চবর্ণের হিন্দুদের অপকরমের প্রতিবাদ সরূপ।
    মন্তব্য করার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।

  3. ভাই ফোঁটা ধর্মীয় ব্যপার তা
    ভাই ফোঁটা ধর্মীয় ব্যপার তা আমার জানা ছিল না! আমার ধারণা ছিল এটি রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর প্রবর্তীত একটি উৎসব মাত্র, যাইহোক কামনা করি ভালবাসার এ বন্ধন অটুট হোক।
    আপনি লিখেছেন চমৎকার, ধন্যবাদ।

    1. কোন ধর্মীয় উৎসবটা কোন
      কোন ধর্মীয় উৎসবটা কোন ব্যক্তির বা ব্যক্তিবর্গের প্রবর্তিত উৎসব নয়? ঈশ্বর স্বর্গ থেকে কোন ধর্মীয় উৎসব পাঠিয়েছেন, তার কোন ইঙ্গিত আজও খুজে পাই নি।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 65 = 71