কিলো ফ্লাইট: মেঘ ফুঁড়ে ওরা এসেছিলো বজ্র হয়ে (Kilo Flight – They Were The Fire From The Clouds) – প্রথম পর্ব


পর্ব – ২ এখানে
৩রা মার্চ, ১৯৭১
করাচী, পশ্চিম পাকিস্তান

পিআইএ এর একটি বোয়িং ৭০৭ টেকঅফের জন্য তৈরী। সেই বিমানের কো পাইলট ক্যাপ্টেন নিজাম আহমেদ চৌধুরি। করাচি–ঢাকা নিয়মিত ফ্লাইটের জন্য সবই প্রস্তুত। প্রসিডিউর অনুযায়ী উড্ডয়নের আগে লোড শিট (যাত্রী সংখ্যা, মালামালের হিসেব এবং তেল ইত্যাদি সংক্রান্ত তথ্য এতে লেখা থাকে) দেখে নেবার কথা, নিজাম আহমেদ চৌধুরী তা চেক করে বেশ অবাক হলেন। লোড এবং যাত্রী কোনটাই নিয়মিত ফ্লাইটের মতো নয়। সর্বোচ্চ সংখ্যক যাত্রী এবং মালামালের উল্লেখ আছে সেই লোড শিটে, যদিও যাত্রীদের সবাই বেসামরিক। তবু উনার সন্দেহ হল। উনি কো পাইলটের আসন ছেড়ে যাত্রীদের দেখতে বিমানের ভেতরে ঢুকলেন এবং অবাক হলেন। কারন এদের একজনও বেসামরিক যাত্রী নয় তা পোষাক, চুল এবং হাবভাবেই বোঝা যাচ্ছিলো।


পর্ব – ২ এখানে
নভেম্বর (দ্বিতীয় সপ্তাহ), ১৯৭০
রাওয়ালপিন্ডি, পশ্চিম পাকিস্তান

ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট শামসুল আলম বর্তমানে সি-১৩০ ট্রান্সপোর্ট স্কোয়াড্রনে কর্মরত, পোস্টিং রাওয়ালপিন্ডিতে। ১২ নভেম্বরের ভয়াবহ ঘূর্নিঝড় আর জ্বলোচ্ছাসের (ভোলা সাইক্লোন) পর উনারা যারা পশ্চিমে ছিলেন তারা টিভি কিংবা রেডিওতে শুনলেন যে পূর্বে ঘূর্নিঝড় আর জ্বলোচ্ছাস হয়েছে এবং তাতে অনেক লোকজন মারা গেছে। কিন্তু তা যে কতটুকু ভয়াবহ সরকারী গনমাধ্যম থেকে উনারা বিন্দুমাত্র আঁচ করতে পারলেননা। তবে বিবিসি কিংবা ভয়েস অব আমেরিকা অথবা ইন্ডিয়ান রেডিও থেকে উনারা জানতে পারলন যে ভয়াবহ এক দূর্যোগ হয়েছে সেখানে আর লাখ লাখ লোক মারা গেছে।

বাঙ্গালী রাজনীতি,জাতীয়তাবোধ কিংবা দেশের হালচাল এসব নিয়ে সাধারন কৌতুহলের বাইরে তেমন বিশেষ কিছু আগ্রহ ছিলনা উনার। তবে বাঙ্গালী অফিসার হিসেবে বাঙ্গালীদের কোন ভালো খবরে উনিও আনন্দিত হতেন যেমনটা খুব সাধারনভাবেই হবার কথা। ৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়ের পর পশ্চিম পাকিস্তানে সব বাঙ্গালী অফিসারেরা অনেক খুশী হয়েছিল, পার্টি করেছিল। ব্যাস,এটুকুই। সাধারনভাবে তাদের তেমন কোন ধারনা ছিলনা যে পশ্চিম আর পূর্বের মধ্যে বৈষম্য কেন আর কতটুকু আছে।

২২ নভেম্বর, ১৯৭০
রাওয়ালপিন্ডি, পশ্চিম পাকিস্তান

সেই দূর্যোগের প্রায় ২০ দিন পর ফ্লাঃ লেঃ শামসুল আলমের স্কোয়াড্রনের উপর নির্দেশ এসেছে যে উনাদের ঢাকাতে স্বানান্তরিত হতে হবে। তবে কেবল মাত্র একটি সি-১৩০ আর কিছু কৃষিকাজে ব্যবহৃত বিমানে অল্প কিছু ত্রান নিয়ে উনারা রওনা হলেন ঢাকার দিকে। তখন তাদের অনেক ঘুরে শ্রীলংকা হয়ে ঢাকা আসতে হতো ।

(এর কারন ছিলো, কিছু পাকিস্তানী অথবা ভারতীয় দুস্কৃতিকারী (খুব সম্ভবত আইএসআই এর মদদপুষ্ট ) একটি ভারতীয় বিমান ছিনতাই করে পাকিস্তানে নিয়ে যেতে বলে, এরপর করাচীতে অবতরনে বাধ্য করা হয় সেই বিমান। এরপর তারা ভারতীয় সরকারের কাছে বিপুল অর্থ দাবী করে। ভারত সরকার দিতে রাজী না হওয়ায় যাত্রীসহ সেই বিমান উড়িয়ে দেয়া হয়। এরপর ভারত সরকার পালটা ব্যবস্থা হিসেবে ভারতের উপর দিয়ে পাকিস্তানী বেসামরিক বিমানের ওভার ফ্লাইও বন্ধ করে দেয়।)

২৪ নভেম্বর, ১৯৭০
তেজগাও এয়ারপোর্ট, ঢাকা

উনি বেশ অনেকদিন পর ঢাকা এসেছেন। ঢাকা এয়ারপোর্টের উপরে আসার পর পরই বেশ অবাক হলেন উনি। শুধু অবাক না, উনি ভাবতে থাকলেন, “আমি এসব কি দেখছি?” ঢাকা এয়ারপোর্টের উপর দিয়ে তাদের বেশ অনেক্ষন সার্কিট করতে হল কেবল ল্যান্ড করার জন্য কিছু জায়গা খুঁজে পেতে। না, রানওয়ে কিংবা এয়ারপোর্টের কোন ক্ষতি হয়নি। উনি অবাক হয়েছিলেন এ কারনে যে, এয়ারপোর্টে শত শত বিমান, নতুন কোন বিমান ল্যান্ড করার সুযোগ পর্যন্ত নেই!! পৃথিবীর প্রতিটি কোণ থেকে নানা জাতি তাদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে আর ঢাকা এয়ারপোর্টে তাই শতশত বিমান,আর উনারা নিজের দেশের মধ্যে থেকেই সাহায্য নিয়ে হাজির হয়েছেন ঠিক ২২ দিন পর!!

হ্যা,ঠিক ২২ দিন পর!!

(১৯৭০ এর সাইক্লোনের পর বাংলাদেশে প্রায় ৩৮ টি হেলিকপ্টার ত্রান এবং উদ্ধার কাজে নিয়োজিত ছিল। এর মধ্যে কেবল একটিও পাকিস্তানী ছিলনা। পাকিস্তান সরকার দাবী করে ভারতীয় আকাশ পথ অবরোধের কারনে তারা পূর্বে হেলিকপ্টার এবং অন্যান্য যন্ত্র স্থানান্তর করতে পারেনি। কিন্তু ভারত সরকার এই দাবী অস্বীকার করে। ভারতীয়দের যে যাই বলুক, ৭০ এর এই দূর্যোগের পর সবচেয়ে প্রথম সাহায্যের হাত তারাই বাড়িয়ে দেয়। ভারত সরকার সেই সময়ের প্রায় ২ মিলিয়ন ডলার সাহায্য হিসেবে প্রদান করে একটি গরীব দেশ হওয়া সত্ত্বেও। পশ্চিম বঙ্গের সামরিক বিমান এবং জাহাজের মাধ্যমে ত্রান এবং উদ্ধার কাজে অংশ নেবার প্রস্তাবও দেয়া হয়। কিন্তু পাকিস্তান সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। এমনকি বেসামরিক কোন বিমানকেও পূর্ব পাকিস্তানে ত্রান নিয়ে আসতে দেয়া হয়নি ভারত থেকে। সকল ত্রান স্থল পথে সীমান্ত থেকে ধীর গতিতে প্রবেশ করতে দেয়া হয়। )

২৫ নভেম্বর, ১৯৭০
পূর্ব পাকিস্তান, উপকূলীয় অঞ্চল

ঘূর্ণিঝড়ের ২৩ দিনের দিন উনারা ত্রান ফেলতে এসেছেন। রায়পুরা, হাতিয়া আর উপকূলীয় নানা দ্বীপের উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছিলেন উনারা। কিন্তু প্রানের কোন চিহ্ন দেখছিলেন না। এমন কাউকে পাচ্ছিলেননা কিংবা কোন নাড়াচাড়া দেখছিলেন না যেটা দেখে তাদের উদ্দেশ্যে কিছু দিতে পারতেন। উনারা নীচে নামতে থাকলেন, ৫০০০ ফিট, ২০০০ ফিট, ১০০০ ফিট, কিন্তু কোন জীবিত প্রানীই দেখতে পাচ্ছিলেন না। পুরো অঞ্চল দুমড়ে মুচড়ে গেছে। সে বর্নণা অন্য এক আলাদা অধ্যায়। তবে ১০০০ ফুতে নেমে আসার পর আমরা মাটির উপর কালো কালো কিসের যেন সারি সারি দাগের মত দেখতে পাচ্ছিলেন। তাদের কৌতুহল হয়। তারা আরো নীচে আসেন, ৫০০ ফিট, ৩০০ ফিট, ২০০ ফিট… তাদের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়। উপর থেকে যেসব কালো কালো দাগের মত দেখছিলেন, সেসব আসলে মৃতদেহ। মানুষ,গবাদিপশু সবার মৃতদেহ। সাগরের পানি সরে যাবার পর মৃতদেহগুলো মাটির উপর সারি সারি হয়ে পরে আছে। এতদিনেও কেউ তাদের সরাতে আসেনি। পঁচে গিয়ে কালো কালো দাগের মত দেখাচ্ছিলো উপর থেকে। এই ঘটনাগুলো উনি নিজের কাছে কিছু বন্ধু আর পরিবারের লোক ছাড়া কাউকে সেভাবে কখনোই বলেননি। কিন্তু জীবনের শেষে এসে হয়তো একসময় উনার ইচ্ছা হবে আসলে কি হয়েছিলো তার কিছু কিছু ঘটনা পরের প্রজন্মকে জানিয়ে যাবার।

সেই রাতে উনি ঠিকমত ঘুমাতে পারলেননা। প্রথমবারের মত বুঝতে পারছিলেন বাঙ্গালীদের সাথে বড় ধরনের কোন বৈষম্য করা হচ্ছে যেটা উনারা পশ্চিমে থেকে খোলা চোখে ধরতে পারেননি, কিংবা চেষ্টাও করেননি সেভাবে।

(সাইক্লোন আঘাত হানবার পরদিন তিনটি নেভাল বোট এবং একটি হসপিটাল শিপ হাতিয়া, সন্দীপ এবং অন্যান্য এলাকার উদ্দেশ্যে উদ্ধার কাজে গমন করে। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান নভেম্বরের ১৬ তারিখ চীনে রাষ্ট্রীয় সফর স্থগিত করে পূর্ব পাকিস্তানে এসে দূর্গত এলাকার উপর দিয়ে বিমান থেকে উড়ে উড়ে দেখে যান। তিনি দূর্গতদের উদ্ধারে ঘোষনা দেন, “no effort to be spared”। তিনি সকল জায়গায় রাষ্ট্রীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখার নির্দেশ দিলেন, সেই সাথে শোক দিবস পালনের ঘোষনা দিলেন ২১ শে নভেম্বর। সাইক্লোন আঘাত হানার ৭ দিন পর। প্রায় ৪০ টি দেশের উদ্ধারকারী দল এদেশে এসে পৌছায় সাইক্লোনের ২ সপ্তাহের মধ্যে, জাপানী পার্লামেন্টে সমালোচনা হয় যথাযথ সাহায্য না পাঠাবার জন্য। যে কারনে আবারো জাপানী উদ্ধারকারী দল ত্রান এবং বিমান সহ এদেশে এসে পৌছায় ২ সপ্তাহের মধ্যেই। কিন্তু পাকিস্তানী বিমান প্রথম ত্রান কাজের জন্য উড্ড্যন করে সাইক্লোনের তিন সপ্তাহ পার হবার পর!! )

৩রা মার্চ, ১৯৭১
করাচী, পশ্চিম পাকিস্তান

পিআইএ এর একটি বোয়িং ৭০৭ টেকঅফের জন্য তৈরী। সেই বিমানের কো পাইলট ক্যাপ্টেন নিজাম আহমেদ চৌধুরি। করাচি–ঢাকা নিয়মিত ফ্লাইটের জন্য সবই প্রস্তুত। প্রসিডিউর অনুযায়ী উড্ডয়নের আগে লোড শিট (যাত্রী সংখ্যা, মালামালের হিসেব এবং তেল ইত্যাদি সংক্রান্ত তথ্য এতে লেখা থাকে) দেখে নেবার কথা, নিজাম আহমেদ চৌধুরী তা চেক করে বেশ অবাক হলেন। লোড এবং যাত্রী কোনটাই নিয়মিত ফ্লাইটের মতো নয়। সর্বোচ্চ সংখ্যক যাত্রী এবং মালামালের উল্লেখ আছে সেই লোড শিটে, যদিও যাত্রীদের সবাই বেসামরিক। তবু উনার সন্দেহ হল। উনি কো পাইলটের আসন ছেড়ে যাত্রীদের দেখতে বিমানের ভেতরে ঢুকলেন এবং অবাক হলেন। কারন এদের একজনও বেসামরিক যাত্রী নয় তা পোষাক, চুল এবং হাবভাবেই বোঝা যাচ্ছিলো।

তিনি এমনিতেই রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং নিজের কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ নিয়ে খুশী ছিলেননা। তিনি বুঝতে পারলেন এটা এক অশুভ সংকেত। তিনি প্রধান পাইলটের সাথে তর্কে লিপ্ত হন এবং এক পর্যায়ে এই ফ্লাইট নিয়ে যেতে অস্বীকার করে বিমান থেকে নেমে যান। সামরিক কর্তুপক্ষের আদেশে গ্রেফতার করা হলো নিজাম আহমেদ চৌধুরিকে এবং তাকে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করা হলো। অন্য আরেক পাকিস্তানী ক্যাপ্টেনকে কো-পাইলট হিসেবে রিপ্লেস করে ফ্লাইট চালনা করা হলো।

(এরপর পুরো ৭১ জুড়েই আর কোন বাঙ্গালী বৈমানিক এই রুটে উড্ডয়ন করেননি। আভ্যন্তরীন কিছু রুটে মার্চের ২৫ তারিখ পর্যন্ত ফ্লাইট পরিচালনায় ছিলেন কিছু বাঙ্গালী বৈমানিক। তবে নিজাম আহমেদ চৌধুরীর ভাগ্য ভালোই ছিলো কারন উনার স্ত্রী ছিলেন একজন জার্মান নাগরিক যিনি ওই সময় ঢাকায় ছিলেন। বেশ কিছুদিন খোজ না পেয়ে উনি জার্মান দুতাবাসের মাধ্যমে পাকিস্থান সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করেন।তাকে মুক্তি দেয়া হয় কিন্তু সেইসাথে পিআইএ থেকে বরখাস্ত করা হয়। ৭১ এর বাকীটা সময় তাকে পশ্চিম পাকিস্তানে অন্তরীন করে নজরদারীতে রাখা হয়। এরপর স্বাধীনতার পর উনি করাচী থেকে ঢাকা পালিয়ে আসেন।)

নিজাম আহমেদ চৌধুরির এই ঘটনা অন্যদেরও প্রভাবিত করে। যাদের অনেকেই পাকিস্তান ত্যাগ করে দেশের বাইরে চলে যান এদের মধ্যেই ৪ জন পরে কিলো ফ্লাইটে যোগ দেন। কিলো ফ্লাইটের ৯ জন বৈমানিকের মধ্যে ৬ জন ছিলেন সিভিল পাইলট, যাদের ৪ জন পি আই এ এবং বাকী ২ জন কৃষি অধিদপ্তরের অধীনে কাজ করতেন।

পিআইএর এমন চারজন পাইলটের কথা জানা যায় যারা ২৬ মার্চের পর ঢাকা ত্যাগ করতে পারেননি। পরবর্তীতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাদের এপ্রিল এর প্রথম সপ্তাহে গ্রেফতার করে এবং এপ্রিল মাসের মধ্যেই ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ এবং নির্যাতনের পর তাদের সবাইকে হত্যা করে। উনারা হচ্ছেনঃ

– ক্যাপ্টেন সিকান্দার আলী, জেষ্ঠ্যতম বৈমানিক, পুর্ব পাকিস্তান
– ক্যাপ্টেন আবু তাহের মোহাম্মদ আলমগীর
– ক্যাপ্টেন এন এস হায়দার
– ক্যাপ্টেন আমিনুল ইসলাম

মার্চ (দ্বিতীয় সপ্তাহ), ১৯৭১
রাওয়ালপিন্ডি, পশ্চিম পাকিস্তান

সবকিছুর বাইরে পশ্চিম পাকিস্তানীরা যে কোন একটা পরিকল্পনা করছে সেটা অনেকের মত ফ্লাঃ লেঃ আলমও বেশ কিছুদিন আগেই টের পান। হুট করে একসময় নির্দেশ আসলো যে উনাদের কিছু ‘স্পেশাল যাত্রী’ পরিবহন করতে হবে। সেই সময় স্কোয়াড্রনের লোড মাস্টারদের প্রায় সকলেই ছিল বাঙ্গালী। একদিন উনাকে বাঙ্গালী এক লোড মাস্টার বললো,

– “স্যার, এরা যে যাত্রী নিয়ে ঢাকা যাচ্ছে, এরাতো আসলে সবাই সৈনিক।“

উনি বললেন,

– “ আমাকে একটা প্যাসেঞ্জারস লিস্ট কার্বন কপি করে দিতে পারবে নাকি।“

লোডমাস্টার বললো যে সে পারবে। উনি লিস্ট পেয়ে দেখলেন সত্যিই তাই। উনার এক পরিচিত আত্মীয় ছিল শেখ মুজিবের খুব ঘনিষ্ঠ। তাকে উনি ব্যক্তিগতভাবে সেই লিস্টের একটা কপি দিয়ে অনুরোধ করলেন যেভাবেই হোক শেখ মুজিবুর রহমানকে পৌছে দিতে। সেটা পৌছেছিলো নাকি উনার হয়তো কখনোই জানা হবেনা।

২৬ মার্চ, ১৯৭১
রাওয়ালপিন্ডি, পশ্চিম পাকিস্তান

ফ্লাঃ লে; শামসুল আলম এবং অন্য বাঙ্গালী অফিসারেরা বুঝতে পারলেন যে পূর্বে বড় ধরনের কিছু হয়েছে যখন ২৬ মার্চ সকল বাঙালি অফিসারদের গ্রাউন্ডেড করা হল। যার মানে হচ্ছে বাঙ্গালী অফিসারেরা ফ্লাই করতে পারবেনা। পাকিস্তানী টিভি আর রেডিওতে শুনলেন যে সামান্য গন্ডগোল হয়েছিলো যা সামলে নেয়া হয়েছে। পূর্বে শান্তি বিরাজ করছে। তবে রাতে বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা এসবে শুনে উনারা জানতে পারেন যে ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে পূর্বে।

উনাদের উপর সারাক্ষন নজরদারী ছিলো এটা উনারা বুঝতে পারতেন। পূর্বে পরিস্থিতি যে খুব ভয়াবহ সেটা আরো নিশ্চিত হলেন কর্নেল জিয়াউদ্দীন নামে আর্মি হেডকোয়ার্টারের এমএস ব্রাঞ্চে (কর্মকর্তাদের বদলী, স্থানান্তর, প্রসাশনিক বিষয়াদী এবং অন্যান্য ব্যাপার এমএস ব্রাঞ্চ দেখভাল করে) কর্মরত এক বাঙ্গালী সামরিক কর্মকর্তার মাধ্যমে। উনি তাকে বললেন,পূর্বে ভয়াবহ অবস্থা। প্রতিদিন অনেক অনেক আহত নিহত হবার খবর আসছে। পুরোদমে যুদ্ধের মত চলছে বলেই মনে হচ্ছে।

(আমার ধারনা মতে পাকিস্তানী বাহিনীর যুদ্ধের সময় যতটা হতাহতের ঘটনা ঘটেছিল, তার ৬০ ভাগ হয়েছিল ২৬ মার্চ রাত থেকে ২০ শে এপ্রিল এবং এরপর ২১ নভেম্বর থেকে ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে। এ কারনে যুদ্ধ শুরু হবার কিছুদিনের মধ্যেই পুর্ব থেকে পশ্চিমে এমএস ব্রাঞ্চে হাজার হাজার হতাহতের খবর (যার মধ্যে অন্তত ১০০ জন অফিসার) আসা পশ্চিমাদের জন্য মারাত্মক ব্যাপার ছিল। ২৬ মার্চ থেকে ২০ শে এপ্রিলের মধ্যে ইপিআর, ইস্টবেগল রেজিমেন্ট এবং নানা জায়গার বাঙ্গালী পুলিশের প্রি এম্পটিভ স্টাইক এবং এম্ব্যুশে অন্তত ৩০০০ হাজার পাকিস্তানী সেনা এবং অফিসার মারা যায় অথবা যুদ্ধবন্দী হিসেবে ধৃত হয়,যাদের কিছুদিন পর বিএসএফের হাত ঘুরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে স্থানান্তর করা হয়। এরমধ্যে পাকিস্তানীরা সবচেয়ে বেশি লোকবল ক্ষয় করে চট্টগ্রামে,এরপর রাজশাহী এবং যশোরে। বাঙ্গালী সামরিক অফিসার,সেনা এবং পরিবার বর্গের উপর সবচেয়ে বেশি নৃশংশতার ঘটনা ঘটে কুমিল্লায়,যেখানে প্রায় ১১০০ বাঙ্গালী অফিসার এবং সেনাকে হত্যা করা হয়। চট্টগ্রামে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারে (ইবিআরসি) অতর্কিত হামলা করে হত্যা করা হয় প্রশিক্ষণরত প্রায় ৫০০ সেনা এবং অফিসারকে।)

উনি কর্নেল জিয়াউদ্দীনকে জিজ্ঞেস করলেন,

– “স্যার আমাদের কি করা উচিত?“

উনি বললেন,

– “যা করবে নিজের বুদ্ধি দিয়ে করো। এমনকি বাঙ্গালী কাউকেও বলবার দরকার নেই, কাউকে বিশ্বাস করোনা!“

সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে দেশে কিংবা ভারতে পালানো অসম্ভব মনে হচ্ছিলো। তবু ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট সামসুল আলম,জিডি(পি),পাক ৪৯২১, সিদ্ধান্ত নিলেন যে উনি দেশে চলে যাবেন আর সেটা যেভাবেই হোক!!

৩রা এপ্রিল, ১৯৭১
প্রধানমন্রীর কার্য্যালয়, দিল্লী

তাজউদ্দীন আহমেদ ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে দেখা করবার সুযোগ পেয়েছেন, তিনি নিজেকে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন। তাকে কোলকাতা থেকে সরাসরি দিল্লী উড়িয়ে আনা হয়েছে। ইন্দিরা গান্ধী উনাকে জিজ্ঞেস করলেন,

– “ আপনারা কি সত্যি স্বাধীনতা চান?”

তাজউদ্দীন আহমেদ জবাব দিলেন,

– “আমরা স্বাধীনতা চাই।“

ইন্দিরা গান্ধী বললেন,

– “তাহলে আপনাদের দেরী না করে খুব দ্রুত স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার গঠন করতে হবে। আপনাদের স্বাধীনতার জন্য যা করা প্রয়োজন আমাদের সামর্থ্যের সবটূকু দিয়ে আমরা করবো।“

এপ্রিল (দ্বিতীয় সপ্তাহ), ১৯৭১
দাউদকান্দি ফেরী ঘাট, কুমিল্লা
স্কোঃ লীঃ সুলতান মাহমুদ (পরবর্তীতে এয়ার ভাইস মার্শাল এবং বিমান বাহিনী প্রধান) তার এক বন্ধুর ভক্সওয়াগেন গাড়িতে করে দাউদকানী ফেরী ঘাটে পৌছেছেন। উদ্দেশ্য হচ্ছে এরপর সীমান্ত পার হয়ে আগরতলা পৌছানো। ঘাটে তার বেশভুষা, হাবভাব এবং চুলের কাটিং দেখে স্থানীয় কিছু পাকিস্তানপ্রেমীর সন্দেহ হলো। তারা সেখানে পাকিস্তানীদের হয়ে দ্বায়িত্বপালন লক্ষ্য রাখছিলো যাতে সেনাবাহিনী কিংবা ইপিআর এর কোন সদস্য নদী পার হয়ে ওপারে সহজে যেতে না পারে। যাকেই সন্দেহ হচ্ছিলো তাকেই তারা তুলে নিচ্ছিলো। সুলতান মাহমুদকেও তারা চ্যালেঞ্জ করে বসলো।

দূর থেকে এই অবস্থা দেখে তার বন্ধু গাড়ি নিয়ে সটকে পড়লেন সুলতান মাহমুদকে ভাগ্যের হাতে সপে দিয়ে। সুলতান মাহমুদ কিছু সময় কথা চালিয়ে গেলেন এবং প্রমত্তা মেঘনা নদীতে ঝাপিয়ে পড়লেন সুযোগ বুঝে আর কোন উপায় না দেখে। পরে জোয়ারের টানে অপর পাড়ে গিয়ে উঠলেন ভাগ্যক্রমে।

কিছুদিনপর তিনি বর্তমান বাক্ষনবাড়িয়ার নবীনগর হয়ে ভারতে পৌছাতে সক্ষম হবেন। ভাগ্যিস ওইসব লোকেদের হাতে তখনো অস্ত্র দেয়া শুরু করেনি পাকিস্তানীরা।

(উনি মতিউর রহমানের কোর্সমেট ছিলেন, শ্রীলঙ্কা হয়ে ছুটিতে এসেছিলেন ঢাকায় মার্চের প্রথম দিকে। এরপর অক্টোবরের প্রথমদিকে তিনি সদ্য গঠিত বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ এবং গৌরবজনক ইতিহাসের সাক্ষী হবেন। বাহিনী গঠিত হবার কয়দিন পর যোগ দেবেন কারন এর আগে ১নং সেক্টরে স্থলযুদ্ধে (মদুনাঘাট পাওয়ার সাব-ষ্টেশন অভিযান) অংশ নিয়ে পায়ে গুলি লাগার কারনে কিছুদিন চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে কাটাতে হয়েছিলো। প্রথমে ২নং সেক্টরে যুদ্ধ করলেও পরে হাই কমান্ডের নির্দেশে ১নং সেক্টরে যোগ দেন।)

স্কোঃ লীঃ সুলতান মাহমুদ

এপ্রিল (মাঝামাঝি কোন সময়), ১৯৭১
করাচী, পশ্চিম পাকিস্তান

ফ্লাঃ লেঃ শামসুল আলম এবং অন্যান্য বাঙ্গালী অফিসারদের তখন তেমন কোন কাজ ছিলনা অফিসে। নজরবন্দী হিসেবে থাকছিলেন, অল্প কিছু দাপ্তরিক কাজ ছাড়া অন্য কোন কিছুতে তাদের টানা হতনা। এর মধ্যে উনি ছুটি চাইলেন ১ মাসের জন্য পারিবারিক কারন দেখিয়ে। অবাক করে দিয়ে তার ছুটি মঞ্জুর করা হল। পুরো ১ মাসের ছুটি!

উনার বোন তখন থাকতেন করাচীতে। ছুটি নিয়েই করাচী চলে গেলেন। উনার কাছে তখন প্রায় ৬০ হাজার রুপী ছিল। ৬০ হাজার রুপী তখন অনেক অনেক টাকা! পুরো মাস জুড়ে সেই ৬০ হাজার রুপীর ৫০ হাজার রুপী তুলে ফেললেন হাবীব ব্যাংক থেকে। এরপর ভাবলেন কাজে যোগ দেবেন নাকি ভারতে পালিয়ে যাবেন? কিন্তু কাজে যোগ দেয়ার ব্যাপারে কিছুতেই অনকে বোঝাতে পারলেন না। আবার ভারতে পৌছানোটাও অনেক দুরুহ ছিল। এজন্য শেষ মুহুর্তে অন্য একটা সিদ্ধান্ত নেন। উনি করাচী থেকে প্রথমে রাওয়াল্পিন্ডির প্লেনের টিকেট কাটলেন। আবার একই সাথে ঢাকার টিকেটও কাটলেন। স্কোয়াড্রনে জানিয়ে দিলেন যে রাওয়াল্পিন্ডি ফিরছেন।

করাচী থেকে ঢাকার প্লেনে চেপে বসলেন উনি। মনে মনে বেশ খুশিই ছিলেন যে পাকিস্তানীদের ধোঁকা দিতে পেরেছেন এবং যথাসময়ে ঢাকায় এসে পৌছাবেন।

এপ্রিল (মাঝামাঝি কোন সময়), ১৯৭১
ঢাকা, পূর্ব পাকিস্তান

ফ্লাঃ লেঃ শামসুল আলম কিছুক্ষন আগে ঢাকা পৌছেছেন। পৌছানোর পরই অদ্ভুত একটা ব্যাপার দেখলেন। পুরো বিমানবন্দর সৈন্যে ভরা আর তেমন কোন শ্রমিকই চোখে পড়ছেনা। উনি উনার লাগেজ খুঁজতে লাগলেন। কিন্তু অনেক পরেও যখন এসে পৌছালোনা, তখন খোঁজে বের হলেন। উনার পরিচিত এক বিমান বাহিনীর অফিসারকে চোখে পরে গেলেন হুট করেই। সেই অফিসার উনাকে জিজ্ঞেস করলেন,

– “আরে আলম, তুমি এখানে কি মনে করে?”

উনি জবাব দিলেন,

– , “অনেকদিন দেশে আসা হয়না, তাই ছুটি নিয়ে বাড়িতে বেড়াতে আসলাম।“

সেই অফিসার বললো,

– “তো কি খুঁজছো?”

জবাব দিলেন,

– “লাগেজ খুঁজছি, এখনো এসে পৌছাচ্ছেনা কেন বুঝতে পারছিনা।“

সেই অফিসার বললো,

– “এসে যাবে, ওদিকে গিয়ে দেখো। বাঙ্গালী আনলোডাররা নেইতো, তাই এখন ঝামেলা হচ্ছে। অপেক্ষা কর, পেয়ে যাবে।“

এর একটুপর উনি উনার লাগেজ দেখতে পেলেন। তবে সেই অফিসার আরো কয়জন সহ উনার কাছে চলে এলো। বললো,

– “শহরের অবস্থা তো খারাপ, যাবে কিভাবে?”

উনি বললেন,

– “সেটা সমস্যা হবেনা। কোন কিছু জোগাড় করে চলে যাব।“

সেই অফিসার বললো,

– “দেখ, আমি একটা গাড়ি ম্যানেজ করেছি, তুমি ওটাতে করে চলে যাও। “
উনি জবাব দিলেন,

– , “না থাক, আমি নিজেই কিছু একটা জোগাড় করে চলে যাব।“

তবু সেই অফিসার উনাকে প্রায় বাধ্য করলো গাড়িতে উঠতে শহরের নানা পরিস্থিতির কথা বলে। গাড়ি এগিয়ে চলছিলো। কিন্তু ফ্লাঃ লেঃ আলম খেয়াল করলেন যে সেগুনবাগিচার দিকে না গিয়ে গাড়ি যাচ্ছে এখনকার যে প্রধানমন্ত্রী কার্য্যালয় আছে, তার সামনের রাস্তা দিয়ে ক্যান্টনমেন্টের দিকে। জিজ্ঞেস করতেই উনাকে বলা হল, এখানে কিছু কাজ আছে, এরপর আমাকে বাড়ি পৌছে দেয়া হবে। এরপর তাকে নিয়ে যাওয়া হল বর্তমানে এয়ারফোর্স মেসের ওখানে। নিয়ে বললো,

– “তুমি চেঞ্জআপ করে নাও ওই রুমে গিয়ে। আমার অল্পকিছু সময় দেরী হবে।“

ফ্লাঃ লেঃ আলম লাগেজ বের করে ওই রুমে প্রবেশ করলেন। এরপরেই বাইরে থেকে খট করে আওয়াজ আসলো দরজা আটকে দেবার। জানালার ওখান থেকে তাকে বলা হল,

– “আমরা জানি তুমি কিভাবে এখানে এসেছো। পালাবার চেষ্টা করে লাভ নেই।“

এরপর রাতে তাকে খেতে দেয়া হল। আর কয়েকজন এসে তার লাগেজ চেক করলো। ব্যাগে এতো টাকা দেখে বললো,

– “তুমি এতো টাকা কেন নিয়ে এসেছো?”

উনি জবাব দিলেন,

– “অনেকদিন পর বাড়িতে আসছি। বাড়িতে কাজ করাবো, এজন্য নিয়ে এসেছি।“

এরপর উনার সকল লাগেজ নিয়ে যাওয়া হয়, যার কিছুই আর ফেরত পাওয়া হবেনা। ঘরে কেবল একজোড়া স্যান্ডেল, জুতা, শার্ট, প্যান্ট আর পরনে লুঙ্গি ফতুয়া। এভাবেই সকাল হল, বাইরে গার্ড ছিল, কড়া পাহারা। উনি বুঝতে পারছিলেন এখন পালাতে চেষ্টা করে লাভ নেই। কিছুটা সময়ের জন্য নিজেকে ভাগ্যের কাছে ছেড়ে দিতে হবে…

সকালে উনাকে বেশ ভালো নাস্তা করানো হল। একটু পর সেই অফিসার আবার আসলেন। উনাকে বললেন,

– “আলম, তোমাকে একটু যেতে হবে আমার সাথে, বেশি সময় নেই, যেভাবে আছো সেভাবেই চল।“

উনি বললেন,

– “আমি একটু ড্রেস চেঞ্জ করে আসি, জুতা পড়ে নেই।“

সেই অফিসার জবাব দিলো,

– “ এর কোন দরকার নেই।“

উনি প্যান্ট, শার্ট আর সাথে স্যান্ডেল পড়ে গাড়িতে উঠে পড়লেণ। টাকে নিয়ে যাওয়া হল কুর্মিটোলার দিকে। ওখানে একটা আর্মি ইউনিট ছিল বলে জানতেন, খুব সম্ভবত সেখানেই। সেখানে নিয়ে বলা হল,

– “তুমি এখানে কয়েকদিন থাকবে। কিছুদিন পর তোমাকে চলে যেতে দেয়া হবে।“

এরপর আর্মির এক সুবেদার আসলো। তাকে উদ্দেশ্য করে বলা হল,

– “ইনি আমাদের অফিসার, ভালো করে যেন খেয়াল রাখা হয়।“

সেই অফিসার চলে গেলেন… সেই সুবেদার উনাকে বললো,

– “সামনে চলো।“

উনি দেখলেম সামনে একটা টিনের চালা দেয়া ঘরের মত। সেইদিকে উদ্দেশ্য করে হাটতে থাকলেন। হাটা শুরু করতে না করতেই ধাম করে মোটা কোন লাঠি দিয়ে উনার পেছন দিকে বাড়ি দেয়া হল। উনার প্রায় দম বন্ধ হবার জোগাড় হলো। উনাকে আবার বলা হল,

– “ সামনে দেখ আর হাটতে থাক।“

উনাকে সেই ঘরের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়া হল। প্রায় ১৫-২০ জনের মত লোক সেখানে শুয়ে ছিলো। উনি ঢুকতেই একজন ঠোটে আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করলো কোন শব্দ না করবার জন্য। বাইরে থেকে দরজা লাগিয়ে চলে যেতেই তাকে একজন বললো,

– “কথা কইয়েন না, চুপ কইরা পইড়া থাকেন।“

আসার পথে স্যান্ডেল খুলে যায়, সেটা নিয়ে আসতে চাইলে আরেকজন বললো,

– “কাপড় চোপড়ই থাকবোনা, সাহেবে স্যান্ডেল খোঁজে! মাইরের সময় মুখ বুইজা থাইকেন, সব সইয়া যাইবো।“

একটুপর সবাইকে লাইন ধরে দাড় করিয়ে বাইরে নেয়া হল। একেকজনকে ডাক দেয়, এরপর শুরু হয় বেদম প্রহার। এভাবে প্রায় সারাদিনই চলতে লাগলো। মারতে থাকে আর গালি দিতে থাকে উর্দুতে। সেসবের খুব বেশি কিছু উনার মনে থাকবেনা একসময়। তবে “কুত্তা বাঙ্গাল” আর “শালে মুজিব কে বাচ্চে” এই দুটা স্পষ্ট মনে থাকবে উনার।

এভাবেই দিন চলছিলো। খেতে দেয় কি দেয়না। সেটা খেতেও কষ্ট হয়। এভাবে চললো বেশ কয়দিন। মাঝে মাঝে কয়েকজনকে নিয়ে যায়, নতুন কেউ কেউ আসে। যাদের নিয়ে যায় তাদের তেমন কেউই ফেরত আসেনা। অল্প কয়জনকে ফিরে আসতে দেখবেন, কিন্তু তাদের দেখে মনে হযবে নরকের উদাহরন হয়তো আল্লাহ এই পৃথিবীতেই সৃষ্টি করে রেখেছেন। এভাবে একদিন উনারও ডাক আসবে!

মে মাস (হয়তো), ১৯৭১
ঢাকা, পুর্ব পাকিস্তান

ফ্লাঃ লেঃ শামসুল আলমকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে সামরিক বাহিনীর কুখ্যাত জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে। সামরিক বাহিনীতে কাজ করার সুবাদে এর সম্পর্কে উনার কিছু জানা ছিল। এখন যেখানে ডিজিএফআই হেডকোয়ার্টার,সেখানে ছিল এর অবস্থান। প্রথমেই উনাকে মেজর পদমর্যাদার এক কর্মকর্তার সামনে নিয়ে যাওয়া হয়। উনি তাকে বলেন,

– “আলম,তুমি সত্য স্বীকার করে নাও। তাহলে তোমাকে কিছু বলা হবেনা। তুমি স্বীকারোক্তি দাও যে তুমি মুক্তিবাহিনিতে যোগ দেবার জন্য পালিয়ে ঢাকা চলে এসেছো।“

উনি বললেন,

– “আমিতো ছুটিতে এসেছি ঢাকায়। পরিবারের জন্য খুব খারাপ লাগছিল। আমি কেন এমন স্বীকারোক্তি দেব?“

এরপর বলা হল,

– “তোমার ভালো তুমি বুঝে নেবে। আর কি বলবে,সেটা আমরা ঠিক করে দেব।“

এরপর উনাকে নিয়ে যাওয়া হবে ডিটেনশন সেলে। গায়ের সব কাপড় খুলে হাত উপরে বেধে দাড় করিয়ে রাখা হবে। এরপর চলতে থাকে অত্যাচার। সেসবের কোন স্মৃতিই সেভাবে মনে করতে পারবেননা উনি অনেক বছর পর। কতবার যে জ্ঞান হারাবেন উনি নিজেও জানবেননা। আর মাথার উপর ছিল ১০০০ ওয়াটের বাল্ব। মারামারি শেষ হলে তাকে চোখের উপরে সেই বাল্ব জ্বালিয়ে রেখে ঝুলিয়ে রাখা হল। তাপে উনার মুখের চামড়া পুড়ে গিয়েছিল। উনি চোখ খুলে তাকাতে পারছিলেননা। প্রচন্ড ক্লান্ত ছিলেন,কিন্তু এক মুহুর্তের জন্যও ঘুমাতে পারছিলেননা। চোখের উপর এমন আলোর উৎস থাকলে ঘুমানো কখনই সম্ভব নয়। দুইদিন পর উনি ঘোরের মধ্যে চলে গেলেন। তাকে বার বার ওই একই কথা জিজ্ঞেস করা হচ্ছিলো আর বক্তব্য লিখতে বলা হচ্ছিলো। উনি বার বার লিখছিলেন,

– “I, Flight Lieutenant Shamsul Alam, PAK/4921, came here to meet my family on my holidays and I would have gone back within few days.”

এরপর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় পাশের এক সেলে। যেখান থেকে উনি নিয়মিত বীভৎস চীৎকার শুনতে পেতেন। সেখানে যাবার পর উনি দেখলেন মেঝেতে ছোপ ছোপ দলা বাধা রক্ত। মনে হচ্ছিলো যেন কেউ একটু আগে এখানে মুরগী জবাই করেছে। তাকে সেখানে নিয়ে আবার নির্যাতন করা হল,যেগুলো বর্ননা করবার ইচ্ছা এই ঘটনা প্রবাহের বাইরেই থাকুক। এরপর আবার তাকে বক্তব্য লিখতে দেয়া হল,উনি সেই একই কথা লিখলেন। তাকে আবার সেই বাল্বের নীচে ঝুলিয়ে দেয়া হল। ৩-৪ দিন পরেই উনি উনার সমস্ত মনবল হারিয়ে ফেললেন। উনার মাথা কাজ করছিল না। না ঘুমিয়ে এভাবে তীব্র আলো আর তাপের নীচে থাকা একটা অসহনীয় অনুভূতি। তাকে আবার জিজ্ঞেস করা হল যে উনি ঠিক বক্তব্য লিখবেন নাকি। উনি এবার বললেন,

– ”তোমরাই বলে দাও আমাকে কি লিখতে হবে। আমি লিখে সই করে দিচ্ছি।“
ওরা উনাকে লিখতে বললো,

– “I, Flight Lieutenant Shamsul Alam, PAK/4921 has deserted PAF which was planned and came in Dhaka to join muktibahini.”

উনি লিখে সই করে দিলেন। পাকিস্তানিরা তাকে বললো,

– “আগে লিখে দিলেই এতো কষ্ট করতে হতনা।“

উনি এবার অনুরোধ করলেন উনাকে তার কাপড়গুলো দিতে। উত্তরে তাকে বলা হল,

– “তুমি সেসব পাবে যদি আমাদের সাহায্য কর।“

উনি বললেন,

– “কি সাহায্য লাগবে?”

তাকে বলা হল, একজন বন্দী আছে,যার ভাষা ওরা বুঝতে পারছেনা। ওর জন্য ইন্টারপ্রিটার হিসেবে কাজ করত হবে। তার বক্তব্য তাদের বুঝিয়ে বলতে হবে। নিরুপায় হয়ে উনি রাজী হলেন।

সেলে নিয়ে আসা হল একটা লুঙ্গী আর গেঞ্জী পরা ২২-২৩ বছরের এক ছেলেকে। তার পুরো শরীর জমাট বাধা রক্তে কালো হয়ে আছে। ঠোট মুখ ফুলে একাকার,চেহারা বোঝাই যাচ্ছেনা। উনাকে বলা হল তার সাথে কথা বলতে। উনি তার সাথে কথা বলে বুঝলেন,সে ময়মনসিংহ অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে যেটা পাকিস্তানীরা ঠিকভাবে বুঝতে পারছিলনা। যেটা জানএন তা হচ্ছে,”ভাওয়াল গড়ের কোন এক জায়গায় মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প ছিল। যাদের এই ছেলেটা সাহায্য করতো। তাদের অস্ত্র,গুলি এসব বহন করতো। একদিন পাক বাহিনী ওখানে আক্রমন করলে তাকে একটা গুলির বাক্স দেয়া হয় মাথায় করে বহন করবার জন্য আর তাদের সাথে পালাতে। অবস্থা যখন বেগতিক হয়,তখন মুক্তিবাহিনী অথবা হয়তো ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের কোন ইউনিটের সদস্যরা যে যার মত পিছু হটে সেই এলাকা ত্যাগ করে। কিন্তু তার মাথায় যেহেতু ভারী গুলির বাক্স ছিল,সে সেটা রেখে পালাতে পারেনি। সে পেছনে পরে যায়, এরপর কাউকে খুজে না পেয়ে সেই বাক্স মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে আর পাক বাহিনীর ঘেরাওয়ের মধ্যে পরে যায়। তাকে যে দ্বায়িত্ব দেয়া হয়েছিল, সেই গুলির বাক্স হেফাযতে রাখা তাঁর কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সে গুলির বাক্স সহ ধরা পরে যায়। এরপর তাকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়,তখন সে এসবই বলছিল,কিন্তু তাঁর ভাষার জন্য কেউ সেভাবে বুঝতে পারছিলনা।“

তাঁর (ওই ছেলেটির) বক্তব্য ফ্লাঃ লেঃ আলম বুঝিয়ে বললেন। এরপর একজন নায়েক কিংবা এমন পদের সৈনিক আসলো। তাকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দিল। এরপর বুট দিয়ে মাথার একপাশে লাত্থি দিল। উনার মনে হল যে খুলি ফেটে যাবে। আবার পেটের মধ্যে লাত্থি দিল। যখনই পেটে লাত্থি দিচ্ছিল, তখনই মুখ দিয়ে দল দলা রক্ত বের হচ্ছিল। মাথায় লাত্থি দিলে ছিটকে ছিটকে রক্ত বের হচ্ছিল,যার জন্য পুরা কক্ষে ছোপ ছোপ রক্ত দেখতে পাচ্ছিলেন ফ্লাঃ লেঃ আলম। উনি এতোক্ষনে এরকম দলা দলা আর ছোপ ছোপ রক্তের কারন কি বুঝতে পারলেন!!

(আমরা অনেকে এখন মুক্তিযোদ্ধা আর তাদের নানা বীরত্ব নিয়ে অনেক কথা বলি। এর খুব অল্পই আমরা জানি। এমন হাজার হাজার মানুষের কাহিনী আমাদের অজানাই থেকে যাবে। আমি জানিনা এই ছেলের কাহিনীটা বীরত্বের সংজ্ঞায় পড়ে নাকি। আমার মনে হয় বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রেই ২৬ মার্চের পর আমি যুদ্ধে যাব,দেশ মুক্ত করবো এমন কিছু আগে ভেবে রেখে,এরপর ধীরেসুস্থে মুক্তিযোদ্ধা হয়নি। সময় ঠিক করে দিয়েছে কে কি করবে। যার মন যেটা বলেছে সে তাই করেছে। সেই অদ্ভুত সময়ে কে কোন পথ অবলম্বন করবে সেটা নির্ধারিত অথবা আগে থেকে বলে দেবার মত করে কিছু ঘটেনি, তবে যে অন্তর থেকে আসলে যেমন, ঠিক সেই পথেই গেছে। ভীরুতার জন্য অন্যায়ের সমর্থনও অপরাধ। কেউ ভয়ে পাকিস্তানীদের সমর্থন করলো,সে জন্য যেমন সে নিজের কাজের জন্য ক্ষমা পেতে পারেনা,আবার তেমনি দেশের জন্য কিছু করবার অথবা যুদ্ধে যাবার ক্ষমতা থাকার পরেও কেউ যদি সেটা না করে থাকে,তবে সেটাও একরকমের অপরাধের মতই। এমন মানুষগুলোর জন্য দেশের উন্নতি থেমে থাকে। এরা সুবিধাবাদী। নিজের ব্যাপার দেখবে,কিন্তু দেশ কিংবা অন্যের বিপদে এরা কোন কাজে আসেনা। আবার যেমন এই ছেলেটা,সে ঠিক তাই করেছে যা তার কাছে ঠিক মনে হয়েছে। সে হয়তো জানতোও না রাজনীতি আসলে কি অথবা দেশে ঠিক কি হচ্ছে। শেখ মুজিবুর রহমানের নাম শুনে তাঁকে অনেক বড় কেউ মনে করতো,কিন্তু আসলে সে কেমন সেটা বিচার করবার ক্ষমতাও হয়তো তার ছিলনা। তবে নিজের মানুষ,নিজের মাটিকে যে ভালোবাসতে হয়, সেটা সে উপলব্ধি করতো। আর একটা মানুষ শুধু অনেক ডিগ্রী নিলে অথবা জ্ঞান অর্জন করলেই বড় মানুষ হয়না। বড় মনের মানুষ হতে গেলে কিংবা মানুষ হিসেবে নিজের উতকর্ষতার জন্য তার বোধ উন্নত হতে হয়,নিজের মানবিক গুনাবলী উন্নত করতে হয়,ভুল শুদ্ধের সঠিক উপলব্ধির প্রয়োজন হয়। )

চলবে…

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 75 = 85