কিলো ফ্লাইট: মেঘ ফুঁড়ে ওরা এসেছিলো বজ্র হয়ে (Kilo Flight – They Were The Fire From The Clouds) – দ্বিতীয় পর্ব


পর্ব – ১ এখানে
১০ মে, ১৯৭১
পিএএফ হেডকোয়ার্টার, পেশোয়ার

উইং কমান্ডার এ জি মাহমুদের পোস্টিং এখন পেশোয়ারের বিমান বাহিনী সদরদপ্তরের প্রসাশনিক বিভাগে। ২৫শে মার্চের পর থেকেই সকল বাঙ্গালী পাইলট গ্রাউন্ডেড অবস্থায় আছেন এবং বাকী সকলকে বিভিন্ন কম গুরুত্বপূর্ন পদে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। রিসালপুরের পাকিস্তান এয়ারফোর্স একাডেমীতে ছিলেন ৫৬ জন ফ্লাইট ক্যাডেট, তাদের প্রশিক্ষণ স্থগিত করে নজরবন্দী রাখা হয়েছে। তাদের ঢাকা পাঠাবার জন্য ব্যবস্থ্যা নিতে উইং কমান্ডার মাহমুদকেই দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। উনি জানতে পারলেন ঢাকায় অবতরনের সাথে সাথেই তাদের সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেয়া হবে যাতে তাদের সহজেই নির্মুল করে ফেলা যায়। তা নাহলে তারা মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিতে পারে।

এয়ার কমোডোর এনাম ছিলেন এয়ার অফিসার কমান্ডিং (এওসি) ইস্ট পাকিস্তান। উনার সাথে আগের পরিচয়ের সুত্র ধরে তার কাছেই ফ্লাইট ক্যাডেটদের সুরক্ষার জন্য কিছু একটা করা যেতে পারে বলে উনি মনে করলেন। ইস্ট পাকিস্তান এয়ার কমান্ডের কাছে তাদের সুরক্ষার সকল ব্যবস্থ্যা নিতে উনি এওসি ইস্ট পাকিস্তান বরাবর একটি বার্তাপত্র লিখে পাঠালেন, “IMMEDIATE” প্রাধিকার দিয়ে।


পর্ব – ১ এখানে
১০ মে, ১৯৭১
পিএএফ হেডকোয়ার্টার, পেশোয়ার

উইং কমান্ডার এ জি মাহমুদের পোস্টিং এখন পেশোয়ারের বিমান বাহিনী সদরদপ্তরের প্রসাশনিক বিভাগে। ২৫শে মার্চের পর থেকেই সকল বাঙ্গালী পাইলট গ্রাউন্ডেড অবস্থায় আছেন এবং বাকী সকলকে বিভিন্ন কম গুরুত্বপূর্ন পদে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। রিসালপুরের পাকিস্তান এয়ারফোর্স একাডেমীতে ছিলেন ৫৬ জন ফ্লাইট ক্যাডেট, তাদের প্রশিক্ষণ স্থগিত করে নজরবন্দী রাখা হয়েছে। তাদের ঢাকা পাঠাবার জন্য ব্যবস্থ্যা নিতে উইং কমান্ডার মাহমুদকেই দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। উনি জানতে পারলেন ঢাকায় অবতরনের সাথে সাথেই তাদের সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেয়া হবে যাতে তাদের সহজেই নির্মুল করে ফেলা যায়। তা নাহলে তারা মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিতে পারে।

এয়ার কমোডোর এনাম ছিলেন এয়ার অফিসার কমান্ডিং (এওসি) ইস্ট পাকিস্তান। উনার সাথে আগের পরিচয়ের সুত্র ধরে তার কাছেই ফ্লাইট ক্যাডেটদের সুরক্ষার জন্য কিছু একটা করা যেতে পারে বলে উনি মনে করলেন। ইস্ট পাকিস্তান এয়ার কমান্ডের কাছে তাদের সুরক্ষার সকল ব্যবস্থ্যা নিতে উনি এওসি ইস্ট পাকিস্তান বরাবর একটি বার্তাপত্র লিখে পাঠালেন, “IMMEDIATE” প্রাধিকার দিয়ে।

এরপর তাদের ভাগ্যে কি হয়েছিলো সেভাবে হয়তো উনার জানা হয়ে ওঠেনি। কিন্তু কেউ নিশ্চয়ই জানবে একদিন…

১৭ মে, ১৯৭১
স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী কার্য্যালয়
বালিগঞ্জ, কলকাতা

গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকার প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদের সাথে দেখা করতে এসেছেন। গত ১৫ মে উনি তৃতীয়বারের প্রচেষ্টায় আগরতলা পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছেন আরো কিছু সদস্য এবং তাদের পরিবার সহ। তাকে একটী বিমানে পরেরদিন কলকাতায় উড়িয়ে আনা হয়। এটাই তার অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের প্রধান কর্মকর্তাদের সাথে প্রথম আনুষ্ঠানিক সাক্ষাত। উনি তাজউদ্দীন আহমেদকে বললেন,

– “স্যার, আমরা বিমান বাহিনীর বেশ কয়জন উর্ধতন কর্মকর্তা ঢাকা থেকে পালিয়ে আসতে পেরেছি। এর মধ্যে বেশ কয়জনেরই যুদ্ধের অভিজ্ঞতা আছে। আরও বেশ অনেকজন এয়ারম্যান পালিয়ে নানা সেক্টরে যুদ্ধ করছে যাদের বিমান রক্ষণাবেক্ষণে দক্ষতা আছে। দেশের জন্য আমরা যে কাজই দরকার করতে রাজি, তবে মুক্তিযুদ্ধে বিমান বাহিনীর প্রয়োজনীয়তাও আছে বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমাদের যদি কিছু বিমান আর একটা এয়ারফিল্ডের ব্যবস্থা করে দিতে পারতেন তবে খুব ভালো হত।“

তাজউদ্দীন আহমেদ উত্তর দিলেন,

– “আমি যথাসাধ্য চেস্টা করবো।“

এর আগে তিনি কর্নেল ওসমানীকেও এই ব্যাপারে বলেছিলেন। তবে সেই সময়ের পরিস্থিতিতে ব্যাপারটা সম্ভব হবেনা বলে কর্নেল ওসমানী তাকে জানিয়ে দেন। তবে নীতিনির্ধারক হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদের মাধ্যমে ব্যাপারটি ভারত সরকারের উপর মহলে যেতে পারে ভেবে নিয়ে তিনি চেস্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।


গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকার

মে মাস (মাঝামাঝি কোন সময়), ১৯৭১
ঢাকা, পূর্ব পাকিস্তান
ফ্লাঃ লেঃ শামসুল আলমকে ছেড়ে দেবার জন্য বলা হয়েছে। তাকে নিয়ে আসা হয় অন্য আরেক জায়গায়। ওখানে আগের মতই দিন কাটতে লাগলো। নিয়মিত মারামারি আর অন্য সময় মেঝেতে কোনমতে শুয়ে ঘুমিয়ে থাকা অথবা ঘুমাবার চেষ্টা করা ছাড়া অন্য কিছু করার ছিলোনা।

এরমাঝে এয়ারফোর্সের এক লিগ্যাল অফিসার আসলেন উনার কাছে। উনি তাকে জানালেন উনার বিরুদ্ধে কোর্ট মার্শাল হচ্ছে এবং তাকে পিএএফ এক্টের সেকশন ২৩ দ্বারা দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। এরপর উনার কাছ থেকে কিছু কাগজ সই করিয়ে নিয়ে যায় আর অভিযোগ পড়ে শোনায়। উনি জানতেন না যে সেকশন ২৩ এ কি আছে। এরমধ্যে অনেক ঘটনা ঘটেছে সেকশন ২৩ এ কি আছে সেটা জানবার প্রচেষ্টায়,যেগুলো হয়তো অপ্রাসঙ্গিক। শেষ পর্যন্ত একটা নিউজপেপার হাতে পাবেন উনি,যেটার একপাশে কৌশলে ফটোকপি করা ছিলো “পিএএফ এক্টের সেকশন ২৩”। ,যাতে বলা আছে, এর শাস্তি হচ্ছে মৃত্যুদন্ড অথবা যাবজ্জীবন। উনি ভাবলেন,হয় উনার জীবন এভাবেই কেটে যাবে। নয়তো কিছুদিনের মধ্যেই মারা যাবেন। উনি এর যেকোন একটার চেয়ে জীবনের ঝুঁকি নেয়াটাই ভালো মনে করলেন।

মে (শেষ সপ্তাহ), ১৯৭১
দিল্লী, ভারত

প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং প্রধান সেনাপতিকে নিয়ে দিল্লী সফরে গেছেন। এখানে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সাথে মুক্তিযুদ্ধে যগ দেয়া সদস্য, বর্তমান পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন আলোচনার পর একটি প্রতিবেদন পেশ করা হয়। এখানে প্রধান সেনাপতি তার মতামত তুলে ধরেন যাতে তিনি উল্লেখ করেন,

“১৯৭১ সালের মে মাসে লিখিতভাবে প্রদত্ত চাহিদার পরবর্তী সময়ে শত্রুদের বিমানঘাটি থেকে পালিয়ে এসে গ্রুপ ক্যাপ্টেন ও উইং কমান্ডার পদবীর চাকুরীরত দুজন জেষ্ঠ্য অফিসার এবং বেশ কয়জন আধুনিক জঙ্গীবিমানের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন জঙ্গী বৈমানিক এবং প্রায় দুইশত গ্রাউন্ড ক্রু বাংলাদেশ বাহিনীতে(মুক্তিবাহিনী) যগ দিয়েছেন। দিল্লীতে যাচাই শেষে বর্তমানে অফিসারদের মাঠপর্যায়ে ষ্টাফ অফিসার হিসেবে অপব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়া প্রাক্তন পিআইএর কিছু ক্যাপ্টেন/বৈমানিক আছেন যাদের ফ্লাইংয়ে নিযুক্ত না রাখলে তাঁরা তাঁদের উপযুক্তরা হারাবেন। শত্রুকে আঘাত হানার জন্য এঁদের আকাশে উড্ডয়নের পথ খুঁজে বের করতে হবে। “

জুন (হয়তো প্রথম সপ্তাহ), ১৯৭১
ঢাকা, পুর্ব পাকিস্তান

ফ্লাঃ লেঃ শামসুল আলমদের ১ দিন কিংবা দুইদিন পর পর গোসলের জন্য কিছুটা সময় দেয়া হতো। গায়ে দুর্গন্ধযুক্ত কাউকে পেটাতে আসার সময় সেই গন্ধ নাকে আসলেও তো খারাপ লাগে,এজন্যই হয়তো তারা আমাদের গোসলের সুযোগ দিত। আর টয়লেটও ছিল সেখানেই। উনি লক্ষ্য করে দেখলেন,গোসলের জায়গার টিউবওয়েলের সামনে কাঁটাতারের ফেন্সিং আছে,তবে সামনের প্রায় ফাঁকা। আশেপাশে প্রায় কিছুই নেই। আর কিছুদিন যাবার পর দেখলেন যে প্রহরীরা যারা উনাদের নিয়ে যেত সেখানে,তারাও খানিকটা ঢিলেঢালা হয়ে গেছে। উনারা গোসলের সময়টায় কি করছেন সেটা সেভাবে খেয়াল করতোনা। উনি এমনই কোন কিছুর সুযোগ নিয়ে একদিন ভোরে গোসলের সময় প্রহরী একটু অসতর্ক হতেই কাঁটাতারের ফাঁক গলে শরীর বের করে দিয়েই ছুটতে শুরু করলেন। পেছনে কি হয়েছে উনার জানা হবেনা।

প্রায় ঘন্টাখানেক এভাবে ছুটবার পর উনি সম্ভবত মিরপুরের দিকের কোথাও আসবেন (উনাকে সম্ভবত মোহাম্মদপুরের আশেপাশের কোন জায়গায়ই রাখা হয়েছিল)। উনার পকেটে একটা পয়সাও নেই, উনি এক ট্যাক্সিওয়ালাকে দেখতে পেলেন। উনি ট্যাক্সিওয়ালাকে বললেন উনাকে সেগুনবাগিচায় নিয়ে যাবার জন্য। উনার পোশাকের অবস্থা দেখে সে দ্বিধায় ছিল। এরপর কি মনে করে জানি রাজী হয়ে গেলো। এরপর উনি বাসায় চলে আসলেন আর ভাড়া মিটিয়ে দিলেন। বাসায় তাকে দেখে সবাই তো অবাক, তারা কেউ জানতোনা যে উনি এতোদিন ধরে দেশে। উনি অল্প কিছু ঘটনা তাদের খুলে বললেন। এরপর উনার কিছু জিনিস আর অল্প কিছু টাকা গুছিয়ে নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে চলে যাবেন পরিচিত এক জায়গায়। আর পরিবারের অন্যদের উনার সাথে সেখানে গোপনে যোগাযোগ করতে বললেন। আর বললেন বাসায় কেউ এলে যাতে বলা হয় তারা উনার কোন খোঁজ জানেনা। সেদিনই উনার বাসায় তল্লাশী করতে আসবে পাকিস্তানীরা। উনার কথা জিজ্ঞেস করাতে পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হবে উনি পশ্চিম পাকিস্তানে আছেন। উনি যে দেশে এসেছেন এ ব্যাপারে তারা কিছুই জানেনা বলে কান্নাকাটি শুরু করে দেবে। এরপর পাকিস্তানীরা চলে যাবে।

এর কিছুদিন গোপন স্থানে থেকে বাসায় ফিরে এসে পরিচিত কিছু মানুষের মাধ্যমে সবকিছু ঠিক করে ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা দেবেন ফ্লাঃ লেঃ শামসুল আলম। সেটা এক অন্য অধ্যায়।

আগস্ট (প্রথম সপ্তাহ), ১৯৭১
৮, থিয়েটার রোড, কলকাতা
অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের কার্য্যালয়

সকাল ১১টা। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ জরুরীভাবে তলব করেছেন গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকারকে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ বাহিনীর প্রথম কনভেনশনাল ব্রিগেড ‘জেড ফোর্স” গঠন করা হয়ে গেছে যার অধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমান। এ মাসেই মেজর শফিউল্লাহ অধিনায়কত্বে দ্বিতীয় ব্রিগেড “এস” ফোর্স গঠিত হয়েছে (সেপ্টেম্বরে মেজর খালেদ মোশাররফের অধীনে “কে” ফোর্স নামে তৃতীয় ব্রিগেড গঠিত হবে। উনার কার্য্যালয়ে পৌঁছে তিনি দেখতে পান ডিফেন্স সেক্রেটারি কে বি লাল, আরেক ব্যুরোক্র্যাট অশোক রায় এবং ভারতীয় বিমান বাহিনীর পুর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার এয়ার মার্শাল হরিচান্দ দেওয়ানকে। । বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তাজ উদ্দিন আহমেদ, কর্ণেল ওসমানী আর উনি নিজে উপস্থিত ছিলেন। তাজউদ্দীন আহমেদ উনাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

– “উনারা বাংলাদেশ বিমান বাহিনী গঠনের ব্যাপারে আপনার সাথে কথা বলতে আগ্রহী।“
কে বি লাল তাকে বললেন,

– “ এ মুহূর্তে তো আমাদের আপনাদেরকে বিমান দেবার সামর্থ্য নেই। তবে আপনাদের যদি আপত্তি না থাকে তবে আমাদের স্কোয়াড্রনের সাথে ফ্লাই করতে পারেন।“
উত্তরে এ কে খন্দকার বললেন,

– “আপনাদের সাথে ফ্লাই করতে গেলে আমাদের বৈমানিকেরা কোন দেশের নিয়ন্ত্রনে থাকবে? কোন দেশের আইন মেনে চলবে? ভারতের আইন না বাংলাদেশের আইন।“

উত্তরে কে বি লাল বললেন,

– “স্বাভাবিকভাবেই ভারতের আইন মেনে চলতে হবে।“

এ কে খন্দকার এরপর তাজউদ্দিন আহমেদকে বললেন,

– “সবচেয়ে ভালো হবে যদি উনারা কিছু বিমান, সরঞ্জাম এবং প্রশিক্ষনের জন্য একটি এয়ারফিল্ডের ব্যবস্থ্যা করে দেন। আমাদের নিজের বৈমানিক এবং গ্রাউন্ড ক্রুরাই নিজেদের অভিযান এবং রক্ষনাবেক্ষন কাজ চালাতে পারবে।“

এর বাইরে সেদিন আর তেমন কোন কথা হয়নি।

আগস্ট (তৃতীয় সপ্তাহ), ১৯৭১
আলীপুর, কলকাতা

এয়ার চিফ মার্শাল প্রতাপ চন্দ্র লাল (জন্ম এলাহাবাদে কিন্তু উনার মা ছিলেন বাঙ্গালী) চা পানের দাওয়াত দিয়েছেন এ কে খন্দকারকে নিজ হোটেলে। মিসেস ইলা লালও ( বাংলাদেশের কুমিল্লার মেয়ে ছিলেন) সেখানে উপস্থিত আছেন। আলোচনার একপর্যায়ে মুক্তিবাহিনীর এয়ার উইং গঠনের বিষয়টিও উঠে আসে। যদিও পি সি লাল এ ব্যাপারে নানা জটীলতার কথা তুলে ধরেন। একপর্যায়ে এ কে খন্দকার বলেন,

– “স্যার, এখন তো গেরিলা যুদ্ধ চলছে। পরে একসময় আমাদের বিমানও চালাতে হতে পারে। তখন বিমানের প্রথম আক্রমনটি আমরাই করতে চাই।“

এয়ার চীফ মার্শাল পি সি লাল মৃদু হাসলেন, মুখে কোন উত্তর দিলেননা।

(বিমান বাহিনি গঠনের পেছনে ক্রিয়ানক হিসেবে কাজ করেন তৎকালীন ভারতের বিমানবাহিনীর প্রধান পিসি লালের স্ত্রী ইলা লাল। নিজে বাঙালি হবার কারণে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি ইলা লালের সহানুভূতি ছিল সেই প্রথম থেকেই। এরই মাঝে একদিন হঠাত কলকাতায় এলে ইলা লালের সাথে ঘনিষ্ঠতা হয় বাঙালী বৈমানিক ফ্লাইট লেফট্যানেন্ট সদরুদ্দিনের। তিনি ইলা লালকে বুঝিয়ে বলেন আমাদের নিজস্ব বিমানবাহিনীর প্রয়োজনীয়তার কথা। পরবর্তীতে ইলা লালই তার স্বামী প্রতাপ চন্দ্র লালকে বাধ্য করেন এই ব্যাপারে আশু পদক্ষেপের জন্য।)

তবে এরমধ্যেই ভারতীয় সরকারের সাথে নানা পর্যায়ের আলোচনায় বাঙ্গালী প্রশিক্ষিত বৈমানিকদের ব্যবহারের ব্যাপারটি আসে। এরপাশাপাশি বিদেশী বাঙ্গালী কুটনোইতিকরা যারা পক্ষত্যাগ করেছিলেন, তাদের মাধ্যমে নিজস্ব বিমান কেনার প্রস্তাবও আসতে থাকে। কিন্তু তৎকালীন সময়ের বাস্তবতায় সেইসব কোনভাবেই সম্ভব ছিলোনা। একটি ছোট বিমানের দাম এই বর্তমান যুগেই যেখানে কোটি কোটি টাকা, তখনও এরচেয়ে কম ছিলোনা। যা বাংলাদেশ সরকারের সেই পরিস্থিতিতে ক্রয় করা অসম্ভবই ছিলো।

আগস্ট (শেষ সপ্তাহ), ১৯৭১
৮, থিয়েটার রোড, কলকাতা

এয়ার চীফ মার্শাল পি সি লাল প্রশিক্ষিত ও যোগ্য বৈমানিকদের ব্যাপারে একটি পত্র পাঠিয়েছেন। সেটা নিয়েই আলোচনা চলছে বাংলাদেশ সরকারের ক্রীড়ানকদের মধ্যে। উনি দুটি প্রস্তাব পাঠিয়েছেন,

১। বাঙ্গালী বৈমানিকদের ভারতীয় বিমান বাহিনীর অপারেশনাল ইউনিটগুলোতে আত্মীকরনের মাধ্যমে ব্যবহার করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে সেইসকল অফিসারদের ভারতীয় বিমান বাহিনীর নিজস্ব নিয়ম শৃংখলার বিধিবিধান এবং আইন মেনে চলতে হবে।

২। দুটি পুরনো ভ্যাম্পায়ার জঙ্গী বিমান প্রদানের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী গঠন করা যেতে পারে। যা বাংগালী বৈমানিক এবং গ্রাউন্ড ক্রুদের দ্বারা পরিচালিত হবে।

এ ব্যাপারে একটি নোটশিটের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের মতামত জানানো হয়। যাতে দুটি প্রস্তাবই কৌশলী উত্তরের মাধ্যমে এড়িয়ে যাওয়া হয় এবং এর বদলে নিজেদের জন্য কিছু বিমান আর এয়ারফিল্ড চাওয়া হয়।

প্রথম প্রস্তাবের ব্যাপারে নোটশিটে এ কে খন্দকার মত দেন যে, যেহেতু বাঙ্গালী বৈমানিকেরা পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে দীর্ঘ্যদিন পশ্চিমা অথবা আমেরিকান বিমান চালনা করেছেন কিন্তু ভারতীয় বিমান বাহিনীতে সেসব ব্যবহার করা হয়না, তাই এই প্রস্তাব বাস্তবসম্মত নয়। যেহেতু এগুলোর পরিচালন পদ্ধতি এবং অন্যান্য শট্যান্ডার্ড প্রসিডিরের মধ্যে তেমন মিল নেই।

আবার দ্বিতীয় প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে বলা হয়, বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর অন্তত এমন কিছু বিমান দরকার যা যুগের সাথে মানানসই হবে যদি তা যুগের চেয়েও আধুনিক না হয়। ভ্যাম্পায়ার বিমান সম্পর্কে বলা হয় যে এটি অত্যন্ত পুরোনো বিমান যা ১৯৪৬ সালে প্রথম ব্যবহার করা হয়েছিলো। এই বিমানের গতি এবং সমরাস্ত্র বহনের সক্ষমতা একেবারেই কম যা পাকিস্তানীদের ব্যবহৃত স্যাবর এফ-৮৬ বিমানের সাথে কোন ভাবেই তুলনীয় নয়। এরচেয়ে এমন কিছু বিমান দেয়া বাস্তবসম্মতহবে যা এখনো আউট ডেটেড হয়ে যায়নি। এই ব্যাপারে ভারতীয়দের কাছে হান্টার জঙ্গী বিমান অথবা এই ধরনের কোন বিমান প্রদানের অনুরোধ করা হয়।

এই মতামত সম্ভবত ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী পর্যন্ত পৌছেছিলো।

সেপ্টেম্বর (প্রথম সপ্তাহ), ১৯৭১
৮, থিয়েটার রোড, কলকাতা

গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকার আজকে খুবই উৎফুল্ল। এইমাত্র উনাকে জানানো হয়েছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ বিমান বাহিনী গঠনের ব্যাপারে সম্মত হয়েছেন।

এরপর কিছুদিনের মধ্যেই একটি কানাডার তৈরী অটার বিমান, একটি ফ্রান্সের নির্মিত এলুয়েট-III হেলিকপ্টার এবং একটি ডিসি-৩ (ডিএইচ-৪৭) ডাকোটা বিমান পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশী বিমানসেনাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরমধ্যে ডিসি-৩ ডাকোটা বিমানটি যোধপুরের মহারাজা ভারত সরকারের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর জন্য উপহার হিসেবে প্রদান করেন যা তিনি ব্যক্তিগত পরিবহরের কাজে ব্যবহার করতেন।

বিমান বাহিনীর জন্য ঘাটি নির্বাচন করা হলো নাগাল্যান্ডের ডিমাপুরকে। এটি ছিলো চীন ভারত সীমান্তের কাছাকাছি ভারতের সবচেয়ে পুবের ঘাটি জোড়হাট এয়ার বেসের অধীনে। এটি নির্বাচনের ব্যাপারে বেশ কিছু ব্যাপার বিবেচনায় আনা হয়ঃ

১। এটি নিয়মিত ব্যবহৃত হতনা। সপ্তাহে একটি মাত্র ফ্লাইট সাধারনত এখানে আসতো রসদ এবং সৈন্য নিয়ে। তাই এটাকে বাংলাদেশ বিম্ন বাহিনীর জন্য ছেড়ে দিলেও অপারেশনাল কার্যক্রমে কোন ব্যাঘাত ঘটতোনা।

২। এর বাইরে এতে ছিলো একটি ৫০০০ ফুট রানওয়ে, যা ভারতীয়দের প্রদানকৃত সবগুলো বিমানের জন্যই যথেষ্ঠ ছিলো এবং রানওয়েটি ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত ছিলো।

৩। এতে একটি কাঠের তৈরী এটিসি টাওয়ার ছিলো যা দরকারের সময় ব্যবহার করা সম্ভব ছিলো।

৪। এটি পাকিস্তানী রাডার কাভারেজের ঠিক বাইরে ছিলো, যে কারনে দিবা রাত্রি টানা উড্ডয়ন প্রশিক্ষন এবং অন্যান্য বিষয় পাকিস্তানীদের জজ্রের বাইরে থাকতো।

৫। এটি ছিলো লোকালয়ের অল্প বাইরে এবং কাছাকাছি একই আর্মি ইউনিট ছিলো, যে কারনে কোন কার্যক্রম সাধারনের নজরে আসতোনা এবং যেকোন অন্তর্ঘাতমুলক কাজে গ্রাউন্ড ট্রুপসের সাপোর্ট স্বল্প সময়ে পাওয়া সম্ভব ছিলো।

(এর বাইরে বিমান প্রদানের ব্যাপারে ভারতীয়রা বেশ কিছু বিষয় বিবেচনায় নিয়েছিলো। প্রধানত, পাকিস্তান বিমান বাহিনী (এলিউট এবং ডিসি-৩) এবং কৃষি অধিদপ্তরের অধীনে (ডাকোটা) এ ধরনের বিমান ছিলো। যার ফলে যদি কোন কারনে পূর্ব পাকিস্তানের অভ্যন্তরেও এগুলো বিধ্বস্ত হতো তবেও পাকিস্তানীরা এগুলো ভারতীয় বিমান বলে দাবী করতে পারতোনা সন্দেহ ব্যতিরেকে। এছাড়াও ভারতীয়রা প্রথমত রাডার এড়িয়ে রাত্রীকালীন মিশনের মাধ্যমে পাকিস্তানীদের আক্রমন করতে চেয়েছিলো মুক্তিবাহিনীর মাধ্যমে। কারন, পাকিস্তানী স্যাবর যুদ্ধবিমানের “নাইট ফ্লাইং ক্যাপাবিলিটি” ছিলোনা। তাই এসব বিমানের রাত্রীকালীন উড্ডয়নের সময় এন্টি এয়ারক্রাফট গান ছাড়া অন্য কোনকিছুর থেকে হুমকীর মুখে পড়ার সম্ভাবনা ছিলোনা। আর যেহেতু সকল ধরনের নেভিগেশন বাতি নিভিয়ে মিশন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা ছিলো, সেটাও এন্টি এয়ারক্রাফট আর্টিলারী গান অপারেটরদের অনেকটা আন্দাজেই করতে হতো। পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষনা ছাড়া ভারতীয়দের পূর্ব পাকিস্তানের ভেতর আক্রমনে যাওয়া কঠিন ছিলো, কারন এতে করে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়তে হতো।)

২৬ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১
বাগডোগরা এয়ার বেস, পশ্চিমবঙ্গ
১১২ নং হেলিকপ্টার ইউনিটের ফ্লাঃ লেঃ চন্দ্র মোহন সিংলাকে ইউনিটের সিও স্কোঃ লীঃ নরেশ (পরে অবঃ এয়ার মার্শাল) ডেকে পাঠিয়েছেন। ফ্লাঃ লেঃ সিংলা ইউনিটের চারজন ফ্লাইং ইন্সট্রাকটারের একজন এবং সবচেয়ে জুনিয়র।

স্কোঃ লীঃ নরেশ বললেন,

– “কাল সকালে তোমাকে তেজপুর যেতে হবে।“

ব্যক্তিগত এবং প্রসাশনিক কারন দেখিয়ে কিছুটা গরিমসি করলেও কোন কিছু শোনা হলনা। কিছুদিন পরই তার ফ্লাইং ক্যাটাগরি আপগ্রেড হবার কথা আর অল্প কিছু ঘন্টা ফ্লাই করলেই। সেইসাথে বিদেশ সেবা মেডেল পাবেন ভুটানে কয়টা মিশন করতে পারলেই। আর শেষ কারন হিসেবে দেখালেন, উনি সবচেয়ে জুনিয়র, তবুও উনিই কেন? কিন্তু কোন কিছুই শোনা হলনা।

ফিরে এসে আবার সাহস করে সিওর অফিসে গেলেন উনি। আবার কারন দেখিয়ে এড়াবার চেস্টা করলেন। কিন্তু স্কোঃ লীঃ নরেশ সব হাসিমুখে শুনলেন জবাব দিলেন,

– “A Dakota will pick you up at 0800 hrs tomorrow”

নিয়তি মেনে নিয়ে উনি জিজ্ঞেস করলেন,

– “ আমার এসাইনমেন্ট কি আর কতদিনের জন্য আমি লাগেজ গোছাবো?”

স্কোঃ লীঃ নরেশ বললেন,

– “ ৪-৫ সপ্তাহের জন্য প্যাক কর তোমার বিছানা পত্র সহ। তেজপুরে সব জানতে পারবে।“

ফ্লাঃ লেঃ সিংলা ভাবতে লাগলেন, ইউনিটে চারজন ইন্সট্রাকটর আছে। এরমধ্যে উনি এমন কি অপরাধ করলেন যার জন্য উনাকেই যেতে হচ্ছে। নিশ্চিত ওখানে গাদা গাদা ফাইল উনার জন্য অপেক্ষা করছে। যুদ্ধ প্রায় অবশ্যম্ভাবী, অন্যরা যেখানে যুদ্ধে অংশ নেবে নিশ্চিত সেখানে উনি কোন পাপ কিংবা ক্রুটির কারনে এই পরিনতি হচ্ছে ভেবে পাচ্ছিলেননা।

উনি তখনও জানতেন না, নিয়তিই তাকে সুযোগ করে দিচ্ছে এমন এক ইতিহাসের অংশ হবার যেটা নিয়ে জীবনের বাকী পুরোটা সময় বুকে অন্যরকম গর্ব ধারন করবেন!!

চলবে…

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

79 − = 75