ভালো বাসা – মন্দ বাসা

আজ বিকালে মেঘলা আকাশ দেখেই ইচ্ছে হচ্ছিলো আজ অফিস থেকে হাতিরঝিলের ভিতর দিয়ে হেঁটে হেঁটে বাসায় যাব । যেই ভাবা সেই কাজ, তবে যখন অফিস থেকে বের হলাম তখন গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছিলো, তাই হেঁটে বাসায় ফেরার ইচ্ছেটা দ্বিগুন হয়ে গেল, হাতে যেহেতু ছাতা আছে তাই রওনা হয়ে গেলাম । অফিস থেকে বের হয়ে কিছুদূর যাওয়ার পরে আমার এক বন্ধুর সাথে দেখা, আমরা পাশাপাশি এলাকায় থাকি । তাকে আমার মনের ইচ্ছেটা বলার পরে সেও রাজী হলো, অতঃপর দুই বন্ধু একসাথে গন্তব্যে রওনা হলাম ।

যেহেতু বৃষ্টি হচ্ছিলো তাই আজকে হাতিরঝিলের পরিবেশটা একটু অন্যরকম ছিলো, কিছুটা নিরিবিলি, লোকজন অনেক কম । দুই বন্ধু কথা বলতে বলতে নিরিবিলি হাঁটছিলাম, হঠাৎই একটু দূর থেকে একটি দৃশ্য দেখে দুজনে হাঁটা থামিয়ে দাড়ালাম ।
দৃশ্যটা ছিলো এরকম- একটি মেয়ে একটা বেঞ্চে বসে আছে, আর তার সামনে দাড়িয়ে একটা ছেলে ঐ মেয়েটিকে মাথায়-গালে চড়-থাপ্পর মারছে । এটা দেখে আমরা হাঁটার গতি আরেকটু কমিয়ে দিয়ে ওদের দিকে এগোতে লাগলাম, বিষয়টা কি সেটা একটু বোঝার চেষ্টা করা আরকি । কিছুটা কাছাকাছি আসতেই ওদের দুয়েকটা কথা কানে এলো, তাতে বুঝলাম এরা প্রেমিক-প্রেমিকা । আরেকটু কাছে আসতেই ওরা আমাদের দেখলো, তারপরে ছেলেটা চুপ করে মেয়েটার সামনে দাড়িয়ে রইলো, আর মেয়েটা দুহাত দিয়ে গাল চেপে ধরে বসে রইলো ।
আমি আমার বন্ধুকে চুপি চুপি বললাম- চল কিছু একটা বলি ।
আমার বন্ধু বললো- না থাক, এটা ওদের পার্সোনাল বিষয় ।
আমি বললাম- তাতে কি ? এভাবে মেয়েটাকে মারছে, আর এটাতো পাবলিক প্লেস, এখানে বসে এসব কি !
বন্ধু বললো- না থাক….
এভাবে আমারা ওদের পাশ কাটিয়ে একটু চলে আসতেই ছেলেটি মেয়েটিকে বললো- তুই আমাকে চিনিস ? একদম মেরে ফেলব তোরে…
বলেই বেশ জোরে সোরেই একটা চড় মারলো, চড় মারার শব্দটা আমার কান অবধি পৌঁছালো ।

এবার আমি আমার বন্ধুকে বলালাম- তুই না গেলে নাই, কিন্তু আমি বিষয়টা বুঝতে চাই । বলেই আবার ওদের কাছে ফিরে আসলাম, আমার বন্ধুও আমার সাথে আসলো ।
আমি মেয়েটিকে জিজ্ঞাসা করলাম- কি হয়েছে আপু ? কোনো সমস্যা ?
মেয়েটি মাথা উচু করে আমাদের দিকে তাকিয়ে কিছু বললো না, আমি খেয়াল করলাম মেয়েটা কাঁদছে ।
ছেলেটা বললো- এটা আমাদের ব্যাপার, আপনারা আপনাদের কাজে যান ।
আমার বন্ধু বললো- সেটা ঠিক আছে আপনাদের ব্যপার, কিন্তু এটা পাবলিক প্লেস এখানে বসে আপনি একটা মেয়েকে এভাবে মারতে পারেন না ।
ছেলেটা বললো- আমার বউকে আমি মারবো না চুমা দেব সেটা আমি বুঝবো ।
এবার আমি বললাম- ইনি যে আপনার বউ তার প্রমান কি ? আর বউ হলেই যে তাকে এভাবে মারতে হবে সেই অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে ? তাছাড়া এটা পাবলিক প্লেস, আশে পাশেই বোধহয় পুলিশ আছে, ডাকবো তাদের ?
এবার দেখলাম ছেলেটা একবার আমার দিকে তাকিয়ে মেয়েটার দিকে তাকালো…..এরপর মেয়েটি যা বললো তাতে আমরা হতাশ হয়ে সেখান থেকে চলে এলাম ।
মেয়েটি বললো- ভাইয়া আপনারা এখান থেকে যান, শুধু শুধু ঝামেলা বাড়াইয়েন না । আমাদের ব্যাপার আমাদের দেখতে দেন, আপনারা চলে যান ।
আমি আর আমার বন্ধু চলে আসতে আসতে আমি বন্ধুকে বললাম- এবার বুঝলাম অধিকারের উৎস্য কি !
——————
এই হচ্ছে আমাদের দেশের মেয়েদের ভালোবাসা, এরা এই ভালোবাসাকে আকরে ধরে বেঁচে থাকতে চায়, ভালো থাকতে চায় । আসলেই কি এটাকে ভালো থাকা বলে ? সত্যিই কি এভাবে ভালো থাকা যায় ?

মাস দুয়েক আগে ধানমন্ডি লেকে ঘুড়তে গিয়েও একই রকম দৃশ্য দেখেছি । আমি আর আমার এক বন্ধু একপারে দাড়িয়ে আছি, অন্যপাড়ে এক ছেলে এক মেয়েকে মারছে, গলা টিপে ধরছে । অর মেয়েটি বারবার ছেলেটির পা ধরে চিৎকার করে বলছে, আমাকে ছেড়ে যেওনা, তুমি যা বলবা আমি তাই শুনবো, তবু সম্পর্কটা টিকে থাকুক । আর ছেলেটি মেয়েটিকে লাথি মারছে । এপাড়ে ওপাড়ে দাড়িয়ে মানুষগুলো সেই দৃশ্য উপভোগ করছে, মজা নিচ্ছে ।
এই যদি হয় কোনো মহাপুরুষের ভালোবাসার নমুনা, তবে সেই ভালোবাসাকে আকরে ধরে পড়ে থাকার অর্থ কি ?
——————
আমাদের দেশের মেয়েদের ক্ষেত্রে যেটা হয়, এরা কোনো ছেলের সাথে শারীরিক সম্পর্ক করাকে জীবনের সর্বস্ব দিয়ে দেয়া মনে করে । তাই কোনো ছেলের সাথে বিয়ের আগে শারীরিক সম্পর্ক করার পরে তারা তাকে ছাড়া অন্য কাউকে তাদের জীবনে ভাবতে পারে না । যেভাবেই হোক এই ছেলের সাথে সারজীবন থাকার চেষ্টা করে ।
আর আমি যে বিষয়টা খেয়াল করেছি, এই দুটি মেয়ের বয়সই সতের থেকে বিশের মধ্যে, যে সময়টাতে আবেগ সবথেকে বেশি কাজ করে ।

যেকোনো ভাবেই হোক এই ছেলেগুলো এই মেয়েদেরকে প্রেমের জালে ফাঁসায় । সেটা হতে পারে সুন্দর কথা আর ভালো ব্যবহারের মাধ্যমে, সুদর্শন চেহারা দিয়ে কিংবা কিছু মেয়েদের লোভকে কাজে লাগিয়ে । এরপর ঐ মেয়ের আবেগকে কাজে লাগায়, মানসিক ভাবে ব্লাকমেইল করে । তারপর মেয়েটি হোক ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় শুধু ছেলেটির প্রতি তার ভালোবাসা রক্ষার্থে শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে ।
প্রথমে একবার, এরপর একাধিকবার তারপর বারবার চলতে থাকে । কিন্তু ছেলেটি তো জানে তার আসল উদ্দেশ্য কি ! তাই যখন মেয়েটিকে পুরোপুরি নিংড়ানো হয়ে যায় তখনই ছেলেটি চলে যাবার কথা ভাবে ।
কিন্তু নিজের ভালো ইমেজ তো রক্ষা করতে হবে, তাই ছেলেটি চেষ্টা করে মেয়েটির কোনো দোষ খুজে বের করতে । যেকোনো অজুহাতে মেয়েটির সাথে খারাপ ব্যাবহার করতে শুরু করে, শারীরিক নির্যাতন করে এবং এর দোষও মেয়েটির উপরেই চাপায় । একটা সময়ে হয়তো মেয়েটি অতিষ্ঠ হয়ে এই সম্পর্ক ছেড়ে বেরিয়ে আসে । কিন্তু অধিকাংশ মেয়েই চায় জীবনের সকল সুখ শান্তি বিসর্জন দিয়ে এই কথিত ভালোবাসাকে আকড়ে ধরে পড়ে থাকতে, জানে তার ভবিষ্যত কি তারপরেও চায় সম্পর্কটা টিকে থাকুক।

আর যারা বের হয়ে আসে তারা জীবনের স্বাভাবিকতা ধরে রাখতে পারে না, চরম হতাশা নিয়ে জীবন যাপন করে । সম্পর্কটা ছেড়ে আসলেও ঐ সম্পর্কের দুঃসহ স্মৃতি তাদের উপর ভর করে, যেটা কাটিয়ে ওঠা অনেক কষ্টসাধ্য । কাটিয়ে ওঠা যায়না এমন নয়, কিন্তু সেক্ষেত্রে নিজের মধ্যে প্রবল ইচ্ছা শক্তি থাকতে হয় ।

যে বয়সটাতে মেয়েরা এই ধরনের সম্পর্কে জড়ায় সেখানে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা অনেক কঠিন, খুব কম মেয়েই পারে এই আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে । কিন্তু একটা পর্যায়ে যখন সম্পর্কটা আর ভালোবাসার থাকে না, খাদক এবং খাদ্যের সম্পর্কে পরিণত হয় তখন তাদের এই সম্পর্কের বেড়াজাল থেকে বেড়িয়ে আসার চেষ্টা করা উচিত । এই সম্পর্কটাকে মন থেকে ঝেড়ে ফেলার প্রবল চেষ্টা করা উচিত । জানি বিষয়টা অনেক কঠিন তবে অবশ্যই অসাধ্য নয় ।

প্রেম ভালোবাসা এগুলো থাকবেই, থাকুক । কিন্তু এই ধরনের সম্পর্ককে আমি কখনোই ভালোবাসার সম্পর্ক বলতে নারাজ । ভালোবাসার সম্পর্কে রাগ-অনুরাগ, মান-অভিমান থাকবে, মাঝে মাঝে দুজন দুজনার সাথে কথাও বন্ধ থাকবে। এতে ভালোবাসার গভীরতা বাড়ে, কাছে থাকার আকাঙ্খা বাড়ে । কিন্তু কোনো কারনে গয়ে হাত তোলা, গালাগালি করা ভালোবাসার অংশ হতে পারে না । ভালোবাসার সম্পর্কে শারীরিক সম্পর্কও থাকবে, এটা স্বাভাবিক । কিন্তু বিষয়টা যদি কোনো উদ্দেশ্যে কিংবা প্রেমিকার অসম্মতিতে হয় তাহলে সেটা কোনো অর্থেই ভালোবাসা নয় ।

তাই কোনো সম্পর্কে জড়ানোর আগে একশ বার ভাবুন । যদি তখন বুঝতে না পারেন তবে সম্পর্ক তৈরি হওয়ার পরে বোঝার চেষ্টা করুন যে, আপনার ভালোবাসার মানুষটি কখন কোন কথা কোন উদ্দেশ্য নিয়ে বলছে । আপনার আবেগকে সে কিভাবে কতটা কাজে লাগাচ্ছে, সেখানে তার কোনো স্বার্থ আছে কি না। আসল নকলের পার্থক্য একটু ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করলে, আবেগকে কম প্রশ্রয় দিয়ে চিন্তা করলেই বোঝা যায় । তাই নিজের যুক্তি বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে এধরনের সম্পর্ক থেকে বের হয়ে আসুন । নিজের জন্য, সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য, পরিবারে জন্য । মনে রাখা দরকার- দুষ্ট লোকের মিষ্টি কথা ।

ভালোবাসা টিকে থাকুক, ভালোবাসার মানুষেরা ভালো থাকুক, ভালোবাসা ভালো থাকুক ।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 30 = 31