ইসলাম এবং সহিষ্ণুতার ভবিষ্যৎ: একটি সংলাপ – স্যাম হ্যারিস এবং মাজিদ নাওয়াজ (৩)

ইসলাম এবং সহিষ্ণুতার ভবিষ্যৎ: একটি সংলাপ – স্যাম হ্যারিস এবং মাজিদ নাওয়াজ (১)
ইসলাম এবং সহিষ্ণুতার ভবিষ্যৎ: একটি সংলাপ – স্যাম হ্যারিস এবং মাজিদ নাওয়াজ (২)

সমস্যার ব্যাপ্তি ( এক )

হ্যারিস: তোমার এই প্রচেষ্টায়, তুমি ‘বিপ্লবী ইসলামবাদী’ (revolutionary Islamists) এবং ‘জিহাদবাদী’ (jihadists), এই দুটির মধ্যে একটি পার্থক্য প্রস্তাব করেছো, আমি মনে করি তোমার উচিৎ হবে আগে শব্দগুলোকে সবার জন্য সংজ্ঞায়িত ও ব্যাখ্যা করা। আমি আরো জানতে চাই, মুসলিম সমাজগুলোয় মতামতগুলো কিভাবে বিভক্ত আর সেই বিষয়ে তুমি কি ভাবছো। আমি এককেন্দ্রিক বেশ কয়েকটি বৃত্তের কথা ভাবতে পারি। কেন্দ্রে আছে ইসলামিক স্টেট (৮) , আল-কায়েদা, আল শেহাব, বোকো হারাম এর মত গ্রুপগুলো। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় তাদের সদস্যদের প্রতিদিন ঘুম ভাঙ্গে সব অবিশ্বাসী আর ধর্মত্যাগীকে হত্যা করার তীব্র কামনাসহ। এবং তাদের অনেকেই এই প্রক্রিয়ায় শহীদ হবার জন্য বিশেষভাবে উদগ্রীব। আমরা অধিকাংশরাই এই সব মানুষগুলোকে চিহ্নিত করি ‘জিহাদবাদী’ হিসাবে। তারপর এর বাইরের আরো বড় একটি ইসলামবাদীদের বৃত্ত, যারা সম্ভবত জিহাদ ও ইসলামবাদের সমর্থক – আর্থিকভাবে, নৈতিকভাবে অথবা দর্শনে – কিন্তু তারা সন্ত্রাস করে তাদের হাত নোংরা করতে চান না। পরিশেষে, সবচেয়ে বাইরের বৃত্তটি, আমরা আশা করতে পারি তথাকথিত মডারেট বা মধ্যমপন্থী মুসলিমদের, এবং আরো অনেক বড় একটি বৃত্ত , তারা তাদের নিজেকে সেভাবে চিহ্নিত করুক কিংবা না করুক, যারা আধুনিক যুগের মূল্যবোধ নিয়ে বাঁচতে চান। যদিও তারা পুরোপুরি সেক্যুলার নয়, কিন্তু তারা মনে করেন যে, ইসলামিক স্টেটদের মত কোনো গ্রুপ তাদের ধর্মবিশ্বাসের প্রতিনিধিত্ব করে না। হয়তো সত্যিকারভাবে বহু মিলিয়ন সেক্যুলার মুসলিম আছেন, যাদের আসলেই কোনো কন্ঠস্বর নেই। ভাবছি আমার এই শ্রেণীবিভাগগুলো নিয়ে আমি যা বুঝতে পারছি , তুমিও কি সেগুলো সঠিক বলে মনে করো কিনা, এবং যদি তাই হয়, তাহলে পৃথিবীর ১.৬ বিলিয়ন মুসলিমদের কত শতাংশ করে ‍তুমি এই প্রত্যেকটি শ্রেণীতে রাখবে।

নাওয়াজ: অবশ্যই, গবেষণা নির্ভর কোনো উত্তর হবে না যদিও, কিন্তু তোমাকে আমার অনুমান নির্ভর কিছু প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছি। তোমার এককেন্দ্রিক বৃত্তগুলোর দৃশ্যকল্পটি অব্যহত রাখছি, কেন্দ্রে, যেমন তুমি সঠিকভাবে বলেছো, আছে ‘জিহাদবাদীরা’,তাদের পরে আমরা দেখছি অপেক্ষাকৃত বড় গ্রুপ, যারা ‘ইসলামবাদী’। আমাদের পাঠকদের মধ্যে যেন কোনো ধরনের সন্দেহ না থাকে, যখন আমি বলছি ‘ইসলামবাদ’, শব্দটি দিয়ে আমি বোঝাতে চাইছি ইসলামের যে কোনো ব্যাখ্যাকেই কোনো সমাজের উপর চাপিয়ে দেবার আকাঙ্খা নির্ভর মতবাদ, যখন আমি ‘জিহাদবাদ’ বলছি আমি বোঝাতে চাইছি ইসলামবাদকে ছড়িয়ে দেবার জন্য শক্তির ব্যবহার করার মতবাদটিকে।

ইসলামবাদ ও জিহাদীবাদ হচ্ছে ইসলাম ও জিহাদের রাজনৈতিক সচেতনতাপুষ্ট সাম্প্রতিক পাঠের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি দুটি অবস্থান। এই মতবাদ দুটির কোনোটাই নিজেরা কিন্তু ইসলাম ও জিহাদ কোনোটাই নয়। যেমন আমি বলেছিলাম, আর যে কোনো ধর্মের মতই ইসলামও প্রথাগত ঐতিহ্যবাহী একটি ধর্ম, নানা সম্প্রদায়,উপদল, গোষ্ঠী এবং বিকল্প নানা পঠনে পরিপূর্ণ। কিন্তু ইসলামবাদ হচ্ছে সমাজের উপর সেই সব পঠনের যে কোনো একটিকে চাপিয়ে দেবার আকাঙ্খা। সাধারণভাবে আইন হিসাবে শারিয়ার (shari’ah) একটি সংস্করণকে আরোপ করার বাসনা হিসাবে এটি প্রকাশিত হয় বিভিন্ন সামাজিক কাঠামোয়। রাজনৈতিক ইসলামবাদীরা তাদের সেই দৃষ্টিভঙ্গীকে সমাজের উপর আরোপ করার চেষ্টা করে ব্যালট বাক্স ব্যবহার করে, তারা অপেক্ষা করে যতক্ষণ না পর্যন্ত সামাজিক সব প্রতিষ্ঠানগুলোয় তারা ভিতর থকে অনুপ্রবেশ করতে পারে। বিপ্লবী ইসলামবাদীরা সমাজকে পরিবর্তন করার চেষ্টা করে বাইরে থেকে এক ধাক্কায়ে। জঙ্গী ইসলামবাদীরা জিহাদবাদী।

সত্যি, জিহাদ সংক্রান্ত কোনো প্রথাগত পাঠ স্বশস্ত্র সংগ্রামের ধারণাটিকে উপেক্ষা করতে পারেনা, এবং এটি অবিশ্বাস্যরকম সরল দাবী করা যে, মুসলিমরা জিহাদ মানে শুধুমাত্র তাদের নিজেদের ভিতরের – অন্তরের সংগ্রামকেই শুধু বোঝায়। তবে যে কোনো বা সব সশস্ত্র সংগ্রামগুলো, যে কোনো অথবা কোনো রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতায় হতে পারে প্রতিরক্ষামূলক অথবা আক্রমনাত্মক, ন্যায় এবং অন্যায়, প্রতিক্রয়ামূলক অথবা পূর্ব পরিকল্পিত এবং সন্ত্রাসবাদী অথবা প্রথাগতভাবে সামরিক। জিহাদবাদ, আমি যেভাবে ব্যবহার করছি শুধুমাত্র প্রতিনিধিত্ব করছে একটি বিশেষ স্বশস্ত্র সংগ্রামের, উপরের যে শ্রেণীতেই এটি সামঞ্জষ্যপূর্ণ হোক না কেন – যার উদ্দেশ্য ইসলামবাদের প্রসার।

এগুলো শুধুমাত্র আমার সংজ্ঞাগুলো, এই ক্ষেত্রে কাজ করা আমার জীবনে আমি এখনও এমন কোনো সংজ্ঞার মুখোমুখি হইনি যাদের মনে হতে পারে আরো সঠিক। অবশ্য অন্যদের তাদের নিজস্ব সংজ্ঞা থাকতেও পারে।

হ্যারিস: সুতরাং একজন ইসলামবাদী চেষ্টা করে সমাজের বাকী অংশের উপর ইসলামের তার সংস্করণটি চাপিয়ে দিতে, আর একজন জিহাদবাদী হচ্ছেন ইসলামবাদী যিনি সেই কাজটি করার চেষ্টা করেন শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে।

নাওয়াজ: হ্যা, ঠিক বলেছো।

হ্যারিস: এই ব্যাখ্যাটি খুবই উপকারী।

নাওয়াজ: আবার তোমার প্রস্তাবিত এককেন্দ্রিক বৃত্তগুলোয় ফিরে আসি। ভিতরের বৃত্তের কেন্দ্রে এই মুহুর্তে আছে ইসলামিক স্টেট, আল-কায়েদাকে ম্লান করতে যাদের আবির্ভাব। এর সদস্যদেরকে আমি বলি বৈশ্বিক জিহাদবাদী। এছাড়াও আছে আঞ্চলিক জিহাদবাদী। তারাও, শক্তি প্রয়োগ করে ইসলামবাদের বিস্তারের জন্য, কিন্তু তারা তাদের সীমাবদ্ধ রেখেছে একটি নির্দিষ্ট ভৌগলিক ও জনগোষ্ঠীর উপর তাদের কর্মকাণ্ড ঘণীভূত করে। তারা অপেক্ষাকৃত কম ভারসাম্যহীন। হামাস এবং হিজবোল্লাহ এই প্রকৃতির। যে কারোরই ব্যাখ্যায় জিহাদবাদীরা পৃথিবীর সংখ্যালঘু মুসলিম, কিন্তু তারা সবচেয়ে বেশী সংগঠিত এবং সবচেয়ে বেশী ক্ষমতার অধিকারী এবং যে কোনো আলোচনায় তাদের বিষয়টি প্রাধান্য বিস্তার করে কারণ তারা হিংস্র। ইসলামিক স্টেট বিশাল পরিমান একটি ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে এবং তেল শুল্ক, ভয় দেখিয়ে চাদাবাজী এবং চোরাচালানী থেকে তারা দৈনিক বহু মিলিয়ন ডলার আয় করতে পারে।

জিহাদবাদীদের পরে আছে বাকী ইসলামবাদীরা যারা আরো বড় গ্রুপ। প্রথমে আসে বিল্পবী ইসলামবাদীরা, যারা তাত্ত্বিকভাবে জিহাদবাদীদের খুব কাছাকাছি অবস্থান করছেন, এবং তারপর আসছে রাজনৈতিক ইসলামবাদীরা, যারা যদিও ইসলামবাদীদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ, কিন্তু সব মুসলিমদের মধ্যে সংখ্যালঘু। যেমনটি আমরা মিসরের সাম্প্রতিক নির্বাচনের প্রথম চক্রে দেখেছিলাম – মুসলিম ব্রাদারহুড মাত্র ২৫ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। দ্বিতীয় স্থানের দাবীদার হোসনি মোবরকেরই প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী, আহমেদ শাফিক, পেয়েছিলেন ২৪ শতাংশ ভোট। এই ১ শতাংশ বাড়তি ভোটই যথেষ্ট ছিলনা মুসলিম ব্রাদারহুডের নিজেদের জয়ী বলে দাবী করার জন্য। পরে শাফিক এবং মোহাম্মেদ মোরসির মধ্যে প্রেসিডেন্ট হবার প্রতিযোগিতায়, শাফিকের বিরুদ্ধে সুস্পষ্টভাবে বেশ কিছু প্রতিবাদ ভোট ( এর আগের হোসনি মোবারক সরকারের সাথে তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে যিনি কলঙ্কিত) সত্ত্বেও ব্রাদারহুড মাত্র ৫১ শতাংশ ভোট সংগ্রহ করতে সফল হয়েছিল। বিষয়টি ইঙ্গিত করছে যে বহু মিসরীয় মুসলিম ব্রাদারহুডকে দ্বিতীয় চক্রে ভোট দিয়েছিল শুধুমাত্র হোসনি মোবারকের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন ঠেকাতে। এটাই যুক্তিসঙ্গত একটি পরিমান, সেকারণে বলা যায়, ক্ষমতার চুড়ান্ত পর্যায়ে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন ও বৃহত্তম ইসলামবাদী গ্রুপ মাত্র ২৫ শতাংশ নিবেদিত সমর্থন আদায় করতে পেরেছিল।

হ্যারিস: তোমার হিসাব মতে তাহলে পৃথিবীব্যাপী কত শতাংশ মুসলিম ইসলামবাদী?

নাওয়াজ: আমি মিসরের উদহারণ ব্যবহার করছি কারণ সেখানে মুসলিম ব্রাদারহুড বিশেষভাবে সফল। এবং ব্রাদারহুড যদি মিশরে নির্বাচনের প্রথম চক্রে তাদের পক্ষে মাত্র ২৫ শতাংশ ভোট সমর্থন আদায় করতে পারে, সম্ভবত এটি অপেক্ষাকৃতভাবে কম জনপ্রিয় অন্যান্য মুসলিম প্রধান সমাজগুলোয়। এটাই আমার অভিজ্ঞতা নির্ভর অনুমান, কোনো পরীক্ষা নির্ভর প্রমান আমার হাতে নেই।

(চলবে)

ইসলাম এবং সহিষ্ণুতার ভবিষ্যৎ: একটি সংলাপ – স্যাম হ্যারিস এবং মাজিদ নাওয়াজ (২)

টীকা:

(৮) আমরা ইসলামিক স্টেট নামটি ব্যবহার করতে সিদ্ধান্ত নিয়েছি কোনো ধরনের পূর্বসংস্কার ছাড়াই, শুধুমাত্র কারণ গ্রুপটি তাদের নিজেদের এই নামেই ডাকে এবং ক্রমবর্ধিষ্ণু হারে গণমাধ্যমগুলোও তাদের এই নামেই ডাকছে। আমাদের এই ব্যবহার গ্রুপটির নিজেদের ‘সত্যিকারের’ ইসলামের প্রতিনিধি অথবা একটি খেলাফত প্রতিষ্ঠা করার দাবীর সত্যতা সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো বিচারিক মনোভাব আরোপ করা নয় । এই বইটি নিজেই এই ধরনের দাবীর সত্যতা সংক্রান্ত বিষয়ে একটি ব্যপক ও বিস্তারিত পর্যালোচনা।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “ইসলাম এবং সহিষ্ণুতার ভবিষ্যৎ: একটি সংলাপ – স্যাম হ্যারিস এবং মাজিদ নাওয়াজ (৩)

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

86 + = 94