ইসলাম এবং সহিষ্ণুতার ভবিষ্যৎ: একটি সংলাপ – স্যাম হ্যারিস এবং মাজিদ নাওয়াজ (৪)

ইসলাম এবং সহিষ্ণুতার ভবিষ্যৎ: একটি সংলাপ – স্যাম হ্যারিস এবং মাজিদ নাওয়াজ (১)
ইসলাম এবং সহিষ্ণুতার ভবিষ্যৎ: একটি সংলাপ – স্যাম হ্যারিস এবং মাজিদ নাওয়াজ (২)
ইসলাম এবং সহিষ্ণুতার ভবিষ্যৎ: একটি সংলাপ – স্যাম হ্যারিস এবং মাজিদ নাওয়াজ (৩)

সমস্যার ব্যাপ্তি ( দুই )

হ্যারিস: বাস্তবিকভাবে কিন্তু একটি গ্রুপ যে মুসলিম প্রধান দেশগুলোয় গত চল্লিশ বছরের সংসদীয় নির্বাচনগুলো বিশ্লেষণ করেছে এবং তারা দেখেছে যে গড়পড়তা, ইসলামবাদী দলগুলো ১৫ শতাংশ ভোট সমর্থন আদায় করেছে (৯)। এটি প্রস্তাব করছে পৃথিবীর ১৫ শতাংশ মুসলিম হচ্ছে ইসলামবাদী। তবে shari’ah বিষয়ে জরিপের ফলাফলগুলো সাধারণত দেখিয়েছে এর নির্দেশাবলী বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সমর্থনের হার আরো অনেক বেশী – যেমন ব্যভিচারীদের হত্যা, চোরদের হাত কেটে ফেলা এবং ইত্যাদি । আমি নিশ্চিৎ না এমন কোনো সমাজ নিয়ে কি চিন্তা করা উচিৎ যেখানে ১৫ শতাংশ মানুষ কোনো ইসলামী দলকে ভোট দিয়ে সমর্থন জানিয়েছে, কিন্তু ৪০ শতাংশ অথবা এমনকি ৬০ শতাংশ মানুষ সেখানে ধর্মত্যাগীদের হত্যা করতে চায় (১০)। আর যদি কিছু নাও হয়, এটি ইসলামবাদীদের প্রকৃত সংখ্যা আরেকটু উপরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আমি বলে এসেছি যে, এই সংখ্যা সম্ভবত বিশ্বব্যাপী ২০ শতাংশ হবে – যা আমি মনে করি বেশ রক্ষণশীল একটি পরিমাপ। অন্যদিকে মুসলিম ধর্ম সমর্থকরা বিষয়টিকে বিবেচনা করেন একটি ভয়ানক কল্পনাপ্রসূত যা আমার সন্দেহপ্রবণতা আর সংকীর্ণ মানসিকতারই স্বাক্ষ্য দিচ্ছে।

নাওয়াজ: আমি মনে করি অনেক বেশী সহায়ক হবে যদি সমালোচনাকারীরা তোমাকে নানা নামে ডেকে সমালোচনা না করার বদলে যদি এখানে যা আলোচনা হচ্ছে সেই ধারণাগুলোর দিকে নজর দেয়। তাদের এই কৌশল হচ্ছে তোমাকে ধারণাগুলোকে উপেক্ষা করার জন্য খুব সহজ এটি উপায়। এছাড়া, মিসরকে উদহারণ হিসাবে ব্যবহার করে, আমি কেবলমাত্র বিশ্বব্যাপী ইসলামবাদীদের সংখ্যা ২৫ শতাংশেরও কম হবে এমন ধারণা করলাম, (মুসলিম ব্রাদারহুড মিসরে তাদের সর্বোচ্চ সমর্থনের সীমা হিসাবে ২৫ শতাংশ ছুতে পেরেছে সেই বিষয়টি মনে রেখেই)। সুতরাং আমি মনে করি তোমার হিসাবও খুব বেশী অসামঞ্জষ্যপূর্ণ নয়। আমার মতে, যে কোনো সমাজ, যেখানে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ মানুষ ইসলামীদের ভোট দেয়, সেই সমাজ ভয়ঙ্কর আত্মপরিচয়ের সংকটের মুখোমুখি, যা এখনও সংগ্রাম করছে বিশ্বায়নের চ্যালেঞ্জ সামাল দেবার জন্য।

এছাড়া তোমার উল্লেখিত সেই বেশী শতাংশ সমর্থনকারীদের হিসাব – যা আমরা দেখি যখন মুসলিমদের বিশেষভাবে জিজ্ঞাসা করা হয় সেই বিষয়গুলো সম্বন্ধে যেমন ধর্মদ্রোহীতা বা ধর্মত্যাগের জন্য মৃতুদণ্ড – আমি বিশ্বাস করি, এর উৎস হয়তো শরিয়া‘র (shari’ah) একটি প্রাচীন ব্যাখ্যা। কিন্তু আমার সংজ্ঞার খাতিরে, আমি এই সব মৌলবাদীদের ইসলামবাদী হিসাবে শ্রেণীবিন্যস্ত করবো না। ধর্মত্যাগীদের মৃত্যুদণ্ডের প্রতি তাদের এই সমর্থনের কারণ শরীয়াকে আইন হিসাবে প্রতিষ্ঠা এবং সেটি সমাজের উপর চাপিয়ে দেবার বাসনায় ইসলামবাদের আর্দশগত পরিকল্পনার উপর বিশ্বাস থেকে যতটা নয়, বরং তার চেয়ে বেশী এর কারণ হচ্ছে ‘গ্রুপ বা গোত্র-বহির্ভূতদের’ শাস্তি দেবার মধ্যযুগীয়, গোত্রস্বার্থ কেন্দ্রিক বাসনা, যার যৌক্তিকতা দিয়েছে পবিত্র ধর্মগ্রন্হ । এর মানে কিন্তু এটা বলা হচ্ছে না এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গীগুলো সুস্থতার পরিচায়ক – বরং এর বীপরিত, তারা অবিশ্বাস্যরকম সমস্যা উদ্রেক করে। ‘ইসলামবাদ’ ছাড়াও এই মানসিকতা প্রায়শই ভিন্ন এবং কখনো একই রকম সমস্যারও উদ্রেক করে।

বাস্তবিকভাবে, বহু উদহারণ আছে এই একই মৌলবাদীরা হিংস্রতার সাথে ইসলামবাদীদের বিরোধিতা করেছে, যাদের তারা বিবেচনা করেছে পুরোপুরিভাবে পশ্চিমা আধুনিকতার একটি উৎপন্ন, যার জন্ম হয়েছে একটি ইউনিটারী বা কেন্দ্রীয় আইন ব্যবস্থার অধীনে আইন বিধিবদ্ধ করার পশ্চিমা উদ্ভাবন থেকে। এ বিষয়ে একটি সুলিপিবদ্ধ উদাহরণ হচ্ছে, পাকিস্তান বিভক্তির সময় ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামবাদী গ্রুপ জামাত-এ- ইসলামীর বিরুদ্ধে রক্ষণশীলদের আন্দোলন। বারেলভিরা (১১)। জামাত এর প্রতিষ্ঠাতা মওদুদীর বিরুদ্ধে যেমন অ্যান্টি-সেমিটিক বা ইহুদী বিদ্বেষী শ্লোগান দিত – —“Sau yahudi aek Mawdui,” – বা ‘এক মওদুদী শত ইহুদীর সমান’। যদিও ঘৃণ্য, এই শ্লোগানটি মৌলবাদী আর ইসলামবাদীদের মধ্যকার শত্রুতা সংক্রান্ত আমার বক্তব্যটাকেই সমর্থন করছে। যিনি পাঞ্জাব প্রদেশের গভর্নর এবং ধর্মনিন্দা আইনের সংস্কারক সালমান তাসিরকে হত্যা করেছিল যে মমতাজ কাদরী, সেও এসেছে একটি বারেলভী আন্দোলন থেকে।

এটা নিখুঁতভাবে আমাদের পরবর্তী চক্রের দিকে নিয়ে যায়, যা সবচেয়ে বৃহত্তম: ধর্মীয়ভাবে রক্ষণশীল মুসলিমরা। পাকিস্তান,ইন্দোনেশিয়া,মালয়শিয়া, মিশর অথবা আরব উপসাগরীয় দেশগুলো, যেদিকে আমরা তাকাই কেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমরা বর্তমানে রক্ষণশীল – কেউ হয়তো তাদের চিহ্নিত করতে পারে মৌলবাদী হিসাবে। আপাতত আমরা তাদের রক্ষণশীলই বলবো, কারণ তারা পুরোপুরিভাবে সমসাময়িক মানবাধিকারের বিষয়টির প্রতি সমর্থন প্রদর্শন করতে পারেননি।

হ্যারিস: রক্ষণশীল ইসলাম আর ইসলামবাদীদের মধ্য বিভেদরেখাটি কি ? অন্যার্থে, রক্ষণশীলদের কি বাধা দিচ্ছে সমাজের বাকী অংশের উপর ইসলাম চাপিয়ে দেবার বাসনায় প্ররোচিত হওয়া থেকে?

নাওয়াজ: ওহ, অনেক কিছুই। আবারো উদহারণ হিসাবে মিসরের দিকে তাকানো যাক। মিসর ধর্মীয়ভাবে রক্ষণশীল একটি দেশ, কিন্তু মিসরীয় মসুলমানদের একটি বিরাট অংশ অবশেষে মুসলিম ব্রাদারহুড সরকারকে প্রত্যাখান করেছে দেশটির ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে বৃহত্তম প্রতিবাদে নিজেদের ইচ্ছা প্রকাশ করে। সেটি করার সময় তাদের সমর্থন দিয়েছে মিসরীয় ধর্মতাত্ত্বিকরা। দূর্ভাগ্যজনকভাবে, সেই প্রতিবাদের পরিসমাপ্তি ঘটেছে আরেকটি নির্বাচনের পরিবর্তে জনতাপন্হী একটি সামরিক ক্যু এর মাধ্যমে, যারা ব্রাদারহুড সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে। এটাই দৃঢ় করে আমার সেই বক্তব্যটিকে যে যদি রক্ষণশীল মিসরীয়রা উদারনৈতিক ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রকে নির্বাচন করেনি যদিও, তবে তারা সন্দেহাতীত দৃঢ়তার সাথে মুসলিম ব্রাদারহুডকে প্রত্যাখান করেছিল।

তিউনিসিয়া আরেকটি উদহারণ। সেখানে ২০১৪ সালের নির্বাচনের পরিণতি হিসাবে দেখেছি মুসলিম আরব তিউনিসিয়াবাসীরা নাহদা পার্টির সরকারকে প্রত্যাখান করেছে – যে দলের উৎস ইসলামবাদী চিন্তাচেতনা – এবং তারা ভোট দিয়ে জয়ী করেছে এর পরিবর্তে একটি ধর্মনিরপেক্ষ দলকে। ভালো খবরটা হচ্ছে নাহদা পার্টি শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা ছেড়েছে, এমনকি জনসম্মুখে সকল ক্ষমতার প্রতিভূ জনগণের ইচ্ছাকে সমর্থন জানিয়েছে।
বেশীরভাগ প্রথাগত মুসলিমরা ইসলামবাদকে তাদের ধর্মকে একটি ভ্রান্ত রাজনীতিকরণ প্রক্রিয়া হিসাবে মনে করেন। এই মানুষগুলো তাদের পরিবার, জীবনাচারণে অত্যন্ত রক্ষণশীল- যা কিছু অত্যাবশকীয় মানবাধিকারের ধারণার বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জের কারণ। কিন্তু তারা সাধারণত চায়না যে রাষ্ট্র তাদের ধর্ম তাদের উপর চাপিয়ে দিক – কারণ তারা এই ধর্মীয় রক্ষণশীলতা বলতে কি বোঝায় সেই সংক্রান্ত তাদের নিজস্ব বোঝাপড়ার উপর অধিকারটিকে তারা ধরে রাখতে চান।

হ্যারিস: বেশ কৌতুহলোদ্দীপক। সুতরাং যখন তারা ‘হনার কিলিং’ এর মত সামাজিক বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলেন, আমরা তখন শুধুমাত্র ইসলামবাদীদের নিয়ে উৎকন্ঠিত নই, আমরা একইভাবে চিন্তিত কিভাবে গড়পড়তা রক্ষণশীল মসুলমান পুরুষ তার ধর্মীয় বিশ্বাস ও সামাজিক মূ্ল্যবোধের আলোকে তার স্ত্রী এবং কন্যার সাথে আচরণ করবে। এবং তারপরও, এই সব রক্ষণশীল মুসলিমদের অনেকেই ইসলামবাদের বিরোধী হতে পারে ?

নাওয়াজ: হ্যা, রক্ষণশীল মুসলিমরা ইসলামবাদ ও জিহাদীবাদের বিরুদ্ধে মিত্র হিসাবে খুবই উপযোগি হতে পারে, কিন্তু তারা আপনার বিরোধিতা করতে পারে লিঙ্গ অধিকার ও সাম্যতা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে পারিবারিক সন্মান রক্ষার্থে সংগঠিত হত্যাকাণ্ডগুলোর। সুতরাং আমাদের হাতের এই বিষয়টি প্রভাবিত করবে তারা আপনার মিত্র হবে কি হবে না।

রক্ষণশীল মুসলিমরা আল-কায়েদার বিরুদ্ধে খুবই উচ্চকন্ঠ হতে পারে, কারণ তারা বিশ্বাস করে আল-কায়েদা তাদের ধর্মকে হাইজ্যাক করছে। বিশাল সংখ্যাক মুসলিমরা, ধরুন, সৌদি আরব, ইন্দোনেশিয়া,পাকিস্তান আর মিসরে রক্ষণশীল। বিষয়টি পরিস্থিতি আরো জটিলতর করে তোলে, কারন আমরা বর্তমানে দুটি পুরোপুরিভাবে ভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি এখন – ইসলামবাদ ও জিহাদবাদকে প্রতিরোধ করা একদিকে, আর অন্যদিকে মানবাধিকার ও গনতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবার প্রচেষ্টা। রক্ষণশীল মুসলিমরা আমাদের মিত্র হতে পারে আগের চ্যালেঞ্জটি মোকাবেলা করার জন্য, কিন্তু তারা পরের চ্যালেঞ্জটি মোকাবেলা করার সময় আমাদের পাশে নাও থাকতে পারেন। আর এটাই সংস্কারপন্হী উদারনৈতিক মুসলিমদের মুখেোমুখি করেছে কঠিন এক পরিস্থিতিতে।

হ্যারিস: এটাও , আরেকটি অত্যন্ত সহায়ক বিভাজন।

নাওয়াজ: মনে করে দেখো যে আমি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমকে রক্ষণশীল হিসাবে চিহ্নিত করেছি: যদিও সব রক্ষণশীল মুসলিমরা প্র্যাকটিসিং বা নিয়মিত ধর্ম পালনকারী মুসলিম না, তবে তাদের দৃষ্টিভঙ্গী প্রথাগত মুসলিম মূল্যবোধকেই প্রতিফলিত করে থাকে। বেশ, এদের ছাড়া একটি ছোট গ্রুপ হচ্ছে রিফর্ম বা সংস্কারবাদী মুসলিম – যেমন যুক্তরাজ্যের সেরা সংস্কারবাদী ধর্মতাত্ত্বিক ডঃ উসামা হাসান। তারা চেষ্টা করছেন, সরাসরি ইসলামবাদ এবং ধর্মবিশ্বাসের কিছু অতি-রক্ষণশীল ব্যাখ্যাগুলোকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য। রিফর্ম বা সংস্কার শব্দটি দিয়ে আমি বোঝাতে চাইছি কিছু ব্যাখ্যার পুননবায়ন অথবা হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া, এর সাথে খ্রিস্টীয় রিফরমেশন বা সংস্কারবাদী ধারণাগুলোর কোনো যোগসূত্র নেই। এই সব সংস্কারবাদীরা হলো, আমি বিশ্বাস করি, সুযোগ্য কিছু মানুষের গ্রুপ, যাদের যথেষ্ট পরিমান সংযোগ এবং বুদ্ধিমত্তাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গী আছে এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার জন্য। আমি আশা করছি তারা আমাদের ভবিষ্যৎ এবং আমার যদি কিছু করার থাকে, আমি তা করবো তাদের জন্য।

আগেই উল্লেখ করেছিলাম যে আমি কুইলিয়াম ফাউণ্ডেশন সহপ্রতিষ্ঠা করতে সহায়তা করেছি, এটি লণ্ডন ভিত্তিক পৃথিবীর প্রথম চরমপন্থা বিরোধী প্রতিষ্ঠান। আমাদেরই অনীর্ষণীয় কাজ হচ্ছে তাদের চ্যালেঞ্জ করা যারা ইসলামবাদ ও অন্যান্য ধরণের সাংস্কৃতিক চরমপন্থার আশ্রয় নেবেন এবং আমাদের উদ্দেশ্য সেক্যুলার গণতান্ত্রিক পাল্টা বার্তা প্রচার ও প্রসার করা। কুইলিয়াম একটি সেক্যুলার প্রতিষ্ঠান। কিন্তু ধর্মশাস্ত্রীয় যৌক্তিক প্রক্রিয়ার মধ্যে ঐতিহাসিক এবং সমসাময়িক প্লুরালিজম বা বহুবাদিতার বিষয়গুলোর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে আমরা সহিংস, মৌলবাদী এবং আদর্শগত গোড়া মতবাদের কঠোর অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করতে পারবো। যুক্তরাষ্ট্রে আমরা একটি নিবন্ধিত দাতব্য প্রতিষ্ঠান, এবং বিভিন্ন অনুদান ও আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজন এর টিকে থাকার জন্য। ডঃ হাসানের মত ইসলামী ধর্মতত্ত্ববিদের সহায়তায় আমরা ইসলামবাদ ও অতিমাত্রায় রক্ষণশীল ধর্মীয় মতবাদের দুটি চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করতে পারবো, যা আমি কিছুক্ষণ আগে উল্লেখ করেছি, একটি ব্যাখ্যা করতে সক্ষম কাঠামোয় মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির প্রসার করার জন্য। আর সেটি করতে গিয়ে মাঝে মাঝে আমরা রক্ষনশীল মুসলিমদের বিচলিত করবো, যারা ইসলামবাদের বিরুদ্ধে আমাদের মিত্র হয়েই যাত্রা শুরু করেছিল। যদি আমরা মানবাধিকারের বিষয়টির দিকে নজর না দিতাম, তারা হয়তো আমাদের মিত্রই থাকতো এখনো। তবে, আমরা নীরব থাকতে পারিনা লিঙ্গ অধিকার কিংবা ব্যক্তি স্বাধীনতার প্রশ্নে। খুবই কঠিন, কিন্তু আমরা দৃঢ় সংকল্প ও এই সব বিষয়গুলোকে দায়বদ্ধ সংস্কারের আলোচনায় আরো কাছে নিয়ে আসার জন্য। একই সাথে আমরা এর বীপরিত প্রান্তের বিষয়গুলোর দিকে নজর দেবো, যারা খুব ক্ষতিকরভাবে ভাবে এখন মুসলিম-বিরোধী।

তোমার সাথে এই সংলাপে অংশগ্রহনটাই যথেষ্ঠ বেশ কিছু রক্ষণশীল এবং গোত্রীয় ( যদিও ধর্মপরায়ন নয়) মুসলিমদেরকে উদ্বিগ্ন করে তোলার কারণ । অন্যদিকে আমি আমাদের এই কথোপকথনকে দেখছি গুরুত্বপূর্ণ একটি উদাহরণ হিসাবে যে কিভাবে কুয়াশাটা কাটানো যেতে পারে, যদি শুধুমাত্র আমরা আমাদের অতিশয়োক্তি একপাশে সরিয়ে রাখতে আর অহংকারী অঙ্গভঙ্গীগুলো বর্জন করতে পারি – অন্যরা এই কথোপকথনকে দেখছে শত্রুর সাথে ভ্রাতৃরূপে মেলামেশা করা হিসাবে – আর সেই শত্রুটি হচ্ছে্ তুমি। আমার নীতি আমাকে অনুমতি দিয়েছে তোমার সাথে এই সংলাপে, ইসলাম ও বর্তমান পৃথিবীতে এর নেতিবাচক ভূমিকা সংক্রান্ত ব্যপারে তোমার দৃষ্টিভঙ্গি সত্ত্বে, ঠিক যেমন করে সেই নীতিগুলো আমাকে অনুমতি দেয় মুসলিম ব্রাদারহুডের কোনো সদস্যের সাথে আলোচনা করা জন্য, যারা মনে করে বর্তমান পৃথিবীতে ইসলামই হচ্ছে একমাত্র সমাধান। যে কোনো ক্ষেত্রেই, আমার লক্ষ্য হবে আমার ধর্মনিরপেক্ষ,গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকারের মূল্যবোধগুলোকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। বাস্তবিকভাবেই আমি নিয়মিতভাবে মত বিনিময় করি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ইসলামবাদী ও জিহাদীবাদীদের সাথে তাদেরকে তাদের আদর্শগত গোড়া মতবাদ থেকে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টায়- যেমনটি আমার দ্বায়িত্ব। তারপরও আমি সন্দেহ করছি যে বহু রক্ষণশীল ও গোত্রভুক্ত ( তারপরও ধর্মপরায়ন নয়) মুসলিমদের জন্য তোমার সাথে আমার এই কথোপকথন সমস্যার মনে করবে কোনো জিহাদীদের সাথে আমার কথোপকথনের চেয়ে। সেটাই ইঙ্গিত দিচ্ছে আমরা যে সমস্যাটার মুখোমুখি হচ্ছি আজ তার ব্যপকতাটাকে।

(চলবে)

ইসলাম এবং সহিষ্ণুতার ভবিষ্যৎ: একটি সংলাপ – স্যাম হ্যারিস এবং মাজিদ নাওয়াজ (৩)

টীকা:

(৯) C. Kurzman and I. Naqvi, “Do Muslims Vote Islamic?” Journal of Democracy 21, no. 2 (April 2010)
(১০) Muslim public opinion on the implementation of shari’ah has been polled extensively. For instance, http://www.pewforum.org/2013/04/30/the-worlds-muslims-religion-politics-society-beliefs-about-sharia/.
(১১) বারেলভী (Barelvi) সুন্নী হানাফী ইসলামী আইনী দর্শনের যে ধারা সূচনা হয়েছিল উত্তর ভারতে বারেলি শহরে, যার সূচনায় ছিলেন আহমেদ রাজা খান (১৮৫৬-১৯২১), যদি এই নামটি গণমাধ্যম কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত হলে এই আন্দোলনটি পরিচিত হয়েছিল Ahle Sunnat wal Jama’at বা সুন্নী হিসাবে))

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

8 + 1 =