এই রাস্তায় রক্ত লেগে আছে, আমায় মুছতে দাও, পানি নয়, অশ্রু দিয়ে মুছতে চাই

রাহাতের ঘুম ভাঙল পানি পড়ার শব্দে। কি বিদঘুটে একটা শব্দ। টিনের বালতিতে মনে হচ্ছে কেউ লোহা দিয়ে বাড়ী মারছে। রাহাত অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও উঠে বসল। পানি ধরে রাখতে হবে। নাহলে আর গসল করা হবে না। একবার গেলে আবার কখন আসে জানা নেই।

রাহাত উঠে গেল। বালতিটা অর্ধেক পুরে গেছে আর উপরের ফুটো দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে। রাহাত বাম পা দিয়ে ঠেলে বালতিটা সরিয়ে এবারে একটা গামলা দিল। মনে মনে ভাবল যে এবার একটা ৬০ লিটারের বালতি কিনতে হবে। বাজারে দেখে এসেছে। ৬০০ টাকায় দিয়ে দেবে বলেছে। কিন্তু এই ছয়শ টাকাও রাহাতের কাছে অনেক। অনেকটা দিন মজুর খাটে। স্ত্রী আছে। কাজ করতে চায় কিন্তু রাহাত দেয় না। এলাকার মসজিদের লোক জন জানতে পারলে সমস্যা হবে। দুই ছেলে আর এক মেয়ে আছে রাহাতের। দুই ছেলেই মাদরাসায় পড়ে, মেয়েও। বড় ছেলেটা কোথা থেকে জেন তাসলিমা নাস্রিনের একটা বই নিয়ে এসেছে। রাহাত এই বদ মহিলার নাম শুনেছিল মসজিদের ইমামের কাছে। সে নাকি কোন বইয়ে উল্লেখ করেছিল কার কার সাথে শুয়েছিল। আস্তাগফিরুল্লাহ্‌। এর পর আর এই বদ মহিলার বই পড়ার কোন মানে হয় না। তাও কোন এক কারনে পড়ে ফেলল লজ্জা বইটা। ছি ছি ছি। চিন্তা করতেও খারাপ লাগে। সেদিন খুব মেরেছিল বড় ছেলেটিকে। পড়ে অনেক কস্ট লেগেছিল।

গামলাটাও ভরে গেল এবারে দিল কলস। তার স্ত্রী এই কলসটা এনেছে। অনেক বড় আছে। কিসব লোহা নাকি প্লাস্টিকের বদলে এই কলস এনেছিল চুমকি। রাহাতের স্ত্রির নাম চুমকি। খুব সুন্দর। একেবারে হুর পরি। রাহাত চুমকিকে অনেক ভালবাসে। কিন্তু অভাব আসলে ভালবাসা জানালা দিয়ে পালায়।

রাহাত উঠানের উনুনের কাছে গেল। উঠান বললে ঠিক হবে না। ঠিক পাঁচ তলা বিল্ডিং এর এক চিলতে ব্যলকনি। এক কোনে রোদ পরছে। উনুনের পাশ থেকে একটুকরা কয়লা তুলে বাম হাতে রেখে ডান হাত দিতে গুড়া করে নিল। দাতে ঘষবে। দাত পরিষ্কারও হয় আবার টুথ পেস্টের টাকাও বেঁচে গেল। এক ঢিলে দুই পাখি।

চুমকি উঠে গেছে। রান্না বসাতে হবে। রান্না আবার কি? এক বাটি তরকারি সাথে সাদা ভাত তাও আবার বাচ্চাদের দিয়ে তাদের নিজেদের কপালে জুটবে কিনা জানে না। এই চিন্তায় চুমকির ঘুম হারাম। অপর দিকে রাহাতের ঘুম হারাম এই ভেবে কাল খাবার জুটবে কিভাবে? আর সেই সাথে তাদের তিন সন্তানের ঘুম হারাম হুজুরের কেরাত বেতের ভয়ে।

রাহাত গত রাতের বাকি থাকা পানি মেশানো ভাত খেয়ে নিল। চুমকির কাছে লবণ চেয়েও পেল না। পাবে কিভাবে লবণই তো নেই। জিজ্ঞাসা করল তো রান্না করবে কিভাবে? চুমকি বলল যে পাশের বাসা থেকে নাকি নিয়ে আসবে। রাহাত মনে মনে ভাবল, ‘আজ আসতে লবন আর চাপাতা কিনে আনতে হবে ও হ্যা সাথে লেবুও। অনেক দিন লেবু চা খাওয়া হয় না।

রাহাত খেয়ে তার বছর খানেক পুরনো শার্টটা পড়ে নিল। মাথা আচরে নিলে এক বিঘত সমান আয়নাটার দিকে তাকিয়ে। হ্যা তাকে আজ সুন্দরই লাগছে। রাহাত আয়নার দিকে তাকিয়ে একটা নায়কী হাসি দিল। হ্যা সত্যিই তাকে নায়কের মতই লাগছে।

রাহাত বের হল কাজের খোজে। কোন নির্মানাধীন দালানের ওখানে গেলে কাজ মিলতে পারে। রাহাত রাস্তায় বের হয়ে তেমন কোন গাড়ি দেখতে না পেয়ে অনেক অবাকই হল। কারন বুঝতে পারল না। একটা টং এর দোকানে পত্রিকায় দেখল আজ বিরোধী দলের হরতাল। রাহাত ৫ মিনিটে ফয়েজ’ লেকের ওখানে পৌঁছল। বেশীরভাগ সময় লোক অখান থেকেই নেয়া হয়। আজ তার ভাগ্য ভালই বলতে হবে। প্রথমেই কাজ পেল। যাদের কাজ তাদের নিজস্ব গাড়ি করেই তাদের দশজনকে নিয়ে যাওয়া হল। কাজটা লালখান বাজারের ওখানে।

রাহাতের মন আজ খুব ভাল। প্রায় ৮০০ টাকা পেয়েছে। আজ অনেকদিন পর লেবু চা খাবে। হু তাই বলে সব টাকা খরচ করা যাবে না। পদিনের বাজারও করতে হবে। অনেক কস্ট জীবনে শান্তিতে থাকা।

বিকাল চারটার দিকে লালখান বাজারের পিটেস্টপ এর সামনে দিয়ে রাহাত হেটে হেটে আসছিল। সকালে ওই পান্তা ভাত ছাড়া সারাদিন আর কিছুই রাহাত খায় নি। খুব ক্ষিদে পেয়েছে। ওয়াসার দিকে এসে রাহাত অনেক পুলিশ দেখতে পেল। অবাক হবার কিছুই নেই। আজ হরতাল।

রাহাত পুলিশদের পার করে চলে গেল। হঠাৎ অপরদিক থেকে একটা মিছিল এল। তাদের মুখে মুহুর্মুহু স্লোগাল চলছিল, “নারায়ে তাকবীর, আল্লাহু আকবর ! নারায়ে তাকবীর, আল্লাহু আকবর !” রাহাতও ভক্তি নিয়ে একই স্লোগান দিল। কখন যে পুলিশ টিয়ার শেল নিক্ষেপ করেছে আর কখন যে তার পাশেই ককটেলটা ফুটল রাহাত বুঝতে পারল না। চারিদিক অন্ধকার হয়ে এল। সে কিছুই বুঝে উঠতে পারল না। সে বুঝলই না যে সে মারা গেছে। হাতে তখনো সে বুক পকেটে রাখা টাকা আকড়ে ধরে আছে সে। ক্ষুদা নিবারনের এই এক পথ।

পরে তার ছবি এল ফেসবুকে। ক্যাপশন ছিল, “হরতাল রত এক ভাই শহীদ হয়েছেন। এইটা কি বাংলাদেশের পুলিশ নাকি কুত্তালীগের পুলিশ?”

আসলেই প্রশ্ন থেকেই যায় । এইটা কি?

 

আকাশ পানে চাহিয়া চিৎকার করিলাম
এই রাস্তায় রক্ত লেগে আছে
আমায় মুছতে দাও
পানি নয়, অশ্রু দিয়ে মুছতে চাই
এই গাড় রক্ত…

আমাকে মুছতে দাও

https://www.facebook.com/anampartho

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “এই রাস্তায় রক্ত লেগে আছে, আমায় মুছতে দাও, পানি নয়, অশ্রু দিয়ে মুছতে চাই

  1. ” পরে তার ছবি এল ফেসবুকে।
    ” পরে তার ছবি এল ফেসবুকে। ক্যাপশন ছিল, “হরতাল রত এক ভাই শহীদ হয়েছেন। এইটা কি বাংলাদেশের পুলিশ নাকি কুত্তালীগের পুলিশ?”.

    ———————— এই জায়গাটা বুঝি নাই … কি কইতে চেয়েছেন ?

    1. খুবি সাধারন ভাবে ছাগুদের
      খুবি সাধারন ভাবে ছাগুদের ভন্ডামি তুলে ধরার চেস্টা করেছি। কেউ মারা গেলে এক দন বলে তাদের লোক কিন্তু যে মারা গিয়েছে তার পরিবারের সাথে কথা বলে জানা যায় যে সে কোন দল করত না। এইভাবে যে রাজনিতি চলছে সেইটা তুলে ধরার চেস্টা করেছি।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 2 = 1