মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা এবং কিছু কথা

স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয় থেকে গতকাল (২১ আগস্ট, ২০১৬) মেডিকেল ও ডেন্টাল ভর্তি পরীক্ষার নতুন সিদ্ধান্ত সমুহ জানানো হয়েছে। প্রথমত, ৩০০ নম্বরে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে, যার মধ্যে ২০০ নম্বর এসএসসি ও এইচএসসির জিপিএ এর উপর নির্ভরশীল, আর ১০০ নম্বর ভর্তি পরীক্ষার এমসিকিউ। দ্বিতীয়ত, মেডিকেল এবং ডেন্টাল ভর্তি পরীক্ষা আলাদাভাবে এক মাসের বিরতিতে অনুষ্ঠিত হবে। পৃথকভাবে দুইটি ব্যাপার নিয়ে কিছুটা আলোচনা দাবী রাখে।
১)
এতোদিন SSC পরীক্ষার জিপিএ কে ৮ দিয়ে এবং HSC পরীক্ষার জিপিএকে ১২ দিয়ে গুন করে, মোট যোগফলকে ১০০ এর মধ্যে কাউন্ট করা হতো। অর্থাৎ, কেউ যদি SSC তে জিপিএ ৫, এবং HSCতে জিপিএ ৪.৫ পায়, তবে ১০০তে তার মার্ক –
SSC = 5 X 8 = 40
HSC = 4.5 X 12 = 54
———————–
মোট = ৯৪
ভর্তি পরীক্ষায় দেখা যায়, ১ মার্কের জন্য অনেক সময় ৩০ জনের পেছনে চলে যেতে হয়, এটি নির্ভর করে কম্পিটিশন কতো জোড়ালো হচ্ছে তার উপর। উপরের জিপিএ প্রাপ্ত ছাত্রটি ইতোমধ্যেই ১০০তে ৯৪, অর্থাৎ ৬ মার্ক কম। বাকি ১০০ মার্কের এমসিকিউতে তাকে খুব ভালো করতে হবে, কারণ ডাবল জিপিএ ৫ পাওয়া ছেলেটি এক্ষেত্রে এমনিতেই তার থেকে ৬ মার্ক এগিয়ে আছে। এক্ষেত্রে আমি আমার দুই বন্ধু রিয়াজুল ইসলাম শাওন এবং সাকিয়ার এর উদাহরণ দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। শাওন এর এইচএসসিতে তার জিপিএ ৫ ছিলো না। কিন্তু ভর্তি পরীক্ষায় সাকিয়া পেয়েছিলাম ৬০.৫, কিন্তু শাওন দারুণ পরীক্ষা দিয়ে ৬৬.৫ পেয়েছিলো, যদিও তার প্লেস সাকিয়ার তিনজনের পেছনে।
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, SSC এর জিপিএকে ১৮ দিয়ে এবং HSC এর জিপিএকে ২২ দিয়ে গুন করে, মোট যোগফলকে ২০০ নম্বরের মধ্যে কাউন্ট করা হবে। তাহলে ঐ একই ছাত্রের এই ক্ষেত্রে ২০০তে মার্ক আসে –
SSC = 5 X 18 = 90
HSC = 4.5 X 22 = 99
———————-
মোট = ১৮৯
অর্থাৎ, ২০০ মার্ক থেকে ১১ মার্ক কম। এই সিস্টেমে পরীক্ষা দিলে রিয়াজুল ইসলাম শাওনকে সাকিয়ার থেকে ১১ মার্ক বেশী পেতে হতো। ১১ মার্ক যে ভর্তি পরীক্ষায় কি ভূমিকা রাখে, তা শুধুমাত্র একজন ভর্তি পরীক্ষার্থী জানে, রেজাল্ট পাবার পরে।
তেলা মাথায় তেল দেয়া আমাদের জাতিগত স্বভাব। মেডিকেল এডমিশন টেস্ট ছিলো একমাত্র পরীক্ষা, যেখানে জিপিএ ৫ না পেলেও খুব বেশী রকমের সম্ভব ছিলো, কঠোর পরিশ্রম করে ভালো মেডিকেলে চান্স পাওয়া। জিপিএ এর দৌড়ে পিছিয়ে পরাদেরকে আরও পিছিয়ে রাখবার জন্য নতুন নিয়মটি অত্যন্ত কার্যকর হবে, তাতে কোন সন্দেহ নেই। এটি দেখে আমার মনে হচ্ছে ঘরের সেই ছেলেটির কথা, যার রেজাল্ট খারাপ হয়েছে বলে তাকে দুধ ডিম দেয়া হয় না, কারণ ওকে দুধ ডিম খাওয়ায়ে কি হবে? বরং তাকেই বেশী করে দুধ ডিম খাওয়ানো হোক, যে এমনিতেই ভালো রেজাল্ট করতে পারে। অথচ, যার রেজাল্ট খারাপ, তার দুধ ডিমের বেশী প্রয়োজন, আদর যত্নের বেশী প্রয়োজন। কিন্তু এইটা তাদেরকে কে বোঝাবে? প্রথমে প্রশ্ন ফাস করে মেরুদন্ডটা ভেংগে দিবে, এরপর সেই ফাঁসকৃত প্রশ্নের ভিত্তিহীন রেজাল্টকে অতিগুরুত্ত্ব দিয়ে, মোটামুটি মানের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড-রুপী পরীক্ষাটির গুরুত্ব কমিয়ে আনা হবে।
২)
মেডিকেল এবং ডেন্টাল ভর্তি পরীক্ষা এবার আলাদা ভাবে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আমার ছোট্ট মাথায় মনে হচ্ছে, এর ভালো দিক যেমন আছে খারাপ দিকও আছে। আমি মোটামুটি নিশ্চিত, প্রাইভেট ডেন্টাল গুলোর সিট খালি থাকায়, মালিক সিন্ডিকেটদের চাপের কিংবা যে কোন কিছুর মুখে এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। এর উপকার হচ্ছে –
ক) যারা মেডিকেলে চান্স পাবে না, তারা প্রায় এক মাস সময় পাবে পড়াশুনা করবার জন্য।
খ) যারা সেকেন্ড টাইমার, তাদের শুধু মেডিকেল এডমিশন টেস্টই একমাত্র ভরসা, কারণ বাকি প্রায় সব জায়গাতেই সেকেন্ড টাইমারদের পরীক্ষা নেয়া বন্ধ করা দেয়া হয়েছে। এবার তারা দুইটি সুযোগ পাচ্ছে।
এবার, অপকার গুলো বলি।
মেডিকেল এডমিশনে গেলো বছর মহামারী আকারে প্রশ্নফাঁস আজ অঘোষিত সত্য। দুইটি পরীক্ষায় যদি আলাদা আলাদাভাবে প্রশ্ন ফাঁস হয়, তবে আমও যাবে, ছালাও যাবে, আমের গাছ শুদ্ধা যাবে। প্রশ্নফাঁসকে যারা ব্যবসা হিসেবে নিয়েছে, তারা কোনভাবেই এই সুযোগ মিস করতে চাইবে না। যেখানে আগে ব্যবসা চলতো লাখ টাকার, প্রশ্নফাস রোধ করতে না পারলে, ব্যবসা হবে এবার কোটি টাকার।
৩)
আমার এক ছাত্রী আমাকে আজকে জিজ্ঞেস করেছে, ‘ভাইয়া। পাশাপাশি দেখাদেখি করে হুবুহু একই জিনিস লিখে ইংরেজিতে একজন এ প্লাস পায়, আরেকজন কিভাবে এ পায়?’ এটাই সত্য। আমি যেবার এইচএসসি দিলাম, সেবার আমাদের ঐ রুমের সিংহভাগ ছাত্র ফিজিক্সে এ প্লাস পায়নি। এই যে, মানব আবেগ তাড়িত পরীক্ষা পদ্ধতি, যেখানে দেশব্যাপী হাজার হাজার শিক্ষকের মন-মেজাজের উপর নির্ভর করে লাখ লাখ পরীক্ষার্থীর রেজাল্ট, আবেগ তাড়িত প্রচন্ড ত্রুটিপুর্ণ এই পরীক্ষা পদ্ধতি, পাশাপাশি ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রের এই পরীক্ষার রেজাল্টকে ২০০ মার্কে আবদ্ধ করে কিভাবে সারা দেশের ছেলে মেয়েদেরকে একটি সমান সমান পরীক্ষার ময়দানে নামিয়ে দিতে পারেন? আপনি কাউকে দিবেন ঢাল তলোয়ার, আর কাউকে দিবেন খুনতি-চটি, এরপর একই যুদ্ধের ময়দানে নামিয়ে দিবেন, সেটা তো সুবিচার হলো না!
একদম সত্য কথা হলো, স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়কে একাডেমিক এবং প্রশাসনিক – এই দুই ভাগে ভাগ না করলে এইরকম বোধ-বুদ্ধিহীন কাজ কর্ম চলতেই থাকবে। আর একাডেমিক অংশে যদি ডাক্তারদের না রেখে সেই আমলাদেরকেই রাখা হয়, তাহলে সুবিচার আশা না করে, বিসিএস দিয়ে এডমিনে গিয়ে আমলা হওয়ার চেষ্টা করাই ভালো। নিজের সেবাই বড় সেবা, দেশের সেবা আল্লাহই করবে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

33 − = 27