সাভার বিপর্যয় ও দিনলিপি ২৯/০৪/১৩

২৭ তারিখে সংগ্রহকৃত ২৩৩৩৩ টাকা সাভারে বিপর্যয়ে বিপন্ন মানুষদের কাজে লাগানোর জন্য আমি ও আমার আরেকজন বন্ধু কাল রাতে ঢাকায় পৌছে কল্যানপুরে অবস্থান করি। সকাল সাতটায় ঘুম থেকে উঠে নিজেরা ফ্রেশ ও নাস্তা খেয়ে যখন সাভারের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করবো তখন পথ আগলে দাড়ালেন স্বয়ং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মহোদয়, তিনি তখন সাভার অবস্থান করছিলেন, সেজন্য রাস্তায় যান চলাচল বন্ধ। প্রায় ঘন্টা চারেক আমাদের পথ আগলে রেখে যখন তিনি ঢাকায় ফিরে আসেন ততক্ষনে বেলা বারোটা। ততোটা সময় আমরা রাস্তায় ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হচ্চিলাম আর শুনছিলাম প্রধানমন্ত্রী মহোদয়কে নিয়ে লোকেদের বিষোদগার।

প্রধানমন্ত্রী মহোদয় চলে যাওয়ার পর পড়লাম আরেক সমস্যায়। যে গাড়িতেই যাই সেটাতেই সিট নাই, দাড়াবার জায়গাটুকুও নাই। কি আর করা অগত্যা অনন্যোপায় হয়ে উঠে পড়লাম গাড়ীর ছাদে। ছাদে করে ভ্রমন আমার কাছে পুরাতন হলেও বন্ধুটির কাছে একেবারেই নতুন। ছাদে ভ্রমন যে কি পরিমান ভয়ংকর তাও টের পেলাম হাড়ে হাড়ে। মাথার উপর বিদ্যুতের তার আর নুয়ে পড়া গাছগাছালির ডাল। শরীরটাকে লেপ্টে বাসের গায়ে ঠেসে দিয়ে বাচাতে হয় নিজেদের। তবুও বন্ধুটির শেষরক্ষা হয়না একবার, একটা গাছের ডাল তার মাথায় মৃদুভাবে আঘাত করে ছুয়ে যায়।

এরমাঝে রাস্তায় আবার বাস বন্ধ। আগে গেন্ডা পর্যন্ত গেলেও আজ তার প্রায় দুই কিলোমিটার আগে থেকেই বন্ধ। রাস্তায় শ্রমিকেরা বিক্ষোভ করছে। ফলে রিকশা বা অন্যান্য যানও বন্ধ, তাই নিজেদের পাগুলোকে পুজি করেই হেটে হেটে গেলাম বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে জঘন্যতম গনহত্যা আর মানবিকতা প্রকাশের সেই কুখ্যাত রানা প্লাজায়।


রানা প্লাজা তখন ২য় পর্যায়ের উদ্ধার ততপরতায় নিরাপত্তা বলয়ে আবদ্ধ। ফলে একদিকে চোখ দুটি বিভতস সে ধংসস্তুপ দেখা থেকে বেচে গেলো অনেকটাই। কিন্তু তখনো রাস্তায় হাজারো মানুষ, কেউ খুজছে স্বজনের লাশ কিংবা খোজ। যার কাছেই যাই, শুনি স্বজন হারানোর বেদনা, বলতেছে ভাই আমার ছেলেটা, ভাইটা, বোনটারে একটু খুজে দেন। কেউ বলতেছে ভাই লাশটা অন্তত খুজে দেন। আমি নির্বাক হয়ে এর কাছ থেকে ওর কাছেই ছুটছিলাম শুধু। কিছু কি করার ছিল?

রানা প্লাজার সামনে থেকে গেলাম অধরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখানেও স্বজন হারাদের ভীর আর আহাজারি। আজো সেখানে শপাচেকের মত লোক তাদের প্রিয়জনকে খুজছে। তবে বিদ্যালয়ের মাঠে তখন কোন লাশ ছিল না, লাশগুলো ছিল হিমঘরে। মাঠে স্বজনদের খুজে আসা লোকেদের বিভিন্নভাবে সাহায্য করার জন্য দেখলাম অনেকগুলো ক্যাম্প । এরমধ্যে কয়েকটা স্কুলের ক্যাম্প দেখলাম আগতদের খাবার স্যলাইন, বিস্কিট, পানি প্রভৃতি খাওয়াচ্ছে। আমরা কাছে যাওয়া মাত্রই একটা মেয়ে বললো কী দেবো? পানি, না কি স্যালাইন পানি? আমি স্যলাইন পানিই পান করলাম, বন্ধুটিকেও নিতে বললাম। স্যালাইন খাওয়া শেষে মেয়েটিকে ধন্যবাদ দিয়ে যখন চলে আসছি, তখন বন্ধুটি শুধালো এগুলো কি ফ্রি খাওয়ালো? আমি বললাম, ওরা বিপন্ন মানবতার পাশে দাড়িয়েছে। তাদের প্রতি স্যালুট দাও।

মাঠে স্বজনহারাদের আহজারি ভারি করে ফিরছিল বাতাস। আর কর্পোরেট সাংবাদিকদের দেখলাম স্বজনহারাদের আহাজারিকে পুজি করে সাংঘাতিকভাবে সাক্ষাতকার নিচ্ছেন। ক্যামেরার সামনে সজনহারাদের ভিড় আর সাংবাদিকের হাতে মাইক্রফোন। দৃশ্যটা কেন জানি আমার কাছে অমানবিক মনে হচ্ছিল। মনে পড়ছিল, হুমায়ুন আজাদের একটা কথা, আমাদের কাছে যা শোক, সাংবাদিকের কাছে তা সংবাদ। তবে মনকে প্রবোধ দিলাম এই ভেবে যে, সংবাদগুলো আর যাই হোক আমাদের ভেতরের ঘুমিয়ে থাকা মানবিক স্বত্বাগুলোকে জাগিয়ে দিচ্ছে। একটা ক্যামেরার সামনে দেখলাম স্কুল ড্রেস পড়া একটি মেয়ে তার ভাইয়ের ছবি নিয়ে দাড়িয়ে আছে যে কি না একটু আগেই আমাদের মত লোকদের পানি খাওয়াচ্ছিল। কাছে গিয়ে শুনলাম তার বড়ভাই রানা প্লাজায় চাপা পড়া হতভাগাদের একজন। ধ্বসের পরদিন পর্যন্ত ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ ছিলো মোবাইলের মাধ্যমে। কিন্তু এখন আর কোন যোগাযোগ তো দুরে থাক সে জানেই না তার ভাই মরে গেছে না কি বেচে আছে। সে তার ভাইয়ের সন্ধান চায় জীবিত কিংবা মৃত। এই মেয়েটির মনোবল আর মানবিকতার কাছে নিজেকে নিতান্তই তুচ্ছ মনে হচ্ছিল তখন, ভাই হারানোর শোককে চাপা দিয়ে এসে গেছে মানুষের সেবায়। মেয়েটির কাছ থেকে দৃঢ় মনোবলের শিক্ষা আমাকে পরবর্তি জীবনে আরো অনেক কিছু করতে শেখাবে নিশ্চিত।

অধর চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে আরো কিছুক্ষন ঘোরাঘোরি আর মানুষের সাথে কথা বলে হাটতে শুরু করলাম এনাম মেডিকেলের দিকে। স্বজনহারা মানুষের একটাই আকুতি সন্ধান দাও জীবিত কিংবা মৃত। কেউ কেউ বলছে লাশ লাগবেনা অন্তত বলে দাও যে সে মারা গেছে আর কোনদিন ফিরবেনা, লাশের হিসেব থেকে ফেলে দিওনা আমার ভাইটিকে, আমার বোনটিকে। এ মাতমের মাঝখানে নিজের অপারগতা পালাই পালাই করে ধিক্কার দিচ্ছিল অন্তরাত্মাকে। চোরের মত বেরিয়ে আসি স্কুলের মাঠ থেকে।

এনাম মেডিকেলের আশেপাশে দেখলাম আরো কিছু সাহায্য ক্যাম্প। কেউ এখানে রোগীর তথ্য দিয়ে সাহায্য করছেন, কেউবা দিচ্ছেন স্বজনদের বিশ্রামের স্থান। আর পানি, বিস্কুট, স্যালাইনের ক্যাম্প তো আছেই। আমাদের ইচ্ছা সংগৃহিত টাকাগুলো এনাম মেডিকেলের ফান্ডে প্রদান করা, কিভাবে দিতে হবে তা তো জানিনা। গেটে তথ্য সরবরাহকারী কয়েকজন ইন্টার্নী ডাক্তারের সাথে কথা বলে যা বুঝলাম, মেডিকেল কর্তৃপক্ষ কোন অনুদান গ্রহন করছে না। তারা আরো বললেন, যে কোন প্রতিষ্ঠান কিংবা সংগঠনকে দেয়াও ঠিক হবেনা, কারন কোন কোন সংগঠন নাকি টাকা হাতিয়ে ফুরুত হয়েছে। এ কথা শুনে মেজাজ যে কি পরিমান খারাপ হলো তা বলে বুঝানো যাবেনা। শালার নষ্ট হয়ে যাওয়া মানুষগুলো কি কখনোই ভাল হবে না? তাই ডাক্তারদের পরামর্শ অনুযায়ী রোগীদের হাতেই টাকাগুলো দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। তারা জানালেন গুরুতর আহতরা আছেন তৃতীয় তলায়।

তৃতীয় তলা মূলতঃ ইনসেন্টিভ কেয়ার ইউনিট। সেখানে সাধারন মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ। কিন্তু গেটে আমাদের কথা বলার পর অনুমতি মিলল, তবে বিশেষ ধরনের পোশাক পড়া বাধ্যতামূলক। পোশাক পরে ভিতরে প্রবেশ করে থমকে গেলাম। কি দেখছি? যে বিছানায়ই তাকাই সেখানেই দেখি কারো হাত নেই, কারো পা নেই, কারো হাত পা কোনটিই নেই। এই দৃশ্য দেখে অনেকটা সময় এক জায়গায় দাড়িয়ে দাড়িয়ে বিরবির করছিলাম এ কি দেখছি, এ কি দেখছি?

খানিকটা ধাতস্থ হয়ে ধীর পায়ে গেলাম একজন রোগীর কাছে। আস্তে আস্তে কথা বলতে চেষ্ট করলাম, তবে উত্তর পেলাম বেশ সাবলিলভাবে। ডাক্তার জানালেন রোগীরা বেশ দ্রুত রিকভার করছে। তাদের মনোবল অনেক বেশি। কথা বলে জানলাম তারা অধিকাংশই ভবন ধ্বসের পরদিনই উদ্ধার হয়েছেন। তাদের হাত পা না কেটে বের করার কোন উপায় ছিলনা। হাত-পাহীন মানুষগুলোকে বেশি সময় ঘাটানো নিজের কাছে কেমন অমানবিক মনে হচ্ছিল। তাই তাড়াতাড়ি দুইবন্ধু মিলে তাদের হাতে টাকাগুলো তুলে দিলাম। হাত-পা কাটা ১২ জন রোগীকে ১০০০ টাকা করে আর অন্যান্য ১৮ জনকে ৫০০ টাকা করে মোট ২১০০০ টাকা দিলাম। এর মধ্যে তিনজন রোগী ঘুমে অচেতন ছিলেন। তাই ডাক্তার সাহেব তাদের বেডের নাম্বার লিখে একসাথে তিনহাজার টাকা বুঝে রাখলেন। ডাক্তারদের কাছে জানতে চাইলাম আমরা যে রোগীদের সাথে কথা বলছি তাতে কোন সমস্যা হচ্ছে কি না? তিনি জানালেন আপনাদের মত শুভাকাংখীরা আসছেন বলেই রোগীদের মনোবল বেড়ে যাচ্ছে। তখন বেশ ভাল লাগছিল।

টাকা বিতরন শেষে ফেরার সময় আবার একটা ক্যাম্প থেকে ডাক পেলাম পানি খাওয়ার। সাড়া দিয়ে পানির গ্লাস হাতে নেয়ার সময় আরেকটা বিস্কুটও হাতে ধরিয়ে দেয়া হলো। মানুষের এমন ব্যবহারে কান্না এসে গেলো। না আমরা এখনো মানুষই আছি। এই মানুষগুলোর জন্য যদি গর্বে বুক ফুলে উঠে তাহলে কি বুকের কোন দূষ হবে? যাই হোক আবার অভিশপ্ত রানা প্লাজায় উকি দিয়ে দেখলাম ক্রেনগুলো তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এবার বেশ আগেই ঢাকায় ফেরার বাস পেয়ে গেলাম। বাসে উঠে যখন ঢাকায় ফিরলাম তখন বিকাল সাড়ে পাচটা।

ঢাকায় ফিরেই কয়েকজন বন্ধুর সাথে দেখা করার জন্য গেলাম। তারা যখন সিঙ্গারা এনে দিল খাবার জন্য তখন খেয়াল হলো দুপুরে কিছুই খাওয়া হয়নি আমাদের।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৫ thoughts on “সাভার বিপর্যয় ও দিনলিপি ২৯/০৪/১৩

  1. স্যালুট আপনাদের। ঠিক একই
    স্যালুট আপনাদের। ঠিক একই চেতনায় এদেশে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। হাজার হাজার টাকা খরচ করে আল্লামা সফির মত ধর্ম ব্যবসায়ীরা হেলিকপ্টারে চড়ে। আর দেশের শ্রমিকরা অকাতারে প্রাণ হারাচ্ছে। এদেশে সফির মত ধর্ম ব্যবসায়ীর চেয়ে শ্রমিকের প্রয়োজন বেশী। আমি একজন শ্রমিককে যতটুকু শ্রদ্ধার চোখে দেখি, ঠিক ততটুকু ঘৃণা ও অশ্রদ্ধার চোখে দেখি সফি’র মত ধর্ম ব্যবসায়ীদের।

  2. স্যালুট আপনাদের… কি বলব…
    স্যালুট আপনাদের… কি বলব… ভাষা হারিয়ে ফেলেছি… প্রিয়জন বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে, এই দ্বিধা নিয়ে সারা জীবন কষ্ট বুকে চেপে রাখা কিভাবে সম্ভব জানিনা…

  3. একটা সময় আসবে ঠিকই যখন মানুষ
    একটা সময় আসবে ঠিকই যখন মানুষ কোন প্রতিবন্ধকতার চিন্তা না করে বিপন্নের পাশে দাঁড়াবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

10 + = 13