ব্লগারদের কথা ভুলিনি

আমাদের মনে আছে কি, মারটিন নিমোলারের সেই বিখ্যাত উক্তিটি?

In Germany, they came first for the communists and I didn’t speak up because I wasn’t a communist. Then they came for the Jews, and I didn’t speak up because I wasn’t a Jew. Then they came for the trade unionists, and I didn’t speak up because I wasn’t a trade unionist. Then they came for the Catholic, and I didn’t speak up because I was a Protestant. Then they came for me, and by that time no one was left to speak up.

আজ মে দিবস। শ্রমিকদের মজুরি মেটানো নিয়ে, ন্যায্য অধিকার নিয়ে, পুঁজিবাদীদের বিরুদ্ধে অনেক লেখাই আজ অনেকে লিখবেন। কিন্তু এই মুহূর্তে আমার প্রাণ কাঁদছে অন্য কারো জন্য যখন লক্ষ্য করছি, আজ একমাস হতে চললো বাঙলা ব্লগস্ফিয়ারে চারজন ব্লগার অনুপস্থিত। শুধু অনুপস্থিতই নন, তাঁরা এই একমাস জেলে আটকে আছেন। আরেকবার মনে করিয়ে দিই, গত ১ এপ্রিল মধ্যরাতে ৩জন ব্লগার রাসেল পারভেজ, মশিউর রহমান বিপ্লব এবঙ সুব্রত অধিকারী শুভকে ‘ধর্মীয় অনুভুতি’তে আঘাত দেওয়ার অভিযোগে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা পুলিশ। এখানে উল্লেখ্য যে, সুব্রত অধিকারী শুভ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাঙলা বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র এবঙ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ভঙ্গ করে প্রোক্টর ও প্রভোস্টের অনুমতি না নিয়েই আকস্মিকভাবে তাঁকে জগন্নাথ হল থেকে একটি মাইক্রোবাসে করে তুলে নিয়ে যায় গোয়েন্দা পুলিশ।

পরের ঘটনা সবারই জানা। গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির অপরাধ প্রমাণের আগে মিডিয়ার সামনে হাজির না করার বিষয়ে হাইকোর্টের নির্দেশনা থাকলেও আদালতের ঐ নিষেদ্ধাজ্ঞা অমান্য করে ২ এপ্রিল তিন ব্লগারকে গণমাধ্যমের সামনে উপস্থাপন করা হয়। দাগী আসামিদের মতো করে তাঁদেরকে মিডিয়ায় দেখানো হয়। সাথে দেখানো হয় তাঁদের ব্যবহৃত ল্যাপটপ, ডেস্কটপ কম্পিউটার এবঙ মডেম যেনো সেগুলো তাঁরা ‘অস্ত্র’ হিশেবে ব্যবহার করে কোনও বড় রকম অপরাধ করে বসেছেন! এ নিয়ে পরে হাইকোর্টে ৭ এপ্রিল একটি রিট আবেদন দাখিল করা হয়। এর ফলে গতকাল ৩০ এপ্রিল তিন ব্লগারকে গণমাধ্যমের সামনে হাজির করা কেনো অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে এভাবে গণমাধ্যমের সামনে হাজির করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, রুলে তা-ও জানতে চাওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্রসচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক, ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার, মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (গণমাধ্যম), শেরেবাংলা নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও উপপরিদর্শক সাজ্জাদ হোসেনকে তিন সপ্তাহের মধ্যে এই রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
এর আগে গত ৩ এপ্রিল গোয়েন্দা পুলিশ ঐ একই অভিযোগে আরেক ব্লগার আসিফ মহিউদ্দীনকেও গ্রেফতার করে। এরপর আবারও ১০ এপ্রিল ইসলাম ধর্ম নিয়ে অবমাননাকর পেইজে ‘লাইক’ দেওয়ার অভিযোগে সিলেটের দুই ফেসবুকার বিজয় চন্দ্র এবঙ পার্থসারথী দাশকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তাঁদের গ্রেফতারের খবরটুকু মিডিয়ায় এলেও পরবর্তীতে তাঁদের বিচারের কী হলো তা জানায়নি কোনও মিডিয়াই। তবে এই দু’জন ফেসবুকার এখন অব্দি ছাড়া পাননি বলেই আমার ধারনা।

বাঙালি বড়োই বিস্মৃতিপ্রবণ এক জাতি! গত ২৪ এপ্রিল সাভারে বহুতল ভবনধ্বসের ঘটনায় আমাদের সবার দৃষ্টি এখন ঐ দিকে। আমি নিজেও এই মানবিক বিপর্যয়ে চরমভাবে শোকাহত। কিন্তু এতোকিছুর পরেও আমার অন্তরাত্মা কিছুতেই ঐ ব্লগারদের কথা ভুলতে পারছে না। আমার বারবার মনে পড়ে যায় ছোটোবেলায় শেখা সেই প্রবাদঃ অসীর চেয়ে মসী বড়। আমি ভুলতে পারি না- যে মুহূর্তে আমি নিশ্চিন্তে ঘরে বসে আমার মতামত তুলে ধরে এই ব্লগপোস্টটি লিখছি, ঠিক সেই মুহূর্তেই শুধুমাত্র ব্লগে নিজের মতামত প্রকাশের দায়ে জেল খাটছেন চারজন কিবোর্ড-যোদ্ধা। একই সঙ্গে আমি উদ্বিগ্ন হয়ে লক্ষ্য করি, চার ব্লগারদের গ্রেফতার করা হয়েছিলো ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায়। এরপর তাঁদেরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নেওয়া হলেও সেই অভিযোগের সপক্ষে কোনও সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রমাণ হাজির করতে পারেনি পুলিশ। ফলাফল- চারজনের নামে কোনও মামলা না থাকা সত্ত্বেও ব্লগারেরা দিনের পর দিন জেলে আটকে থাকেন। পরে গত ১৭ এপ্রিল পুলিশ ২০০৬ সালের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ (২) ধারায় আসিফ মহিউদ্দীনের নামে একটি এবঙ বাকি তিন ব্লগারের নামে একটি মামলা করে। আইনের এই ধারাটি নিয়েও রয়েছে নানা বিতর্ক।

ব্লগারদের গ্রেফতারের পরপরই সরব হয়ে ওঠে দেশের ও বিদেশের বিভিন্ন সঙগঠন। প্রতিবাদের ঝড় ওঠে মিডিয়ায়, আন্দোলন শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রজন্ম চত্বরে গণজাগরণ মঞ্চ থেকেও চার ব্লগারের মুক্তির দাবি তোলা হয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিডিয়াও তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করে বাকস্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপের এই খবর ছাপায়।
একথা ভুলে গেলে চলবে না- যাদেরকে গ্রেফতার করা হয়েছে, তাঁরা আমাদেরই ভাই, আমাদেরই সহযোদ্ধা। জেলে আটকাবস্থায় তাঁরা কীভাবে দিন কাটাচ্ছেন, তাঁদের পরিবারই বা কেমন আছে- তা শুধু তাঁরাই জানেন। সেই কষ্ট কোনও ভাবেই আমরা উপলব্ধি করতে পারব না। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে যে এই ব্লগারদের আটক করা হয়েছে শুধু নিজের মত প্রকাশের অপরাধে। তাঁরা ব্লগে যা-ই লিখে থাকুন না কেন, সেটি তাঁদের নিজস্ব মতামত। অর্থাৎ এই গ্রেফতারের মাধ্যমে আমাদের নিজস্ব চিন্তা-চেতনা প্রকাশের পথে একটি শিকল টানা হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে কাল বা পরশু যে আপনিই মত প্রকাশের দায়ে গ্রেফতার হবেন না তার কোনও গ্যারান্টি আছে কি? অতএব, এটাই শেষ সময়- আমাদের জেগে ওঠার, এটাই শেষ সময় আমাদের নিরাপত্তা অর্জন করার। আটককৃত সকল ব্লগারের মুক্তির দাবি তুলুন এখনই।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১০ thoughts on “ব্লগারদের কথা ভুলিনি

    1. আসুন, আমরা সবাই মিলে সবগুলো
      আসুন, আমরা সবাই মিলে সবগুলো বাঙলা ব্লগে একদিন শুধু ব্লগারদের মুক্তির দাবিতে লিখি। সবাই মিলে এগিয়ে আসলে অবশ্যই কাজ হবে।

      ——————————————————————-

  1. না আমরা ভুলি নি। আমরা ভুলি নি
    না আমরা ভুলি নি। আমরা ভুলি নি ধর্ষকরাও জামিন পায়, খুনির আসামীও জামিন পায়, চোর ডাকাত দুর্নীতিবাজ সবাই এখানে জামিন পায়, সুধু জামিন পায় না যারা অস্ত্র ব্যবহার না করে ব্যবহার করে কলম আর কীবোর্ড।

    1. আসুন, আমরা সবাই মিলে সবগুলো
      আসুন, আমরা সবাই মিলে সবগুলো বাঙলা ব্লগে একদিন শুধু ব্লগারদের মুক্তির দাবিতে লিখি। সবাই মিলে এগিয়ে আসলে অবশ্যই কাজ হবে।
      ——————————————————————-

    1. পড়ার জন্য ধন্যবাদ। ভোলা যায়
      পড়ার জন্য ধন্যবাদ। ভোলা যায় না কারণ এই পরিণতি হতে পারে আপনার-আমারও। 🙁
      ——————————————————

  2. আমি ইতিপূর্বে বলেছিলাম অহিংস
    আমি ইতিপূর্বে বলেছিলাম অহিংস আন্দোলন দিয়ে এদেশে কোন দাবী আদায় করা যাবে না। প্রয়োজন বিক্ষোভ মিছিল, অবরোধ ইত্যাদি কর্মসুচি। আমরা ব্লগে যত লেখা-লেখি আর চিল্লাচিল্লি করি না কেন কোন কাজ হবে না। আমাদের এ লেখা কোন মিডিয়া প্রচার করবে না, আমাদের লেখা কোন আমলা-মন্ত্রীরা পড়বে না বা পড়ে না। কারণ তারা অনেকে বুঝেনই না ব্লগ কি ব্লগে কি লেখা হয় বা কারা লেখে ! সুতরাং বুঝতেই পারছেন…..যা হবার তাই হবে….

    1. দুঃখের বিষয় এই যে, অনেক
      দুঃখের বিষয় এই যে, অনেক চেষ্টা করেও আপনার সাথে দ্বিমত পোষণ করতে পারলাম না। বড়োই অক্ষম আমরা! 🙁
      —————————————————————–

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 2 = 4