শেখ মুজিব কি সমালোচনার ঊর্ধ্বে

স্বাধীনতার মহাস্থপতি শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্য করায় একই পরিবারের দুইজনকে গ্রেপ্তার করে বাঙলাদেশ পুলিশ। সম্প্রতি শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে একটি আইনের খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। অর্থাৎ শেখ মুজিবকে স্মরণ করতে হলে শুধুমাত্র প্রশংসা করতে হবে। শেখ মুজিবের ক্ষেত্রে সমালোচনা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সমালোচনাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে। যেহেতু এই আইন সম্পর্কে এখনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা হয় নি, সেহেতু এই আইনের অন্যান্য দিকগুলি নিয়ে মন্তব্য না করা যাচ্ছে না।

আমি মনে প্রাণে শেখ মুজিবুর রহমানকে শ্রদ্ধা করি। সেইসাথে শেখ মুজিবকে সমালোচনা করার অধিকার রাখি। কোন কিছুই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। স্বয়ং ঈশ্বর কিংবা তার প্রেরিত গুন্ডাবাহিনীও সমালোচনা ঊর্ধ্বে নয়। সভ্য সমাজে মানুষ কথা বলবে, বাক্য বিনিময় করবে, ব্যয় করবে এটাই স্বাভাবিক। যে বিষয় নিয়ে কথা বলা যাবে না, মন্তব্য করা যাবে না, সমালোচনা করা যাবে না, স্পর্শ করা যাবে না- সে সব বিষয় নিয়েই মূলত পৃথিবী আজ রক্তাক্ত, ধ্বংসাত্ম্‌ক, হিংসাত্মক।

যেহেতু আওয়ামী হাসিনা সরকার এমন একটি দুঃসাহসী, অক্ষরজ্ঞানহীন, অসভ্য পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে সুতরাং তা দেশের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে না। বরং সহিংসতা বাড়বে। আওয়ামীলীগ এমন একটি ধারা প্রণয়নের চেষ্টায় আছে যা ভবিষ্যতে বিএনপি জামাতী ক্ষমতায় এলে ঘোষণা দেবে, জিয়াউর রহমানের সমালোচনা করলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড নয়, ফাঁসি দেয়া হবে। অর্থাৎ সমাধান নেই কিন্তু সমস্যার সৃষ্টি আছে। এই প্রেক্ষিতে তখন তারা কুযুক্তি উপস্থাপন করবে, আওয়ামীলীগ ফুটপাতে পায়খানা করেছিলো তখন সেটা তাদের স্বাধীনতা ছিল। এখন আমরা রাস্তায় পায়খানা করবো- এটা আমাদের স্বাধীনতা। দেশের রাজনীতির চিত্র তো এমনই।

এই দুটি রাজনৈতিক দলের হিংসাত্মক কর্মকাণ্ডের ফলে সাধারণের উপকার কোন অংশেই হয় নি বরঞ্চ ক্ষতির পরিমাণই বেশি। প্রায়ই শোনা যায়, মুজিব কিংবা জিয়া- তাদের চেতনা চারিদিকে ছড়িয়ে দিতে হবে। কিন্তু কীভাবে? তাদের চেতনা কী- এটাই তো তাদের নিজেদের রাজনৈতিক কর্মীরাই জানে না। ঈশ্বরের সমালোচনায় মানুষ জবাই করা হয় আর শেখ মুজিবের সমালোচনায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে, এগুলো তো সভ্য সমাজে মেনে নেয়া যায় না। তবে কি এই সমাজ বর্বরতায় ভরা?

শেখ মুজিবকে কেনো স্পর্শকাতর করে রাখতে হবে? শেখ মুজিবকে সমালোচনা করা কেনো অন্যায় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে? এতই যদি শেখ মুজিবপ্রেমি হতে হয় তাহলে বাঙলাদেশের সব কয়টি দোকানপাট, রাস্তা, স্থাপনার নাম পরিবর্তন করে মুজিব রাখা হোক, মুজিবের ছবি দিয়ে আন্ডারওয়্যার বের করা হোক, ব্রা-পেন্টিতে মুজিবের ছবি দিয়ে আওয়ামী লেখা হোক, জুতো-মুজো-যানবাহন সব কিছুতেই মুজিবের ছবি ছাপানোর ব্যবস্থা করা হোক। শেখ মুজিবের সমালোচনা নিষিদ্ধ করলেই যে তিনি সম্মানিত, শ্রদ্ধাশীল ব্যক্তি হয়ে থাকবে এবং তাঁর চেতনা ঘরে ঘরে পৌঁছাবে এটা শুধু আহাম্মক মন্ত্রীসভার স্বপ্ন দোষের ফসল।

চে গেভারার কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। অর্ধেক মানুষ যারা চে গেভারার মুখওয়ালা টিশার্ট বা টুপি পরে, তারা কেউই চে’ সম্বন্ধে অবগত নন। চে শুধুমাত্র রেবেল অর্থে ব্যবহারের ক্ষেত্রেই নেমে এসেছে। চে’ একটি পণ্য। মুজিবকে এভাবে চূড়ান্ত অস্পৃশ্যতার শিখরে বসানো কি তাহলে তাকে রাজনৈতিক পণ্যে পরিণত করা নয়? ঈশ্বরের নামে ব্যবসা করতে তো ধর্মব্যবসায়ীর অভাব ছিল না। এই একই ধারায় এখন মুজিব-প্রীতি-কে কি তবে মুজিবের পণ্যায়ন বলে ধরা যায় না? এবং যদি তাই হয়, এর চেয়ে চরম অবমানন আর কী কখনো হতে পারে?

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

21 + = 27